একশো বা দুইশো বছর পর মানুষ কি আমার কথা মনে রাখবে?
একশো বা দুইশো বছর পর মানুষ কি আমার কথা মনে রাখবে?

শত বছর পর কেউ মনে রাখলে তা হবে অনেক বড় পাওয়া

একশো বা দুইশো বছর পর মানুষ কি আমার কথা মনে রাখবে?

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

আজ থেকে শত বছর পরের কথা একটু কল্পনা করি...।  

ধরুন, ক্যালেন্ডার পাতায় তখন সাল হয়তোবা ২১২৩। এটা বলা যায়, আজকে আমরা যারা পৃথিবীতে বেঁচে আছি, সেই সময় একজনও হয়তো বেঁচে থাকবো না। প্রত্যেকে আমরা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব।

আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তখন হয়তো আমাদের জমি-জমা, বাড়ি-ঘর, টাকা-পয়সা সবকিছু ভোগ করবে। আমাদের এতো সাধের গাড়ি, বাড়ি, কাপড়-চোপড়, গহনা কিছুই হয়তো থাকবে না তখন।  

আচ্ছা, তখন কি আমার কথা কেউ ভাববে? আমাদের পরবর্তী প্রজন্মও কি আমাকে/আমাদেরকে মনে রাখবে? এর উত্তর সহজ যদি নিজেকে প্রশ্ন করি যে, আমরা আমাদের ১০০ বছর আগের প্রজন্ম তথা আমাদের দাদার দাদা, নানার নানার কথা আমরা কতটুকু মনে করছি এখন? আসলে আমরা ততটুকু মনে করি না। সুতরাং প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেছি যে, ওই সময়ের প্রজন্ম আমাকে ততটা মনে রাখবে না হয়তোবা।

 

এটা ভেবে একটু কষ্টই হচ্ছে বৈকি! তাহলে পৃথিবীতে এসে এত কিছু অর্জন করে আমার কি লাভ হল? সত্যি কথা বলতে কি এই পৃথিবীতে নিজের বলে আসলে কিছু নেই। আমরা মৃত্যুর সময় সঙ্গে কিছুই নিয়ে যেতে পারবো না। সুতরাং আজ থেকে ১০০ বছর পর কেউ যদি আমাদের কথা মনে করে, তাহলে মৃত্যুর পর এর থেকে বড় পাওয়া মনে হয় আর কিছু হবে না। এটা হবে অনেক বড় অর্জন এখনকার পৃথিবীর মানুষের, যারা আমরা বেঁচে আছি।

এখন প্রশ্ন হল, আজ থেকে একশো বা দুইশো বছর পর মানুষ কেনইবা আমাদেরকে মনে রাখবে? এটা নিয়ে একটু যদি ভাবি তাহলে এরও উত্তর মিলবে।  এই যে আজ আমরা সামান্য কারণে মানুষের প্রতি বিরাগভাজন হই, সামান্য কারণে মানুষকে ঠকাই, মারামারি করি এমনকি মানুষকে খুনও করে ফেলি! আরও কত কি? অথচ এসবের পরিবর্তে আমরা যদি ভাল কাজ বাড়িয়ে দেই, নিজে প্রয়োজনীয় সামান্য ভোগ করে বাকিটুকু সমাজকে বিলিয়ে দেই তাহলেই হয়তো মানুষ আমাদের মনে রাখবে। এই বিলিয়ে দেওয়ার তালিকায় হতে পারে সেটা সম্পদ, জ্ঞান, মেধা কিংবা অন্য ভালো কিছু তা আমি অর্জন করেছিলাম।

পরকালের শান্তির কথা ভাবলেও আমরা দুনিয়াতে অনেক ভালো কিছু করে যেতে পারি। আরো অনেক ভালো কিছু করার সুযোগ আমাদের হাতে আছে। এই যে আমরা যারা ধর্ম-কর্ম পালন করছি, তারা কতটুকুইবা সঠিকভাবে করছি? পর্যাপ্ত কি করছি? তাহলে আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে হলেও ভালো কাজগুলো বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী যেভাবে চলা দরকার সেভাবেই চলা উচিত। খারাপ কাজ করা, মানুষকে ঠকানো, মানুষকে মেরে ফেলা কোন ধর্মই প্রশ্রয় দেয় না।

সুতরাং ধর্মীয় অনুশাসন কড়াকড়িভাবে মেনে চলার মধ্যেও কিন্তু আমরা নিজের পরকালকে গোছানোর পাশাপাশি পরোক্ষভাবে পরবর্তী প্রজন্মেরও উপকার করে যাচ্ছি। এই পৃথিবীর উপকার করে যাচ্ছি। এটা করতে পারলে একদিকে আমাদের পরকাল ভালো হলো, অপরদিকে আমার ভালো কাজের মাধ্যমে পৃথিবী যদি উপকৃত হয়-তাহলে সেটা পরবর্তী প্রজন্মও মনে রাখবে এবং আমার জন্য দোয়া করবে। এই দোয়ার বদৌলতে কবরে শুয়েও পরম শান্তি পাবো ইনশাআল্লাহ।

আমরা যদি পৃথিবীতে খুব খারাপ কাজ না করে কোন মতে কবর পর্যন্ত চলে যাই, তারপরও কিন্তু আফসোসের শেষ থাকবে না। তখন মনে হবে, আরো কেন ভালো ভালো কাজ করলাম না? আরও কেন ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললাম না? আরও তো অনেক ভালো ভালো কিছু করার ছিল সেগুলো কেন করলাম না?

সুতরাং পজিটিভের মাইর নাই। বিশ্বাসী মানুষদেরও লস নাই। দুচোখ বন্ধ করলে যখন আমরা কিছুই দেখতে পারছি না তখন কিসের এতো অহংকার আমাদের? আমাদের উচিত- প্রতিটি সেকেন্ড সময়কে কাজে লাগানো। এবং সেটা অবশ্যই ভালো কাজে। আপনি দরিদ্রকে খাবার দিন, কাপড়চোপড় দিন, আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ উপকৃত হবে এমন কিছু করে যান, সদকায়ে জারিয়া মনে করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করে যান, প্রচুর বৃক্ষরোপন করুন কিংবা আপনার ধন সম্পত্তি ভাল কাজের জন্য দান করে যান। এসবের রিটার্ন আপনি পাবেন পরবর্তী জীবনে, যে জীবনে থেকে আর ফেরা যাবে না কখনও। তখন মনে হবে, দুনিয়ার জীবন থেকেই আজ পরকালেও আমি সত্যিকার ভাবেই সফল।

লেখক : প্রফেসর ইমিরেটাস, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক।

এই রকম আরও টপিক