ফিলিস্তিনিদের ওপর আল্লামা ইকবালের সহমর্মিতা যেমন ছিল

সংগৃহীত ছবি

ফিলিস্তিনিদের ওপর আল্লামা ইকবালের সহমর্মিতা যেমন ছিল

 আমজাদ ইউনুস

আল্লামা ইকবাল প্রাচ্যের কবি (শায়ের-এ-মাশরিক) খেতাবে ভূষিত হলেও তিনি মহাকবি উপাধিতে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি পাকিস্তানের জাতীয় কবি।  প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একাধারে গবেষক, সাহিত্যিক, দার্শনিক ও আইনজীবী। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম মুসলিম চিন্তাবিদ।

তিনি তাঁর জাগরণী কাব্য-লেখনী ও নেতৃত্বে মুসলিম সমাজে পুনর্জাগরণের স্বপ্ন জাগ্রত করেছিলেন। আল কুদসের পবিত্র ভূমিতে ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক দাবির প্রবল সমর্থক ছিলেন তিনি। তিনি ফিলিস্তিন নিয়ে ইসরায়েলিদের হঠকারিতা আঁচ করতে পেরেছিলেন। ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনের ঘোর বিরোধিতাও করেছেন বিংশ শতকের গোড়ার দিকে।


আল্লামা ইকবালের কাব্যগ্রন্থ ‘যরবে কালীম’-এ ‘শাম ও ফিলিস্তিন’ শিরোনামে একটি কবিতা আছে। তাতে তিনি বলেন : ‘ফিলিস্তিনের ভূমিতে থাকে যদি ইহুদিদের অধিকার তবে স্পেনের ওপর আরববাসী নয় কেন দাবিদার’

আল্লামা ইকবালের দৃষ্টিতে ফিলিস্তিন হলো আরবদের প্রাপ্য অধিকার। যদি কেউ ফিলিস্তিনের পুণ্যভূমি ইহুদিদের—এ দাবিকে এ জন্য সমর্থন করে যে তা (ইসরায়েল) ফিলিস্তিন থেকেই বের করা হয়েছিল। তাহলে এই অধিকার স্পেনের আরবদেরও হওয়া উচিত। কেননা তাদেরও স্পেন থেকে দেশান্তর করা হয়েছিল।

ফিলিস্তিনের মুসলমানদের প্রতি আল্লামা ইকবালের সহমর্মিতা ছিল সীমাহীন। তিনি মনে করতেন, ইসলামে বর্ণ, গোত্র,  সাম্প্রদায়িকতা ও জাতীয়তার কোনো বৈষম্য নেই। ইসলাম সব জাতি, অঞ্চল ও সীমানা অতিক্রম করে শান্তির বার্তা বহন করে। যদিও তিনি ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন আর ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে আসন্ন শক্তিধর আগ্রাসনকে খুব নিকট থেকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। পাশ্চাত্যের রাষ্ট্রগুলো ফিলিস্তিনে ইহুদিদের স্থান দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এবং তারা সেসব প্রতিশ্রুতি পদদলিত করে, যা তারা পারস্পরিক আলোচনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল। আর এই সমন্বিত আলোচনায় মুসলিম বিশ্বকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে অস্বীকার করতে শুরু করে, যা পরে দৃশ্যমান হতে থাকে।

‘আনওয়ারে ইকবাল’ গ্রন্থের লেখক বলেন, ৩০ ডিসেম্বর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে লাহোরের প্রসিদ্ধ ‘মোচি’ ফটকের বাইরে একটি জনসভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় আল্লামা ইকবাল একটি জোরালো ভাষণ দেন। বক্তব্যের মধ্যে তিনি এই মর্মে একটি প্রস্তাব পেশ করেন যে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমানদের ভূখণ্ড সোপর্দ প্রসঙ্গে ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা, যা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল তা অনতিবিলম্বে পূরণ করা হোক। তিনি দীপ্ত কণ্ঠে আরো বলেন যে মুসলিম ভূখণ্ডের কোনো অংশ অন্য কোনো পক্ষের কাছে সোপর্দ কিংবা হস্তান্তর না করা বাঞ্ছনীয়। (পৃষ্ঠা ৪২-৪৩)

প্যারিস শান্তি সম্মেলনের পর বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রয়োজন দেখা দেয়। ফলস্বরূপ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে League of Nations (জাতিপুঞ্জ) প্রতিষ্ঠিত হয়। দুর্ভাগ্যবশত মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো লিগ অব নেশনসের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।

প্রথম মহাযুদ্ধ এবং লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের প্রতি যে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়েছিল তাতে আল্লামা ইকবাল মর্মাহত হন। এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তিনি চার স্তবকের ব্যঙ্গাত্মক পঙক্তি রচনা করেন। পঙক্তিতে তিনি জাতিপুঞ্জকে ‘কাফন চোর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কবিতা দুটি ‘পায়ামে মাশরিক’ বা প্রাচ্যের বার্তা নামক সংকলনে রয়েছে। আল্লামা ইকবালের ফারসি কবিতার এই পাণ্ডুলিপি ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন,

‘দেখতে পাবে তোমরা এই সমগ্র পৃথিবীর দিগ্বিদিক, জালিমেরা যুদ্ধ-সংবিধান ধ্বংসে নির্মাণ করেছে ভিত। তাদেরকে চিনি আমি কেবলই ‘কাফন চোর’ উপাধিতে, বানিয়েছে তারা সংস্থা; পরস্পর কবর বণ্টনের নিমিত্তে। ’

উসমানী সাম্রাজ্যের তুর্কিরা স্বীয় শাসনামলে ইহুদিদের সঙ্গে অসাধারণ ব্যবহার উপহার দেয়। তারা পশ্চিম প্রাচীরের (দেওয়ার-এ-গিরিয়া) সম্মুখপানে ইহুদিদের উপাসনা করার অনুমতিও প্রদান করে। এই প্রাচীনতম প্রাচীর জেরুজালেমে কুব্বাতুস সাখরার সন্নিকটে অবস্থিত আর মুসলিমদের নিকটে এটি ‘দেওয়ার-এ-বুরাক’ নামেই সুপ্রসিদ্ধ। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে আল্লামা ইকবাল ইংরেজদের ইহুদিপন্থী নীতির সমালোচনা করে একটি বক্তব্য দেন। মুহাম্মদ রফিক আফজাল তাঁর ‘গুফতারে ইকবাল’ গ্রন্থে সেই বক্তব্য সন্নিবেশিত করেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- মুসলমান ভাই ভাই। আল্লামা ইকবালের কবিতার উৎসগুলোর মধ্যে কোরআন অগ্রগামী ছিল। তাই ফিলিস্তিন থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি মুসলিমদের দুঃখে সমব্যথী ছিলেন তিনি। এটা তাঁর ঈমানি চেতনা ছাড়া আর কিছু না।

এই রকম আরও টপিক

সম্পর্কিত খবর

পাঠকপ্রিয়