আরশাদ শরীফ হত্যাকাণ্ড: নেপথ্যে জিহাদি অর্থায়নে হেরোইন সাম্রাজ্য
আরশাদ শরীফ হত্যাকাণ্ড: নেপথ্যে জিহাদি অর্থায়নে হেরোইন সাম্রাজ্য

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়েজ হামিদ, আজহার আব্বাস, সাহির শামশাদ মির্জা ও নওমান মাহমুদ রাজা

আরশাদ শরীফ হত্যাকাণ্ড: নেপথ্যে জিহাদি অর্থায়নে হেরোইন সাম্রাজ্য

অনলাইন ডেস্ক

গত ২৪ অক্টোবর কেনিয়ায় গুলিতে নিহত হন পাকিস্তানি সাংবাদিক আরশাদ শরীফ। তিনি পাকিস্তান সরকারের একজন স্পষ্টবাদী সমালোচক। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরের দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করছিলেন তিনি। তার হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের নানা দিক নিয়ে লিখেছেন প্রবীণ স্বামী।

গত ২ নভেম্বর ‌‘দ্য প্রিন্ট’ অনলাইন নিউজ পোর্টালে তার লেখাটি প্রকাশিত হয়। তার কলামের বাংলা অনুবাদটি তুলে ধরা হলো।    

আমস্টারডামের ব্যস্ত সড়কে সেদিন রক্তের ধারা নেমে এসেছিল। ঘাতকের বুলেট ভেদ করেছিল এক ড্রাগ মাফিয়ার বুক।

নাম ইব্রাহীম আবদাল্লা আকাশা। বহু বছর ভারত মহাসাগর দিয়ে কেনিয়ার রুট ধরে ইউরোপে বিস্তৃত করেছিলেন নিজের গাঁজা ও হেরোইনের মাদক সাম্রাজ্য। পুরো সময় জুড়ে চালিয়েছেন নিজের অপরাধের রাজত্ব। কিন্তু হঠাৎ খুন হন তিনি।

একইভাবে কেনিয়ার সড়কে যেন নেমে এলো আরেক রক্তের ধারা। গত মাসের শেষ দিকে নাইরোবির নির্জন সড়কে খুন করা হয় পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সমর্থক আরশাদ শরীফকে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ স্তরে দুর্নীতির বিষয়ে তদন্ত করছিলেন তিনি। সেই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তাকে শেষ করে দেওয়া হয়।  

এসব অভিযোগ সমর্থনও করেছে কর্তৃপক্ষ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল তারিক খান বলছেন, এই হত্যাকাণ্ডটি বেইমান ভাড়াটে খুনির হাতে ঘটেছে। তিনি বলেন, ওই খুনি একদল কথিত দেশপ্রেমিকের কথায় এই কাজ করেছেন যারা দুর্নীতির তথ্য ফাঁস হওয়ার চেয়ে তদন্তকারীকে সরিয়ে দেওয়া বেশি জরুরি মনে করে।

২২ বছরের ব্যবধানে দুটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে। আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা (আইএসআই) পরিচালনাকারী জেনারেলরা তহবিল সংগ্রহের জন্য আফগান ও পাকিস্তানি ড্রাগের যোগানদাতারা কীভাবে একসঙ্গে কাজ করছিল, সেই অদ্ভুত এক গল্পই জানানো হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

আইএসআই-এর হেরোইন সাম্রাজ্য

ব্যবসার নাম চাল বিক্রি। তবুও ম্যাগনাম আফ্রিকা লিমিটেড অফশোর ব্যাংকে নিজেদের গোপন অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে আসছিল। প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রেকর্ডে একটি পোস্ট অফিস বক্স নম্বর ও পরিচালকদের জাতীয়তার ঘরটি পূরণ করা হয়নি। এর মালিক আনোয়ার মুহাম্মদের কাছে পাকিস্তানি পাসপোর্ট থাকলেও সেটিতে জাতীয়তা ছিল না। মূলত ম্যাগনাম আফ্রিকার মালিক ছিলেন মুনাফ হালারি। ১৯৯৩ সালে মুম্বাইয়ে ২৫৭ জনকে হত্যাকাণ্ডে বোমা হামলায় ব্যবহৃত তিনটি গাড়ি সরবরাহ করেন তিনি।

বোমা হামলার পর গুজরাট পুলিশ অভিযোগ করে হালারি আইএসআই এর সহায়তায় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতা ইব্রাহিম মেননের দেওয়া পাসপোর্ট নিয়ে কেনিয়ায় চলে যান।  

১৯৭৯ সালে আফগান জিহাদ শুরু হলে আইএসআই হেরোইনের বিক্রির মাধ্যমে নগদ অর্থ আয় করতে মুজাহিদিন গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহিত করেছিলেন।

করাচি বন্দরে আফিমের চালানের নির্বিঘ্ন আমদানি রপ্তানি নিশ্চিতে তারা মুজাহিদিনদের সহায়তা করেছিল।

