বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২০ | আপডেট ২৭ মিনিট আগে

এক মাসের ছুটি নিয়ে ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস

অনলাইন ডেস্ক

এক মাসের ছুটি নিয়ে ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস

জামালপুর জেলার ইসলামপুর উপজেলায় জে জে কে এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষিকা ফারজানা হক। তিনি স্কুল থেকে এক মাসের ছুটি নিয়ে ১১ বছর ধরে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন। তার চাকরি রয়েছে বহাল তবিয়তে, স্কুলের হাজিরা খাতায় তিনি ১১ বছর ধরে অনুপস্থিত। ফারজানা হক জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব ফরিদুল হক খান দুলালের মেয়ে।

বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলে বলছেন, ১১ বছর ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার পরেও কোন নিয়মে তার চাকরি আছে? আর সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনপ্রতিনিধির মেয়ে হিসেবে এমন প্রতারণা কাম্য নয়। স্কুল শিক্ষিকার ওই পদে অন্য কেউ সহজেই চাকরি করতে পারতেন। তবে বিষয়টি অপপ্রচার জানিয়ে সংসদ সদস্য বলেছেন, তার মেয়ে চাকরি বাদ দিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় স্বামী, সন্তান নিয়ে সংসার করছেন।

জানা যায়, সংসদ সদস্য এমপির মেয়ে ফারজানা হক ২০০৫ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক হিসেবে চাকরি পান। তিনি ২০০৯ সালে জে জে কে এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন। সেখানে কয়েকদিন ক্লাস নেন। পরে ওই বছরই তিনি অসুস্থতাজনিত কারণে এক মাসের ছুটি নিয়ে স্বামী সন্তান নিয়ে অস্ট্রেলিয়াতে চলে যান। এরপর থেকে তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন।

এমপি কন্যার প্রতিবেদন পৌঁছেছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে
একমাসের ছুটি ১১ বছরেও শেষ হয়নি, এমপি কন্যা হওয়াতে কি ফারজানা সুবিধা ভোগ করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে জামালপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন: ‘আইন সবার জন্যই সমান। গত ১১ বছরের কয়েকজন জেলা শিক্ষা অফিসার বদলি হয়েছেন, আমার জানা মতে তারাও বিষয়টি সুরহা করতে চেষ্টা চালিয়েছেন। আমি বিষয়টা জানার পর ইসলামপুরের উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে প্রতিবেদন চাই। পরে প্রতিবেদনটি উপ-পরিচালক প্রাথমিক শিক্ষা ময়মনসিংহ বিভাগের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। এমপি কন্যার ব্যাপারে এখন যে কোনো ব্যবস্থা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নেবেন।’

বেতন উত্তোলন না করলেও কোন অব্যাহতি পত্র দেননি ফারজানা
জে জে কে এম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আশরাফুর রহমান খান বলেন, ‘চিকিৎসা করার কথা বলে ফারজানা হক এক মাসের ছুটি নিয়েছিলেন, এরপর থেকে তিনি ১১ বছর অনুপস্থিত। তিনি বেতন উত্তোলন না করলেও কোনো অব্যাহতি পত্র দেননি।’

প্রাইমারি স্কুলটিতে শিক্ষিকার অনুপস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ায় ক্ষতি হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন: ‘এখানে শিক্ষকদের প্রতিটি বিষয়েই ক্লাস নিতে হয়। স্বাভাবিকভাবে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হলেও আমরা ব্যাকআপ ক্লাস নিয়ে সেটা পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

সচেতন মানুষ হিসেবে এমন প্রতারণা কাম্য নয়
জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জিয়াউল হক বলেন: ‘এখনো এমপি কন্যা বেতন তুলতেছে কি না, সেটা জানি না। কেউ বলছে তুলছে আবার কেউ বলছে তুলছে না। সম্ভবত বেতন তুলছেন না। তবে চাকরি আছে, তিনি অব্যাহতি দেন নাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘একজন জনপ্রতিনিধির মেয়ে হয়ে এমন প্রতারণা করা কখনোই ঠিক হয়নি। সে তো সচেতন মানুষ। তার জায়গায় ওই পোস্টে অন্য কেউ চাকরি করতে পারত।’

