বাগেরহাট বিআরটিএ : শেয়ালের কাছে মুরগী যেন সেবা গ্রহীতারা
বাগেরহাট বিআরটিএ : শেয়ালের কাছে মুরগী যেন সেবা গ্রহীতারা

বাগেরহাট বিআরটিএ : শেয়ালের কাছে মুরগী যেন সেবা গ্রহীতারা

বাগেরহাট প্রতিনিধি

বাগেরহাটের মোটরসাইকেল চালকদের জন্য 'ঘরে বিআরটিএ, রোডে ট্রাফিক’ এই প্রবাদ যেন অক্ষরে অক্ষরে পালিত হচ্ছে। চলতি বছরের আট মাসে বাগেরহাট বিআরটিএ ড্রাইভিং লাইন্সেস গ্রহীতাদের নিকট থেকে অর্ধকোটি টাকার বেশি উৎকোচ নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এই একই সময়ে ট্রাফিক পুলিশ মামলা দিয়েছে ৩৫৯৩টি। যা থেকে শুধু জরিমানা আদায় করা হয়েছে এক কোটি ৩১ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা।

বাগেরহাট বিআরটিএ থেকে ৫/৬ বার পরীক্ষা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না ড্রাইভিং লাইন্সেস। ৩০/৩৫ বছর মোটরসাইকেল চালিয়েও বাগেরহাট বিআরটিএতে ড্রাইভিং লাইন্সেস পরীক্ষায় অংশ নিয়েও ফেল করতে হয়। শুধু বাঁকা পথে বিশেষ তদবিরে মেলে ড্রাইভিং লাইন্সেস। আর বিআরটিএ কর্মকর্তাদের খারাপ ব্যবহার তো নিত্য সঙ্গী।

এ কারণে বাগেরহাট বিআরটিএ অফিস বাদ দিয়ে ব্যাপক সংখ্যক লোক পার্শ্ববর্তী জেলায় লাইন্সেসের জন্য চলে যাচ্ছে।

বিআরটিএর খুলনা অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত মাসে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে বাগেরহাটে সর্বনিম্ন ড্রাইভিং লাইন্সেসের কাজ হয়েছে। যেখানে যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরার মত জেলায় গত মাসে প্রায় এক হাজার থেকে হাজারের ঊর্ধ্বে ড্রাইভিং লাইন্সেস হয়েছে। এছাড়া নড়াইলের মত ছোট জেলাও গত মাসে প্রায় ৫ শত ড্রাইভিং লাইন্সেস হয়েছে। সেখানে বাগেরহাটের মত বড় জেলায় গত মাসে দুই শতাধিক লাইন্সেস হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই লাইন্সেসের অধিকাংশ আবার বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে হয়েছে।

বাগেরহাট বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৮ মাসে বাগেরহাটের ডিসিটিবি বোর্ড থেকে ড্রাইভিংয়ের জন্য পাশ করানো হয়ে ২৪শ' জনকে। একই সময়ে বাগেরহাট বিআরটিএ থেকে নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হয়েছে দুই হাজারের বেশি আর প্রায় দেড়শত গাড়ির ফিটনেস হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, যার অধিকাংশ বিশেষ সুবিধা ছাড়া কেউই সম্পন্ন করতে পারেনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিএ’র সাথে সংশ্লিষ্ট এক মোটর শোরুমের কর্মকর্তা জানান, বিআরটিএ অফিস এখন মোটরসাইকেলের শোরুমের মাধ্যমে বিশেষ সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে। তাদের নির্ধারিত লোকের কাছে চাহিদামত টাকা দিলে সব কিছু দ্রুতই সম্পন্ন হয়। না হলে চলে দীর্ঘ ঘোরাঘুরি। এক্ষেত্রে ড্রাইভিং প্রতি ২০০০ থেকে ২৫শ', নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশনে লাগে ১২শ' থেকে ১৫শ', আর গাড়ির ফিটনেস বাবদ দেয়া লাগে গাড়ী প্রতি ২৫শ'। এর মধ্যেই চলে নানা ধরণের সুপারিশ।

বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও বিআরটিএ অফিসের নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ, গত ৮ মাসে শুধু ড্রাইভিং লাইন্সেস বাবদ ৪০ লক্ষাধিক টাকা, নতুন গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বাবদ ২৫ লক্ষ টাকা আর ফিটনেস বাবদ ৩ লক্ষ টাকার বিশেষ সুবিধা নিয়েছেন বিআরটিএ মোটরযান পরিদর্শক। এছাড়া মোটরযান পরিদর্শকের বিভিন্ন দুর্ব্যবহারের কারণে জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন একাধিক ব্যক্তি। কিন্তু কোন প্রতিকার মিলছে না। নিজের ইচ্ছামতোই চালিয়ে যাচ্ছেন সকল কার্যক্রম।

অভিযোগ রয়েছে, বাগেরহাটের প্রতিটি ডিসিটিবি বোর্ডে দুই থেকে তিনশত লোকে ড্রাইভিং লাইন্সেসের জন্য অংশ নিলেও পাশ করে মাত্র যারা বিশেষ সুবিধা পায় তারাই। জানা গেছে, এই সুবিধা মোটরসাইকেল শোরুমের মাধ্যমে নেওয়া হয়। বিআরটিএ কর্তৃক নির্ধারিত মোটরসাইকেল শোরুমের নির্ধারিত লোকের কাছে টাকা না দিলে মেলে না ড্রাইভিং পাস।  

গত আগস্ট মাসের ৮ তারিখে পরীক্ষা দেয় দুই শত জনের উপরে। কিন্তু পাশ করে ১১৮ জন। ২২ তারিখ পরীক্ষা দেয় দুইশত জনের উপরে এখানেও পাশ করে ১২০ জন। আর ২৯ আগস্ট অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সার্বক্ষণিক উপস্থিতিতে পরীক্ষা দেন ২১২ জন। এই বোর্ডেও পাশ করে ৮৮ জন। এই পরীক্ষাগুলোতে মাঠে যারা পাশ করে পরে রেজুলেশনে তাদের নাম ওঠে না। ভিন্ন নামে ভিন্ন ব্যক্তিকে পাশ দেখিয়ে রেজুলেশন তৈরি করা হয়। মূলত পরীক্ষার প্রশ্ন করা, খাতা দেখা ও রেজুলেশন লেখার কাজ করেন বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক। আর ফিল্ডে পরীক্ষা নেওয়ার সময়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা, বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক থাকেন। যেটা শুধুই লোক দেখানো বলে অনেক পরীক্ষার্থী মন্তব্য করেছেন।

৩৫ বছর ধরে মোটরসাইকেল চালানো সদরের রেজা, আরাফাত, রামপালের ওমর ফারুক, মোংলার হাসান, চিতলমারীর নাজমুস সাকিবসহ ডিসিটিবির পরীক্ষায় অংশ নেওয়া একাধিক ব্যক্তি বলেন- ঘরে বিআরটিএ, রাস্তায় ট্রাফিক। তাদের মধ্যে গোপন চুক্তির কারণে হয়তো বাগেরহাটে বিআরটিএ ড্রাইভিং লাইন্সেস দিতে এমন ঘটনা হচ্ছে।

বাগেরহাট বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক রনজিৎ হালদার জানান, নিজের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করার চেষ্টা করি। নতুন চাকুরী এরপরও অফিসের সকলকে ম্যানেজ করেই তো সকল কাজ করতে হয়।

এ ব্যাপারে বাগেরহাট বিআরটিএতে সদ্য যোগদানকারী সহকারী পরিচালক কে এম মাহাবুব কবির জানান, তিনি নতুন এসেছেন। আর ড্রাইভিং পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত বোর্ড আছে। তারাই সবকিছুই বলতে পারবেন। তবে কেউ অভিযোগ দিলে তদন্ত করে দেখা হবে।

news24bd.tv/FA