শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০ | আপডেট ০৯ মিনিট আগে

আসুন খানিকটা ঋণ শোধ করি

ডা. নাফিসা মাহমুদ

আসুন খানিকটা ঋণ শোধ করি

আসালামুআলাইকুম। আমি আজকে আপনাদের সাথে আমার জীবনের খুব ভালো একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই।

তার আগে বলে নেই, আমার গত ২৩ এপ্রিল কোভিড-১৯ পজিটিভ আসে। ঢাকা সিএমএইচ এ ১৪ দিন চিকিৎসা শেষে ৭ মে আমার দ্বিতীয় স্যাম্পল নেগেটিভ আসায় আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাসায় চলে আসি।

কিছুদিন পর আমি Convalescent Plasma Therapy র বিষয়ে জানতে পারি যে কোভিড -১৯ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা একজন রোগীর রক্তরসে থাকা সেই বিশেষ জীবাণুর বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া এন্টিবডি দ্বারা অন্য এরেকজন মরণাপন্ন করোনা রোগীর চিকিৎসা সম্ভব। তখন একটাই চিন্তা আমাকে ঘিরে ধরে,আমার রক্ত এখন অনেক দামী, এর ১০০ শতাংশ সদ্ব্যবহার করাটা এই মুহূর্তে আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমি একজন ডাক্তার হিসেবে জানি যে, মেশিনে রক্তরসটুকু আলাদা করে সমস্ত রক্ত কণিকাগুলো শরীরে পুণরায় দিয়ে দেওয়া হয় সুতরাং এটিতে সাধারণ রক্তদানের মতো রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে দুর্বলতা হওয়ার কোনো চান্স নেই।

২০মে ২০২০, সকাল ৯টা। আমার দেওয়া পোস্ট দেখে একজন মুমূর্ষু রোগীর আত্মীয়া আমাকে ফোনে জানান, তাঁর রোগীর বি পজিটিভ প্লাজমা একান্ত প্রয়োজন ও রোগী আইসিইউতে মৃত্যুশয্যায়!! আমি ছুটে চলে যাই শেখ হাসিনা বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউট (ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর পাশে)। ঝাঁচকচকে নতুন বিল্ডিং দেখে আমি আর আম্মু তো অবাক! আমাদের ধারণা ছিল পাব্লিক মেডিকেলের মত রোগীরা গিজগিজ করছে, করোনা রোগীতে ভরপুর! আমাদের থতমত ভাব দেখে এসিসটেন্স প্রফেসর ডা. আশরাফুল স্যার হেসে বললেন, ‘এই কর্পোরেট পরিবেশ আশা করেননি তাই না? মানুষের আসলে ভুল ধারণা যে ঢাকা মেডিকেল যেহুতু, এখানে আসলেই করোনা আবার হবেই!! এই বিল্ডিংএ করোনা কেন, বার্ন ছাড়া কোনও রোগী নেই’

তারপর উনি আমাদেরকে খুব খাতির করে বসালেন, আমার যাবতীয় রিপোর্ট, সিএমএইচ এর ছাড়পত্র সব দেখলেন, আমার কাছে শুনে সিওর হলেন যে, দ্বিতীয় স্যাম্পল (নেগেটিভ) নেওয়ার পর ১৪দিন বা প্রথম স্যিম্পটমস দেখা দেওয়ার পর ২৮ দিন/যে কোনো স্যিম্পটমস ছাড়াই ১৪ দিন অতিবাহিত হয়েছে কিনা (এই গুলো ক্রাইটেরিয়া ডোনেশনর)। উনি আমার ভেইন চেক করলেন, ওয়েট মাপলেন, ব্লাড নিয়ে অনেক রকম পরীক্ষার পর আমাকে ক্লিন চিট দিলেন যে আমি সবদিক দিয়েই 'ফিট'।

আলহামদুলিল্লাহ, কারণ এই 'ফিটনেস' টা থাকা খুবই সৌভাগ্যের। পুরো ৪৫ মিনিটের (কারণ মেশিনে রক্তরস আলাদা করে নিয়ে বাকিটা রিটার্ন করা হয় তাই নরমাল ডোনেশনের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে) এই রক্তদানের সময় বা তার পরে আমি কোনোরকমে শারীরিক কষ্ট দুর্বলতা, মাথা ঘোরা বা কোনো রকম খারাপ লাগা এক মিনিটের জন্যও অনুভব করিনি! আমি আম্মু ও স্যারের সাথে গল্প করতে করতে দেখি হঠাৎ স্যার বললেন, একজনকে দেওয়ার মতো প্লাজমা নেওয়া কম্পিলিট, তুমি চাইলে আরও (২০০ মি.লি.) মানে আরও একজন রোগীকে দেওরার মতো ডোনেট করতে পার মাশায়াল্লাহ! তুমি দেবে?’ আমি খুশি হয়ে বললাম ‘কেন নয়?’

শেষ হলে পর আম্মু আমাকে প্রায় জোর করেই এক বোতল জুস খাওয়ান, যদিও স্যার বললেন, এর কোনও দরকার নেই কারণ যতটুকু রক্তরস নেওয়া হয়েছে তা ১ লিটার নরমাল স্যালাইন দিয়েই কাভার হয়ে গেছে! স্যার অত্যন্ত বিনয়ী মানুষ, আমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলেন, লিফটে এগিয়ে দিতে দিতে বললেন, তোমার এই প্লাজমা থেকে আমার ঢাকা মেডিকেলের দুজন আইসিইউ রোগীর জীবন বাঁচবে ইনশাআল্লাহ!

আমার এতই ভালো লাগছিল (শারিরীক ও মানসিকভাবে) যে আমি গাড়িতে না এসে আম্মুকে নিয়ে বহুদিনপর রিকশা রাইড দিলাম।

আমার এই সামান্য একটি কাজের জন্য আমাকে প্লাটফর্ম, বিডিএফ’র বাঁচাও এর তরফ থেকে অসামান্য অভিবাদন, অভিনন্দন জানানো হয়, অনেক পেইজে নিউজটি ভাইরাল হয়! আপনারা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না আমাকে হাজার হাজার সাধারণ মানুষসহ আমার মেডিকেলের স্যার/ম্যাডামরা বাহবা দেন, দোয়া দেন।

একজন বলেছেন- শব-ই-কদর এর রাতে আমার জন্য নামাযে দোয়া করবেন- জীবনে প্রথমবার মনে হয়েছে আমার বেঁচে থাকা সার্থক!

আসুন না, আমরা যাদেরকে মহান আল্লাহ করোনার মতো মরণঘাতী রোগ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন, প্লাজমা ডোনেট করি, আমাদের উছিলায় আল্লাহ অন্য দুজনকে যদি বাঁচান; এর চেয়ে ভালো পন্থা আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা জানানোর আর নেই! আসুন খানিকটা ঋণ শোধ করি।

লেখক- মেডিকেল অফিসার, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতাল, ঢাকা।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য