শিশুদের কতটুকু ক্ষতি করছে সোশ্যাল মিডিয়া?
শিশুদের কতটুকু ক্ষতি করছে সোশ্যাল মিডিয়া?

সংগৃহীত ছবি

শিশুদের কতটুকু ক্ষতি করছে সোশ্যাল মিডিয়া?

অনলাইন ডেস্ক

সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার এখন শুধু বড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় এখন সবকিছুই ধরাছোঁয়ার মধ্যে। ফলে শিশু-কিশোররাও ঝুঁকে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে। সমস্যা হল, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের তেমন কোনো নিয়ম-নীতি না থাকায় ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ইন্সটাগ্রামের মতো জনপ্রিয় সব প্লাটফর্মে রীতিমতো আসক্ত হয়ে পড়েছে তারা।

টিকটক তো ব্যাধির আকার ধারণ করেছে।

শিশুদের ওপর যেভাবে প্রভাব ফেলছে
বিভিন্ন সামাজিক নেটওয়ার্ক ব্যবহারে মানুষ যেমন উপকৃত হচ্ছে, তেমনি এসবের অপব্যবহারে ক্ষতিকর প্রভাবও পড়ছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিশুদের ক্ষেত্রে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্রাউজিং, চ্যাটিংয়ে তাদের পড়ালেখার ক্ষতি যেমন হচ্ছে, তেমনি মানসিকভাবেও ক্ষতির মুখে পড়ছে তারা।

নৈতিক অবক্ষয় তো আছেই। সঙ্গে বাড়াচ্ছে বিরক্তি, উদ্বেগ এবং আত্মসম্মানবোধের অভাব।

সোশ্যাল মিডিয়া শিশুদের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে কয়েক বছর আগে বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি সমীক্ষা করা হয়েছিল। সেখানে প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা গেছে, অর্ধেক অভিভাবক মনে করেন, ফেসবুক, টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়া শিশুদের নৈতিক উন্নতিতে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের বেড়ে ওঠায় পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

বিখ্যাত আমেরিকান গবেষণা সংস্থা ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’ তাদের এক সমীক্ষা শেষে জানায়, ৯৫ শতাংশ তরুণ-তরুণী এখন স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে যার মধ্যে প্রায় ৪৫ ভাগ সারাক্ষণ অনলাইনে থাকে। এখন এই ব্যবহার কমানো চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে অভিভাবকদের জন্য। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার কোনো কোনো ব্যবহারকারীর মধ্যে হতাশা ও উদ্বিগ্নতা তৈরি করছে।  

সোশ্যাল মিডিয়ায় সবধরনের তথ্যই সামনে চলে আসে। যা নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও সম্ভব নয়। যে কারণে শিশুরা যেকোনো সময় তাদের বয়সের তুলনায় অনুপযুক্ত এবং ক্ষতিকারক কনটেন্ট বা বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা লাভ করছে। যা তাদের চিন্তা ভাবনাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা আদান-প্রদানের মাধ্যমে বাড়ছে সাইবারবুলিংয়ের মতো ঘটনা। এটি শিশুদের মনে যেমন ভয় ও লজ্জা ছড়ায়, তেমনি তাদের ওপর অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে।

কিছু গবেষণা বলছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আসক্ত হয়ে পড়লে শিশুরা তাদের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারে না। এতে পড়াশোনার মারাত্মক ক্ষতি হয়। অসময়ে খাওয়া-দাওয়া স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। অত্যধিক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে শিশুদের আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক বিকাশের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি চর্চায়ও বিরূপ প্রভাব ফেলে, তাদের জানার পরিধি ও জ্ঞানচর্চাকে সংকুচিত করে।

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে শিশুদের পড়ালেখায় কীভাবে প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে শিশু মনোবিজ্ঞানী কেট ইশলেম্যান বলেন, যদি বাচ্চাদের সোশ্যাল মিডিয়া বন্ধ করে তাদের বাড়ির কাজ করতে বলা হয়, তাহলে লক্ষ্য করবেন তারা বাবা-মায়ের প্রতি বিরক্তি বা হতাশা প্রকাশ করে। বিষয়টি এমন যে, তাদের এমন কিছু করতে বলা হচ্ছে যা তারা করতে চায় না এবং এমন কিছু করতে বারণ করা হচ্ছে, যা তারা উপভোগ করে।

কারা বেশি সম্পৃক্ত?
বেশিরভাগ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে বয়স কমপক্ষে ১৩ হতে হয়। তবে ভয়ংকর তথ্য হলো, এখন ১০ থেকে ১২ বছরের ৫০ শতাংশ শিশুই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে। ৭ থেকে ৯ বছর বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৩৩ শতাংশ।  শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা মিশিগানের সিএস মোট হাসপাতালের করা এক সমীক্ষায় উঠে আসে এই তথ্য।    

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন
বাংলাদেশের বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ নিউজ টোয়েন্টিফোরকে বলেন, ‘অতিরিক্ত সোশ্যাল সাইট নির্ভরতা মানেই হলো অতিরিক্ত ডিভাইস নির্ভরতা। এতে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবার পাশাপাশি শিশুটি মুটিয়েও যায়। এছাড়া তারা কুরুচিপূর্ণ সাইটে ঢোকার সুযোগ পায়। এতে চারিত্রিক অধঃপতন ঘটার আশঙ্কা থাকে। অভিভাবকদের উচিত, ডিভাইস থেকে দূরে রেখে শিশুদেরকে নিয়মিত খেলাধুলার অভ্যাস করা। ’

বাংলাদেশ আই হাসপাতালের বিশিষ্ট ফ্যাকো এবং গ্লুকোমা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শিশুরা যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার করে তখন তা তাদের চোখে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। ক্ষুদে ডিভাইসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতায় তাদের চোখের পাওয়ার কমে যায়, যাকে বলে ‘মায়োপিয়া’। এটি ছাড়াও চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত নানা রোগ দেখা দেয়। ফলে দেখা যায়, প্রাইমারি লেভেলেই পাওয়ারফুল চশমা পড়ে অনেক শিশু। ’

তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘পড়াশোনার বা প্রয়োজনের বাইরেও কিছু সময় তারা অভিভাবকের সমন্বয়ে সামাজিক সাইটগুলোতে থাকতে পারে। তবে তা যেন মাত্রাতিরিক্ত না হয়। শিশুদের হাতে স্মার্ট ফোন তুলে দেওয়া মোটেই ঠিক নয়। ’

news24bd.tv/সাব্বির