মার্কিন নির্বাচনে কীভাবে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়?

নাহিদ জিহান

মার্কিন নির্বাচনে কীভাবে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়?

অন্য অনেক দেশের নির্বাচনেই দেখা যায় - যে প্রার্থী বেশি ভোট পান তিনিই প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সব সময় তা নাও হতে পারে। কারণ মার্কিন নির্বাচনী পদ্ধতিকে বলা যায় 'পরোক্ষ' ভোট ব্যবস্থা। এখানে একজন ভোটার যখন তার পছন্দের প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন, তখন আসলে তিনি ভোট দিচ্ছেন তার অঙ্গরাজ্যভিত্তিক নির্বাচনী লড়াইয়ে থাকা দলকে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আসল লড়াই হয় যে রাজ্যগুলোতে কোনো দলেরই সুস্পষ্ট প্রাধান্য নেই। 
নির্বাচনে বিজয়ী হতে হলে প্রার্থীকে আসলে দু'ধরণের ভোটে জিততে হয়। একটি হচ্ছে 'পপুলার' ভোট বা সাধারণ ভোটারদের ভোট।

আরও পড়ুন: 


মার্কিন মসনদে এবার কে বসছেন, ট্রাম্প নাকি বাইডেন?


আরেকটি হচ্ছে 'ইলেকটোরাল কলেজ' নামে এক ধরনের নির্বাচকমন্ডলীর ভোট। একদল নির্বাচকমণ্ডলী বা কর্মকর্তা - যারা একেকটি রাজ্যের পপুলার ভোটে প্রতিফলিত রায় অনুযায়ী ভোট দেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত এবং রাষ্ট্র ও কেন্দ্রীয় আইনের অধীনে একটি জটিল ব্যবস্থা। নির্বাচনের প্রার্থীরা আসলে এই ইলেকটোরাল ভোট জেতার জন্যই লড়াই করেন।

জনগণের সরাসরি বা প্রত্যক্ষ ভোটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন না। ইলেকটোরাল কলেজ নামে পরিচিত এক দল কর্মকর্তার পরোক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। কলেজ শব্দটি বলতে একদল লোককে বোঝায় যারা নির্বাচকের ভূমিকা পালন করেন। তাদের সবার কাজ প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা। ইলেকটোরাল কলেজ পদ্ধতি অনুযায়ী যেসব রাজ্যে জনসংখ্যা বেশি, সেসব রাজ্যে ইলেকটোরাল ভোটও বেশি। ফলে এসব রাজ্য থেকে সর্বাধিক ইলেকটোরাল ভোট জেতার জন্য বিশেষ কিছু কিছু অঙ্গরাজ্যে প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়।

কীভাবে কাজ করে ইলেকটোরাল কলেজ?

আমেরিকায় হোয়াইট হাউসে যাবার দৌড়ে নির্বাচন পদ্ধতি অন্য দেশের তুলনায় ভিন্ন এবং কিছুটা জটিল। কোন একজন প্রার্থী নাগরিকদের সরাসরি ভোট পেলেই যে তিনি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন - তা নয়। বরং ইলেকটোরাল কলেজ নামে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিশেষ নির্বাচনী ব্যবস্থা আছে - আসলে তার মাধ্যমেই ঠিক হয় কে হবেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট।

৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রার্থীরা সাধারণ ভোটারদের যে ভোটগুলো পাবেন, সেটাকে বলা হয় পপুলার ভোট। ইলেকটোরাল কলেজের ভোটকে বলা যায় 'ইলেকটোরাল ভোট।' যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যক ইলেকটোরাল ভোট আছে। দুটি ছাড়া প্রতিটি অঙ্গরাজ্যের নিয়ম হলো - যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পাবেন, তিনি ওই রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন। মোট ইলেকটোরাল ভোটের সংখ্যা হচ্ছে ৫৩৮। সবগুলো রাজ্যের ইলেকটোরাল ভোট যোগ হয়ে যে প্রার্থী ২৭০টি বা তারচেয়ে বেশি ভোট পাবেন - তিনিই নির্বাচিত হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন প্রার্থীরা সারা দেশে ভোটারদের কাছ থেকে যেসব ভোট পান সেগুলোকে বলা হয় পপুলার ভোট এবং ইলেকটোরাল কলেজের ভোটকে বলা হয় ইলেকটোরাল ভোট। কোনো একটি রাজ্যে যে প্রার্থী সবচেয়ে বেশি পপুলার ভোট পাবেন তিনি ওই রাজ্যের সবগুলো ইলেকটোরাল ভোট পেয়ে যাবেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, টেক্সাস রাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী যদি ৫০.১% ভোট পান, তাহলে ওই রাজ্যের ৩৮টি ইলেকটোরাল ভোট তাদের পকেটেই যাবে। ইলেকটোরাল কলেজের মোট ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। মাইন ও নেব্রাসকা এই দুটো অঙ্গরাজ্য বাদে বাকি সবগুলো রাজ্যের ইলেকটোরাল ভোট যোগ দিলে যে প্রার্থী ২৭০টি বা তারও বেশি ভোট পাবেন তিনিই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন।

