সোমবার, ১ জুন, ২০২০ | আপডেট ০৭ মিনিট আগে

এপ্রিল ও মে মাসের অর্ধেক ঘরে কাটালে আমরা জয়ী হব

আমিনুল ইসলাম

এপ্রিল ও মে মাসের অর্ধেক ঘরে কাটালে আমরা জয়ী হব

আমেরিকায় গতকাল এক দিনে এক হাজারের উপর মানুষ মারা গেছে করোনা ভাইরাসে। এক দিনে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। সব মিলিয়ে আমেরিকায় করোনা রোগীর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখের মতো এখন! সংখ্যাটা কয়েক কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে আর কয়েক দিনের মাথায়!

আমেরিকার নিউইয়র্ক এখন মৃত্যুপুরী। এমনকি আমার পরিচিত মানুষজনকে মরে যেতে দেখছি!

নিউইয়র্কে থাকে, এমন বাংলাদেশির সাথে আমি কথা বলেছি, যারা নিজেরা অসুস্থ কিন্তু এরপরও হাসপাতালে যাচ্ছে না। কারণ হাসপাতালগুলোতে জায়গা নেই।

হ্যাঁ, সেই আমেরিকা। যারা নিজেদের পৃথিবীর এক নাম্বার উন্নত দেশ হিসেবে দাবি করে। সেই আমেরিকায় এখন পশু-পাখির মতো মানুষ মারা যাচ্ছে।

এখন হয়ত নিউইয়র্কে সব চাইতে বেশি মারা আচ্ছে। আগামী দুই সপ্তাহ পর পুরো আমেরিকা জুড়েই চলবে এই মৃত্যুর মিছিল।

খোদ হোয়াইট হাউজ এখন বলছে- আমেরিকায় হয়ত দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ মারা যেতে পারে, যদি তারা সব কিছু এখন ঠিক-ঠাক মতো করে!

অর্থাৎ কেউ যদি ঘরের বাইরে বের না হয়, ডাক্তাররা সবাই যদি সুস্থ থেকে চিকিৎসা দিতে পারে; হাসপাতালগুলো যদি রোগী ভর্তি করাতে পারে; তাহলে হয়ত দুই থেকে আড়াই লাখ মানুষ মারা যাবে নিশ্চিত ভাবেই।

আর এইসব কিছু যদি ঠিক মতো না যায়; তাহলে মৃত্যুর সংখ্যা ১০ লাখের উপর ছাড়িয়ে যাবে।

হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন-১০ লাখ। নিশ্চিত জেনে রাখুন সংখ্যাটা এর আশপাশেই থাকবে!

এদিকে গতকালও স্পেনে প্রায় এক হাজারের মতো মারা গেছে। ইতালিতেও মৃত্যুর মিছিল শেষ হচ্ছে না। ইংল্যান্ডে গতকাল পাঁচশোর উপর মানুষ মারা গেছে। নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়ামেও মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। আমার পাশের দেশ সুইডেনেও শুরু হয়েছে মৃত্যুর মিছিল। এইসব হচ্ছে হাসপাতালে যারা মারা গেছে তাদের সংখ্যা। এর বাইরে হাজারে হাজারে মানুষ মারা যাচ্ছে নিজেদের ঘরে! ওই সংখ্যাগুলো হিসাবের বাইরে!

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকার এই দেশগুলো কেন দেখতে দেখতে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হলো? কেন এরা এই মৃত্যু উৎসব থামাতে পারছে না?

উত্তরটা খুব সোজা।

এরা এদের মানুষকে ঘরে আটকিয়ে রাখতে পারেনি। যেমন ধরুন সুইডেনে এখনও মানুষ স্বাভাবিকভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে! সেখানে সরকার এখনও কোনো জরুরি অবস্থা ঘোষণা দেয়নি!

