বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০ | আপডেট ০৩ মিনিট আগে

রঙিন নয়, আমাদের জীবন পুরোটাই ধূসর

আমিনুল ইসলাম

রঙিন নয়, আমাদের জীবন পুরোটাই ধূসর

আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না বলে কয়েকবার বলার পরও লাভ হয়নি। পা দিয়ে গলা চেপে ধরে থাকা পুলিশ অফিসারের এতো টুকু মায়া হয়নি। মায়া হবেই বা কেন? কালো চামড়া'র মানুষ যে! ফ্লয়েড'কে প্রাণ দিতে হয়েছে স্রেফ গায়ের রঙ কালো বলে।

কোন অপরাধ করেনি। পুলিশের সঙ্গে কোন রকম মারামারিও করেনি। এমনকি পুলিশ এরেস্ট করার পর কোন প্রতিরোধও করেনি। এরপরও গলার উপর চেপে বসে তাকে হত্যা করা হলো। এভাবে কতো শত কালো চামড়ার মানুষকে মরতে হচ্ছে আমেরিকায় তার কোন হিসেব নেই।

ভাগ্যিস, ছোট্ট একটা ছেলে পুরো দৃশ্যে'র ভিডিও'টি ধারণ করেছিল। যার কারনে পুরো পৃথিবীর মানুষ দেখতে পাচ্ছে এই ২০২০ সালে এসেও সাদা চামড়া'র মানুষ গুলো কিভাবে কালো কিংবা বাদামী চামড়ার মানুষদের উপরর অত্যাচার করে বেড়াচ্ছে।

আমেরিকার যেই এলাকায় এই ঘটনা ঘটেছে, সেখনকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি, যিনি নিজেও একজন আফ্রিকান-আমেরিকান; তিনি বলছিলেন- আমি যখন ছোট ছিলাম, বাসার বাইরে গেলে আমার মা আমাকে সব সময় বলতেন- পুলিশ থেকে সাবধানে থাকবে। দূরে দূরে থাকবে। কোন ভাবেই কোন কথার উত্তর দিবে না। আমরা সব সময় পুলিশ দেখলে ভয় পেতাম। 

এরপর তিনি বলেছেন- এই অবস্থার এতো টুকু উন্নতি হয়নি আমেরিকায়। এই ২০২০ সালে এসে আমাকেও আমার সন্তানদের এক'ই কথা বলতে হচ্ছে।

এই হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকার অবস্থা। যেই কালো চামড়ার মানুষটিকে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশ হত্যা করেছে- সে কিন্তু আমেরিকারই নাগরিক। ওই দেশেই তার জন্ম। সে ইংরেজিতেই কথা বলে ঠিক অন্য আমেরিকানদের মতো। এরপরও শেষ রক্ষা হয়নি। প্রাণ দিতে হয়েছে স্রেফ গায়ের রঙ কালো হবার কারনে।

এরাতো তবুও ওই দেশের নাগরিক। এবার চিন্তা করে দেখুন, আমার-আপনার মতো যারা বিদেশি; যারা কথাও বলি না ওদের মতো করে; দেখতেও ওদের মতো না। তাদেরকে প্রতিনিয়ত কিসের মাঝ দিয়ে যেতে হয়।

আমি নিজে প্রতিনিয়ত বুঝতে পারি- আমাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়- তুমি হচ্ছে এখানকার তৃতীয় শ্রেণীর মানুষ। এবার আপনি গবেষণা করুন, শিক্ষকতা করুন আর রেস্টুরেন্টে কাজ করুন। দিন শেষে আপনার পরিচয় আপনি বিদেশি।

ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা যেই মানুষ গুলো ভাব করে- তারা খুব ভালো আছে। গাড়ি-বাড়ি আছে। বিশাল সুখে আছে। গিয়ে দেখবেন- তাদের মনোজগতের অবস্থা। শুধু তারাই না। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এই গ্লানি'র মাঝে দিয়ে যেতে হচ্ছে। 

কারন এরা না পারছে নিজ দেশে ফেরত যেতে, না পাচ্ছে এইসব দেশের মানুষজনদের স্বীকৃতি। এই জীবন যারা নিজ চোখে দেখছে কিংবা অনুভব করছে; তারা সেটা প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত অনুভব করছে! আপনারা যারা দেশে আছেন; তারা কোন দিনও সেটা বুঝতে পারবেন না।

আমেরিকায় এই মুহূর্তে প্রায় ২৫টি শহরে কারফিউ চলছে। ওই ঘটনার পর মানুষজন (কালো চামড়ার মানুষ বিশেষ করে) রাস্তায় নেমে এসছে। তারা তাদের অধিকার চায়।

