খিচুড়ির আদ্যোপান্ত
খিচুড়ির আদ্যোপান্ত

খিচুড়ির আদ্যোপান্ত

শান্তা আনোয়ার

খিচুড়ি যে কবে থেকে বাঙালির রান্নাঘরে জায়গা নিয়েছিল কে জানে!  সেলুকাস, মেগাস্থিনিস, ইবন বতুতা, টারভিনিয়ের রোজনামচায় পর্যন্ত জায়গা করে নিয়েছে খিচুড়ি। সস্তায় পুষ্টিকর আর সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে এর জুড়ি মেলা ভার। একটা পুর্ণ প্লেট খিচুড়িতে আছে প্রায় ১১৭ ক্যালোরি তার মধ্যে ৩২.৩ গ্রাম শর্করা, ৮.৪ গ্রাম প্রোটিন আর চর্বির মাত্রা সামান্য ১.৫ গ্রাম। এর সঙ্গে আছে ফাইবার, ক্যালশিয়াম, আয়রন, ভিটামিন সি।

গ্রামীণ বাংলায় ‘খিচুড়ি’ শব্দটা নাকি অযাত্রা! তাই সাতসকালে, যাত্রাকালে এই নামটি বলতে নেই! যার এত সুখ্যাতি তার এই বদনাম! শুধু তাই নয় গোলমেলে, ভজকট ব্যাপার হলে সেটা নাকি ‘জগাখিচুড়ি’!

উত্তর ভারতে আবার পেট খারাপের মোক্ষম পথ্য হলো কলাইয়ের ডালের খিচুড়ি। খিচুড়ির এমনই কপাল সুকুমার রায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘হাঁস ছিল, সজারু (ব্যাকরণ মানি না)’-এর শিরোনাম ‘খিচুড়ি’!

মোগল বাদশাহরাও খিচুড়ির প্রেমে পাগল ছিলেন। সম্রাট আকবর সাত রকমের খিচুড়ি পছন্দ করতেন। গুলবদন বেগমের ‘হুমায়ুননামা’তেও স্থান পেয়েছে খিচুড়ির কথা। জাহাঙ্গিরের ‘লাজেজান’, শাহজাহানের ‘নওরতন’, আওরঙ্গজেবের ‘আলমগিরি খিচুড়ি’ মোগল খানদানে মাইলস্টোন হয়ে আছে। ইংরেজের হাত ধরে খিচুড়ির অনুপ্রবেশ ঘটেছে খোদ ইংল্যান্ডেও!

বাঙালির সাধের খিচুড়ি কিন্তু বর্ষার সঙ্গেও জুড়ে আছে। বৃষ্টি হলে আমাদের খিচুড়ি চাইই। হিন্দুদের মধ্যে আবার খিচুড়ির বৈষ্ণব, শাক্তের ভাগ আছে। সাধারণ ঘি, ডাল, চাল সহযোগে রান্নাটি বৈষ্ণবপন্থী। আর খিচুড়িতে পেঁয়াজ, রসুন, মাছ ছুঁইয়ে নিবেদন করা হয় শাক্তপুজোয়। খিচুড়ি যে কত রকমের হয় তার হিসেব কে রাখে! সব্জি, ভুনা, ভুজিয়া, সাবু, ভুট্টা, নবরত্ন বিভিন্ন প্রকারের ডাল, মাছ, মাংস, ডিম আরও কত কী!

লখনৌ নবাবিয়ানায় খিচুড়ি নিয়ে বহু কাণ্ড হয়েছে। এ ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে নবাব আসফউদ্দৌলা। সেকালের মস্ত এক প্রবাদ ঘিরে আছে এই মানুষটিকে কেন্দ্র করে—‘যো না দেতা মওলা/উও দেতা আসফউদ্দৌলা। ’ ঈশ্বর যা দিতে পারে না, এই মানুষটি তাই দেন। তাঁর খানা কিস্যার কথা লিখে গেছেন আবদুল হামিদ শরর। আসফউদ্দৌলা মাংসের কিমা দিয়ে ‘শাহি খিচড়ি’র প্রচলন করেছিলেন। জাফরান, পেস্তা, আখরোট সহযোগে খিচুড়িও রান্নাঘরে ঢুকিয়েছিলেন।

স্বামী বিবেকানন্দের ছোট ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের স্মৃতিচারণ। স্কুল ছুটির পর বাড়ি ফিরে এসে তাঁরা তিনভাই পাঁঠার মগজ দিয়ে খিচুড়ি খেতেন। একে খিচুড়ি তায় পাঁঠার মাথার ঘিলু— ধন্য হজমশক্তি!

ফেসবুক থেকে নেওয়া

news24bd.tv তৌহিদ

পাঠকপ্রিয়