বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯ | আপডেট ০১ মিনিট আগে

চলেই গেলেন দগ্ধ কলেজছাত্রী ফুলন

নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী

চলেই গেলেন দগ্ধ কলেজছাত্রী ফুলন

নরসিংদীতে ফুফাত ভাইয়ের দেওয়া আগুনে দগ্ধ কলেজছাত্রী ফুলন বর্মণ ১৩ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে হার মেনেছেন। বুধবার ভোর ছয়টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এর আগে ১৩ জুন বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে নরসিংদীর বীরপুরে কলেজছাত্রী ফুলন বর্মণ কেক নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। এসময় পথে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

ফুলনের বাবা যুগেন্ধ বর্মন বলেন, আগুনে ফুলনের শরীরের ২১ শতাংশ পুড়ে যায়। মুখে কেরোসিন ঢালার কারণে ফুলনের শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার কারণে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। এজন্য গত বৃহস্পতিবার ফুলনের অপারেশন করা হয়। এরপর থেকে ফুলন ভালোই ছিল। কিন্তু গতকাল থেকে তার বমি হচ্ছিল ও শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছিল। ডাক্তাররা তাকে সুস্থ্য করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক আব্দুল গাফফার বলেন, সকালে ফুলনের বাবা যুগেন্দ্র বর্মণ ফোন করে আমাদের মৃত্যুর খবর জানায়। আমরা নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করব।

উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে আটটার দিকে নরসিংদীর বীরপুরে কলেজছাত্রী ফুলন বর্মণ কেক নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ির আঙিনায় পৌঁছালে ওঁৎ পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা দুই দুর্বৃত্ত তার হাত-মুখ চেপে ধরে। পরে টেনে-হেঁচড়ে পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওই সময় তার চিৎকারে প্রতিবেশীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করে।

এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে তার বাবা যোগেন্দ্র বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা দুইজনকে আসামি করে সদর মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত ভার পড়ে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ডিবির উপ-পরিদর্শক আব্দুল গাফফারের নেতৃত্বে অভিযানে নামে পুলিশ। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সঞ্জিবসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। কিন্তু তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করে।

পরে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ২০ জুন বৃহস্পতিবার রাতে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রাজু সূত্রধর নামে একজনকে শহরের শিক্ষা চত্বর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসময় পুলিশের কাছে আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করেন রাজু। রাজুর দেওয়া তথ্য মতে ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ ও আনন্দকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পরে গ্রেপ্তার হওয়া রাজু ২১ জুন শুক্রবার বিকেলে নরসিংদীর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আক্তার পিংকীর আদালতে দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর শনিবার বিকেলে কলেজছাত্রী ফুলনের ফুফাতো ভাই ভবতোষ বর্মণ নিজের সম্পৃক্ততা স্বীকার করে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শাহিনা আক্তারের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে রাজু ও ভবতোষ উল্লেখ করেন, ফুলনের ফুপাত ভাই ভবতোষের ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাজু সূত্রধর ও আনন্দ বর্মণ। ফুলনের বাবা যোগেন্দ্রের সঙ্গে প্রতিবেশী সুখ লাল ও হিরা লালের সঙ্গে বাড়ির জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে এলাকায় সালিশ দরবার হয়েছে। ঘটনার দুই দিন আগে ১১ জুন মঙ্গলবার ভবতোষ ও তার মামীর (ফুলনের মা) সঙ্গে ঝগড়া হয় প্রতিবেশী সুখ লালের। এ ঝগড়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ফুলনের মা বলেন, এখানে থাকব না। দরকার হয় জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাব। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ফুলনের শরীরে আগুন দিয়ে প্রতিবেশীকে মামলায় ফাঁসানোর পরিকল্পনা করে কলেজছাত্রী ফুলনের ভাই ভবতোষ। ঘটনার দিন ভবতোষ তার বন্ধু রাজু সূত্রধর ও আনন্দ বর্মণকে নিয়ে বীরপুর রেললাইনে বসে পরিকল্পনা করে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে ফুলন কেক নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে রাজু ফুলনের মুখ চেপে ধরে আর আনন্দ মাথায় ও শরীরে কেরোসিন ঢালে। আর ভবতোষ দিয়াশলাইয়ের কাঠি দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন দেওয়ার পর ভবতোষ, আনন্দ একদিক দিয়ে ও রাজু অন্যদিক দিক দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/সুমন/তৌহিদ)

মন্তব্য