‘আপনি যতোই ভয় দেখান আমি লিখবই’

শরিফুল হাসান

‘আপনি যতোই ভয় দেখান আমি লিখবই’

মানুষ হিসেবে আমি প্রচণ্ড নরম মনের হলেও নীতি-আদর্শের মতো বিষয়ে আমি ভীষণ কঠিন। ফলে যারা আমাকে খুব কাছ থেকে দেখেন না বা জানেন না তাদের কেউ কেউ ভুল বুঝতে পারেন।  আপনাদের জন্য এক কথায় বলি, আমি কোমল-কঠিন কিন্তু কর্কশ নই।

নিজের সম্পর্কে এভাবে বলা ঠিক কী না জানি না। আমার খুব অল্পতেই চোখের পানি চলে আসে। ধরেন বাংলাদেশের যে কোনো ভালো খবরে আনন্দে চোখে পানি চলে আসে। আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি শুনলেও ভিজে যায় আমার চোখ। 

চলতি পথে কোনো শিশুর হাসি দেখলে ভালোলাগে ভীষণ। আবার রাস্তায় যানজটে শিশুকোলে কোনো মায়ের দুর্ভোগ দেখলে আমার কান্না পায়। কান্না পায় যে কোনো মানুষের কষ্টে। আবার মানুষের খুশির খবরে আমার দারুণ লাগে।

ছোটবেলা থেকে শুনেছি ছেলেদের এতো নরম মনের হতে নেই, ছেলেদের এতো কাঁদতে নেই। কিন্তু নিজেকে আমি বদলাতে পারিনি। যে কোনো মানুষের সংকট শুনলে চোখ বন্ধ করে আমি ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি। এক্ষেত্রে আমার কতোটা ক্ষতি হবে বা কতোটা ঝুঁকিতে পড়ব সেটা আমি জানি না। ভাবিও না। আরেকজনের বিপদে পাশে দাঁড়াতে মরতে হলেও রাজি আমি। আমি মরে গেলে শুনবেন এই শহরের এমন কোনো চেনাজানা মানুষ নেই যার সংকটে আমি ছিলাম না।

হ্যা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোটা, মানুষকে সম্মান করাটা আমি ইবাদত মনে করি। আমার স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে দপ্তরি পিয়ন সবাই আমাকে দেখলেই এখনো আবেগে কাছে টানবে। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের দাদু-মামা থেকে শুরু করে দোকানদার সবার ভালোবাসা পেয়েছি। আমি আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগেটে গেলে সব মামারা ছুটে আসবে।

রিকশাওয়ালা, ড্রাইভার, কাজের বুয়াদের আমি যে কোনো প্রতিষ্ঠিত মানুষের চেয়ে কম নয় বরং পারলে বেশি শ্রদ্ধা করি। তারাও আমাকে ভীষণ ভালোবাসে।

আমি সবসময় বলি আজকে আমার যতোটুকু প্রাপ্তি সেটা মানুষের ভালোবাসার কারণে। আর এই ভালোবাসর কারণ মানুষকে শ্রদ্ধা। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়-কর্মক্ষেত্র সবখানে আমি বড়দের সম্মান করেছি। ছোটদের আদর করেছি। বন্ধুদের জন্য পারলে সবটুকু দিয়েছি। আরেকজন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে গিয়ে আমি সবটুকু ছাড় দিতে রাজি।

শুধু যে বন্ধু তাই নয়, আমাকে কেউ অপছন্দ করে, কেউ গালি দেয় সেটা জানার পরেও আমি তাকে সম্মান করি। মাঝে মধ্যে মজা করে বলি, আমাকে যদি কেউ খুন করতে আসে আমি তাকে হয়তো বলব আসেন একটু কথা বলি। চা খাই। এরপর খুন করবেন।

আমি মনে করতে পারি না জীবনে কোনোদিন কখনো কোনো মানুষকে আমি অসম্মান করে কথা বলেছি কী না। কারণ, বান্দার হক আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি সবসময় মনে করি আরেকজন মানুষকে আমি কষ্ট দিলে স্বয়ং আল্লাহ আমাকে মাফ করবেন না।

আমার ৩৭ বছরের জীবনে আমি অন্তত ৩৭ হাজার মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে এসেছি। প্রত্যক্ষভাবে ধরলে এই সংখ্যা আরও বেশি হবে। কিন্তু একজন মানুষকেও আমি কখনো জেনে-বুঝে কষ্ট দিইনি।

এই যে মানুষকে সম্মান করা সেটা আমি সবচেয়ে বেশি শিখেছি আমার মায়ের কাছ থেকে। আমার মা আমাকে সবসময় বলতেন স্বপ্ন দেখবে আকাশ ছোঁয়ার কিন্তু বিনয়ে মাথা নত থাকবে মাটিতে। আমি সবসময় সেটা মানার চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করেছি বিনয়ী থাকতে, মানুষকে সম্মান করতে, আর মনটা নরম রাখতে।

