বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২০ | আপডেট ০২ মিনিট আগে

কোভিড ১৯ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হাসপাতালে নাকি বাড়িতে?

কোভিড ১৯ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা হাসপাতালে নাকি বাড়িতে?

অনেকেই দ্বিধা দ্বন্দে ভুগছেন কোভিড ১৯ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা বাড়িতে হবে নাকি হাসপাতালে। এক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা এবং CDC র গাইডলাইন টি আপনাদের বোধগম্য করে লেখার চেষ্টা করলাম।

প্রথমত কেউ যদি কোভিড ১৯ পজিটিভ হয়ে থাকেন তাহলে, কোনো চিকিৎসকের কাছে বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে যাবার পূর্বেই টেলিফোনে যোগাযোগ করে তিনি যে কোভিড ১৯ এ আক্রান্ত হয়েছেন সেটা আগে জানাবেন। এতে করে অন্য সুস্থ ব্যক্তিরা যেন আক্রান্ত না হয়/সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত থাকতে পারে সে ব্যাপারে চিকিৎসকের বা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের পক্ষে সাবধানতা বা সতর্কতা অবলম্বন করা সম্ভব হবে। এরপর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণ কোভিড ১৯ আক্রান্ত রোগীর উপসর্গ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন তাঁর ব্যবস্থাপত্র কেমন হবে। যথাঃ-

১। রোগীর মৃদু উপসর্গ যেমন- অল্প জ্বর, কাশি, গলাব্যাথা বা গলায় খুসখুসে ভাব, শরীর ব্যাথা, নাক বন্ধ থাকে এবং সাথে কোনোরূপ বিপদজনিত উপসর্গ না থাকে কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা না থাকে, তাহলে তাঁরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ সাপেক্ষে বাড়িতে হোম কোয়ারেন্টাইনে থেকে চিকিৎসা পেতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে রোগীকে বাড়িতে থাকা অবস্থায় আইসোলেশন এর নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।
২। যদি উপরোল্লিখিত উপসর্গগুলোর সাথে কোনো বিপদজনিত উপসর্গ যেমন- শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত কফ, কাশির সাথে রক্ত যাওয়া, বমিবমি ভাব, ডায়রিয়া, মানসিক অবস্থার অবনতি, নিস্তেজতা, অচেতন ভাব ইত্যাদি থাকে তবে তাকে অবশ্যই হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে এবং তাদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের ব্যবস্থা (ICU) থাকতে হবে।
৩। মৃদু উপসর্গ থাকা সত্ত্বেও যেসব রোগীর অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতা যেমন- পূর্ব থেকে শ্বাসযন্ত্রের রোগ বা হৃদরোগ সমস্যা, ডায়বেটিস, রোগ প্রতিরোধ দুর্বলকারী রোগ, ইত্যাদি থাকে তাঁদের ও হাসপাতালে ভর্তি সাপেক্ষে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

মৃদু উপসর্গে আক্রান্ত ব্যক্তি কীভাবে বাড়িতে চিকিৎসা নেবেন?
১। অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের ব্যবস্থাপত্র মেনে চলবেন। জ্বর থাকলে নিয়মিত তাপমাত্রা পরিমাপ করবেন। প্রচুর পানি পান করবেন এবং বাড়িতে বিশ্রামে থাকবেন।
২। আক্রান্ত ব্যক্তি বাড়িতেই অবস্থান করবেন, বাইরে যাবেন না। বাড়িতে আইসোলেশনে থাকার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলবেন।
৩। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে অনলাইনে বা টেলিফোনে যোগাযোগ রাখবেন। কোনো প্রকার অবস্থার অবনতি হলে কিংবা বিপদচিহ্ন দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তার কে জানাবেন।
৪। চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া অত্যাবশ্যক হলেও, গণপরিবহন, ট্যাক্সি, সিএনজি প্রভৃতি এড়িয়ে চলবেন। বাইরে গেলে মেডিকেল মাস্ক পরিধান করবেন।

