নামাজে মনোযোগ বাড়ানোর উপায়

নামাজে মনোযোগ বাড়ানোর উপায়

অনলাইন ডেস্ক

অধিকাংশ সময় আমরা নামাজে পুরোপুরি মনোযোগ রাখতে পারি না। কিন্তু ঈমানের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো নামাজ। নামাজ মুমিনের পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যের প্রতীক। মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র ও নৈকট্যশীল হওয়ার প্রধান মাধ্যম।

ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ এই ইবাদতটি সঠিকভাবে আদায় করলে মানুষের সীমাহীন দৈহিক ও আত্মিক প্রশান্তি লাভ হয়। জাগ্রত হয় প্রভু ও দাসের মাঝে নিবিড় বন্ধনের সুখানুভূতি। যেটা প্রতিটি মানুষের চিরকামনায় বিষয়।  

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে নামাজ আদায়ের আদেশ, আদেশ উপেক্ষার ভয়াবহ শাস্তি এবং নামাজ আদায়ের বিনিময়ে অপরিসীম সওয়াবের কথা বর্ণিত হয়েছে।

আফসোসের বিষয় হলো, সারা পৃথিবীর মুসলিম জনগোষ্ঠীর মুষ্টিমেয় কিছু খোদাভীরু বান্দা ব্যতীত অনেক মানুষের এই অতিগুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটির প্রতি অমনোযোগিতা স্পষ্ট, গাফেল আচরণ দৃশ্যমান। অথচ স্বাভাবিক বিবেক বুদ্ধির সঠিক দাবি হলো, নামাজের প্রতিই বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত বক্তব্যের ভেতরে নামাজে আগ্রহী হওয়ার পন্থা ও পদ্ধতির কথা ফুটে উঠেছে যথাযথভাবে।

আল্লাহর ভয়, বড়ত্ব ও সীমাহীন শক্তির কথা স্মরণ করা নামাজে আগ্রহী হওয়ার প্রধানতম মাধ্যম। কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘এবং ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য লাভ কর। সালাতকে অবশ্যই কঠিন মনে হয়। কিন্তু তাদের পক্ষে (কঠিন) নয়, যারা খুশু (অর্থাৎ ধ্যান ও বিনয়)-এর সঙ্গে পড়ে। যারা এ বিষয়ের প্রতি খেয়াল রাখে যে, তারা তাদের প্রতিপালকের সঙ্গে মিলিত হবে এবং তাদেরকে তারই কাছে ফিরে যেতে হবে। ’ (সুরা বাকারা : ৪৫-৪৬) আয়াতে উল্লিখিত ‘খুশু’ শব্দ দ্বারা অক্ষমতা ও অপারগতাজনিত সেই মানসিক অবস্থা বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহ তায়ালার মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার সামনে নিজের ক্ষুদ্রতা ও দীনতার অনুভ‚তি থেকে সৃষ্টি হয়। এর ফলে ইবাদত উপাসনা সহজতর হয়ে যায়। আল্লাহ তায়ালা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তিনি মর্মন্তুদ শাস্তি দেওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসেব তার কাছে অবশ্যই দিতে হবে, এসব বিষয় স্থিরচিত্তে স্মরণ করলে নামাজে মনোযোগী হওয়া সহজ হবে।

যথাসময়ে নামাজ আদায়ের যেসব মহাপ্রতিদানের কথা বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো অনুধাবন করা ও উপলব্ধি করার চেষ্টা করা নামাজে আগ্রহী হওয়ার আরেকটি পদ্ধতি। ইবনে মাসউদ (রা.) নবী করিমকে (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! সর্বোত্তম ইবাদত কোনটি? 

নবী করিম (সা.) বললেন, ঈমানের পর সবচে’ উত্তম ইবাদত হলো সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করা। ’ (বুখারি : ৭৫৩৪)।

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, মনে করো তোমাদের কারো বাড়ির সম্মুখে একটি নদী আছে এবং সে প্রতিদিন পাঁচবার ওই নদীতে গোসল করে, তার শরীরে কি কোনো ময়লা থাকতে পারে? 