ইসলামপুরের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ‘২০১৭ সালে এমপি কন্যা একবার দেশে এসেছিল, তিনি চাইলে তখনই চাকরি থেকে অবসর নিতে পারতেন। এমনকি এমপি দুলাল নিজেও গত বছরের ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া গেলেন তখনও অবসরের একটি দরখাস্ত আনতে পারতেন। তাহলে আমরা সাধারণ জনতারা তো ভাবতেই পারি সরকারি চাকরির লোভটা রয়ে গেছে। সরকারি চাকরি শেষ হলে বড় অঙ্কের টাকাও পাওয়া যাবে।’

চাকরির নিয়ম লঙ্ঘন করেই বহাল আছেন ফারজানা
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ‘এটা সম্পূর্ণভাবে চাকরি সংক্রান্ত নিয়ম কানুন লঙ্ঘন, ১১ বছর ধরে অনুপস্থিত থাকলে স্বাভাবিক নিয়মে চাকরি থাকার কথা না। যদি থেকে থাকে তাহলে কোন নিয়মে রয়েছে? চাকরি নিয়ম লঙ্ঘন করেই তিনি তাহলে বহাল রয়েছেন।’

তিনি বলেন, নৈতিকভাবে একটা বিষয় থাকে যে জনপ্রতিনিধির মেয়ে হওয়ায় তার উচিত ছিল চাকরি ছেড়ে দেশের বাইরে যাওয়া। যেহেতু তিনি অস্ট্রেলিয়ার ১১ বছর ধরে বসবাস করছেন, ট্যুরিস্ট ভিসায় তো তিনি কখনোই ১১ বছর দেশের বাইরে থাকতে পারেন না। নিশ্চয় তিনি স্থায়ী বাসিন্দা বা ওয়ার্ক পারমিটে আছেন। তাহলে তো তার দেশে চাকরি রাখার দরকার নেই। যদি তিনি প্রতিমাসে বেতন তুলে থাকেন তাহলে সেটা চাকরি নিয়মে লঙ্ঘন, এবং চাকরি না করে কোনোভাবেই তিনি বেতন ভাতা তুলতে পারেন না।’

অপপ্রচার, ‘এমন কথার গ্রহণযোগ্যতা নেই’ জানালেন সাংসদ দুলাল
এক মাসের ছুটিতে ১১ বছর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাদানে অনুপস্থিত আপনার মেয়ে, একজন জনপ্রতিনিধির মেয়ে যদি এমন কাজ করে তাহলে অন্যরা কি শিখবে, জানতে চাইলে জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফরিদুর হক দুলাল বলেন: বিষয়টি সম্পূর্ণ অপপ্রচার, এমন কথার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই এবং নিন্দুকেরা এসব কাজ করছে।

সাংসদ দুলাল বলেন, ‘১১ বছর আগে আমার মেয়ে চাকরি বাদ দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার চলে যায়। তার অব্যাহতি পত্র এবং সকল প্রকার তথ্য উপাত্ত আমার কাছে আছে। তবে যেহেতু ১১ বছর আগের বিষয় জেলা শিক্ষা অফিসসহ অন্যান্যরা নাকি অব্যাহতি পত্রটি পায় নাই, বিষয়টি জানার পরই মেয়ের সঙ্গে কথা বলে তাকে এখনকার তারিখে আরেকটি অব্যাহতি পত্র দিতে বলেছি, এখনো সেটা আমি হাতে পাইনি। দুই একদিনের মধ্যে পাওয়ার কথা পেলেই আমি অব্যাহতি পত্র জমা দিয়ে দেব।’

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য