হজের প্রচলন যেভাবে হয়

হজের প্রচলন যেভাবে হয়

 আতাউর রহমান খসরু

ইসলামপূর্ব যুগের যেসব বিধান শরিয়তেও অনুমোদন লাভ করেছে হজ এর অন্যতম। কেননা আরব সমাজে হজের প্রচলন ঘটেছিল ইসলাম আগমনের বহু পূর্বে। তবে ইসলাম মৌলিক হজকে অনুমোদন করলেও হজের বিধি-বিধানে সংস্কার ও পরিবর্তন এনেছে। বরং বলা যায়, হজের বিধি-বিধানকে ইসলাম শিরক ও কুসংস্কারমুক্ত করেছে।

হজের প্রচলন যেভাবে হয়
মুসলিম ঐতিহাসিকরা এ বিষয়ে একমত যে হজের সূচনা হয়েছিল মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহিম (আ.)-এর মাধ্যমে। তিনি আল্লাহর নির্দেশে পবিত্র কাবাঘরের নির্মাণকাজ শেষ করলে আল্লাহ তাঁকে হজের ঘোষণা দেওয়ার নির্দেশ দেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘আর স্মরণ করো, যখন আমি ইবরাহিমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম সেই ঘরের স্থান, তখন বলেছিলাম আমার সঙ্গে কোনো শরিক স্থির কোরো না এবং আমার ঘরকে পবিত্র রাখো তাদের জন্য যারা তাওয়াফ করে এবং যারা নামাজে দাঁড়ায়, রুকু করে ও সিজদা করে। এবং মানুষের কাছে হজের ঘোষণা করে দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে ও সব ধরনের ক্ষীণকায় উঠের পিঠে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।

’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৬-২৭)

আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) উল্লিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় লেখেন, ‘হজের ঘোষণার নির্দেশ দিলে ইবরাহিম (আ.) বলেন, হে আমার প্রতিপালক! আমি কিভাবে এই আহবান পৌঁছে দেব, আমার কণ্ঠস্বর তো তাদের কাছে পৌঁছাবে না। আল্লাহ বলেন, তুমি আহবান জানাও, পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব আমার।

ইবরাহিম (আ.) মাকামে ইবরাহিমের পাথর, সাফা পর্বত ও আবু কায়েস পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন—হে মানবজাতি, তোমাদের প্রভু একটি ঘর নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং তোমরা তাঁর হজ করো।

বলা হয়, পৃথিবীর পাহাড়গুলো তখন নিচু হয়ে যায়। ফলে তাঁর ঘোষণা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। মায়ের গর্ভাশয় ও পিতার মেরুদণ্ডে অবস্থানকারী সব মানুষ তা শুনতে পারে। কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ হজ করবে, তারা লাব্বাইক বলে সাড়া দেয়। ’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)

কাবা যেভাবে মানুষের হৃদয়ে স্থান পেল

ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমি আমার বংশধরদের কতককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় তোমার পবিত্র ঘরের কাছে।

হে আমাদের প্রতিপালক! এ জন্য যে তারা যেন নামাজ কায়েম করে। অতএব তুমি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দাও এবং ফলাদি দ্বারা তাদের রিজিকের ব্যবস্থা কোরো, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৩৭) 

ইবরাহিম (আ.)-এর হজের ঘোষণা এবং উল্লিখিত দোয়ার বরকতে আল্লাহ মক্কার মানুষের অন্তর ঝুঁকিয়ে দিলেন। এ ছাড়া মক্কা আরব উপদ্বীপের ঠিক মধ্যভাগে হওয়ায় আরবের লোকেরা উত্তর-দক্ষিণ বা পূর্ব-পশ্চিম যেদিকেই যাতায়াত করত অনিবার্যভাবে মক্কাকে অতিক্রম করতে হতো। ফলে মক্কা নগরী সহজেই ধর্মীয় ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মর্যাদা লাভ করে। মক্কার কুরাইশরাও ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ.)-এর উত্তরাধিকারী হিসেবে পবিত্র কাবাঘর এবং তার জিয়ারতকারীদের সেবা করত। তারা ছিল হজযাত্রীদের প্রতি অত্যন্ত সহানুভূতিশীল। এ কারণেও কাবার প্রতি মানুষ আকৃষ্ট হয়েছিল।