মোট ইলেকটোরাল ভোট ৫৩৮ এর অর্ধেক ২৬৯ এবং জয়ী হয়ে হোয়াইট হাউজে যাওয়ার জন্যে আরো একটি ভোট এভাবেই ২৭০টি ভোট পেতে হবে একজন প্রার্থীকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য।

২০১৬ সালে যা হয়েছিল তা হলো - হিলারি ক্লিনটন ট্রাম্পের চাইতে প্রায় ৩০ লাখ পপুলার ভোট বেশি পেলেও প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। তিনি নিউইয়র্ক এবং ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ডেমোক্র্যাটিক-প্রধান অঙ্গরাজ্যগুলোতে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়েছিলেন। সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য কয়েকটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যে জয়ী হন, যার ফলে তিনি মোট ৩০৪টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পান, যা ছিল হিলারি ক্লিনটনের পাওয়া ২২৭টি ইলেকটোরাল ভোটের চেয়ে অনেক বেশি।

আরও পড়ুন: 


জো বাইডেন বড় সন্ত্রাসী: ট্রাম্প


যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ রাজ্যই চিরাচরিতভাবে 'রিপাবলিকান' বা 'ডেমোক্র্যাট' বলে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তাই প্রার্থীরা প্রচারণার সময় এমন ১০-১২টি রাজ্যের দিকে মনোযোগ দিয়ে থাকেন, যেগুলো ঠিক নির্দিষ্ট কোনো দলের সমর্থক হিসেবে পরিচিত নয় এবং যে কোন দলই জিতে যেতে পারে। এগুলোকেই বলে 'ব্যাটলগ্রাউন্ড' স্টেট - অর্থাৎ আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আসল লড়াই হয় এ রাজ্যগুলোতেই।

ইলেকটোরাল কলেজের ভোট

'ইলেকটোরাল কলেজ' হচ্ছে কর্মকর্তাদের একটি প্যানেল, যাদের 'ইলেকটরস্' বলা হয়। এরা এক কথায় নির্বাচক মণ্ডলী। প্রতি চার বছর পর পর এটি গঠন করা হয়, এবং এরাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্টকে বাছাই করেন।

কংগ্রেসে প্রতিনিধিত্বের অনুপাতে প্রতিটি স্টেটের ইলেকটরসের সংখ্যা নির্ধারিত হয়: যা নির্ধারিত হয় স্টেটে সেনেটরের সংখ্যা (প্রত্যেক স্টেটে দুইজন) এবং প্রতিনিধি পরিষদে প্রতিনিধির (যা জনসংখ্যার অনুপাতে) যোগফল মিলে।

সবচেয়ে বড় ছয়টি স্টেট হলো ক্যালিফোর্নিয়া (৫৫), টেক্সাস (৩৮), নিউইয়র্ক (২৯), ফ্লোরিডা (২৯), ইলিনয় (২০) এবং পেনসিলভেনিয়া (২০)।

প্রত্যেক নির্বাচনের সময় দেখা গেছে যেসব রাজ্যের ভোট বেশি, প্রার্থীরা সেসব রাজ্যে নির্বাচনী প্রচারণার পেছনে অনেক বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করে থাকেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি যেহেতু এই ব্যাটলগ্রাউন্ড রাজ্যগুলোতে, তাই দুই দলের প্রার্থীই আগামী মাসগুলোতে জয়ের জন্য তাদের মরীয়া লড়াই যে চালাবেন এই ব্যাটলগ্রাউন্ড স্টেটগুলোতে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

(নিউজ টোয়েন্টিফোর/তৌহিদ)

মন্তব্য