ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আবারও চার বাঙালি কন্যা

এম নজরুল ইসলাম

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আবারও চার বাঙালি কন্যা

এম নজরুল ইসলাম

গত ৪ জুলাই বৃহস্পতিবার ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সময় ৭টা থেকে ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। এবারের নির্বাচনে ছোট-বড় মিলিয়ে অন্তত ৯৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ৩৫টি রাজনৈতিক দল মাত্র একজন করে প্রার্থী দেয়।

এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল চার হাজার ৫১৫।

যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে যেমনটি ফল আশা করা গিয়েছিল, তেমনটিই ঘটেছে। নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে লেবার পার্টি। কনজারভেটিভ পার্টির ভরাডুবি হয়েছে।

বুথফেরত সমীক্ষা থেকেও এমন আভাস পাওয়া গিয়েছিল। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হয়ে ভোটগ্রহণ চলে রাত ১০টা পর্যন্ত। শুক্রবার স্থানীয় সময় ভোর থেকেই ভোটের ফল জানা যেতে থাকে। সকালে স্পষ্ট হয়ে যায় দলগত অবস্থান।

জনমত জরিপের ফলই সত্য প্রমাণ করে ১৪ বছরের টোরি শাসনের অবসান ঘটিয়ে যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেল কিয়ার স্টারমারের লেবার পার্টি। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমনসের ৬৫০টি আসনের মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৩২৬টি। এই লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত ৬৫০টি আসনের ৬৪৪টির ফল ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত ফলে ৪১০টি জিতে নিয়ে নিরঙ্কুশ জয় পেয়ে মধ্যম বামপন্থী দল লেবার পার্টি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ভোটের প্রচারে পরিবর্তনের ডাক দেওয়া লেবার নেতা কিয়ার স্টারমার দলের বিপুল বিজয়ের পর ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, যুক্তরাজ্যে ‘পরিবর্তনের সূচনা’ হলো।

টিউলিপ সিদ্দিক, রুশনারা আলী, রুপা হক ও আফসানা বেগম

অন্যদিকে পরাজয় স্বীকার করে কনজারভেটিভ দলনেতা ঋষি সুনাক দুঃখ প্রকাশ করে বলেছেন, জনগণ ‘গুরুগম্ভীর রায়’ দিয়েছে, ‘ভোটে জয়ী হয়েছে লেবার’। নির্বাচনে জয়ের জন্য ফোনে কিয়ার স্টারমারকে অভিনন্দনও জানিয়েছেন তিনি। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে রক্ষণশীলদের ১৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটল। এবারের নির্বাচনে কনজারভেটিভদের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা পরাজিত হয়েছেন। কনজারভেটিভ পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা প্রতিরক্ষামন্ত্রী গ্র্যান্ট শ্যাপস ও বিচারমন্ত্রী অ্যালেক্স চক হেরে গেছেন। হেরে গেছেন শিক্ষামন্ত্রী গিলিয়ান কিগান ও কনজারভেটিভ পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা পেনি মর্ডান্ট।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে আবারও চার বাঙালি কন্যাবরাবরের মতো যুক্তরাজ্যের এবারের নির্বাচনের দিকে বিশ্বের পর্যবেক্ষকমহলের দৃষ্টি ছিল। এর অন্যতম কারণ, মেয়াদ পূর্তির ছয় মাস আগেই ঋষি সুনাকের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া। সেই ব্রেক্সিটের সময় থেকেই নানা ইস্যুতে সব সময় সামনে চলে এসেছে ব্রিটেনের নির্বাচন।

ব্রিটেনের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এর আগেও লন্ডনে আসা হয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময়ও লন্ডনে ছিলাম। সবারই জানা ব্রিটেনের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতদের একটি অবস্থান রয়েছে। সেখানে সাধারণ নির্বাচন থেকে শুরু করে স্থানীয় নির্বাচনে বাঙালিদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যে পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন ১১ জন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। ২০১৯ সালে সংখ্যাটি বেড়ে হয় ১৪। এবারের নির্বাচনে ৩৪ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী হয়েছিলেন। এর মধ্যে একক দল হিসেবে বিরোধী লেবার পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন সর্বোচ্চ আটজন। লেবার পার্টির ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, তাদের প্রার্থী তালিকায় আটজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীর মধ্যে ছয়জনই নারী। কনজারভেটিভ পার্টির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা দুজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিককে এবার প্রার্থী করেছে। অন্যান্য দলের মধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি অব ব্রিটেন থেকে ছয়জন, রিফর্ম ইউকে থেকে একজন, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস থেকে একজন, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি (এসএনপি) থেকে একজন, গ্রিন থেকে তিনজন এবং সোশ্যালিস্ট পার্টি থেকে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থী হয়েছেন। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ১১ জন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক।

২০১৯ সালের নির্বাচনে যেমনটি ফল এসেছিল, এবার ঠিক তেমনই আশার আলো জ্বালিয়েছেন চার বাঙালি নারী। এমপি হিসেবে নির্বাচিত এই চার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী রুশনারা আলী, টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক, রূপা হক ও আপসানা বেগম। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশনারা আলী যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টি থেকে টানা পঞ্চমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড স্টেপনি আসন থেকে ১৫ হাজার ৮৯৬ ভোট পেয়ে জিতেছেন রুশনারা। হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট আসনে লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে ২৩ হাজার ৪৩২ ভোট পেয়ে জিতেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্রী টিউলিপ সিদ্দিক। টানা চতুর্থবারের মতো এমপি নির্বাচিত হলেন তিনি। পশ্চিম লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন রূপা হক। টানা তিনবার এমপি নির্বাচিত হলেন তিনি। আরেক বাংলাদেশি পপলার অ্যান্ড লাইমহাউস আসন থেকে লেবার পার্টির আপসানা বেগম ১৮ হাজার ৫৩৫ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেছেন।

ব্রিটেনের নির্বাচনে বাঙালির বিজয় পতাকা তুলে ধরলেন তাঁরা। লেবার পার্টির হয়ে একাধিকবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপি নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তাঁরা। আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিমণ্ডলে বাঙালির জয়পতাকা উড়িয়ে জানিয়ে দিলেন ‘কম নয় বঙ্গনারী’।

চারজন ব্রিটিশ বাংলাদেশি এমপি প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন গণতন্ত্রের সূতিকাগারে। বিজয়িনী চার বাঙালি কন্যাকে অভিনন্দন।

 লেখক: সর্ব-ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি

nazru@gmx.at

news24bd.tv/আইএএম