পঞ্চগড়ে নৌকাডুবিতে সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন
পঞ্চগড়ে নৌকাডুবিতে সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন

পঞ্চগড়ে নৌকাডুবিতে সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন

সরকার হায়দার, পঞ্চগড়

পঞ্চগড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করে সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছেন ওই এলাকার মানুষ। নৌকাডুবির পর মাড়েয়া এলাকার শত শত তরুণ নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অনেককে জীবিত উদ্ধার করে। পরে পানিতে ডুবে মরদেহ উদ্ধার শুরু করে।

ঘটনার দিনই ডুবে যাওয়া প্রায় ২৫টি মরদেহ উদ্ধার করে তারা। উদ্ধারকারীদের অধিকাংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের।

ঐতিহাসিক বদেশ্বরী মন্দিরে প্রতিবছর মহালয়ার দিনে পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসে সারা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বী।

তাদের আত্মীয় স্বজনের মঙ্গল কামনায় তারা করোতোয়া ও ঘোড়ামাড়া নদীর মিলনস্থলে স্নান করে। অনেকে মন্দিরে তর্পণ দেয়। সেদিনও মহালয়ার দিনে ওই মন্দিরে যোগ দিতে হাজারো পূজারি উপস্থিত হয়। তাদের অধিকাংশই আউলিয়া ঘাট দিয়ে নৌকাযোগে মন্দিরে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নৌকাটি যখন ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে তখন তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। উপস্থিত অনেকেই এতো যাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করতে নিষেধ করে। কিন্তু ঘাট ইজারাদার কারও কথায় কর্ণপাত না করে নৌকার ইঞ্জিন চালু করে। একটু এগোতেই নৌকায় পানি ঢুকতে শুরু করে। পরে ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। কাঁত হয়ে যায় নৌকা। আস্তে আস্তে পানিতে ডুবতে শুরু করে। এসময় চিৎকার শুরু করে নৌকার যাত্রীরা। এ অবস্থা দেখে ডুবতে থাকাদের উদ্ধারে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাড়ে থাকা মানুষ। তারা সাঁতরে দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে অনেককেই জীবিত উদ্ধার করে।

উদ্ধার কর্মীরা জানান, প্রথম দিন ২০ থেকে ২৫ জন নদীতে নামেন। এসময় চা শ্রমিক ও জেলেরা নদীতে নেমে উদ্ধার কাজে যোগ দেন। পরদিন স্থানীয় শতাধিক মানুষ মরদেহ উদ্ধারে নিখোঁজদের খুঁজতে থাকেন। তৃতীয় দিনেও তারা ডুবুরি দল এবং ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে এমন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে।

কমলাপুকুরী এলাকার ইকবাল জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে সজিব রায় এবং তার স্ত্রীকে। ওইদিনই সজিবের ছেলেরও মরদেহ উদ্ধার করে উদ্ধারকর্মীরা।

সজিব রায় জানান, স্থানীয়রা না হলে মরে যেতাম।

সর্দারপাড়া এলাকার জেলে বাবুল হোসেন জানান, মাছ ধরছিলাম। এসময় নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। সাথে সাথে জাল ফেলে তাদের উদ্ধারে নেমে যাই। দুজন জীবিত এবং চারজনের মরদেহ উদ্ধার করি।

সমাজ কর্মী সারোয়ার হোসেন জানান, উদ্ধারের দ্বিতীয় দিন আমরা দল বেঁধে নদীতে নেমে পড়ি। নদীর গভীরে ডুবে মরদেহ উদ্ধার করি। অনেক মরদেহের হাত কাটা। অনেকের পা নষ্ট হয়ে গেছে। অনেকের শরীরে পঁচন ধরেছে। অনেকের শরীর ফুলে গেছে। অনেক মৃতদেহ থেকে বিকট গন্ধ বের হচ্ছিল। অনেককেই চেনা যাচ্ছিল না। কিন্তু এসব তোয়াক্কা না করে উদ্ধার কাজে নিয়োজিত থাকি। কখনো কাউকে হিন্দু-মুসলিম মনে হয়নি।

হিন্দু ধর্মালম্বীরা বলছেন, যখন নৌকা ডুবে গেল তখন তারা বিহ্বল হয়ে পড়েন। দিশাহীন হয়ে যান তারা। তারা জানান, মুসলিম ভাইয়েরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার কাজে নেমে পড়েন।

আরাজি শিকারপুর এলাকার জমিদার বর্মণ জানান, মুসলিম ভাইয়েরা নিজের ভাইয়ের মতো আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা তাদের উপর সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো।

দেবীগঞ্জ উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিতু আক্তার জানান, উদ্ধারকর্মীরা নৌকাডুবির ঘটনায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বলেন, আমাদের এখানে হাজার বছর ধরেই হিন্দু-মুসলিম ভাই ভাই সম্পর্ক। তাদের পূজায় আমরা আনন্দ করি। তারা আমাদের ঈদে। তিনি স্থানীয় উদ্ধার কর্মীদের সাধুবাদ জানান।