সোমবার, ১ জুন, ২০২০ |

রাজা-বাদশা গেল তল, জনগণ বলে কত জল!

রুমানা রাখি

রাজা-বাদশা গেল তল, জনগণ বলে কত জল!

ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের নাম আমরা প্রায় সবাই শুনেছি। পৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাবান রাষ্ট্রপ্রধান তিনি। ব্রিটেনের রানিকে ঘিরে রয়েছে অনেক আইন। যুক্তরাজ্যের নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ মানুষ রাজপ্রাসাদের পাশের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে পারবে, দূর থেকে ছবি তুলতে পারবে; কিন্তু কেউ রাজপ্রাসাদের দেয়াল ছুঁতে পারবে না। কেউ যদি ভুল করেও রানির বাড়ির দেয়াল ছুঁয়ে দেয়, তাহলেই জেল।

রানিকে সম্মান করে আর এক অদ্ভুত আইন রয়েছে। পৃথিবীর যতই ক্ষমতাবান বা ধনী মানুষই হোক না কেন, রানির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে কেউ রানির চোখে চোখ রাখতে পারবেন না।

কিন্তু ক্ষমতাবান এই মানুষটির প্রাসাদেও পৌঁছে গেছে করোনাভাইরাস। যে রানির চোখে চোখ রাখার ক্ষমতা নেই কারো, সেই রানি করোনার ভয়ে প্রাসাদ ছেড়েছেন। করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লসও। করোনা যেমন পৌঁছে গেছে ব্রিটেনের রাজপ্রাসাদে, ঠিক তেমনি পৌঁছে গেছে টেন ডাউনিং স্ট্রিটে। গত শুক্রবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর দেশটির সাধারণ মানুষের মুখে একটি কথাই ঘুরছে—প্রকৃতি বড়ই নিষ্ঠুর, যার কাছে পরাজিত পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষগুলো।

করোনায় আক্রান্তের তালিকায় আরো রয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডটন, মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল উইলিয়াম পি বার, ব্রাজিলের নেতা জায়ের বলসোনারো, কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর স্ত্রী সোফি গ্রেগোয়ার ট্রুডো, ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাদিন ডরিস ও অস্কারজয়ী মার্কিন অভিনেতা টম হ্যাঙ্কস ও তাঁর স্ত্রী রিটা উইলসনসহ আরো অনেকে।

বিশ্বের বাঘা বাঘা মানুষ যখন করোনার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে নিজেদের বন্দি করেছেন ঘরে, সেখানে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের ভয় ও অনিশ্চয়তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ক্ষমতাবান এসব মানুষের কাছে হয়তো খাবার বা প্রয়োজনীয় সব কিছু পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু আমাদের কী হবে?

যদিও এই মুহূর্তে আমি, আমরা, আমাদের পরিচিত সবাই নিজ নিজ দেশে কিংবা পরদেশে, নিজ নিজ ঘরে স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে জীবন পার করছি। যুক্তরাজ্যের মতো গণতান্ত্রিক দেশেও মুঠোফোনে খুদেবার্তায় সরকার থেকে জানানো হয়েছে, কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ (খাবার, ওষুধ ও ব্যায়াম) ছাড়া বাইরে বের হলে জরিমানা কিংবা আইনের আওতায় আনার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।

গত কয়েকদিন যে কয়েকবার প্রয়োজনীয় কাজে বাইরে বের হয়েছি, আমি নিজে অবাক হয়েছি ‘কর্মচঞ্চল’ ব্রিটেনকে দেখে। সুপারশপগুলোতে লোক নেই। রাস্তা ফাঁকা। অচেনা লাগলেও নিজেকে নিরাপদ মনে হয়েছে।

এদিকে ব্রিটেনে মার্চ মাসের শুরুতে সুপারশপগুলোতে খাবারদাবার, বিশেষ করে টয়লেট পেপারের মতো তুচ্ছ সামগ্রী নিয়ে কাড়াকাড়ি রীতিমতো হাস্যরস তৈরি করেছিল। অনেকে হয়তো বলেছিল, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস এত কেনার কী আছে? সবাইকে কেনার সুযোগ করে দিন। কিন্তু এখন আর এই না-থাকাটা হাস্যকর নয় কারো জন্যই, বরং এটাই বাস্তবতা; গৃহবন্দি মানুষের আর বড়জোড় সপ্তাহখানেক চলার মতো খাবারদাবার আছে; এরপর মানুষকে এই ভয়াবহতা উপেক্ষা করে বাইরে বেরোতে হবে, যেখানে যতটুকু পাওয়া যাবে, তা কিনতে হবে।

লন্ডনে আছি, হয়তো খাবার সংকটে পড়তে হবে না। বাইরে গিয়ে সুপারশপগুলোতে খাদ্যদ্রব্য কিনতে পারব। তা ছাড়া এখানকার কিছু সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু ভয় হচ্ছে নিজের দেশকে নিয়ে। যদি আমাদের দেশের দিনমজুররা কাজের জন্য বের না হন, তাহলে তাঁরা কী খাবেন? তাঁদের পরিবার কীভাবে চলবে? অবশ্য সরকার ইতিমধ্যে সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে।

যুক্তরাজ্যের সঙ্গে তুলনা করছি না। তবু বিশ্ব যখন এমন পরিস্থিতিতে স্তব্ধ হয়ে গেছে, তখন আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে খেটে খাওয়া মানুষের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে বিত্তবানদের। একই সঙ্গে যার যা কিছু আছে, তা-ই নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। যাতে কাউকে অনাহারে মরতে না হয়।

আমরা বলতে পারি—প্রকৃতির প্রতি, পৃথিবীর প্রতি এই দায়বদ্ধতার কথা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে করোনাভাইরাস। আগের মতো এবারও মানুষ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হবে সন্দেহ নেই। হয়তো আরো অনেক প্রাণের বিনিময়ে, আরো অনেক কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে। তবে মানুষ এই অণুজীবের বিপক্ষে জয়ী হবে, সন্দেহ নেই।

লেখক: যুক্তরাজ্য প্রবাসী।

 

নিউজ টোয়েন্টিফোর/কামরুল

মন্তব্য