কিন্তু এই আমি আবার ভীষণ কঠিন নীতি আদর্শের ক্ষেত্রে। আপনি আমাকে খুন করে ফেলতে পারবেন কিন্তু আমাকে দিয়ে কোনো অসৎ কাজ করাতে পারবেন না। নীতির বাইরে আমি এতোটুকু যাব না। আপনি আমার যতোই ঘনিষ্ঠ হন, যতোই অনুরোধ করেন আমি অন্যায় কাজ করব না। অসৎ পথে যাব না। আপনার সাথে কোনোভাবে কাজের সম্পর্ক থাকলে আপনি আমার যতোই ঘনিষ্ঠ হন আমি আপনার উপহার নেব না। আমি অফিসের কোনো জিনিষ বাসায় কখনো আনব না। 

আরও শুনবেন? ধরেন কোনো অন্যায় হচ্ছে আমি সেটা দেখে চুপ থাকব না। কোনোভাবেই না। যে আমি মানুষকে সবসময় সম্মান করি সেই আমি কিন্তু আপনার কোনো অন্যায় আচরণ দেখলে শক্ত প্রতিবাদ করব সে আপনি যতোই প্রভাবশালী হন। আমার এমন আচরণে আপনার হয়তো মনে হতে পারে আমি জেদি মানুষ। হয়তো মনে হতে পারে আমি বেয়াদব। আপনি হয়তো কষ্ট পেতে পারেন। কিন্তু আপনি মন্ত্রী-সচিব কিংবা যতো বড় পদের মানুষই হন না কেন কঠিন সত্যটা আমি বলবই।

আরও পড়ুন: ‘তখন অনেকেই আমরা তাচ্ছিল্য করেছিলাম’

মনে আছে, এই সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রীকে আমি সংবাদ সম্মেলনে এমন প্রশ্ন করেছিলাম যে রাগ করে সংবাদ সম্মেলন ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি টলিনি। ভয় পাইনি। কারণ আমি ঠিক ছিলাম।  শুধু বলা নয়, লেখার ক্ষেত্রেও আমি সত্যটা লিখব। আপনি আমাকে যতোই ভয় দেখান আমি লিখবই হোক সেটা ফেসবুক কিংবা সংবাদপত্র।

হ্যা যেহেতু আমি মানুষ আমার ভুল হয়। আমার চলার পথে আমি কোনো ভুল করেছি বুঝলেই আমি ক্ষমা চাই। এক্ষেত্রে আমি এতোটুকু ইগো দেখাই না। আমার কাছে এই জীবনে টাকা-পয়সা, সম্পদ নয়, মূল্যবোধ সবার আগে। সেই মূল্যেবাধের জন্য আমি মরতেও রাজি।

এখন অনেকেই অবাক হতে পারেন যেই আমি এতো নরম সেই আমি আবার নীতি-আদর্শের বিষয়ে এতো কঠিন কেন? এটাই আমার দুর্বলতা। এটাই আমার চরিত্র। মনে রাখবেন চোখে চোখ রেখে সত্য কথাটা বলা আমার অভ্যাস। অভ্যাস আমার অন্যায়ের প্রতিবাদ করা। হ্যা, এই আমিই আবার আরেকজন মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, আরেকজন মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে নিজের সবটুকু ত্যাগ করতে প্রস্তুত। কারণ, মানবিকতা আমার কাছে সবার আগে।

আরও পড়ুন: রাত পোহালেই শিবচর উপজেলা পরিষদের উপনির্বাচন

এক কথায় প্রকাশ করতে গেলে, আমি নরম এবং কঠিন। আমার কণ্ঠস্বর শুনে আপনার ভালো নাও লাগতে পারে কিন্তু মনে রাখবেন আমি কর্কশ নই, কিন্তু কঠিন। ভীষণ কঠিন। আর এ কারণেই আমি শরিফুল হাসান। আমার এই কঠোর আচরণের কারণে আপনি যদি কোনো কারণে আমাকে ভুল বুঝে থাকেন আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আপনাকে শুধু একটা কথাই বলি, নীতি-আদর্শের সময় আচরণে আমাকে হয়তো আপনার ভীষণ কঠিন মনে হয়েছে। কিন্তু বিশ্বাস করেন এই আমি ভীষণ নরম। অন্তত কর্কশ তো নয়ই। ভালো থাকুন সবাই। শুভ রাত্রি।

আরও পড়ুন: ঢাকার অর্ধেক মানুষই করোনা আক্রান্ত হয়েছে

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য