ক্ষমতাও কি জ্ঞান হয়ে ওঠে না !

আজফার হোসেন-ফেসবুক থেকে সংগৃহীত ছবি ।

ক্ষমতাও কি জ্ঞান হয়ে ওঠে না !

অনলাইন ডেস্ক

‘জ্ঞানই ক্ষমতা’ এই কথা বলাটাই যথেষ্ট? এর উল্টো ব্যাপারটাও কি কাজ করে না? অর্থাৎ ক্ষমতাও কি জ্ঞান হয়ে ওঠে না? অথবা এভাবেও প্রশ্ন তোলা যায় : ক্ষমতা কি জ্ঞান উৎপাদন করে না বা জ্ঞানকে জ্ঞান হিসাবে বৈধতা দেয় না? উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেন বিশ শতকের ফরাসি তাত্ত্বিক ও দার্শনিক মিশেল ফুকো, যিনি ‘ক্ষমতা/জ্ঞান’-সম্পর্কের তুমুল তত্ত্বায়নের জন্য প্রসিদ্ধ, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত, যদিও ফুকোর ক্ষুদে ক্ষমতার গতিতত্ত্ব চূড়ান্ত দৃষ্টান্তে অদ্বান্দ্বিক হওয়ার কারণেই ‘ক্ষুদ্র’-এর সঙ্গে ‘বৃহৎ’-এর পরস্পর-প্রভাববিস্তারী সম্পর্ককে ধারণ করতে সক্ষম হয় না বলেই ফুকোর তত্ত্ব দিয়ে ফলপ্রসুভাবে রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জটিল লব্ধিকে ব্যাখ্যা করা যায় না বললেই চলে। এটি আরেক প্রসঙ্গ।  

তবে ফুকোর ধারণা অনুসারে ক্ষমতাবলেও যে জ্ঞান-উৎপাদন সম্ভব, এই বিষয়টা আমাদের দেশের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কীভাবে? আমাদের দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা কিংবা বন্দুকের ক্ষমতা কিংবা প্রতীকী ক্ষমতাবলে মাঝেমাঝেই জং-ধরা আমলারা এবং এমনকি সামরিক আমলারাও বিভিন্ন বিষয়ে ‘বিশেষজ্ঞ’ হয়ে ওঠেন।

সেটা তো দেখেছি বেশ সময় ধরে। বন্দুকের নলের জোরে একজন রাষ্ট্রপতির ‘কবি’ হয়ে ওঠার নজির আমাদের দেশেই আছে বৈকি। অর্থাৎ বন্দুকের নলও ‘কবি’র ক্ষমতা তৈরি করে এমনভাবে যে, সমাজে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত কবিরা ওই বন্দুকওয়ালা ‘কবি’কে ভয়ে বা লোভে বা স্বেচ্ছায় স্বীকৃতি দিয়ে থাকেন।  

এই ভাবে সাহিত্য-না-জানা আমলা কেবল ক্ষমতার জোরে হয়ে ওঠেন সাহিত্যের আসরের মধ্যমণি।

কিংবা ওই একই কারণে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনভিজ্ঞ ব্যারিস্টার রাস্ত্রবিজ্ঞানীদের জ্ঞান বিতরণ করেন তাদের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি হিসাবেই। আমাদের দেশে এমন অনেক বুদ্ধিজীবী, অধ্যাপক, লেখক ও সাংবাদিক আছেন, যাঁরা ক্ষমতাকেই জ্ঞান মনে করেন। মনে করেন বলেই কার্তেসীয় জ্ঞানতত্ত্ব বা চার্বাকের দর্শনের ওপর কোনো সেমিনার অনুষ্ঠিত হলে সেখানে ওইসব বুদ্ধিজীবী সমাজের ক্ষমতাবানদের ডেকে এনে তাঁদের বক্তৃতা শোনেন, যদিও তাঁরা ফরাসি দার্শনিক দেকার্তের নামের বানানটা ঠিক লিখতে বা বলতে পারবেন কিনা তাতে সন্দেহ হয়। কিন্তু ওই ক্ষমতাবানরা ক্ষমতার জোরেই যা বলবেন তা জ্ঞান হিসাবে বিবেচিত হতে বাধ্য।  
শুধু তাই নয়, তাদেরকে ‘জ্ঞানী’ বা ‘বিশেষজ্ঞ’ বানানোর জন্য উঠেপড়ে লেগে যায় শক্তিশালী গণমাধ্যমগুলো, যারা প্রতিনিয়ত জ্ঞানের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক বিভিন্নভাবে দেখিয়ে দেয়। হ্যাঁ, ক্ষমতা টাকার মতোই কথা বলে। আর যখন সে কথা বলে, নিজের কথাকে সে জ্ঞান হিসাবে জাহির করতে থাকে।

লেখক:  অধ্যাপক, দ্য  গ্লোবাল সেন্টার ফর এডভান্সড স্টাডিজ, যুক্তরাষ্ট্র

news24bd.tv/ডিডি