বেশিরভাগ সবাই চেচিয়ে বলেছে- আমার জন্মের জন্যতো আমি দায়ী নই। আমার গায়ের রঙের জন্য তো আমি দায়ী নই। আমিও মানুষ।

হ্যাঁ, ঠিক'ই পড়ছেন। এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে হলিউডের কালো অভিনেতা-অভিনেত্রী কিংবা সিনএনএন এর বিখ্যাত সাংবাদিক (কালো), অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (কালো); সবাই এক'ই সূরে কথা বলছে।

কেন বলছে জানেন তো? কারন এদের সবাইকে নিত্য দিন এর মাঝে দিয়ে যেতে হয়।

আমরা বাংলাদেশিরা হচ্ছি স্ববিরোধী জাতি। এরা বিদেশে এসে একটু টাকা-পয়সা হবার পর দেশে থাকা মানুষদের এমন একটা বার্তা দেয়- আমরা বিরাট ভালো আছি। আমাদের কতো টাকা। কতো কি করতে পারি আমরা ইত্যাদি! অথচ দেখা যাবে ইউরোপ-আমেরিকায় এরা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। না আছে অন্তরে কোন শান্তি। না আছে কোন স্বীকৃতি!

স্রেফ বিদেশে থাকি, ভালো আছি এই রঙিন একটা বিষয় এরা ফুটিয়ে তোলে। যার কারনে শুনেছি ইউরোপ-আমেরিকায় থাকা পাত্র-পাত্রীদের চাহিদা নাকি দেশে অনেক বেশি! এর জন্য দেশ থেকে যে করে'ই হোক সবাই ইউরোপ-আমেরিকায় পাড়ি জমাতে চায়।

আমেরিকায় এই ঘটনা যে দিন ঘটেছে; সেদিন'ই লিবিয়াতে ২৬ বাংলাদেশিকে পাখির মতো গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। এদের সবাই লিবিয়া থেকে সমুদ্র পথে ইউরোপ যেতে চেয়েছিল। এদের কেউ কিন্তু দরিদ্র ছিল না। সবাই ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা দালালকে দিয়ে ইউরোপ যাচ্ছিলো। এর কি কোন দরকার ছিল?

১০-১২ লাখ টাকা দিয়ে নিজের জীবন হাতে রেখে কেন আপনাকে তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হবার জন্য ছুটতে হবে? এই টাকা দিয়ে দেশে কিছু করুন। একদম কিছু যদি করতে না পারেন, টাকাটা ব্যাংকে রেখে দিন। এতেও প্রতি মাসে যে টাকা পাবেন, চলে যাবে কোন ভাবে।

জীবন হাতে নিয়ে কেন বিদেশে যেতে হবে? যারা পড়াশুনা করতে বিদেশে আসতে চায়, তারা আসতে পারে। যারা ভালো একটা চাকরি পেয়েছে, তারা আসতে পারে। কিংবা যাদের কোন কিছু'ই করার নেই দেশে, বিদেশে হয়ত শ্রমিক হিসেবে বৈধ ভাবে যাওয়া সম্ভব, তারাও আসতে পারে।

কিন্তু জীবন হাতে রেখে বিদেশে আসতে হবে কেন? এমনকি যাদের সুযোগ আছে বিদেশে আসার, তাদেরও উচিত হবে না প্রথম চেষ্টায় বিদেশে চলে আসা। বরং দেশে'ই কিছু করা ভালো। একদম কিছু না হলে, তখন দেখা যেতে পারে।

বিদেশে এসে এরপর বাদ বাকী জীবন কেবল আপনি না, আপনার পরবর্তী প্রজন্মও তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে'ই বেড়ে উঠবে। যারা ভাবেন নিরাপত্তা-সুযোগ- সুবিধা কতো কিছু আছে ইউরোপ-আমেরিকায়। অস্বীকার করছি না আমি। তবে শান্তি নেই। একদম শান্তি নেই।

আপনাদের জানিয়ে রাখি- গবেষণা রিপোর্ট বলছে এইসব দেশে থাকা বেশিরভাগ বাংলাদেশি কোন না কোন মানসিক সমস্যায় ভুগছে। এক জীবনে এরা না পারে এইসব দেশের নাগরিক হতে; না পারে নিজ দেশে ফেরত যেতে।

দেশ থেকে এই সব দেশের জীবন রঙিন মনে হলেও, আমরা যারা এইসব দেশে থাকি, আমরা জানি কতোটা গ্লানি নিয়ে আমাদের জীবন কাটাতে হয়। রঙিন নয়, আমাদের এখানকার জীবন পুরোটাই ধূসর।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

 

নিউজ টোয়েন্টিফোর/কামরুল 

মন্তব্য