মুজাহিদিন কমান্ডার মোল্লা নাসিম আখুন্দজাদার বিষয়ে গবেষক গ্রেচেন পিটার্স বলেন, অনেক কৃষক পোস্ত চাষ করতে চাইতো। কিন্তু মুজাহিদিনরা তাদের আফিম চাষে বাধ্য করতো।

পাকিস্তানে সেনা শাসক জেনারেল মুহাম্মদ জিয়াউল হকের শাসনের বিষয়ে গবেষক ডেভিড উইনস্টন ন্যাটোর এক সমীক্ষায় বলেছিলেন, ‘দেশটি ব্যাপকভাবে হেরোইন ব্যবসায় জড়িত। ’

তিনি লেখেন, হেরোইন ব্যবসায়ীদের সরকারি সুরক্ষা, হেরোইন ব্যবসা থেকে সরকারি কর্মকর্তাদের লাভ দেওয়া ও সরকারে হেরোইন সিন্ডিকেটের রাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি হয় সেসময়। জেনারেল জিয়ার হত্যার পর আইএসআই মাদক বিক্রির সেই অর্থ কাশ্মীরে ব্যবহার করা শুরু করে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ অভিযোগ করেন, সেনাবাহিনী প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মির্জা আসলাম বেগ ও আইএসআই মহাপরিচালক আসাদ দুররানি গোপন সিরিজ সামরিক অভিযানের জন্য অর্থের প্রয়োজনে বড় আকারের মাদক ব্যবসার অনুমোদন দেওয়ার জন্য তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছিলেন।

ওই সময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজিত করার দিকে মনোনিবেশ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে আইএসআই-এর মাদক ব্যবসার দিকে নজর দিতে পারেনি মার্কিন কর্মকর্তারা।

সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (সিআইএ) আফগানিস্তানের অপারেশনের পরিচালক, চার্লস কোগান পরে সাংবাদিক লরেটা নেপোলিওনিকে বলেছিলেন, আমেরিকা শীতল যুদ্ধ জয়ের জন্য মাদকের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ বিসর্জন দিয়েছে।

পপি উদ্যোক্তারা

স্যুটকেসে দুই কেজি হেরোইন নিয়ে ফ্রাঙ্কফুর্ট বিমানবন্দরে ট্রানজিট নেয় এক যুবক। স্বাধীনচেতা আমেরিকান সোশ্যালাইট ও পাকিস্তানি এক উপস্থাপকের ছেলে যার এক চোখ নীল, অন্যটি বাদামি। আকর্ষণীয় যুবক ডেভিড কোলম্যান হেডলি আশা করেছিলেন পাকিস্তান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক ফেরি করলে তার আর্থিক সংকট কেটে যাবে। ড্রাগ এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি (ডিইএ) এর হাতে ধরা পড়ে তাকে ১৯৮৮ সাল থেকে চার বছরের কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।

১৯৯৭ সালের দিকে ডিইএ হেডলিকে আবার গ্রেপ্তার করে। তবে এবার মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে তাকে তথ্যদাতা হিসেবেও নিয়োগ করা হয়। এই যাত্রায় শেষ পর্যন্ত হেডলিকে পাকিস্তানের জিহাদিদের অন্ধকার জগতে ঠেলে দেয়।

হেডলি নতুন প্রজন্মের একজন পপি উদ্যোক্তা ছিলেন। যিনি ১৯৯৩ সালে বোমা হামলার পর ভারত থেকে পালিয়ে গিয়েছিল।

জাতিগত এশীয়রা বিশেষ করে যাদের করাচির সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে তাদের অনেকেই সোনা ও ইলেকট্রনিক্স চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকে। তাদের মূলত পেছন থেকে সমর্থন দিয়েছিল পাকিস্তান। এভাবে পূর্ব আফ্রিকার উপকূল জুড়ে কেনিয়ার আকাশ, তাহির শেখ সাইদ পরিবার, তানজানিয়ায় আলী খতিব হাজি হাসান, গুলাম রসুল মতি এবং মোজাম্বিকে মোমাদে রসুলের হাত দিয়ে মাদকের ছোট্ট সাম্রাজ্য ছড়িয়ে পড়ে।

আফগানিস্তানে তালেবান শাসনামলে হেরোইন উৎপাদন নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ইউরোপে পাচারের লাইন শুরুর দিকে ইরান হয়ে উত্তরে পূর্ব তুরস্কে ও মধ্য এশিয়া থেকে রাশিয়া পর্যন্ত চলে গিয়েছিল। দাউদ কার্টেল মীর ইয়াকুব বিজেঞ্জোর মতো পাচারকারীদের সহায়তা নিয়ে দক্ষিণে ভারত মহাসাগরে মাদক ব্যবসা ছড়িয়ে দেয়। বিশ্বের শীর্ষ চারটি কার্টেলের একজনের প্রধান হিসেবে নিজের নাম করা মীর ইয়াকুব সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের সোচ্চার সমর্থক ছিলেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ওয়াশিংটনের হাত ছেড়ে দিয়েছিলেন। ঠিক একইসময়ে তিনি মুহাম্মদ আনোয়ার খট্টক ও মির্জা ইকবাল বেগের মতো কুখ্যাত পাচারকারীদের প্রত্যর্পণ করান।

