নাসার বিজ্ঞানী হতে চায় বিস্ময়বালক ‘রুশো’ (ভিডিও)

নাসার বিজ্ঞানী হতে চায় বিস্ময়বালক ‘রুশো’ (ভিডিও)

অনলাইন ডেস্ক

জটিল সব গাণিতিক সমস্যার সমাধান করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন রাজধানী ঢাকার মনিপুর হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মাহির আলি রুশো। এই বয়সেই তিনি সমাধান করছেন বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের অঙ্ক ও বিজ্ঞানের নানা সূত্র। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ, যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটিসহ বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এখন পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি সনদ অর্জন করেছে সে।  

অল্প বয়সেই রপ্ত 
রুশোর বয়স যখন ১১ বছর, তখন সে ক্যালকুলাস এবং জ্যামিতিক বিভিন্ন সমাধান রপ্ত করে ফেলে।

১২ বছর বয়সে কলেজ পর্যায়ের গণিত ও ফিজিক্স অনায়াসে করতে পারত। করোনাভাইরাস সংক্রমণের সময় স্কুল বন্ধ হলে বিজ্ঞানের এসব বিষয়ে জানতে ব্যয় করে বেশি। ২০২০ সালের মার্চ থেকে সে অনলাইনে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত, ক্যালকুলাস, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি বিষয়ে অসংখ্য অনলাইন কোর্সে অংশ নেয়। তার মধ্যেই অনলাইনে ‘সেন্ট জোসেফ ন্যাশনাল পাই অলিম্পিয়াড’ সম্পর্কে জানতে পেরে এতে অংশ নেয় রুশো এবং হয়ে যায় চ্যাম্পিয়ন।  

নানা প্রতিযোগিতা ও অর্জন
এই ক্ষুদে জিনিয়াস দেশে এবং দেশের বাইরের অসংখ্য প্রতিযোগিতা ও অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ওপেন কনটেস্ট অলিম্পিয়াডে রুশোকে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় স্কলারদের সঙ্গে। ‘ওয়ার্ল্ড গ্লোবাল চাইল্ড প্রডিজি অ্যাওয়ার্ড কমিটি’ মাহির আলি রুশোর সম্মানসূচক অর্জনগুলোর প্রশংসা করেছেন। কমিটি জানিয়েছে, তারা রুশোকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

সেন্ট জোসেফ ন্যাশনাল পাই অলিম্পিয়াডে এ অংশ নিয়ে নটরডেমের শিক্ষার্থীকে হারিয়ে হয়েছে চ্যাম্পিয়ন। বাংলাদেশ ম্যাথমেটিক্স অলিম্পিয়াড, বাংলাদেশ ফিজিক্স অলিম্পিয়াড, জামাল নাল কেমিস্ট্রি অলিম্পিয়াড চ্যাম্পিয়ন এবং জামাল নাক্রল জ্যোতির্বিদ্যা উৎসব, ন্যাশনাল সাইবার অলিম্পিয়াড, বাংলাদেশ জ্যোতির্বিদ্যা অলিম্পিয়াডসহ অসংখ্য প্রতিযোগিতায় আঞ্চলিকভাবে বিজয়ী হয়েছে রুশো। এছাড়া বাংলাদেশ আইকিউ অলিম্পিয়াডে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন এবং ভারতে সিপিএস অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছে। এই কিশোর বাংলাদেশ বিজ্ঞান সংগঠন থেকে ‘গুগল-আইটি অলিম্পিয়াডে চ্যাম্পিয়ন পদক পায়। ‘হিগসিনো বায়োলজি অলিম্পিয়াড’ বিজয়ীও হয় সে।

তাছাড়া সেন্ট জোসেফ থেকে সুডোকু উৎসব, বাংলাদেশ সায়েন্স কংগ্রেসের সারা দেশের মধ্যে পদার্থবিদ্যা এবং ‘ফটোগ্রাফিং ডেসক্রাইবিং কনটেস্ট’ এর চূড়ান্ত বিজয়ী, ‘নেট্রোফিল সায়েন্স অলিম্পিয়াড অ্যাস্ট্রোনমি: বাংলাদশ রোবট’ নক-আউট রাউন্ডসহ অসংখ্য প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছে রুশো।

আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায়ও সেরা
দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ‘অনলাইন ফিজিক্স অলিম্পিয়াড-২০২১’ এ তার দল ইনভাইটেশনাল রাউন্ড বিজয়ী; তার অধিনায়কত্বে ১৫ জনের সদ্যসদ্যের একটি দল আন্তর্জাতিক ‘পারপেল ম্যাথ কমেট মেট’ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান দখল করে। ভারতে জ্যোতির্বিদ্যার আসর আইওএসএ-২০২১ একক প্রতিযোগিতায় গোল্ড মেডেল অর্জন করে রুশো এবং আন্তর্জাতিক আসরে ‘স্কুল কানেকশন ম্যাথ, সায়েন্স অ্যান্ড আর্টিফিশিয়াল কনটেস্ট’ এ জিতেছে স্বর্ণপদক। ‘স্টেমকো ইন্টারন্যাশাল ফিজিক্স, ক্যামিস্ট্রি, বায়োলজি’ প্রদত্ত বিষয়ে ‘বেস্ট অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন এবং সেরা মেধা তালিকায় থাকার গৌরব অর্জন করে।  
দেশভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘আউলিপিয়া সায়েন্স অ্যান্ড টেক কনটেস্ট’ এ পরপর দুইবার রৌপ্য পদক, একবার স্বর্ণপদক এবং দুইবার ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে বিজয়ী হয় রুশো এবং বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জের জন্য ২০২২ সালের জুনে যুক্তরাজ্য সফরের জন্য আমন্ত্রণপত্রও পেয়েছে।  
বাংলাদেশের এই কিশোর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলিম্পিয়াড ‘জিনিয়াস সেলেবরাম অলিম্পিয়াড’ থেকে আর্ট, জেনারেল নলেজ এবং সাইবার এ জিনিয়াস পদক অর্জন করেছে। এছাড়া সম্প্রতি হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি স্নাতকোত্তর স্টুডেন্ট কর্তৃক চালিত ‘ইন্টারন্যাশনাল লিডারশিপ ইথিকস অ্যান্ড লাইফ স্কিল অলিম্পিয়াড’ দ্বারা শ্রেষ্ঠ ৫০ জনের মেধা তালিকায় থাকার গৌরব অর্জন করে।  
ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড ফাউন্ডেশনের বেসরকারি অলিম্পিয়াড ইন্টারন্যাশনাল জিকে অলিম্পিয়াডে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ থেকে স্বর্ণপদক এবং গণিত অলিম্পিয়াডে ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে রুশো। এছাড়া পরিবেশ বিজ্ঞানেও তার সাফল্য রয়েছে। বাংলাদেশ ক্লাইমেট সায়েন্স অলিম্পিয়াডের আঞ্চলিক বিজয়ী এবং উইজডম একাডেমি ক্লাইমেট ফেয়ার-২০২১ এর ন্যাশনাল বিজয়ী সে।

গবেষণা ও প্রকাশনা
বিশ্বের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে এখন পর্যন্ত ৫০টিরও বেশি কোর্স করে সনদ অর্জন করেছে রুশো। যার মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ ও যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটির সনদ।  
বর্তমানে সে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ক্যামব্রিজের আওতায় ম্যানুফ্যাকচার ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে মাইক্রোমাস্টার্স কোর্সে অধ্যয়নরত রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বখ্যাত হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে কেমিস্ট্রি বিষয়ে মাইক্রোমাস্টার্স কোর্সে সুযোগ পেয়েছে। ১৪ বছর বয়সী এই কিশোর আইজেএসআর, আইওএসআর, কোয়েস্ট-এ বেশ কিছু জার্নাল প্রকাশ করেছে এবং গবেষণাপত্র লিখেছে।  

