বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২০ | আপডেট ১৬ মিনিট আগে

‘নেই’; ‘এটা নেই – ওটা নেই’

আলী রিয়াজ

‘নেই’; ‘এটা নেই – ওটা নেই’

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা নিয়ে কথা বলা এখন প্রায় নিরর্থক, কেননা স্বাস্থ্য খাতের রোগ সারানোর উপায় যা তা করার কোনো ইচ্ছে বা আগ্রহ ক্ষমতাসীনদের আছে বলে মনে হয় না। এর কারণ সুস্পষ্ট। গত কয়েক দশক ধরেই এই খাত রোগাক্রান্ত। গত এক দশকে তা দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়েছে। কিন্ত এই নিয়ে কারো মাথা ব্যথা ছিল না, এখনও নেই। শুনতে বেদনাদায়ক এবং হতাশা ব্যঞ্জক শোনাবে – কিন্ত তবু বলি, আশু ভবিষ্যতেও হবে না।

স্বাস্থ্য খাত কেন এবং কীভাবে এই দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হলো? এর কারণ দুটি। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রাধীন জনস্বাস্থ্য খাতকে সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসে পরিণত করা হয়েছে। এখানে জনগণের অর্থ দেওয়া হবে এবং তা এক শ্রেণির মানুষ যেভাবে পারেন লুটপাট করবেন। কী ধরণের লুটপাট হয়েছে? নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, ব্যবহারের অনুপোযোগী যন্ত্রপাতি, অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দিয়েছেন; বেশি দামে তো দেবেনই – পর্দা, বালিশ ইত্যাদি নিয়ে হরহামেশা হরিলুট হয়েছে। এমন কি খালি বাক্স দিয়েও ‘টাকা হাতিয়ে” নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই যে লুটেরারা তাঁরা ক্ষমতাসীনদের আশ্রিত, তাঁদের ঘনিষ্ঠ এবং দলের লোক - না হয় তাঁরা টিকতে পারতেন না – এটা কোনো তত্ত্বের কথা নয়, বাস্তবের ছবি। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতিপ্রবণ আমলা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্বে নিয়োজিত রাজনীতিবিদদের ত্রিভুজ চক্র মিলেমিশে, ভাগ বাটোয়ারা করে বছরের পর বছর এই সব করেছেন। ক্ষেত্র বিশেষে গণমাধ্যমে খবর হয়েছে এবং লোক দেখানো প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কখনো কখনো ‘তদন্ত’ হয়েছে, বারবার বলা হয়েছে ‘খতিয়ে’ দেখা হবে, দুদকের বিশেষ সেল হয়েছে। কিন্ত বছর ঘুরে বাজেট হয়েছে – গৌরী সেন না থাক জনগণ আছেন, তাঁরা কর দিয়েছেন – অর্থ বরাদ্দ হয়েছে; কিছু ব্যয় হয়েছে, কিছু হয়নি। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রকল্প। একই অবস্থা চলেছে। অর্থের তো অভাব নেই। মনমাতানো নামের কর্মসূচি হয়েছে। এই হচ্ছে জনগণের অর্থে পরিচালিত জনস্বাস্থ্য খাতের অবস্থা – সরকার চালায় সরকারের তো নিজের টাকা না, টাকা জনগণের; কিন্ত জনগণ চিকিৎসা পায়নি। এই বিপদের সময় স্বাস্থ্য কর্মীদের জীবন বিপন্ন করার ব্যবস্থা হয়েছে নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই সরবরাহ করে। এর পক্ষে সাফাই কারা গাইলেন, গাইছেন দেখুন – মনে রাখুন।

