বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২০ | আপডেট ০৪ মিনিট আগে

শিল্পখাত বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারের ভর্তুকি এবং ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ

ড. কাজী এরতেজা হাসান

শিল্পখাত বাঁচাতে প্রয়োজন সরকারের ভর্তুকি এবং ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ

বিশ্বব্যাপী মহামারী রূপ ধারণকারী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশে সব ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ মহামারী ঠেকাতে দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি চলছে। শিল্প খাতের প্রায় সব কারখানার উৎপাদনও বন্ধ রাখা হয়েছে। ইতিমধ্যে এসএমই, কৃষি, গার্মেন্ট ও শিল্প খাতের ব্যবসা-বাণিজ্যের ধস ঠেকাতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু এই প্রণোদনা প্যাকেজ শিল্প খাতকে রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা। ইতিমধ্যে প্রায় সব ধরনের শিল্পঋণের কিস্তিও ৩০ মে পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। অর্থাৎ ৩০ মে এর পর বকেয়া কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। যা এই মুহূর্তে সাময়িক স্বস্তিকর হলেও এটা স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। এ জন্য সরকারের এই পলিসির পাশাপাশি শিল্প খাতকে রক্ষায় আগামী ডিসেম্বর-২০২০ পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করার দাবি জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা। সুদ মওকুফ করা হলে শিল্প খাতের বিপর্যয় ঠেকানো সহজ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যবসায়ী, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে একটি অন্তর্বর্তীকালীন নীতি নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন শিল্প খাত সংশ্লিষ্টরা।

এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, এই করোনা সংকটকালে দেশের পুরো অর্থ ব্যবস্থাই থমকে গেছে। এ অবস্থায় আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। পরিস্থিতি অনুকূলে আসলে সবার আগে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারের ভর্তুকির পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। আমরা ইতিমধ্যেই ৩০ হাজার কোটি টাকার সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাথে আলোচনায় বসেছি। আশা করছি অল্প দিনের মধ্যেই কিভাবে সুষ্ঠুভাবে এই ভতুর্কির টাকা প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছানো যায় সে বিষয়ে চূড়ান্ত কাজ সম্পন্ন হবে। ফলে বিভিন্ন জেলা থেকে শুরু করে মেট্রোপলিটান সিটিতে যেসব সুপারশপ, বিউটি পার্লার, ফ্যাশন হাউজ রয়েছে সেগুলো যেন প্রণোদনার আওতায় আসে সেদিকেও কাজ করা হচ্ছে। 

এ প্রসঙ্গে অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, নভেল করোনাভাইরাস মহামারীতে অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত প্রণোদনার অর্থ ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা যেন পান, সেই জন্য সঠিক লোকদের খুঁজে বের করার কাজ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক। করোনাভাইরাস ঠেকাতে লকডাউনে বন্ধ রয়েছে সব ধরণের কল-কারখানাসহ দেশের সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠান। ফলে প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তালিকা বাড়ছে। এই অবস্থার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৫ এপ্রিল ৭২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঘোষণা দেন। এর মধ্যে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসেবে টাকা জোগানোর জন্য। এই তহবিল থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা ৯ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবে। তবে তাদের ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধ করতে হবে আর বাকি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি হিসেবে দেবে। কিন্তু বরাদ্দ দেয়া এই অর্থ সঠিকভাবে সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ।
মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের খুঁজে বের করে এই অর্থ প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে খেলাপি গ্রাহকরা সুবিধা পাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মেনে প্রণোদনার সুবিধা দেয়া হবে। বর্তমানে আমানত জমার চেয়ে উত্তোলন বেশি হওয়ার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে গ্রাহকদের কাছে নগদ টাকা নেই। তাই তাদের সঞ্চয়ের পরিমাণও কমেছে। বরং আগেই সঞ্চয় করা অর্থ তুলে নিচ্ছেন গ্রাহকরা।’

