২০ নভেম্বর ,সোমবার, ২০১৭

শিরোনাম

> আন্তর্জাতিক

 

নিউজ টোয়েন্টিফোর ডেস্ক:

১১ সেপ্টেম্বর ,সোমবার, ২০১৭ ১৫:২২:৪৩

রোহিঙ্গা শূন্য রাখাইনের ১৫০ গ্রাম


রোহিঙ্গা শূন্য রাখাইনের ১৫০ গ্রাম


মিয়ানমারে শত শত বছর ধরে বাস করা রোহিঙ্গাদেরকে চিরতরে দেশছাড়া করতে চূড়ান্ত অভিযানে নেমেছে দেশটির সরকার। চালানো হচ্ছে বর্বর নির্যাতন ও গণহত্যা। ধর্ষণ করা হচ্ছে রোহিঙ্গা নারীদের। কেটে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে যুবক, শিশু, বৃদ্ধদের। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে শত শত রোহিঙ্গা বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রাণভয়ে এসব সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে আসছে বাংলাদেশে। এরইমধ্যে সে দেশের মংডু, বুচিডং ও রাচিডং টাউনশিপ (জেলা) এলাকার অন্তত ১৫০ গ্রাম রোহিঙ্গা শূন্য হয়েছে। বাকি রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে সীমান্তে স্থায়ী বেড়া দিয়ে দিতে চায় দেশটি। 

বেশ কিছুদিন ধরেই মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর চলছে বার্মিজ আর্মি, বিজিপি, নাসাকা বাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের হত্যাযজ্ঞ।

নাফ নদীর ওপারে এখনো জ্বলছে গ্রামের পর গ্রাম। প্রাণভয়ে টেকনাফের লাম্বা বিল, উখিয়ার আঞ্জুমানপাড়াসহ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে বানের পানির মতো লাখ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে বাংলাদেশে। নির্যাতনের শিকার সেইসব অসহায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় দিচ্ছে, একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য তাদের নিজ দেশ মিয়ানমারের রাখাইনে 'সেফ জোন' তৈরি করে তাদের ফেরত পাঠাতে চাইছে।

এদিকে অত্যাচারের মাধ্যমে অধিকাংশ রোহিঙ্গাকে ইতোমধ্যে দেশছাড়া করেছে মিয়ানমার। এখন সেখানে মাইকিং করে অবশিষ্ট রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার ছেড়ে চলে যেতে বলছে সেখানকার সেনাবাহিনী।

ধারণা করা হচ্ছে, চলমান সহিংসতায় মিয়ানমার থেকে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বাড়ি-ঘর অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে সেদেশের সরকারি বাহিনীর লোকজন ও সংখ্যাগরিষ্ঠরা। তবে ওই তিন জেলা শহরের সদরে সরকারি স্থাপনা ও কার্যালয়ের পাশে এখনো কিছু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ চরম বিপন্ন অবস্থায় টিকে রয়েছে। রাখাইনের (আরাকান) অন্য জেলাগুলোতেও সহিংসতা শুরু হওয়ায় সেখান থেকেও বিপন্ন মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে।  

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মিয়ানমার থেকে যারা আসছেন, তাদের অনেকেই গুলিবিদ্ধ, ক্ষুধার্ত ও জীর্ণশীর্ণ চেহারায় বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে অবস্থান নিয়েছেন। গতকাল রবিবার টেকনাফের লাম্বা বিল সীমান্তের বিপরীতে মিয়ানমারের নাইছাদং, পোয়াখালী, বলিবাজার, শিকদারপাড়া গ্রামে দিনভর আগুনের কুুণ্ডলী লক্ষ্য করা যায়। ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় আশপাশের এলাকা। উখিয়ার পালংখালীর আঞ্জুমানপাড়ার বিপরীতে মিয়ানমারের পোয়াংদিবন টমবাজার এলাকায়ও দিনভর আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এসব এলাকায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারে টহল দিয়ে দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করে। ওই এলাকাগুলোতে বসবাস করা কয়েক হাজার রোহিঙ্গা গতকালও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। তারা সীমান্তের লাম্বা বিলের পাশে লেদা মুছুনি নয়াপাড়া, থাইনখালী, বালুখালী ও কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। এর মধ্যে অনেকেই পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়ে একাই চলে এসেছেন। কোনো কোনো নারীকে দেখা যায় কোলের সন্তানকে নিয়ে একাই আসতে।  