আক্রান্ত রোগীর হোম কোয়ারেন্টাইন নিয়মাবলীঃ
১। বাড়ির সদস্যদের সাথে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবেন, সদস্যদের সাথে ওঠা-বসা, একত্রে খাওয়া-দাওয়া সবকিছু পরিহার করবেন।
২। বাড়ির সদস্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা কক্ষকে "সিক রুম" বানিয়ে নিয়ে সেখানে অবস্থান করবেন, সম্পূর্ণ আলাদা বা ব্যক্তিগত ওয়াশরুম ব্যবহার করবেন। কোনো শেয়ারড ওয়াশরুম ব্যবহার করা যাবে না।
৩। কখনো যদি প্রয়োজন বশত বাড়ির কোনো সদস্যদের মুখোমুখি আসতে হয় তবে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন, নিজের নাক ও মুখ ঢেকে চলবেন। নিজ কক্ষে একাকি অবস্থানকালীন মাস্ক না পরলেও চলবে।
৪। হাঁচি-কাশি, সর্দি, কফ বের হলে টিস্যু ব্যবহার করবেন এবং ব্যবহৃত টিস্যুটি ঢাকনাযুক্ত ময়লার বিনে ফেলে দেবেন। টিস্যু ব্যবহার ও ফেলে দেবার পর হাত ভালোভাবে সাবান ও পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবেন
৫। ময়লা হাতে নিজের নাক, মুখ, কপাল স্পর্শ করবেন না
৬। আক্রান্ত ব্যক্তির প্লেট, গ্লাস, কাপ, অন্যান্য তৈজসপত্র, বিছানার চাদর, তোয়ালে, ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র সম্পূর্ণ আলাদা হবে, কারো সাথে শেয়ার করা যাবে না।
৭। এই জিনিসগুলো তিনি নিজ দায়িত্বে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখবেন, পরিষ্কারের জন্য সাবান, ডিটারজেন্ট ব্যবহার করবেন।
৮। সিক রুমের কক্ষটি, প্রতিদিন পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত রাখবেন। বিশেষ করে হাই টাচ সার্ফেসগুলো জীবাণুমুক্ত রাখতে হবে, যেমন- সেল ফোন, ট্যাব, টিভি রিমোট, দরজার হ্যান্ডেল ও নব, কিবোর্ড, রুমের সুইচ, ডেস্ক বা টেবিলের উপরিভাগ, ওয়াশরুমের নব, ওয়াশরুম।
৯। আক্রান্ত ব্যক্তি যদি নিজের টেক কেয়ার করতে বা নিজ কক্ষ ও ওয়াশরুম নিজে পরিচ্ছন্ন রাখতে অপারগ হন তাহলে পরিপূর্ণ সম্মতিক্রমে পরিচর্যাকারী নিয়োগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে পরিচর্যাকারী কে, নিজস্ব সেইফটি ইস্যু নিশ্চিত করে কাজ করতে হবে।

বাড়িতে চিকিৎসারত আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যাকারীর জন্য নির্দেশনাবলী-
১। পরিচর্যাকারী এমন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়োজিত করতে হবে যিনি সুস্থ আছেন, যার কোনো করোনাজনিত উপসর্গ নেই এবং যার কোনো দীর্ঘমেয়াদী অন্য অসুস্থতা নেই।
২। রোগীকে তাঁর ঘনিষ্ট ব্যক্তি/ অতিথির সাথে দেখা করতে দেয়া যাবে না।
৩। রোগী পরিচর্যাকালীন এবং রোগীর মল-মূত্র বা অন্য বর্জ্য পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই একবার ব্যবহারযোগ্য (ডিসপজেবল) মাস্ক বা গ্লাভস ব্যবহা করবেন। খালি হাতে রোগী বা ওই ঘরের কোনো কিছু স্পর্শ করবেন না।
৪। পরিচর্যাকারী নিম্নলিখিত যেকোন কাজ করার পর প্রতিবার সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড দুই হাত পরিষ্কার করে নেবেন-
➢ রোগীর সংস্পর্শে এলে বা তাঁর কক্ষে প্রবেশ করলে
➢খাবার তৈরির আগে ও পরে
➢টয়লেট ব্যবহারের পরে
➢ গ্লাভস পরার আগে ও পরে
➢ যখনই হাত দেখে নোংরা মনে হয়।
৫। রোগী পরিচর্যাকালীন এবং রোগীর মল-মূত্র বা অন্য বর্জ্য পরিষ্কার করার সময় অবশ্যই একবার ব্যবহারযোগ্য (ডিসপজেবল) মাস্ক বা গ্লাভস ব্যবহার করবেন। খালি হাতে রোগী বা ওই ঘরের কোনো কিছু স্পর্শ করবেন না।
৬। রোগীর ব্যবহৃত বা রোগী পরিচর্যাকালীন ব্যবহৃত মাস্ক, গ্লাভস, টিস্যু ইত্যাদি অথবা অন্য যেকোনো বর্জ্য রোগীর রুমে রাখা ঢাকনাযুক্ত ময়লার বিনে ফেলতে হবে। বর্জ্যগুলো উন্মুক্ত স্থানে না ফেলে পুড়িয়ে ফেলবেন।
৭। রোগীর কক্ষের মেঝে, আসবাবপত্র, টয়লেট ও বাথরুম প্রতিদিন অন্তত একবার জীবানুনাশক ব্লিচ সলুশন দিয়ে পরিষ্কার করবেন।
৮। রোগীর ব্যবহৃত কাপড়, তোয়ালে, বিছানার চাদর ইত্যাদি ডিটারজেন্ট/গুড়া সাবান/ কাপড় কাচার সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে ফেলবেন।
৯। ব্যবহৃত ময়লা কাপড় একটি ব্যাগে আলাদা করে রাখুন। মল-মূত্র বা ময়লাযুক্ত কাপড় ঝাঁকাবেন না এবং নিজের শরীরে যেন না লাগে খেয়াল রাখবেন।
১০। রোগীর ঘর / টয়লেট/ বাথরুম/ কাপড় ইত্যাদি পরিষ্কারের পূর্বে একবার ব্যবহারযোগ্য (ডিসপজেবল) গ্লাভস, মাস্ক ও এপ্রন পরে নিন এবং কাজ শেষে উভয় হাত কনুই পর্যন্ত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলবেন।

বাড়িতে চিকিৎসা প্রাপ্ত ব্যক্তি কখন আইসোলেশন থেকে বেরুতে পারবেন?
১। যখন তার উপসর্গগুলি আর থাকবে না, সম্পূর্ণভাবে দূর হয়ে যাবে, ভালো হয়ে যাবে, তার ও তিনদিন পর্যন্ত আইসোলেশনে থাকবেন।
২। সুস্থ হবার পরে যদি ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তার দুবার টেস্ট রেজাল্ট নেগাটিভ আসে।

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য