এই একই কাজ করেছিল ইতালি, স্পেন, ইংল্যান্ড, আমেরিকা সহ অন্যান্য দেশ। এমনকি আমি যেই দেশে থাকি, সেই এস্তনিয়াতে এখনও মানুষ মনের আনন্দে বের হতে পারছে। যদিও দুজনের বেশি এক সাথে হাঁটা যাবে না।

এরা যখন টোটাল লক-ডাউনে গেছে; ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। তাই মৃত্যুর মিছিল আর থামছেই না।

আমার সত্যিই জানা নেই ইউরোপ-আমেরিকার এই দেশগুলো আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কিনা।

যেই দেশ গুলোতে মানুষজন ৮০-৯০ বছর বয়েসেও মনের আনন্দে পৃথিবী ঘুরে বেড়ায়; সে দেশের মানুষগুলো এখন চোখের সামনে দেখছে এদের এমনকি ৩০- ৪০ বছরের জলজ্যান্ত মানুষগুলো ভাইরাসের কাছে পরাজিত হয়ে মরে যাচ্ছে!

ইউরোপ-আমেরিকা যেই ভুল করেছে; আমাদের কোনোভাবেই উচিত হবে না সেই ভুল করা।

বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। আমি জানি করোনায় অনেকেই হয়তো মারা যাচ্ছে বাংলাদেশেও। তবে এখনও মহামারী আকার হয়ত ধারণ করেনি।

পুরো এপ্রিল মাসটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনোভাবে এপ্রিল পুরোটা আর মে মাসের অর্ধেক যদি আমরা সবাই ঘরে বসে কাটিয়ে দিতে পারি; অন্তত আমার ধারণা এই যুদ্ধে হয়ত ইউরোপ- আমেরিকা জয়ী হতে না পারলেও আমরা জয়ী হব।

আমি করোনা পরিস্থিতি নিয়ে একদম প্রথম থেকে লিখে আসছি। যখন বাংলাদেশে কেউ হয়ত করোনা নিয়ে কিছু বলছিলই না।

আমি নিজে চাইলেই দেশে ফেরত যেতে পারতাম যখন ইউরোপের পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছিল।

নিজে ফেরত না গিয়ে আমি বরং উল্টো লিখেছি- ইউরোপ থেকে কাউকে ওই মুহূর্তে বাংলাদেশে ঢুকতে দেবেন না।

আপনারা শুনেছিলেন, হয়ত একটু দেরি করেছেন।

এরপর স্কুল-কলেজ বন্ধ করার কথাও লিখেছি। শুনেছেন। বলেছিলাম কারফিউ জারি করতে; সেটা না করলেও মোটামুটি সব কিছু বন্ধ করে দিয়েছেন।

কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে সবাই এটা পুরোপুরি মানছে না ঠিক মতো।

আপনারা যারা অনেক দিন ধরে আমার লেখার সাথে পরিচিত এবং যারা আমাকে কাছ থেকে চেনেন; তারা হয়ত জেনে থাকবেন, আমি খুবই লিবারেল একজন মানুষ।

কোনো মানুষকে শারীরিকভাবে আঘাত করার পক্ষে আমি নই। এমনকি সে যদি চিহ্নিত আসামিও হয়। কোনো মানুষকে জোর করে কোনো কাজ করিয়ে নেওয়ার পক্ষেও আমি নই।

কিন্তু বর্তমান পৃথিবী যেই পরিস্থিতে এসে দাঁড়িয়েছে; তাতে আমাকে কিছু কথা বলতেই হচ্ছে।

আমার পরিচিত এমনকি শিক্ষিত মানুষগুলো এখনও -মনের আনন্দে পিপিই পড়ে বাইরে বের হয়ে একই চায়ের কাপে চা খাচ্ছে মোড়ের দোকানে!

-এদের মাঝে অনেকে'ই আবার রেস্টুরেন্ট খোলা থাকাতে সেখানে গিয়ে আড্ডাও দিচ্ছে; খাচ্ছেও!
-অনেকে আবার মসজিদে গিয়ে নামাজও পড়ছে!
-অনেকে আড্ডা দিতেও বের হচ্ছে!
-অনেককে দেখতে পাচ্ছি রিলিফ নিতে এসে এক সঙ্গে জড় হচ্ছে!