সাহাবাগণ উত্তর দিলেন, না, তার শরীরে কোনো ময়লা থাকতে পারে না। নবী করিম (সা.) বললেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও অনুরূপ, আল্লাহ তায়ালা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিনিময়ে বান্দার সমস্ত গোনাহ মাফ করে দেন। ’ (মুসলিম : ৬৬৭)

আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তার মধ্যবর্তী সময়ের, এক রমজান থেকে আরেক রমজান তার মধ্যবর্তী সময়ের, এক জুমা থেকে আরেক জুমা তার মধ্যবর্তী সময়ের সমস্ত গোনাহ ধ্বংস করে দেয়। যদি বান্দা কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে। ’ (মুসলিম : ২৩৩)।  

ইবনে উমর (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যথাসময়ে যথা নিয়মে নামাজ আদায় করবে, ওই নামাজ তার জন্য কেয়ামতের দিন আলো, প্রমাণ ও নাজাতের মাধ্যম হবে। আর যে ব্যক্তি সঠিকভাবে নামাজ আদায় করবে না, তার জন্য তার নামাজ কেয়ামতের দিন নূর, দলিল ও নাজাতের মাধ্যম হবে না। কেয়ামতের দিন সে কারুন, ফিরআউন, হামান ও উবাই ইবনে খালফের সঙ্গে থাকবে। ’ (মুসনাদে আহমদ : ৬৫৭৫)

উপর্যুক্ত হাদিসগুলোতে নামাজি ব্যক্তির প্রতি সুসংবাদ ও সওয়াবের কথা ঘোষিত হয়েছে। প্রতিদানের কথায় মানুষ উৎসাহিত হয়। সংশ্লিষ্ট কাজের প্রতি মনোযোগী ও আগ্রহী হয়ে ওঠে। উল্লিখিত হাদিস ব্যতীত আরও অসংখ্য হাদিসে নামাজের প্রতিদান স্বরূপ জান্নাতে প্রবেশ, গুনাহ মাফ, জাহান্নাম থেকে মুক্তি, সফলতা অর্জন ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে।

নামাজের প্রতি অমনোযোগী ব্যক্তির জন্য যেসব হুঁশিয়ারি ও ধমকি উচ্চারিত হয়েছে, সে সব কথা হৃদয়ে ধারণ করা, জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি ও আজাবের কথা স্মরণ করা, নামাজে আগ্রহী হওয়ার আরেকটি পন্থা। কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘তারা জিজ্ঞাসাবাদ করবে অপরাধীদের সম্পর্কে যেকোনো জিনিস তোমাদেরকে জাহান্নামে দাখিল করেছে? তারা বলবে, আমরা নামাজিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। ’ (সুরা মুদ্দাসসির : ৪১-৪৩)

অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ‘তারপর তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো এমন লোক, যারা নামাজ নষ্ট করল এবং ইন্দ্রিয় চাহিদার অনুগামী হলো। সুতরাং তারা অচিরেই তাদের ‘গাইয়ার’ (পথভ্রষ্টতার) সাক্ষাৎ পাবে। ’ (সুরা মারয়াম : ৫৯)। আয়াতে উল্লিখিত ‘গাইয়া’ শব্দের তাফসিরে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সেটা হলো জাহান্নামের একটি গর্ত, যার উত্তাপ অত্যন্ত বেশি, যদ্দরুন জাহান্নামের অন্যান্য গর্ত আল্লাহ তায়ালা কাছে তার থেকে পানাহ চায়। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘গাইয়া’ জাহান্নামের একটি গর্ত, এতে সমগ্র জাহান্নামের চাইতে অধিক আজাবের সমাবশে রয়েছে।

আব্দুল্লাহ ইবনে বুরাইদা নিজ পিতা সূত্রে বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মুসলমান ও অন্যদের মাঝে মূল পার্থক্য হলো নামাজ। যে ব্যক্তি নামাজ পরিত্যাগ করবে সে কাফের হয়ে যাবে। ’ (তিরমিজি : ২৬২১)

সম্ভব হলে নামাজের মধ্যে এমন পূর্ণাঙ্গ অনুভব ও ধ্যান রাখুন, আপনি যেনো মহাল আল্লাহকে দেখছেন, তার সামনে নতজানু হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এ রূপ চিন্তা বা অনুভব করতে না পারলে অন্তত এতটুকু ভাবুন যে, তিনি আপনার প্রতিটি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছেন। তার কাছে আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে। (ইবাদতে এমন ভাব আনার কথা হাদিসে উল্লেখ হয়েছে।

উপর্যুক্ত হাদিসসমূহে বর্ণিত আল্লাহর বড়ত্ব, নামাজ আদায় করার ফজিলত ও নামাজ আদায় না করার ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা গভীরভাবে ভাবলে, আলোচনা করলে প্রতিটি ব্যক্তির নামাজ আদায়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে। আশা করা যায়, কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে। আল্লাহ কবুল করুন।

এই রকম আরও টপিক

পাঠকপ্রিয়