ভালোবাসার আওয়ামী লীগ

মো. জাকির হোসেন

ভালোবাসার আওয়ামী লীগ

মো. জাকির হোসেন

আওয়ামী লীগ কেবলই একটি রাজনৈতিক দল নয়। এটি ভালোবাসার আরেক নাম। আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম। ’ কয়েকটি শব্দ নিয়ে উচ্চারিত হয় ভালোবাসা।

কিন্তু এর মর্মকথা তথা গভীরতা অপরিমেয়, অতল। আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের ভালোবাসা এবং দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি আওয়ামী লীগের উজাড় করা ভালোবাসার গভীরতাও পরিমাপযোগ্য নয়। বাঙালি ও বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন তার সব কিছুর সঙ্গেই রয়েছে আওয়ামী লীগ। কোনো সাম্রাজ্যবাদী শাসকের পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা জমিদার-ভূস্বামীদের হাতে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়নি।


সামরিক জান্তা, দখলদার ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাব-প্রতিপত্তির অবৈধ গর্ভেও আওয়ামী লীগ জন্ম নেয়নি। লোভ-লালসা, ভয়-ভীতি ও পদ-পদবির লোভ দেখিয়ে দলছুট, নীতিভ্রষ্টদের নিয়ে আওয়ামী লীগ যাত্রা শুরু করেনি। বাংলার মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির এক মহান লক্ষ্যে ধারাবাহিক ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দলটির জন্ম।

আওয়ামী লীগের উদ্যোক্তা বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সময়েই বিভিন্ন জনসভায় তিনি তুলে ধরতেন বাঙালিদের জন্য একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা। ১৯৭২ সালের ১৮ মার্চ সংবাদ পত্রিকায় কমরেড মণি সিংহের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু ১৯৫১ সালে কারাগারে থাকাকালেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। চিঠিপত্র আদান-প্রদানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর এই পরিকল্পনার কথা জানতে পেরেছিলেন বলে মণি সিংহ উল্লেখ করেন। মণি সিংহ আরো বলেছেন, যদিও তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল তথাপি বঙ্গবন্ধু তাঁর কাছে এটা জানতে চেয়ে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিলেন যে স্বাধীনতাসংগ্রামকে তিনি (মণি সিংহ) সমর্থন করবেন কি না। ১৯৫১ সালে পাকিস্তান ভাঙার কথা বোধ করি কেউ নির্জনে বসেও চিন্তা করার দুঃসাহস করেননি।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার কথা কেবল চিন্তাই করেননি, তা বাস্তবায়নের জন্য অন্য দলের নেতাদের সাহায্য কামনা করেছেন। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই পাকিস্তান সৃষ্টির তিন সপ্তাহের মধ্যে বঙ্গবন্ধু সর্বপ্রথম গণতান্ত্রিক যুবলীগ নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তানের কর্মী সম্মেলনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু চমৎকার করে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “আমি বললাম, এর (গণতান্ত্রিক যুবলীগের) কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা করা, যাতে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশ ত্যাগ না করে, যাকে ইংরেজিতে বলে ‘কমিউনাল হারমনি’ তার জন্য চেষ্টা করা। অনেকেই এই মত সমর্থন করল। ” গণতান্ত্রিক যুবলীগের কর্মী সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাবও গৃহীত হয়। এ প্রসঙ্গে প্রয়াত ভাষাসৈনিক গাজীউল হক লিখেছেন, ‘সম্মেলনের কমিটিতে গৃহীত প্রস্তাবগুলো পাঠ করলেন সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। ’ ভাষা সম্পর্কিত প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের লিখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক। এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক। ’ (সূত্র : ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’ গাজীউল হক, ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু গবেষণা কেন্দ্র, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪)

গণতান্ত্রিক যুবলীগ প্রতিষ্ঠার পাঁচ মাসেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু গড়ে তোলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। পরবর্তী সময়ে ১৯৫৩ সালে মুসলিম শব্দ বাদ দেওয়া হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। আর স্বাধীনতার নেতৃত্ব দানকারী দল আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন হয় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছর ১০ মাসের মধ্যে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। প্রতিষ্ঠার পর অতি দ্রুততম সময়ে আওয়ামী লীগ গতানুগতিক রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে জনসাধারণের অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত একটি অনন্য সংগঠনে পরিণত হয়। কালক্রমে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিভূ হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ। জন্মের পাঁচ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯৫৪ সালের ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত যুক্তফ্রন্ট ২২৮টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন লাভ করে। ২২৩ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে ১৪৩টি আসনে জয়লাভ করে। নবীন দল আওয়ামী লীগের এই অভূতপূর্ব সাফল্য আওয়ামী লীগের প্রতি জনসাধারণের অনন্য ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