এমন অনেক কিছুই হচ্ছে; যেটা হওয়া উচিত না। কাল আবার জুম্মার দিন। অনেকে হয়ত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়বে।

এই জন্য এই লেখা লিখতে বসলাম।

দেখুন বেঁচে থাকলে নামাজ পড়তে পারবেন জীবনভর। আপনার সামান্য ভুলের খেসারত হয়ত পুরো জাতিকে দিতে হতে পারে। একজনের করোনা ভাইরাস হওয়া মানে হাজার হাজার মানুষের মাঝে ছড়িয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

আপনার যদি নামাজ পড়তে মন চায়, বাসায় পড়ুন। চা খেতে মন চাইলে বাসায় খান। আড্ডা দিতে মন চাইলে, দরকার হয় মন খারাপ করে বসে থাকুন। নইলে টেলিফোনে কথা বলুন কিংবা অন্য যা ইচ্ছে ঘরে বসে করুন।

আর যেটা বলার জন্য এই লেখার অবতারণা- সরকারের উচিত হবে কেউ যদি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া আজ থেকে যদি ঘর থেকে বের হয়, সোজা জেলে ভোরে দিন। দরকার হয় দুই একটা ভিডিও করে ছেড়ে দিন। যাতে মানুষজন ভয় পায়। নইলে জরিমানা করুন। শুনেছি বাঙালির নাকি লাঠির বাড়ি ছাড়া কাজ হয় না। যদিও আমি এই মতের বিরুদ্ধে। এরপরও বৃহত্তর স্বার্থে এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতে এই আমাকে'ই বলতে হচ্ছে- দরকার হয় লাঠির বাড়ি দিয়ে হলেও এদের ঘরে ঢোকান। মানুষ যাতে ভয় পায়, কয়েকটা ভিডিও করে ছেড়ে দিন।

রেস্টুরেন্ট গুলো বন্ধ করে দিন। পাড়া র মোড়ের চায়ের দোকান বন্ধ করে দিন। শুধু মুদির দোকান খোলা থাকবে। যেখানে জরুরি খাদ্য পাওয়া যাবে। মসজিতে জামাত আপাতত নিষিদ্ধ করে দিন। মন্দিরে যাবার দরকার নেই। কোনো ধর্মীয় জমায়েতের দরকার নেই। কোনো রকম জমায়েতেরই দরকার নেই। রিলিফ দেওয়ার জন্যও জড় হওয়া যাবে না। বাসায় বাসায় গিয়ে দিয়ে আসুন, বস্তিতে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে থেকে খাবার দিয়ে আসুন।

এই এপ্রিল মাসটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যদি এভাবে বের হতে থাকি, তাহলে শুধু আমার মতামত না; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে- বাংলাদেশে ১০ লাখের মতো মানুষ মারা যেতে পারে।

আমি নিজে দেশে যাইনি; স্রেফ দেশে থাকা মানুষ গুলোর কথা চিন্তা করে। ইউরোপে এখানে বাঁচি-মরি ঠিক নেই। অন্তত আমার দেশের এই মানুষ গুলো বেঁচে থাক।

যারা এভাবে বাইরে বের হচ্ছে, আমি তাদের দোষ দিই না। কারণ আমরা সবাই মিলে এমন সমাজ'ই গড়ে তুলেছি; যেখানে এমন'কি শিক্ষিত মানুষরাও সচেতন না।

কোনোভাবে এই এপ্রিল মাস টুকু মানুষগুলোকে জোর করে ভেতরে ঢুকিয়ে রাখুন।

এম মাস কম খেয়ে থাকলে কিছু হয় না। এরপরও বেঁচে থাকা যাবে। আর যারা খুব গরীব, তাদের আপনারা না হয় চিড়া-মুড়ি দিয়ে আসুন। এক মাস এই খেয়ে'ই থাকুক। সমস্যা নেই। বেঁচে থাকলে পোলাউ-মাংস খেতে পারবে।

একটা মাস'ই তো কেবল।

জরুরী স্বাস্থ্য সেবা আর খাদ্য সামগ্রী কেনা ছাড়া আর কোনো কারণে কেউ যদি ঘর থেকে বের হয়- সোজা জেলে ভোরে দিন, নইলে লাঠির বাড়ি দিয়ে ঘরে পাঠিয়ে দিন।

বৃহত্তর স্বার্থে এই আমার মতো মানুষ কোনো এক দিন এমন কথাও বলেছিল; এই জন্য হয়ত ভবিষ্যতে আমাকে সমালোচনা সহ্য করতে হবে। সেটা আমি মাথা পেতে নিব।

এরপরও মানুষ গুলো বেঁচে থাকুক।

ইউরোপ-আমেরিকা হয়ত এই যুদ্ধে পরাজিত হতে যাচ্ছে। আমরা না হয় জয়ী হই এই যুদ্ধে।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য