গর্বিত বাবা-মা
রুশোর বাবা সেন্ট্রাল মেডিক্যাল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান প্রফেসর মোহাম্মদ আলী বলেন, ক্লাস ফাইভ থেকেই বিজ্ঞানের প্রতি প্রচণ্ড ঝোঁক ছিলো রুশোর। সে সময় আমার একটা ল্যাপটপ ছিল, সেটাও খুব বেশি ভালো ছিল না। কিন্তু একটা পর্যায়ে আমি খেয়াল করি, সে আমার ল্যাটপটে ভিডিও দেখছে। এসব ভিডিও ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ম্যাথের ভিডিও। আর সবগুলোই তার চেয়ে অনেক আপার লেভেলের।  
তিনি আরও বলেন, এরপর আমি একদিন তাকে ডেকে নিয়ে বলি, বাবা তুমি যেসব ভিডিও দেখো সেসব কি তুমি বুঝো, নাকি শুধু দেখো? তার উত্তর ছিল- বাবা আমি এসবই বুঝি। তারপর তার সঙ্গে কয়েকদিন আমি নিয়মিত কথা বলি। দেখলাম আসলেই সে বোঝে। সে সময় রুশো তার বাবা-মায়ের কাছে একটি আবদার করে বসে। সে প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা ইউটিউবে ভিডিও দেখতে চায়। প্রথমে বাবা-মা এতো সময় ভিডিও দেখায় কিছুটা আপত্তি করলেও পরে শর্ত দেয় যে, প্রতিদিনের পড়াটুকু ঠিকভাবে সেরে সকালে এক ঘণ্টা এবং রাতে এক ঘণ্টা করে ইউটিউব দেখতে পারবে। তাতেই রাজি হয় রুশো।  

রুশোর মা চিকিৎসক রুমা আক্তার জানান, অনেক ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, পড়ালেখার প্রতি ভীষণ ঝোঁক তার। আমার জন্য যখন কোনো বই কিনেছি, তখন তার জন্যও কিনেছি। আসলে সন্তানকে বুঝতে হবে। সে কি চায় সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানের চাওয়া থেকে আমাদের চাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিলে তাদের বিকাশ বাধাগ্রস্থ হয়।

হতে চায় নাসার বিজ্ঞানী
কিশোর মাহির আলি রুশো তার নিজের অর্জনে বেশ গর্বিত। তার কাছে মনে হয়, সায়েন্স আসলে ‘ভয়েস অফ গড’, যার নেতৃত্বে থাকে ফিজিক্স। আর এর মূলে রয়েছে ম্যাথ যা জানার কোনো বিকল্প নেই। রুশো বলেন, কেউ কাউকে শেখাতে পারে না। নিজে থেকে শিখতে হয়। আমাদের সবসময় অ্যাকাডেমিক বইয়ের বাইরে পড়ার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। কেননা আমরা নিজের বই তো পড়বোই, তার বাইরে সেটা কেন হচ্ছে সেটা জানতে অন্য বইও পড়ব।  

ব্যাক্তি জীবনে রুশো প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার পাশাপাশি ইয়থফিজিক্স চ্যালেঞ্জ (iphoc.org) এর সিইও,কোয়ান্টাম লার্নিং ইউটিউব চ্যানেল, রুশো এডুকেশন প্ল্যানেট এ তার শিক্ষা এবং গবেষণা কাজ করে যাচ্ছেন।  

মাহির আলি রুশোর ইচ্ছে, একজন পদার্থবিদ এবং কসমোলজিস্ট মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার বিজ্ঞানী হিসেবে নিজেকে তৈরি করার পাশাপাশি দেশের বিজ্ঞান গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা রাখা। রুশোর মতে, প্রতিটি শিশুর মাঝেই রয়েছে অপার সম্ভাবনা। সঠিক পরিচর্যা পেলেই সম্ভব এই সুপ্ত প্রতিভার সম্পূর্ণ বিকাশ৷ এজন্য প্রয়োজন পারিবারিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উৎসাহ৷ রুশো বিশ্বাস করে মানুষের কর্মফল নির্ভর করে ৯০ শতাংশ তার চেষ্টা এবং বাকি ১০ শতাংশ মেধার ওপর।

news24bd.tv/desk

সম্পর্কিত খবর