স্বাস্থ্য খাতের রোগের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতগুলোকে নিয়ন্ত্রনহীনভাবে চলতে দেওয়ার নীতি। স্বাস্থ্য খাতের সম্প্রসারণের নামে বাংলাদেশে গত এক দশকে গড়ে উঠেছে হাসপাতাল, ক্লিনিক। প্রাইভেট সেক্টরে হাসপাতাল ক্লিনিক গড়ে ওঠা দোষের বিষয় নয়। কিন্ত যা ঘটেছে তা হচ্ছে এগুলোকে প্রায় ‘স্বাধীনভাবে’ চলতে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রের কাজ এগুলোর ওপরে নজরদারী করা, মান নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্ত দেখুন কি ঘটেছে - দেশের ১৫ হাজার ক্লিনিক ও হাসপাতালের দুই-তৃতীয়াংশের গত দুই বছর ধরে লাইসেন্স নবায়ন করা হয়নি। কিন্ত সেগুলো বহাল তবিয়তে রোগীর দেবা দিচ্ছে। কী সেবা দিচ্ছে সেটা কে জানে! এর মধ্যেই ঢাকায় বড় বড় হাসপাতাল গড়ে উঠেছে – ‘বিদেশি’ ডাক্তাররা চিকিৎসা দেন – সেটা তো ধনীদের জন্যে, বড় জোর উচ্চ মধ্যবিত্তের জন্যে। কিন্ত যে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত কিংবা নিরুপায় দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা চাইবেন তাঁরা কোথায় যাবেন? সেই জন্যেও কিছু হাসপাতাল আছে, কিন্ত সেগুলোর মান কে দেখে? বিলের পরিমাণ কে নির্ধারণ করে? এই যে হাসপাতালগুলো সেগুলোর সঙ্গেও রাজনীতি জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। কে কেন অনুমোদন পেয়েছে তাঁর খোঁজ নিলেই দেখা যাবে।

করোনা ভাইরাসের বিপদ যখন মাথার ওপরে নামলো, যখন প্রমাণিত হলো যে, ‘করোনার চেয়ে আমরা ভয়ংকর’ হচ্ছে অভ্যাসের হুংকার আসলে কাজের কথা নয়, তখন সঙ্গত কারণেই এই সব প্রাইভেট হাসপাতালকে যুক্ত করার কথা উঠলো। অনেক ধরণের বাক্য বিস্তার হলো, চুক্তি হলো। কিন্ত এই সব চুক্তি করার সময়েও দেখা হয়নি কার লাইসেন্স আছে আর কার নেই। সরকারের যে বিভাগ চুক্তি করার সময় হাসপাতালের লাইসেন্স দেখেনি সেই বিভাগ সরেজমিনে দেখেছে যে এই সব হাসপাতালের আসলেই কোভিড-১৯ রোগিদের সেবা দেবার ব্যবস্থা আছে – এই কথা আপনার বিশ্বাস হয়? আসলেই সেই সব সরেজমিন পরীক্ষার প্রতিবেদন কই বলুন তো? যেদিন থেকে এই সব হাসপাতালকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সেই থেকেই শোনা যাচ্ছে – ‘নেই’; ‘এটা নেই – ওটা নেই’।

বিবিসি’র প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, “ঢাকাসহ সারাদেশে সরকারি এবং বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক মিলিয়ে ১২০টি প্রতিষ্ঠানকে করোনা ভাইরাস চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭১টি প্রতিষ্ঠানই যথাযথ মানসম্পন্ন নয়।“ এবার অংকটা করুন, আমি অংকে খুব কাঁচা কিন্ত এটুকু বুঝতে পারি অর্ধেকের বেশি হাসপাতাল মানসম্পন নয়। তা হলে কিসের ভিত্তিতে এই সব হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? এখন একটা হাসপাতালের মালিককে নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সেই নিয়ে হৈ হৈ রৈ রৈ হচ্ছে। কিন্ত লক্ষ করুন এই হাসপাতাল কী করেছে – ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়েছে। ভালো করে বোঝার চেষ্টা করুন – বিপদের মাত্রা কোথায় নিয়ে গেছে। কিন্ত এই হাসপাতাল একা এটা করেছে তা তো নয়। সরকারের অনুমোদন দেওয়া আরেকটি প্রতিষ্ঠান কতগুলো ভুয়া সার্টিফিকেট দিয়েছে কেউ কি জানেন? এই রকম কতগুলো আছে? এই ধরণের প্রতিষ্ঠান কে কেন অনুমতি দেয়? এই সবের পরিণতি দেখতে পাচ্ছেন?

স্বাস্থ্যখাতের এই রোগ আপাতত সারবে না, হম্বিতম্বি যা শুনতে পাচ্ছেন সেগুলো গর্জন মাত্র। বলতে পারেন খালি কলসি বাজে বেশি। প্রশ্ন করতে পারেন ভবিষ্যতে কেন এই রোগ সারবে না? আমার এই রকম কথার কারণ কী? সেটা বুঝতে হলে এই বছরের স্বাস্থ্য খাতের বাজেট দেখুন – ভালো করে পড়ুন তা হলেই বুঝবেন। একটা উদাহরণ দেই - অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হচ্ছে ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা। অথচ বাজেট দলিল পাঠ করুন – সেখানে দেখা যাচ্ছে, বরাদ্দ ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। আরো এই রকম ফাঁক ফোঁকর তো আছেই।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য