তুলি ফেলে হাতে অস্ত্র নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নাথান এখন যেন গডফাদার

নাথান লনচেও বম

তুলি ফেলে হাতে অস্ত্র নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নাথান এখন যেন গডফাদার

দেবদুলাল মুন্না

একটা সময় ছেলেটির স্বপ্ন ছিল চিত্রকর হবে। মেধাবী কিন্তু গরিব ঘরে জন্ম। সন্তু লারমার তখন পার্বত্য চট্রগ্রামে একচেটিয়া দাপট। তিনি সাহায্য করেন ছেলেটিকে।

ছেলেটি ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। ক্লাস করতেন রফিকুন্নবী, ওয়াকিলুর রহমানদের মতো বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের। এখনকার ছবির হাটে আড্ডা দিতেন। আর্ট কলেজের পুকুরপাড়ে।
তুলিতে আঁকতেন কতোশতো মুখ, নিসর্গ। একসময় পাশ করেও বেরোন। সময়টা ১৯৯৬ সাল। সেসময় তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ছাত্র সংগঠন পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) ঢাকা মহানগর শাখা ও কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। করতেন বাম রাজনীতি। তার নাম নাথান লনচেও বম। কিছুদিন চাকরি খুঁজলেন। পেলেন না। খাগড়াছড়ির চেঙ্গী স্কয়ারের পাশে সন্তু লারমার ভাস্কর্যটি যখন করা হয় তখন সেখানে কাজ পেলেন। কয়েকজনের মধ্যে তিনিও একজন কারিগর।  

কিন্তু একসময় তিনি একটু আড়ালেই চলে যান। কোনো খোঁজ খবর নেই। বন্ধুরা হয়তো ভেবেছিলেন, হতাশায় ভুগছেন। কেউ কেউ ভুলতেই হয়তো বসেছিল।  

তবে বান্দরবানের হামলা ও ব্যাংক ডাকাতির পর তার নাম আবার ওঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। জানা যায়, তিনি অনেক দিন থেকেই গোপন উগ্রবাদী রাজনীতি করে আসছেন। তিনি হয়ে উঠেছেন পাহাড়ের ত্রাস। তার নেতৃত্বে একটি সংগঠন গোপনে বেড়ে উঠেছে, যার নাম কেএনএফ। এই সংগঠনটি চায়, রাঙামাটির সাজেক উপত্যকা বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, বান্দরবান উপকণ্ঠ থেকে চিম্বুক পাহাড়ের ম্রো অঞ্চল হয়ে রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা ও আলীকদম এ নয়টি উপজেলা নিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত একটি পৃথক রাজ্য।
আর এ জন্য তারা মাঝেমাঝে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

নাথান বমের সম্পর্কে বিবিসি বাংলা একটি গণমাধ্যমের রেফারেন্স টেনে বলেছে, নাথান বম বেশিরভাগ সময় থাকতেন পার্বত্য চট্টগ্রামে। কিন্তু ভারতের আসাম ও মিয়ানমারে যেতেন ঘনঘন। প্রথমে প্রতিষ্ঠা করেন কুকি-চিন জাতীয় ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (কেএনডিও)। তিনি এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। কয়েক বছর পর এ সংগঠনটি ভেঙে গড়ে তোলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)।

লাথান বম কুকি-চিনভুক্ত জাতিগোষ্ঠীর পরিচিতি নিয়ে ‘দ্য বমজৌ’সহ ছয়টি বই প্রকাশ করেছেন। বম সম্প্রদায় থেকে ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থীও হয়েছিলেন। সন্তু লারমাকে টেক্কা দিতেই মূলত নাথান বাম সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।  

জানা গেছে, তার গ্রুপে বর্তমান সদস্য সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজারের মতো। তারা দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ২০২২ সালের ২৪ মার্চ রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ট্রাই-জংশনের কাছাকাছি সীমান্ত লাগোয় ভারতের মিজোরাম রাজ্যের লংতলাই জেলার পারভা থেকে কেএনএফের ছয় জনকে আটক করে সে দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এরপরই কেএনএফ আলোচনায় আসে। আটকের পর আসামিদের কাছে থাকা একটি চিঠিতে কেএনএফের সামরিক শাখা কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মির (কেএনএ) সভাপতি ও চিফ অব স্টাফের সিলমোহরসহ কিছু সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানায় বিএসএফের ১৯৯ নম্বর পারভা ব্যাটালিয়ন। আটককৃতদের কাছ থেকে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের তথ্যও জানা যায়। ওই বছরের ১২ এপ্রিল পারভা ১১৯ ব্যাটালিয়ন বিএসএফ সশস্ত্র সরঞ্জামসহ কেএনএফের চার সদস্যকে আটক করে।

বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বিলাইছড়ি, রোয়াংছড়ি, রুমা, থানচি, লামা ও আলীকদম উপজেলা নিয়ে কেএনএফের কল্পিত কুকি-চিন রাজ্য গঠিত। বম, পাঙ্খুয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো, খিয়াং নামের ছয় জাতিগোষ্ঠীর কিছু লোকজন নিয়ে কেএনএফ গঠিত হয়। তারা নিজেদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা মনে করে। একই সঙ্গে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি জনগোষ্ঠীকে বার্মিজ ও ভারতীয় জাতিভুক্ত এবং বহিরাগত মনে করে। আর এ কারণে জেএসএস ও ইউপিডিএফের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি তাদের মধ্যে বৈরী মনোভাব রয়েছে।

একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যায়, গত বছর ২৪ জুলাই কেএনএফের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল আনসার আল ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার যোগাযোগের নতুন তথ্য সামনে আনে র‌্যাফব। সংগঠনটির কথিত আমির মো. আনিসুর রহমান মাহমুদকে গ্রেপ্তারের পর নাথান বমের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ থাকার বিষয়টি জানা যায়। তাছাড়া নাথান যখন চারুকলার ছাত্র, জামা’আতুল আনসারের নেতা শামিন মাহফুজ তখন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। ওই সময় তারা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। ২০২১ সালে নাথানের সঙ্গে জামা’আতুল আনসারের আমিরের একটি সমঝোতা হয়। পার্বত্য অঞ্চলে কেএনএফের ছত্রছায়ায় জামা’আতুল আনসার সদস্যদের ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তাদের মধ্যে চুক্তিও হয়। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি মাসে ৩ লাখ টাকা দেওয়ার পাশাপাশি জামা’আতুল আনসার কেএনএফ সদস্যদের খাবার খরচ বহন করে আসছিল।

বান্দরবানের রুমা সদর ইউনিয়নের ইডেনপাড়ার বাসিন্দা মৃত জাওতন লনচেওর ছেলে নাথান লনচেও বম। তার বাবা ছিলেন পেশায় জুমচাষি। মায়ের নাম রৌকিল বম। তিনিও মারা গেছেন। ছিলেন গৃহিণী। পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে লাথান ছোট। অভাবের সংসারে বড় হন লাথান। তার স্ত্রী লাল সমকিম বম রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নার্স হিসেবে কাজ করেন।  তাদের দুটি সন্তান আছে।  

news24bd.tv/ডিডি
 

পাঠকপ্রিয়