রংপুর মেডিকেলে ডায়ালাইসিস মেশিন বিকল, মৃত্যুমুখে রোগীরা

রেজাউল করিম মানিক, রংপুর

রংপুর মেডিকেলে ডায়ালাইসিস মেশিন বিকল, মৃত্যুমুখে রোগীরা

রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের দুই কোটি মানুষের কিডনি রোগীর একমাত্র বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এই হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগে কিডনি রোগীদের জীবন রক্ষাকারী ডায়ালাইসিস মেশিনের ২৫টির মধ্যে ২০টি বিকল হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে পানি ফিল্টার করার মেশিনটিও বিকলের পথে। এ জন্য চার ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করার বদলে দেড়-দুই ঘণ্টা করেই বিদায় দেওয়া হচ্ছে রোগীদের। ডায়ালাইসিসের অভাবে অনেক রোগী চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে মারা যাচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও রোগীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

হাসপাতালের নেফ্রোলজি বিভাগের ডায়ালাইসিস ওয়ার্ড সূত্রে জানা গেছে, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার দুই শতাধিক কিডনি রোগী আছেন, যারা আগাম টাকা জমা দিয়ে তালিকাভূক্ত হয়েছেন। তাদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত চার দিন ডায়ালাইসিস করার জন্য আসতে হয়। এ ছাড়াও নতুন রোগী তো আছেই। কিন্তু ২৫টি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে ২০টি বিকল হওয়ায় তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি দু-তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় ডায়ালাইসিস করার জন্য। এতে কিডনি রোগীরা
শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। তার ওপর মেশিন সচল রাখার জন্য পানি ফিল্টারিং করার মেশিন বেশিরভাগ সময় কাজ করে না। এতে পানির অভাবে ডায়ালাইসিস মেশিন কাজ করে না। ফিল্টার মেশিনে যেখানে ঘণ্টায় ১০ লিটার পানি সরবরাহ করার কথা সেখানে করছে চার থেকে পাঁচ লিটার। এভাবেই কোনও রকমে চলছে ডায়ালাইসিস বিভাগটি।

সরেজমিন ওই ওয়ার্ডে দেখা গেছে, ডায়ালাইসিস মেশিনের ২৫টির মধ্যে ২০টি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। পাঁচটি সচল থাকলেও দুটি মাঝে মাঝে চলে বন্ধ হয়ে যায়। মূলত তিনটি মেশিন চলছে। চিকিৎসকরা বলছেন, একজন কিডনি রোগীর কমপক্ষে চার ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করতে হয়। কিন্তু মেশিনের অভাবে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে।

ডায়ালাইসিস সেবা নিতে আসা আসা গাইবান্ধার মুক্তিযোদ্ধা আউয়াল উদ্দিন জানান, দেড়-দুই ঘণ্টা ডায়ালাইসিস করে তারা বলছে মেশিন নেই। ফলে পরিমাণ মতো ডায়ালাইসিস করাতে না পারায় শ্বাসকষ্টসহ নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে রোগীদের। 

তিনি বলেন, আসলে আমাদের মেরে ফেলার চক্রান্ত ছাড়া কিছুই নয়। তা না হলে মেশিনগুলো সচল করা হচ্ছে না কেন?

একই কথা জানালেন নীলফামারীর জলঢাকা থেকে আসা আসমা বেগম। তিনি বলেন, আমাদের দিকটা কেউ দেখে না। সিরিয়াল দিয়ে দু-তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়। মেশিন না থাকায় আমাদের ঠিকমতো ডায়ালাইসিস না করেই বিদায় করে দেওয়া হয়। এভাবে চললে আমরা বিনা চিকিৎসায় মারা যাব।

রংপুর নগরীর নিউ ইঞ্জিনিয়ারপাড়ার কলেজছাত্রী আকলিমা জানালেন একই কথা। তিনি বললেন, ঠিকমতো ডায়ালাইসিস করতে না পারায় আমার শ্বাসকষ্টসহ নানান সমস্যা দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্তব্যরত নার্স ও ব্রাদার স্বীকার করলেন, যেভাবে ডায়ালাইসিস করা হচ্ছে সেটা কোনও রকম বেঁচে থাকা। তারা জানালেন, বেশিরভাগ ডায়ালাইসিস মেশিন নষ্ট। কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না। এছাড়াও পানি ফিল্টারিং মেশিনও কাজ করছে না। এভাবে কিডনি রোগীদের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রাখতে বাধ্য হচ্ছি আমরা।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফরিদুল ইসলাম জানান, বেশ কয়েকটি ডায়ালাইসিস মেশিন নষ্ট হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। কবে নাগাদ সচল করা যাবে সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি।

এই হাসপাতালের ডায়ালাইসিস মেশিনগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা না হলে অনেক রোগী বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন এমনটাই মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য