করোনায় সৃষ্ট সংকটের কারণে ব্যাংক খাতে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে জানতে চাইলে মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, ‘এই মুহুর্তে এটি বলা যাবে না। আগামী ডিসেম্বর শেষে ধীরে ধীরে এটি বোঝা যাবে।’ করোনা পরিস্থিতির কারণে অগ্রণী ব্যাংকের জন্য নতুন করে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে কি-না জানতে চাইলে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘নতুন বছরে জন্য আমাদের চলমান যে পরিকল্পনা হয়েছে সেটি শতভাগ বাস্তবারণ করতে চাই। আমাদের এই পরিকল্পনায় ঋণ আদায়কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আর আমাদের সরকারি ব্যাংক হিসেবে সরকারের পলিসিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে চাই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এখন এমন একটা পরিস্থিতি বিরাজ করছে যে, কেউই ভালো নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোদ্যোক্তা, সাধারণ মানুষ সবাই সংকটে রয়েছেন। তবে শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা চরম উদ্বিগ্নতায় দিন কাটাচ্ছেন। একদিকে জনজীবন বিপর্যস্ত। অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ। কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদ তো আর থেমে নেই। কিস্তি স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু সেটা তো পরবর্তীতে দিতেই হবে। ফলে এটা সাময়িক স্বস্তিদায়ক হলেও দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান নয়। এক্ষেত্রে সরকার চাইলে একটা সমন্বিত পলিসি নিয়ে সুদ বাবদ কিছু ভর্তুকি দিতে পারে। তাহলে শিল্প মালিকদের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমে আসবে। আবার একটা এসআরও জারি করে করপোরেট ট্যাক্সও কমিয়ে দিতে পারে। চাইলে ব্যাংকের সুদ বাবদ ভর্র্তুকিও দিতে পারে। পৃথিবীর অনেক দেশে কিন্তু পরিস্থিতি সামলাতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেননা ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে হলে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার বিকল্প কিছুও ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের পুরো সুদ মওকুফ করা হলে ব্যাংকের ব্যবসার মুনাফা কমে যাবে। কেননা ব্যাংক চালানোও তো এক ধরনের ব্যবসা। তাদের তো আমানতের সুদ দিতে হয়। কর্মীদের বেতন-ভাতা দিতে হয়। ফলে এখানে সরকার চাইলে ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা দিতে পারে। আবার শিল্প ও ব্যাংক খাতের জন্য করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো চাইলে তাদের ভালো গ্রাহকদের বেছে বেছে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে সুদ ছাড় দিতে পারে। তবে এসবের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন লাগবে। আবার সরকারেরও নীতিগত অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপর্যয় ঠেকাতে হলে এটা আরও গভীরভাবে সরকারকে ভাবতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

বিজিএমইএ'র সভাপতি রুবানা হক বলেন, শিল্প খাতকে রক্ষার জন্য ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করলে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা স্বস্তি আসবে। তবে এক্ষেত্রে সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এজন্য সরকার চাইলে করপোরেট করও কমিয়ে দিতে পারে। আবার সুদ বাবদ কিছুটা ভর্তুকিও দিতে পারে। অর্থাৎ সুদের একটা অংশ সরকার নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিতে পারে। বাকিটা ব্যাংকগুলো মওকুফ করতে পারে। এতে করে ব্যাংকগুলোর যেমন মুনাফা কমবে না। তেমনি কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো ঘটনাও ঘটবে না শিল্প কিংবা ব্যাংক খাতে। এক তরফাভাবে ব্যাংক ঋণের সুদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে গিয়ে করোনা পরবর্তীতে হয়তো অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে জনবল কমিয়ে আনার কথা ভাববে। অনেকেই হয়তো এই ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে টিকতেই পারবে না। আবার ব্যাংকগুলোর ব্যবসা ভালো না হলে তারাও জনবল কমিয়ে আনার কথা চিন্তা করতে পারে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব সেক্টরকে বাঁচাতে হলে একটি সমন্বিত পলিসি গ্রহণ করতে হবে। যার ফলে শিল্পোদ্যোক্তারাও বাঁচবেন আবার ব্যাংক কর্তৃপক্ষও মুনাফা করতে পারবেন। একইভাবে কোনো শিল্প বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো সিদ্ধান্ত থেকেও বিরত থাকবে। 

এদিকে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ইতিমধ্যেই দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের গতি কমে গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে এ খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। গত আট মাস ধরেই টানা কমছে এ খাতের ঋণ। করোনাভাইরাস সংক্রমণে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ বৃদ্ধি ও আগামী এপ্রিল থেকে এক অঙ্কের সুদহার কার্যকরের প্রভাবে চলতি মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি আরও কমবে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যদিও ২৫ মার্চের পর বাংলাদেশ ব্যাংক শিল্প খাতের ঋণের তথ্য ওয়েবসাইটে আর হালনাগাদ করেনি। চলতি এপ্রিলে এই প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক পর্যায়ে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি শেষে বেসরকারি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৫৮ হাজার ৮৯৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯ লাখ ৭০ হাজার ৩৪৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা। অথচ করোনাভাইরাসের কারণে এটা এখন নেতিবাচক পর্যায়ে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু অর্থবছরের গত আট মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে। চলতি জানুয়ারিতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ২ শতাংশ, যা আগের মাসে ছিল ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ। গত বছর নভেম্বরে এ প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আর ফেব্রুয়ারি-২০২০ শেষে এটা নেমে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, যে কোনো সংকট মোকাবিলায় সরকারকে নীতিগত সহায়তা দিতে হয়। আবার আর্থিক প্রণোদনারও প্রয়োজন পড়ে। এবারের যে সংকট এটা একটা মহামারী। বৈশ্বিক সমস্যা। এটা সব খাতকেই বিপর্যস্ত করেছে। সারা বিশ্বই বিপর্যস্ত। ব্যবসা-বাণিজ্যের বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের উচিত হবে পলিসি সহায়তার পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায় কিনা- সেটা ভেবে দেখা। তবে সুদ মওকুফের বিষয়টা বেশ জটিল। এটার সঙ্গে ব্যাংকের ব্যবসাও জড়িত। তবে করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে আনতে পারে সরকার। চাইলে এর পাশাপাশি সুদবাবদ ভর্তুকিও দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক ভোরের পাতা ও ডেইলি পিপলস টাইম। পরিচালক, এফবিসিসিআই।

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য