‘ইন্টেরিয়র ডিজাইন’ ব্যবসার ধরন পাল্টাাচ্ছে

‘ইন্টেরিয়র ডিজাইন’ ব্যবসার ধরন পাল্টাাচ্ছে

জোবায়ের নোবেল

বাড়ি-ঘর, অফিস বা কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি স্থানে আসবাবপত্র, আলোকসজ্জা, গৃহসজ্জা সামগ্রীর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করে দৃষ্টিনন্দন করাই ‘ইন্টেরিয়র ডিজাইন’।

আগে স্থপতিরা ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ইন্টেরিয়র ডিজাইন করতেন। কিন্তু এখন সময় বদলেছে। বর্তমানে আর্কিটেকচার ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন পৃথকভাবে করা হচ্ছে।

তরুণরা এ কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করে গড়ে তুলছে সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার। আর্কিটেকচারাল কোম্পানি, রিয়েল এস্টেট কোম্পানি, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম, ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্ম, পেইন্ট কোম্পানিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। স্মার্ট ও প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে ওঠার কারণে পেশাদার ইন্টেরিয়র ডিজাইনারকে দিয়ে সুন্দর ও বসবাসের জন্য সুবিধাজনক গৃহসজ্জা করানোর ঝোঁক বাড়ছে রুচিশীল মানুষের।

বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় স্বল্প জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার উপযোগী করাই সবার মূল লক্ষ্য থাকে।

সেই সাথে নিজের স্থাপনাটি সবাই আকর্ষণীয় দেখতে চায়। এ কারণেই ইন্টেরিয়র ডিজাইনের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররাই বলে দিচ্ছেন কীভাবে একটি ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট বা অফিসকে দৃষ্টিনন্দন করার পাশাপাশি এর প্রতিটি স্থানকে সঠিক ও সফলভাবে ব্যবহার উপযোগী করা যায়।

বর্তমানে দেশে অনেক ইন্টেরিয়র ডিজাইন ফার্ম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যারা অত্যন্ত সফলতার সাথে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানেরও বেশ সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি সুযোগ রয়েছে ইন্টেরিয়র ডিজাইন শেখার পর ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করারও। তবে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করার জন্য সৃজনশীলতার পাশাপাশি দরকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার মানসিকতা। অনেকেই ওডেস্ক বা ফ্রিল্যান্সার ডটকমে অটোক্যাড অথবা থ্রিডি স্টুডিও ম্যাক্স্যের সাহায্যে বিভিন্ন ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে আয় করছেন হাজার হাজার ডলার।

ইন্টেরিয়র ডিজাইন ব্যবসায় বিপ্লব এনেছে থ্রি-ডি প্রিন্ট। এতে সহজেই নিখুঁত মডেল তৈরি করে ফেলতে পারছেন ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা। বাজারে এসেছে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি, যেখানে ঘরে বসে সম্পূর্ণ অন্য এক জায়গায় থাকার স্বাদ মিলবে। এতে ৩৬০ ডিগ্রির ভিডিও বা স্থির চিত্র তৈরি করা হয় এবং কেউ মাথা ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গেই ভিডিও স্থিরচিত্রটিও এমনভাবে সরবে যা দেখে মনে হবে, তিনি সরাসরি সেই জায়গাতেই পৌঁছে গেছেন।

বর্তমানে স্কেচআপ, ভি-রে এবং থ্রি-ডি ম্যাক্সের মতো সফ্টওয়্যারের সাহায্যে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ডিজাইন সম্পর্কে গ্রাহককে স্পষ্ট ধারণা দিতে পারছেন ডিজাইনাররা। ভার্চুয়ালি ক্রেতা পৌঁছে যাচ্ছেন তাঁর ভবিষ্যৎ গৃহে। আগামীতে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের ক্ষেত্রে ক্রমেই  বাড়বে এই প্রযুক্তির ব্যবহার।

পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে পরিবেশ বান্ধব উপাদানের ব্যবহার বৃদ্ধি পাবে। কাঠের বদলে বিকল্প উপাদান ব্যবহার করে আসবাব তৈরির ঝোঁক বাড়ছে ক্রমশ। বাড়ির দেয়াল থেকে ছাদ এমন উপাদানসমূহ দিয়ে বানানো হচ্ছে, যাতে এসি ব্যবহারের প্রয়োজন কম পড়ে। বাড়ির ছাদে লাগানো হচ্ছে ঘাসের কার্পেট। আগামীতে এই ট্রেন্ড আরও বাড়ার পাশাপাশি বাড়বে রিসাইকেলড্ কম্পোজিটের ব্যবহার।

ইনস্টাগ্রাম, পিন্টারেস্ট-এর মতো প্ল্যাটফর্মে হাজারো ডিজাইন হাতের মুঠোয়ে পাচ্ছেন আজকের তরুণ প্রজন্ম। আর তাই আরও স্বতন্ত্র ও মৌলিক ডিজাইনের চাহিদা বাড়বে এই প্রজন্মের মধ্যে। আগামী দিনগুলোতে পরিবারের অল্পবয়সী সদস্যদের রুচির ভিত্তিতে তৈরি হবে ইন্টেরিয়র ডিজাইনের নতুন ধাঁচ। ফলে ডিজাইন হবে আরও বেশি। বিশ্বজুড়ে ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে থিম ভিত্তিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন। আগামী বছরগুলোতে এই ট্রেন্ড-ই ছড়িয়ে পড়বে বাংলাদেশেও। মধ্যপ্রাচ্যের নকশা, ইউরোপীয় ধাঁচের ডিজাইন, পুরনো ভারতীয় ডিজাইন ইত্যাদি বিভিন্ন থিমকে মাথায় রেখে প্রয়োজন মতো ঘর সাজিয়ে নিতে চাইবে নতুন প্রজন্ম।

ব্যবসা বৃদ্ধিতে মুখ্য সহায়ক হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। অন্যান্য ব্যবসার মতোই ইন্টেরিয়র ডিজাইন ব্যবসাতেও গুরুত্ব বেড়েছে সোশ্যাল মিডিয়ার। সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইলগুলোই ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের পোর্টফোলিও হিসেবে কাজ ব্যবসায় প্রসার করতে হলে এই সুবিধার ব্যবহার বাড়াতে হবে।

একটা সময় অবধি অনলাইনে আসবাব কেনার কথা ভাবতেই পারতেন না বেশিরভাগ ক্রেতা। এখনও অনেকেই নিজে চোখে না দেখে আসবাব কিনতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। প্রযুক্তির মাধ্যমে মার্কেটে না গিয়েই আসবাব বা অন্দর সজ্জার উপকরণ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব ভার্চুয়্যাল রিয়্যালিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে। এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবসা হয়ে পড়বে আরও প্রযুক্তিনির্ভর।

ইন্টেরিয়র ডিজাইনের অন্যান্য উপকরণের ক্ষেত্রেও অনলাইন ব্যবসার ওপরও ক্রমশ আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বেন ভবিষ্যতের ইন্টেরিয়র ডিজাইনাররা। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও বিশ্ব বাজারের প্রভাবই পরিবর্তন আনবে আগামী দশকের ইন্টেরিয়র ডিজাইন ব্যবসায়। ডিজানিংয়ের ক্ষেত্রে খুলে যাবে নতুন দিগন্ত। পরিবর্তন আসবে ক্রেতাদের প্রোফাইলে। মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্মের ক্রেতার সংখ্যা বাড়বে, পরিবর্তন আসবে রুচি ও পছন্দে। আর তাই বাজারের চাহিদা মাথায় রেখে, নতুন প্রজন্মের চাহিদামতো ডিজাইনে পরিবর্তন আনতে হবে ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের।

লেখক: জোবায়ের নোবেল, টেলিভিশন প্রযোজক

news24bd.tv/তৌহিদ

এই রকম আরও টপিক

সম্পর্কিত খবর

পাঠকপ্রিয়