তবে বাংলাদেশ সরকার বা আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা- কারো কাছেই পালিয়ে আসা মানুষের প্রকৃত কোনো সংখ্যার তথ্য নেই। নিবন্ধনের মাধ্যমে প্রবেশ না করানোয় এই সমস্যার সৃষ্টি। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের প্রায় স্থান দিয়ে রোহিঙ্গারা প্রবেশ করছে।  

বাংলাদেশে পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গা নেতা ও সু চির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির এক সময়ের কর্মী জানান, তিন জেলার অন্তত ১৫০টি গ্রামের কোনো রোহিঙ্গা আর সে দেশে নেই। প্রতি গ্রামে কম করে হলে তিন হাজারের মতো মুসলিম জনগোষ্ঠীর মানুষের বাস ছিল। কোনটায় আবার ২৫ হাজার। সব মিলিয়ে কমপক্ষে পাঁচ লাখ মানুষ এরইমধ্যে বাংলাদেশে এসেছে। তারা কেউই বাংলাদেশি বা বাংলাভাষী নয়। শতশত বছর ধরে তারা বংশ পরাক্রমে সে দেশে বাস করছেন এবং রোহান ভাষায় কথা বলছেন। রোহান ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষার হয়তো কিছুটা মিল আছে, কিন্তু তা বাংলা ভাষা তো নয়!

বুচিডং টাউনশিপের বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুম বলছিলেন, সীমান্ত পেরুনো মানুষের মধ্যে প্রথমেই এসেছে সীমান্ত জেলা মংডুর মানুষ। আঘাতটা তাদের ওপরই এসেছে প্রথম। নদী ও সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তারা এসেছে সহজে। কিন্তু বুচিডং ও রাচিডং জেলার মানুষদের অনেকপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। অন্য জেলাগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। সেখানকার মানুষও বাংলাদেশের দিকে রওনা দিয়ে পথে রয়েছেন বলে স্বজনদের কাছে জানতে পেরেছেন তিনি।  

এদিকে ১০টি কর্মপরিধি নির্ধারণ করে রোহিঙ্গা সেল গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। গতকাল জননিরাপত্তা বিভাগের রাজনৈতিক শাখা-১-এর উপসচিব আবু হেনা মোস্তাফা কামাল স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সেল গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সহিংসতা ও উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তের ওপার থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনুপ্রবেশের কারণে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাসহ সন্নিহিত সীমান্তবর্তী এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণসহ বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের সুবিধার্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ রোহিঙ্গা সেল গঠন করেছে।

এদিকে রোহিঙ্গা তাড়িয়ে সীমান্তে নতুন কাটাতারের বেড়া দিয়ে বর্ডার সিলগালা করে দিতে চায় মিয়ানমার। সেক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো দুষ্কর হয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ঠেকাতে বাংলাদেশের সাথে ১৭০ কিলোমিটার সীমান্তের বাকি থাকা ৪০ কিলোমিটার দ্রুত কাটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেলার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের মুখপাত্র ইউ জ থায়। 

দেশটির দৈনিক দ্য ইরাওয়াদিকে তিনি জানান, বেড়া নির্মাণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে চলতি অর্থবছরে কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না। তবে যেকোনো উপায়ে এই বেড়া নির্মাণ করা হবে। এজন্য আগামী বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। আমরা জানি না টাকা কোথা থেকে আসবে, তবে যে কোন উপায়ে এ বেড়া নির্মাণ করা হবে। গত বুধবার মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচির কার্যালয়ে রাখাইন নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের পর তিনি এ কথা জানান।

ওই দিন সুচির কার্যালয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠক হয় যেখানে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট, স্টেট কাউন্সিলর সুচি, ডিফেন্স ও নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যসহ সরকার উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।