ওই সময় ইসলামাবাদ মাদকের টাকার লোভে পড়ে। ভুট্টোর মন্ত্রিসভার উপজাতীয় বিষয়ক মন্ত্রী ওয়ারিস খান আফ্রিদি পরে হেরোইন পাচারের দায়ে গ্রেপ্তার হন। নওয়াজ শরিফের ইসলামী জামহুরি ইত্তেহাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হাজি আইয়ুব আফ্রিদিও মাদকের নেটওয়ার্ক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

আইএসআই-এর দায়মুক্তির গ্যারান্টি মাদক সম্রাটদের বিকাশে ভূমিকা রাখে। করাচি ব্যবসায়ী জাবির ‘মতিওয়ালা’ সিদ্দিক প্রযুক্তিগত কারণে গত বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণ এড়িয়েছিলেন। তিনি করাচি স্টক এক্সচেঞ্জের পাশাপাশি দুবাই এবং পূর্ব আফ্রিকার সম্পত্তি ও মাদক ব্যবসা ছড়িয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।

ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, সকল সম্পদ জ্যেষ্ঠ জেনারেলদের সঙ্গে ভাগ করায় পাকিস্তান সরকারকে সিদ্দিকের মুক্তির জন্য কঠোর লবিং করেছিল।

২০০১ সালে করাচিতে সাংবাদিক গোলাম হাসনাইন লেখেন, দাউদ এই পৃষ্ঠপোষকতাকে পুঁজি করে উচ্চ জীবন যাপন করে। তিনি বলেন, তার দিন কাটতো আনন্দে। সে সাধারণত পানীয়, মুজরা এবং জুয়া খেলায় মগ্ন থাকতো।

রক্তের স্রোত

ব্লাড স্ট্রিটে হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে রক্তের এক স্রোত শুরু হয়েছিল। সেই স্রোতে একে একে যুক্ত হয় মাগদি ইউসুফ ও মিশরীয় বংশোদ্ভূত মাদক সম্রাট ইব্রাহীম আকাশা। ঘটনার দিন তিনি দীর্ঘসময় ধরে  মুলতুবি থাকা ২.৫ মিলিয়ন ডলারের অর্থ পাওয়া নিয়ে আলোচনা করতে কফি খেতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। ম্যাগদির ভাই মুনিরকে ২০০৪ সালে হত্যা করা হয়েছিল। ম্যাগদিদের কাছে টাকা পাওনা থাকা ডাচ মাদক ব্যবসায়ী স্যাম ক্লেপার ও তার লেফটেন্যান্ট জন ফ্লেমারকেও হত্যা করা হয়েছিল। চাঁদা নিয়ে পারিবারিক কলহের জের ধরে আকাশের দ্বিতীয় সন্তান কামালদিন নিহত হয়।

ইব্রাহিম আকাশের হত্যার ১৫ বছর পর এলিট স্পেশাল ফোর্সের কর্মীদের একটি ক্র্যাক দল মোম্বাসার বাইরে তার পাম-ফ্রিঞ্জড প্রাসাদ ঘিরে ফেলে। মার্কিন নেতৃত্বাধীন স্টিং অপারেশনের ফলে আকাশের ছেলে বক্তাশ ইব্রাহিম ও তাদের ভারতীয় সহযোগী বিজয়গিরি গোস্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাদক ও অস্ত্র পাচারের দায়ে আগামী দুই দশক কারাগারে কাটাবেন দুই ভাই।

যদিও হত্যা ও গ্রেপ্তার হেরোইন ব্যবসাকে আড়ালে রেখেছে। জাতিসংঘ এই মাসে সতর্ক করে জানায়, তালেবানের অধীনে আফগান মাদক উৎপাদন আবার বেড়েছে।

করাচির পুলিশ সূত্র বলছে, দাউদ কার্টেল তার পিতৃপুরুষের মৃত্যুর পর একটি সুশৃঙ্খল উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে। যার নিয়ন্ত্রণ তার ছেলে মঈন এবং ভাই আনিস এবং মুস্তাকিম-এর পাশাপাশি আইএসআইকে দেওয়া হয়েছে।

আরশাদ শরীফের হত্যাকাণ্ড আরও প্রমাণ করতে পারে আইএসআই তার গভীরতম গোপনীয়তা রক্ষা করতে কতদূর যাবে। মাদক ব্যবসায়ী বিজেঞ্জোর বিষয়ে রিপোর্ট করার পর জাতিগত-বেলুচ সাংবাদিক সাজিদ হুসেনকে মৃত উদ্ধার করা হয়। আইএসআই-এর সবচেয়ে সোচ্চার সমালোচকদের মধ্যে থাকা সাংবাদিক আহমেদ ওয়াকাস গোরায়াকেও ‘ডিপ স্টেট’ হত্যা করে বলে সন্দেহ করা হয়। আলেম আয়েশা সিদ্দিকা ও সাংবাদিক ত্বহা সিদ্দিকীকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।

পপির বিষাক্ত গন্ধ জেনারেলদের রক্তের দুর্গন্ধ লুকাতে সাহায্য করেছে।

news24bd.tv/ইস্রাফিল