শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২০ | আপডেট ০১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিট আগে

৬ একর জমির মালিক ‘ভূমিহীন’, দখল করলেন খাস জমি

রেজাউল করিম মানিক, রংপুর

৬ একর জমির মালিক ‘ভূমিহীন’, দখল করলেন খাস জমি

রংপুরের মিঠাপুকুরে প্রায় ৬ একর পৈত্রিক সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও গাজীপুরের একটি গার্মেন্টস কারখানায় কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার গোলাম রব্বানী সরকারি খাস খতিয়ানের ২২ শতক জমি দখল করে তাতে স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। ওই জমিতে থাকা ভূমিহীন এক স্কুলের নাইটগার্ডকে উচ্ছেদে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

শুধু তাই নয় বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ হলে একজন সার্ভেয়ার বিষয়টি তদন্ত করে আবার গোলাম রব্বানীর পক্ষেই সাফাই গেয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ব্যক্তি প্রভাবশালী হওয়ায় উপজেলা ভূমি অফিস, তহশিলদার অফিস এবং
ইউনিয়ন চেয়ারম্যান অফিস সরাসরি এই অনিয়মের সাথে জড়িয়ে আছে।

রংপুর ডিসি অফিসের ভূমি শাখা ও মিঠাপুকুর ভূমি অফিস সূত্র জানা গেছে, উপজেলার বড়বালা ইউনিয়নের হাছিয়া ছড়ান মৌজার ১ নং খতিয়ানের ৫৫২ নং এর বাটা ৯০৮ দাগের ২২ শতক জমিতে একই এলাকার আজগর আলীর ছেলে একটি স্কুলের নাইটগার্ড ভূমিহীন মাসুদ রানা ১৯৯৪ সাল থেকে বসতবাড়ি করে ভোগ দখল করে আসছে। কিন্তু ওই জমিটি ভূমি অফিসের সাথে যোগসাজস করে গোপনে ২০১২ সালে পাশের আটকুনিয়া এলাকার মমদেল হোসেনের ছেলে গোলাম রব্বানী ও পুত্রবধূ রেখা খাতুন
ভূমিহীন হিসেবে নিজেদের নামে কবুলিয়াত বন্দোবস্ত করে নেয়। এরপর তারা সেই জমি দখলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। বিষয়টি জানতে পেরে গোলাম রব্বানী ভূমিহীন নয় মর্মে ওই জমিতে বসবাসকারী ভূমিহীন মাসুদ রানা অবৈধ কবুলিয়াত বাতিলের জন্য ভূমি অফিসে আবেদন করেন। কিন্তু তৎকালীন
উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আমিনুল ইসলাম যোগসাজস করে বিপুল পরিমাণ জমির মালিক গোলাম রব্বানীকে ভূমিহীন বলেই তদন্ত রিপোর্ট জমা দেন। যা এস এ এন্ড টি আইনের পরিপন্থী।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মমদেল হোসেনের ছেলে গোলাম রব্বানী পৈত্রিক সূত্রে প্রায় ৬ একর জমির মালিক এবং তিনি বর্তমানে গাজিপুরের কোনাবাড়ির বাগেরবাজার এলাকায় এসএম গার্মেন্টস এ কর্মরত আছেন।

উপজেলা রেজিষ্ট্রি অফিস থেকে জানা গেছে, গোলাম রব্বানীর বাবা মমদেল হোসেনের নামে ৩০ একর জমি আছে। আর মমদেল হোসেনের পাঁচ ছেলে।

বাটোয়ারা অনুযায়ী সে হিসেবে ৬ একর জমির মালিক। গোলাম রব্বানীর বাবা মমদেল হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ২০১২ সালে উনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সামসুজ্জামান নয়া মিয়ার সাথে যোগসাজস করে গোলাম রব্বানী ও স্ত্রী রেখা খাতুন নামে ভূমিহীন সনদ নিয়ে ওই জমিটি কবুলিয়াত নেয়। একাজে সরাসরি জড়িত উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এরপর নানাভাবে ওই জায়গাটি দখল করার চেস্টা করে রব্বানী। বিষয়টি জানতে পেরে মাসুদ রানা ভূমি অফিসে অভিযোগ করেও সুরাহা না পাওয়ায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঠাপুকুর আমলী আদালতে মামলা করেন(নং এসআর৩৮৫/১৬)। এরপর গোলাম রব্বানীও একই আদালতে একটি মামলা করেন (নং ৩৯৬/১৬)। মামলায় দুই পক্ষকেই অর্ধেক করে দেওয়ার রায় দেয়। কিন্তু গোলাম রববানী করোনা লকডাউনের সুযোগ নিয়ে গত ১৪ এপ্রিল ভোরে ওই জমিতে থাকা ভূমিহীন মাসুদের বসত বাড়ি ভাঙচুর করে দখলে নেওয়ার জন্য গাছপালা কাটে এবং বিল্ডিং নির্মাণ শুরু করে। এতে বাঁধা দিতে গেলে গোলাম রব্বানীর লোকজন মাসুদ রানা ও তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকাকে মারধর করে। বিষয়টি জানিয়ে
মিঠাপুকুর থানায় অভিযোগ দায়ের করলেও সেটি এখনও মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি।