ইসলামপূর্ব আরবে কাবার সম্মান
ইসলাম আগমনের আগেও কাবাঘরকে আরবরা অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখত। ঐতিহাসিক কালবি লেখেন, ‘আরব জাতি তাদের পিতা ইসমাইল (আ.)-এর শিক্ষা ও উত্তরাধিকার হিসেবে পবিত্র কাবার সম্মানে হজ ও ওমরাহ করত। মক্কায় যে ব্যক্তিই আগমন করত তারা কাবার সম্মান ও ভালোবাসায় হেরেম অঞ্চলের পাথর নিয়ে যেত। তারা যেখানে যেত সেখানেই এই পাথর বহন করে নিয়ে যেত। কাবার প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা, আবেগ ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এসব পাথরের চারপাশে তারা তাওয়াফও করত। ’ (শুআরাউ মক্কা কাবলাল ইসলাম, পৃষ্ঠা ৭৩)

ইসলামপূর্ব হজের কার্যক্রম
ইসলাম আগনের আগে হজের মৌলিক কার্যক্রমগুলোর সঙ্গে শরিয়তের মৌলিক বিধানের সাদৃশ্য রয়েছে। তবে তা আদায়ের পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। যেমন—

১. সাঈ করা : জাহেলি যুগেও সাফা ও মারওয়া পাহাড়ে সাঈ করা হতো। তবে সবাই তা করত না। সে সময় এই দুই পাহাড়ে মূর্তি স্থাপন করা হয়েছিল এবং সাঈর সময় মূর্তির প্রতি সম্মান দেখানো হতো।

২. তাওয়াফ : ইসলামপূর্ব যুগেও হাজিরা সাতবার পবিত্র কাবাঘরের তাওয়াফ করত। তবে কুরাইশ নয় এমন হাজিরা উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করত। তারা বলত, যে কাপড় পরিধান করে আমরা আল্লাহর অবাধ্য হয়েছি তা পরে কিভাবে তাওয়াফ করব। অবশ্য কোনো কোনো হাজি কুরাইশ, তাদের বংশোদ্ভূত ও মিত্র যাদেরকে ‘হুমস’ বলা হতো তাদের কাছ থেকে কাপড় ধার করে বা কিনে নিয়ে তা পরিধান করে তাওয়াফ করত।

৩. মাথা মুণ্ডানো : জাহেলি যুগেও হাজিরা হজ শেষে মাথা মুণ্ডাত বা চুল ছোট করত।

৪. আরাফায় অবস্থান : আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, জাহেলি যুগে মক্কার কুরাইশরা মুজদালিফায় অবস্থান করত, তারা আরাফায় যেত না। আরবের অন্য সব গোত্র আরাফায় অবস্থান করত।

৫. পশু কোরবানি : জাহেলি যুগেও হাজিরা পশু কোরবানি করত। তবে তা করা হতো কাবা প্রাঙ্গণে স্থাপিত দেব-দেবীর সামনে। অতঃপর পশুর গোশত দরিদ্র হাজিদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া হতো।

৬. রুফাদা : হজের সময় মক্কাবাসী প্রত্যেকের সাধ্যানুযায়ী অর্থ জমা করত এবং তা দিয়ে আগত হাজিদের আপ্যায়ন করত। হিশাম ইবনে আবদে মানাফ রুফাদা প্রথার প্রচলন ঘটান। (ভেটোগেট ডটকম; তাফসির ডটনেট)

হজের বিধানে বিকৃতি
ইবরাহিম (আ.) হজের বিধান প্রবর্তন করেন। কিন্তু দীর্ঘকাল আরব ভূখণ্ড ঐশী আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ায় হজের বিধি-বিধানে নানা ধরনের বিদআত ও বিকৃতি যুক্ত হয়। এমনকি তাতে মূর্তিপূজার মতো শিরকের সংযোগ ঘটে, যা ছিল ইবরাহিম (আ.)-এর দ্বিনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তবে ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়ার বরকতে আরব সমাজে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন পর্যন্ত এমন একদল লোক অবশিষ্ট ছিল, যারা কখনো মূর্তিপূজায় লিপ্ত হয়নি। তাদের দ্বিনে হানিফের অনুসারী বলা হতো।

মক্কায় দ্বিনে হানিফের অনুসারীদের প্রধান ছিলেন ওরাকা বিন নওফেল। ইবরাহিম (আ.) দোয়া করেছিলেন, ‘স্মরণ করো, ইবরাহিম বলেছিল, হে আমার প্রতিপালক! এই নগরীকে নিরাপদ করো এবং আমাকে ও আমার পুত্রদেরকে প্রতিমা পূজা থেকে দূরে রাখো। ’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৩৫)

এই রকম আরও টপিক