শত-সহস্র Near miss এর কাহিনী অজানাই থেকে যায়

শত-সহস্র Near miss এর কাহিনী অজানাই থেকে যায়

 
 

প্রসূতিবিদ্যা বা অবস্টেট্রিক্সের ভাষায় Near miss মানে হলো, মাকে প্রায় হারিয়ে ফেলা। অর্থাৎ মরতে মরতে যে মা বেঁচে যায়।  

প্রেগন্যান্সি মানেই ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সারা বছর এন্টিনেটাল চেক আপে থেকে কোন সমস্যা না থাকা সত্বেও প্রসবকালীন যে কোন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

এজন্যই এন্টিনেটাল চেক আপের উপকারীতা বর্ণনার শেষ কালে উপসংহার টেনেছে এই বলে যে, ‘সবকিছু ঠিক থাকার পরও মাকে সুস্থ রেখে একটি সম্পূর্ণ সুস্থ নবজাতক জন্মদানের নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। ’

তিনদিন ধরে আবহাওয়ার দশ নাম্বার সঙ্কেত দেবার পরে মানুষ এতো এলার্ট হয়ে যায় যে, সেই দশ নাম্বার ঝড় নাও আসতে পারে। আবার ঝড় এলেও মানুষের জীবন নাশ কমই হয়ে থাকে। তবে হঠাৎ যে সুনামিটা এলো, টের পাবার আগেই সম্পূর্ণ লোকালয় ভাসিয়ে নিয়ে গেল।

অবসটেট্রিক্সের দশ নাম্বার সঙ্কেত অনেকগুলো আছে; যার জন্য প্রসবকালীন সব রকম সতর্কতা অবলম্বন করা হয়ে থাকে। ডেলিভারি কোথায় হবে, কখন হবে, রাতে, নাকি দিনে, কে করাবে, কিভাবে হবে, কত রকমের কনসালট্যান্ট উপস্থিত থাকবেন, কতো ব্যাগ ব্লাড রেডি থাকবে ইত্যাদি। কিন্তু যেখানে কোন সঙ্কেতই নেই, যেই ডেলিভারিতে বেবি গড়িয়ে গড়িয়ে চলে আসে সেই ডেলিভারি দাঈরা করায়। শুধু ধপাস করে পরে গিয়ে বেবি যেন ব্যাথা না পায় সেজন্য ধরে ফেলে। আর হাসপাতালে মিডওয়াইফরা করায়। সেরকম কেইসগুলোতেও সুনামি হতে পারে। হঠাৎ করে মারা যেতে পারে।  

এমনিওটিক ফ্লুইড এমবোলিজম, ফুসফুসের  রক্তনালী বন্ধ হয়ে যাওয়া, কার্ডিয়াক এরেস্ট, হঠাৎ হৃদপিন্ডের কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়া, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ, পানি ভর্তি মাটির কলসীতে একটা আঘাত মারলে যেমন পানি পরে ফ্লোর ভিজিয়ে দেয় তেমনি অকল্পনীয় রক্তক্ষরণ হয়ে লেবার রুম বা ওটির ফ্লোরে সুনামি হওয়া।  

এগুলো তড়িৎগতিতে ম্যানেজমেন্ট করলে বাঁচানো যেতেও পারে, নাও যেতে পারে। মারা গেলে তো দুর্ভাগ্য। বেঁচে গেলে তাদেরকে বলি near miss. এজন্য যে, সে চলে যাচ্ছিলো প্রায়। তাকে আমরা মিস করতে যাচ্ছিলাম।  

দশ নাম্বার সঙ্কেতেরগুলোরও কারো কিছুই হয় না। কেউ কেউ আবার চলে যেতে যেতে ফিরে আসতে পারে।

রাত আড়াইটায় আইভির টেলিফোন, আপা গাড়ী পাঠিয়েছি, শিগগির একটু মারকাজুলে আসেন। পিপিএইচ (প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ)। যেই ড্রেসে ছিলাম তা-ই পরেই চলে গেলাম। ওটি রক্তে ভেসে গেছে। সুনামি। পেশেন্টের ভাই ডাক্তার। জরায়ু কেটা ফেলা বাঞ্চণীয়। রোগী ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাবে। বুঝিয়ে বললাম, মেডিকেলে নেবার পথে সে মারা যাবে। পথে মারা না গেলেও ওখানে সবকিছু এরেঞ্জ করতে করতে মারা যাবে। এখানে সব যেহেতু রেডি আছে ডাবল রিস্ক বন্ড দিন আমরা শেষ চেষ্টা করি। যেহেতু টেবিলেই মারা যেতে পারে তাই ডাবল রিস্ক বন্ড। শুধু ডাক্তার বলে সহজেই বোঝানো গেল এবং পেশেন্টকে বাঁচানো গেল। যে কোন মুহূর্তে সে মারা যেতে পারত। এমন গল্প একটি নয়, অনেক আছে।

আর এই গল্প শুধু আমার নয়। এদেশের প্রতিটি অবস্টেট্রিসিয়ানের এমন গল্প আছে। আপনি তা জানেন কি? না, এই দুঃসাহসিকতার গল্প আপনি-আপনারা জানেন না। কারন, এসবের খবর হয় না। এসবে সংবাদপত্রের কাটতি বাড়ে না; টেলিভিশনের টিআরপি বাড়ে না। তাই শত সহস্র Near miss এর কাহিনী অজানাই থেকে যায়। শুধু মারা গেলেই ভুল চিকিৎসা হয়ে যায়! বাংলাদেশের এই দুঃসাহসিক অবস্টেট্রিসিয়ানরা এমন শত শত কেসকে ফিরিয়ে এনে মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে এমডিজির লক্ষ্য পূরণ করেছেন। ফলশ্রুতিতে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পুরষ্কৃত হয়েছেন।

আসলে যে কোন চিকিৎসক তার সবটুকু দিয়েই চেষ্টা করে পেশেন্ট বাঁচাতে। আল্লাহ কি মানুষের জীবন চিকিৎসকের হাতে দিয়ে দিয়েছেন? না। সব চেষ্টার পরও রোগী বাঁচাতে না পারলে অবস্টেট্রিসিয়ানের বুকের ঝড়, বুকের ব্যথা কেউ দেখে না।  

তবুও যদি কখনও মনে হয় চিকিৎসা সঠিক হয়নি তাহলে অভিযোগ করুন। তার তদন্ত হোক, তদন্তে সঠিক চিত্র বেরিয়ে আসুক। কারো অবহেলা হলে তাকে শাস্তি দিন। তার আগে কাউকে জেলখানায় নেবেন না। কাউকে পিটিয়ে মেরে ফেলবেন না। রোগী যেমন আপনার দেশের, চিকিৎসকও আপনার দেশের। একজনকে ভালবাসতে গিয়ে আর একজনের ওপর অবিচার করবেন না। এমন চলতে থাকলে NEAR MISS এর চিকিৎসা করাতে কেউ সাহস পাবে না।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ কনসালট্যান্ট, ইনফার্টিলিটি কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার লিমিটেড (আইসিআরসি)