দেশপ্রেম, জনগণের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, বাঙালির অন্তরে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তাগিদ গেঁথে দেওয়া, জেল-জুলুম, মামলা, নির্যাতন, ষড়যন্ত্রে দমে না যাওয়া, বরং ত্যাগ, নিষ্ঠা, সাহসিকতা, সততা, প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা দিয়ে মোকাবেলা করার বঙ্গবন্ধুর অনন্য রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য নির্ভরশীল বন্ধু হিসেবে বাঙালির হৃদয়ে তাঁকে এক বিশেষ উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাঙালির কয়েক হাজার বছরের ইতিহাসে এমন দরদি নেতা, জনক, স্থপতি, বন্ধু একবারই জন্মেছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বাঙালির আত্মার বন্ধন তৈরি হয়েছে বলেই মৃত্যুতেও সে বন্ধন ছিন্ন হয়নি, হওয়ার নয়। তাইতো মৃত্যুর কয়েক দশক পরও মুজিবকে মুছে ফেলার সব অপচেষ্টা পদদলিত করে বিশ্বব্যাপী বিবিসির জরিপে কালজয়ী রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ধাপে ধাপে জাতিকে প্রস্তুত করেছে মুক্তিযুদ্ধের জন্য। স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলনকে মুক্তিযুদ্ধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে রূপ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এরপর জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনে রূপ দিয়েছে। স্বায়ত্তশাসনকে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ দিয়ে অর্জন করেছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র মিলে লাখ লাখ মানুষ, যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না, তারাও মুক্তিযুদ্ধ করেছে। আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে ভালোবেসে জীবন উৎসর্গ করেছে, স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছে।

দেশের মানুষ গতানুগতিক রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরে গভীর মমতায় ভালোবেসেছে আওয়ামী লীগকে। আওয়ামী লীগও দেশবাসীর ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে চলেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিকতন্ত্রের নিগড়ে বন্দি হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রাজনৈতিক দলগুলোর যৌথ আন্দোলনে সামরিকতন্তের অভিশাপমুক্ত হয় বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার বিচার করা যাবে না মর্মে দায়মুক্তি আইন করে খুনিদের বাঁচাতে সাংবিধানিক রক্ষাকবচ তৈরি করা হয়েছিল। আইনের শাসন, মানবাধিকার, বিবেক ও সভ্যতাবিরোধী এই আইন বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে অসভ্য-জংলি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ললাট থেকে সেই কলঙ্ক তিলক অপসারণ করেছে।

মুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গঠিত ট্রাইব্যুনাল বাতিলের পাশাপাশি বিচারে দণ্ডপ্রাপ্তদেরও মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী জাতীয় চার নেতাকে বিনা বিচারে কারাগারের অভ্যন্তরে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রীয় ও দলীয় আশ্রয়-প্রশ্রয়ে বাংলাদেশ জঙ্গিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়। আত্মঘাতী জঙ্গি হামলা নৈমিত্তিক হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করতে রাষ্ট্র ও জঙ্গিরা মিলেমিশে কাজ শুরু করে। সাম্প্রদায়িকতা গ্রাস করে বাংলাদেশকে। গভীর অমানিশা নেমে আসে বাঙালি ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জীবনে। বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যাওয়া বাংলাদেশকে উদ্ধার করে আলোতে ফিরিয়ে আনে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্বে অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

বহু ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে কখনো সরকারে, কখনো বিরোধী দলে থেকে দেশ গঠনে অনন্য অবদান রেখে চলেছে মাটি ও মানুষের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগকে মানুষ যেমন অকাতরে ভালোবেসেছে, তেমনি আওয়ামী লীগও উজাড় করে ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে চলেছে। এলিজাবেথ বাওয়েন বলেছেন, ‘যখন আপনি কাউকে ভালোবাসেন, তখন আপনার জমিয়ে রাখা সব ইচ্ছা বেরিয়ে আসতে থাকে। ’ বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের আদর্শবিরোধী বহু দানবের অনুপ্রবেশ ঘটেছে আওয়ামী লীগে। ভয়ংকর বদনাম হচ্ছে দলের। এখনই দানবদের বিরুদ্ধে কঠোর না হলে জনমনে আস্থার সংকট দল ও দেশকে ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। প্রচলিত আছে, ‘আওয়ামী লীগ হারলে একা হারে না, সেই সঙ্গে দেশ ও জনগণও হারে। ’

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

zhossain1965@gmail.com


 

এই রকম আরও টপিক