এ বিষয়ে বড়বালা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেব সরকার জানান, গোলাম রব্বানী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মমদেল হোসেনের ছেলে। গোলাম রবাবানী ভূমিহীন নয়, তার বাবার অনেক সম্পদ এখনও আছে। 

তিনি আরও জানান, আমি চেয়ারম্যান হওয়ার আগে গোলাম রব্বানী ও তার স্ত্রীর নামে ভূমিহীনের
সনদ দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও ওই জমিতে বসবাসকারী মাসুদ রানার কোনো জমি নেই। কিন্তু করোনা ভাইরাসের মধ্যেই এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখে ওই স্থানে মাসুদের বাড়ি ভাঙচুর ও দখল বিষয়ে অনেক লোক জমায়েত হয়েছিল।

আমি গ্রাম পুলিশ দিয়ে সামাজিক দূরত্বের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে সেটি হয়নি। এরপর আর তাদের কেউ আমার কাছে আসেনি।

বড়বালা ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগ সভাপতি জামিউর রহমান টগর জানান, গোলাম রব্বানী অনেক সম্পত্বির মালিক। আর মাসুদ রানা একজন অসহায় ভূমিহীন। কিন্তু অর্থকরি খরচ করে মমদেল মাস্টারের ছেলে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ভূমিহীন সেজে ওই জমি কবুলিয়াত নিয়েছে। এখন মাসুদ রানাকে প্রায়
উচ্ছেদ করেই ফেলেছে। বিষয়টি তদন্ত কওে প্রকৃত ভূমিহীনের বরাদ্দ দেওয়ার আবেদন জানান তিনি। 
তিনি বলেন, করোনার কারণে সরকার প্রধান যখন প্রশাসনকে করোনা মোকাবেলায় ব্যস্ত রেখেছেন, তখন সেই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে গোলাম রব্বানী ওই জমি দখল কাে স্থাপনা করছেন। এটা অমানবিক।

এ ব্যপারে বড়বালা হাটের ইজারাদার আলমগীর হোসেন জানান, মমদেল মাস্টার ও তার ছেলে গোলাম রব্বানী অনেক অবস্থাশালী লোক। তারপরেও টাকার জোড়ে খাস জমিতে থাকা ভূমিহীন মাসুদ রানাকে উচ্ছেদেও জন্য নিজেদেও নামে কবলা নিয়েছে। মাসুদেও টাকা নাই, সে কোথাও গিয়ে পাত্তা পাচ্ছে না।
সাংবাদিকরাও এই বিয়ষটি নিয়ে কিছুই করছে না।

বিষয়টি জানতে বড়বালা ইউনিয়ন পরিষদের ভুূমি অফিসের তহশিলদার নজরুল ইসলামের (০১৭০৮৫০৯৪১) মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। আর বর্তমান উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার আব্দুস সবুর অসুস্থ্য থাকায় তার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

এ ব্যপারে মিঠাপুকুর উপজেলার সহকারী কমিশনার(ভূমি) নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, বাবার সম্পত্তি থাকলে তাতে ছেলে মালিক হবে। যদি কোনো কারণে বঞ্চিত করা হয় সেটি আলাদা কথা। এর বাইরে অবশ্যই বাবার সম্পত্তির মালিক ছেলে। সে হিসেবে গোলাম রব্বানীও তার বাবা মমদেল হোসেনের
সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। তিনি কোনোভাবেই ভূমিহীন হিসেবে বিবেচিত হবেন না।

এ ব্যাপারে অভিযোগ পেলে কিভাবে গোলাম রবাবানী ভূমিহীন হিসেবে সনদ এবং খাস জমি কবুলিয়াত পেলো বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, ওই খাস জমিটি আমার আমলের অনেক আগে কবুলিয়াত দেওয়া হয়। এখানে কীভাবে ঘাপলা হয়েছে, সেটিও যথাযথভাবে তদন্ত করা হবে।

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য