বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২০ | আপডেট ৪২ মিনিট আগে

শোকে আছি দ্রোহে বাঁচি

ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন

শোকে আছি দ্রোহে বাঁচি

প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভেঙে ভয়ে ভয়ে ফেসবুকে এফডিএসআরের ইনবক্স দেখি। প্রায় প্রতিদিনই কোন না কোন ডাক্তার কোভিড-১৯ এ ভুগে মৃত্যুবরণ করছেন। পাশাপাশি আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন পরিচিত-অপরিচিত অনেক ডাক্তারই। এসব খবর পেয়ে প্রতিটি দিন আজকাল শুরু হয় এক ধরণের কষ্টের ভেতর দিয়ে। ডাক্তারদের পাশাপাশি অন্যান্য মৃত্যুগুলোও কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের প্রিয়, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা মোহাম্মদ নাসিম ভাই কোভিড রোগে আক্রান্ত হয়ে, পরবর্তীতে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতায় মৃত্যুবরণ করলেন। যেবার আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হলাম, সেই সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নাসিম ভাই। তখন তিনি আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক, আমাদের ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন ভাই সহ-প্রচার সম্পাদক।

কারণে-অকারণে আমাদের বহুবার দেখা হয়েছে। যখন তিনি টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী এবং ঢাকা শহরে ল্যান্ড টেলিফোন খুব দুর্লভ, তখন আমার করা আবেদনপত্রে মন্ত্রী হিসেবে সই করেছিলেন। দ্রুততম সময়ে আমি ফোন পেয়েছিলাম। পারিবারিক সূত্রেও কিছু সম্পর্ক ছিল। গত টার্মে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবার আগ পর্যন্ত প্রায় নিয়মিতই যোগাযোগ ছিল। গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আব্দুল্লাহও সবার শ্রদ্ধা এবং ভালবাসার মানুষ ছিলেন। আমার প্রয়াত মায়ের তিনি ছিলেন বড় ভাইয়ের মত, সেই সূত্রে আমাদের আব্দুল্লাহ মামা। তিনিও কোভিড রোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে চলে গেলেন। সিলেটের গণমানুষের নেতা কামরান ভাইও কোভিড রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন। এভাবেই প্রতিদিন শোকের তালিকা দীর্ঘতর হচ্ছে। প্রতিটি দিনই আজকাল তাই শোকাচ্ছন্ন দিন।

সকল সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় জীবন বাজি রেখে ডাক্তারসহ সকল স্বাস্থ্যকর্মীরা সন্মুখ সারিতে থেকে লড়ছেন। নিম্নমানের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী সরবরাহ করে ইতিমধ্যে ডাক্তারসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীদের বাড়তি ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

এই লড়াইয়ে ডাক্তারসহ কয়েক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী ইতিমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তবু লড়াই চলছে। এর মধ্যে থেমে নেই স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতি, থেমে নেই ডাক্তারের উপর নৃশংসতা। থামেনি হুমকি-ধামকি আর মিথ্যে মামলা দিয়ে ডাক্তার নির্যাতন। খুলনায় প্রকাশ্য দিবালোকে রোগীর কয়েকজন আত্মীয়স্বজন মিলে গরীবের ডাক্তার বলে পরিচিত ডা. মো. আব্দুর রকিব খানকে নিজের ক্লিনিকের গেটে নৃশংসভাবে আঘাত করেছে। পরিণতিতে মৃত্যবরণ করেছে ডা. রাকিব। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ডা. রকিবের কোন খুনিকে পুলিশ এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি।

সিলেটের বিয়ানীবাজারের চারখাইয়ে মিথ্যে মামলা সাজিয়ে ডা. জোবায়ের আহমেদকে জেলে পাঠানো হয়েছে। ডা. জোবায়ের বিরূদ্ধে রোগীর শ্লীলতাহানির চেষ্টার অভিযোগ সাজানো হয়েছে। আসল ঘটনা ছিল, স্তনের সমস্যা নিয়ে একজন নারী রোগী এসেছিল।

একজন এটেনডেন্টের উপস্থিতিতে ডা. তাকে পরীক্ষা করে দেখলেন, সেভাবে চিকিৎসাও দিলেন। রোগী বেশ খুশি হয়ে চলে যাবার তিনঘণ্টা পরে শত শত লোক এসে ডাক্তারের ক্লিনিক ঘেরাও করলো। তাদের মূল দাবি ডা. জোবায়েরকে চারখাই ছাড়তে হবে। কারণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সে রোগী দেখলে ভুয়া চিকিৎসকদের অপচিকিৎসা দেবার সুযোগ কমে যায়। তাই জোবায়েরকে এলাকা ছাড়া করার জন্য প্রথমে প্রস্তাব, পরে হুমকি দেওয়া হয়। তাতেও কাজ না হলে এই শ্লীলতাহানির কাহিনী সাজানো হয়। মিথ্যে মামলা মাথায় নিয়ে ডা. জোবায়ের এখন কারাগারে।

আর তাকে ফাঁসাতে পেরে এলাকায় দাপটের সাথে চষে বেড়াচ্ছে সন্ত্রাসী মইনুল এবং অনি মিয়া। অথচ তৃণমূলের মানুষের উপকার করবে বলে শহরের মায়া ছেড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সে মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতো। আর তার বিনিময়ে বারবার সে এভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে। এর আগেও একবার তাকে চিহ্নিত স্থানীয় সন্ত্রাসী মহলটি এলাকা ছাড়তে বাধ্য করেছিল। তবে নাছোড়বান্দা জোবায়ের সহজে হাল ছাড়বার নয়। কারাগার থেকে সে খবর পাঠিয়েছে, অন্যায়ের বিরূদ্ধে লড়াই চলবে।

অবিলম্বে ডা. জোবায়ের আহমেদের মুক্তি চাই ও এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার চাই। অবিলম্বে খুলনায় নিহত ডা. রকিব হত্যার বিচার চাই। কোভিড-১৯ রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ডাক্তারদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিস (এফডিএসআর)।

 

নিউজ টোয়েন্টিফোর/কামরুল

মন্তব্য