বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ | আপডেট ৫৭ মিনিট আগে

রাজীব যেভাবে মালিক হয়ে ওঠেন শত শত কোটি টাকার

অনলাইন ডেস্ক

রাজীব যেভাবে মালিক হয়ে ওঠেন শত শত কোটি টাকার

২০১৪ সালে কাউন্সিলর হওয়ার পরই বদলে যেতে থাকে যুবলীগের এই থানা পর্যায়ের নেতার জীবনযাত্রা। আর মাত্র কয়েক বছরেই তিনি মালিক হয়েছেন কয়েক শ' কোটি টাকার।

প্রায় ছয় বছর আগে মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির একটি বাড়ির নিচতলার গ্যারেজের পাশেই ছোট্ট এক বাড়িতে সস্ত্রীক ভাড়া থাকতেন তারিকুজ্জামান রাজীব। ভাড়া দিতেন ৬ হাজার টাকা। তবে ছয় বছর শেষে একই হাউজিং এলাকায় নিজের ডুপ্লেক্স বাড়িতে থাকেন। নামে-বেনামে তার অন্তত ৬টি বাড়ি রয়েছে মোহাম্মদপুরে। রয়েছে দেশ-বিদেশে সম্পত্তিও। ছয় বছর আগে একমাত্র বাহন অল্প দামি একটি মোটরসাইকেল থাকলেও ছয় বছর শেষে হয়েছে কোটি টাকা দামের বিলাসবহুল গাড়ি।

কিছুদিন পরপরই তিনি পরিবর্তন করেন গাড়ির ব্র্যান্ড। যেখানেই যান, তার গাড়িবহরের সামনে-পেছনে থাকে শতাধিক সহযোগীর একটি দল। নিজের সংগ্রহে রয়েছে মার্সিডিস, বিএমডব্লিউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮, বিএমডব্লিউ স্পোর্টসসহ নামিদামি সব ব্র্যান্ডের গাড়ি।

সরকারি জায়গা দখল করে ভাড়া দেওয়া, বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসা, জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্ম করেই তিনি গড়ে তুলেছেন বিশাল সাম্রাজ্য। রাজীবের সব অপকর্মের সঙ্গী যুবলীগ নেতা শাহ আলম জীবন, সিএনজি কামাল, আশিকুজ্জামান রনি, ফারুক, রাজীবের স্ত্রীর বড় ভাই ইমতিহান হোসেন ইমতিসহ অর্ধশত ক্যাডার। অভিযোগ রয়েছে, রাজীবের নির্দেশেই যুবলীগ কর্মী তছিরকে হত্যা করে রাজীবের ঘনিষ্ঠরা।

২০১৫ সালের কাউন্সিলর নির্বাচনে তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। বিভিন্ন কারসাজি করে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা ঢাকা মহানগরী উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারান। অভিযোগ রয়েছে, এর পর থেকেই এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করছিলেন না তিনি।

জানা গেছে, মোহাম্মদপুরে যুবলীগ দিয়েই শুরু রাজীবের রাজনৈতিক জীবন। মাত্র এক বছরের রাজনীতি করেই বাগিয়ে নেন মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম-আহ্বায়কের পদ। এ পদ পেয়েই থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করেন। সে সময় যুবলীগ থেকে তাকে বহিষ্কারও করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাজীব মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে উল্টো ঢাকা মহানগরী উত্তর যুবলীগের যুগ্মসাধারণ সম্পাদক বনে যান। কেন্দ্রীয় যুবলীগের আলোচিত দফতর সম্পাদক আনিসুর রহমানকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে এ পদ কেনেন রাজীব।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাউন্সিলর নির্বাচন করার আগে রাজনীতির পাশাপাশি এক চাচাকে কাজকর্মে সহযোগিতা করতেন। ওই চাচা ঠিকাদারি করতেন। নির্বাচনের সময় তার ওই চাচা একটি জমি বিক্রি করে ৮০ লাখ টাকা দিয়ে তাকে কাউন্সিলর নির্বাচন করতে সহযোগিতা করেন। ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বনিবনা না হওয়ায় এখন ওই চাচার সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর প্লটে রয়েছে রাজীবের ডুপ্লেক্স বাড়ি।

জানা গেছে, ৫ কাঠা জমির ওপর বাড়িটি করতে খরচ হয়েছে ৬ কোটি টাকা। এর বাইরে রহিম ব্যাপারী ঘাট মসজিদের সামনে আবদুুল হক নামে এক ব্যক্তির ৩৫ কাঠার একটি প্লট যুবলীগের কার্যালয়ের নামে দখল, ওই জমির পাশেই জাকির হোসেনের ৭-৮ কাঠার ১টি প্লট দখল করেছিলেন। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে ময়ূর ভিলার মালিক রফিক মিয়ার কয়েক কোটি টাকা দামের জমি দখল করেন রাজীব। পাবলিক টয়লেট নির্মাণের মাধ্যমে জমিটি দখল করলেও সেখানে ৫টি দোকান তুলে ভাড়া দিয়েছেন।

ঢাকা রিয়েল এস্টেটের ৩ নম্বর সড়কের ৫৬ নম্বর প্লট, চাঁদ উদ্যানের ৩ নম্বর সড়কের রহিমা আক্তার রাহি, বাবুল ও জসিমের ৩টি প্লটসহ অন্তত ১০টি প্লট দখল করেছেন তিনি। মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের সামনে আল্লাহ করিম মসজিদ ও মার্কেটের নিয়ন্ত্রণও রাজীবের হাতে। অভিযোগ রয়েছে, মোহাম্মদপুর, বেড়িবাঁধ, বসিলার পরিবহনে চাঁদাবাজি রাজীবের নিয়ন্ত্রণে। অটোরিকশা, লেগুনা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও বাস থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলে তার লোকজন। পাঁচ বছর ধরে এলাকার কোরবানির পশুর হাটের ইজারাও নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন রাজীব।

উল্লেখ্য, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তারিকুজ্জামান রাজীব। মোহাম্মদপুর-বসিলা-ঢাকা উদ্যানসহ আশপাশ এলাকার অঘোষিত সম্রাট রাজীবের সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। দিনমজুর থেকে চাঁদাবাজি ও দখলের টাকায় ধনকুবের হয়ে ওঠা রাজীব গতকাল ভাটারা থেকে আটক হয়েছেন র‌্যাবের হাতে। ওই বাড়িতে রাজীব ১৩ অক্টোবর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন। বাড়িটি তার আমেরিকাপ্রবাসী বন্ধুর। 

 

নিউজ টোয়েন্টিফোর/কামরুল 

মন্তব্য