তখন আমার জগতটা আলোকিত হয়ে ওঠে

জসিম মল্লিক

তখন আমার জগতটা আলোকিত হয়ে ওঠে

মাঝে মাঝে আমি চিন্তা করি আমার কী কোনো দুঃখ আছে! মাঝে মাঝে আমি চিন্তা করি আমি কী সুখী! আমি আমার শৈশব আর কৈশোরের দিনগুলোর সাথে বর্তমানের দিনগুলোর তুলনা করি এবং এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজি। এই দুইয়ের মাঝে মধ্যবর্তী যে জীবন ছিল আমার সেখানে অভাব, অনটন, লড়াই, সংগ্রাম, অপমান, অবহেলা, আনন্দ, বেদনা, হাসি, কান্না সব ছিল। কি ছিল না সেই জীবনে! সবই ছিল। সেসবেরও ব্যবচ্ছেদ করি। সুখ বা দুঃখ কোনোটা নিয়েই আমি কখনো আদিখ্যেতা করিনি। কোনোটাই নিরবচ্ছিন্ন নয় জীবনে। দুটোই জীবনের অংশ। তাই জীবনের বঞ্চনাগুলো নিয়ে আমি কখনো নিজেকে দুঃখিত করে তুলিনি। ভারাক্রান্ত হইনি। নির্দিষ্টভাবে কাউকে দায়ী করিনি। বরং আমি যে এখন নিজের পায়ে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে আছি সেজন্য নেপথ্যের মানুষগুলোর প্রতি অবনতমস্তকে কৃতজ্ঞতা জানাই। যারা আমাকে স্বার্থহীনভাবে ভালবেসেছে, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে, পাশে থেকেছে, প্রশ্রয় দিয়েছে তাদের প্রতি আমার একবুক ভালোবাসা সবসময়। এখনও যারা আমার প্রতি সহমর্মীতার হাত বাড়ায়, ভালোবাসে, মাথায় হাত রাখে তাদের স্পর্শ আমার কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। বাঁচতে শেখায়।

মনে আছে যখন স্কুলে পড়ি লেইজারে আমি খুব দিনই মালেক ভাইয়ের মালাই আইসক্রীম খেতে পারতাম। একটা দুটোর বেশি জামা, প্যান্ট বা জুতা ছিল না আমার। রোদ্রে বৃষ্টিতে ভিজত, আবার গায়েই শুকাত। ঠান্ডা লাগত না। শরীর সব সয়ে নিত। আমার ক্লাসের যে বন্ধু আমাকে ডেকে নিয়ে আইসক্রীম অফার করত তার কথাও আমি কখনো ভুলিনি। এক ঈদে আমার নতুন জামা ছিল না। পুরনো জামা ধুয়ে মা ইস্ত্রী করে দিয়েছিল। বাড়ির সবা্ই নতুন জামা পড়ে ঈদের নামাজ পড়তে গিয়েছে, আমি পুরনো জামা পড়েছি, তাও আমার মনে কষ্ট হয়নি। মা বলেছিল কষ্ট পেয়োনা। তোমার জন্য দোয়া করি, একদিন তুমি অনেক জামা পড়তে পারবে। আমার ছেলে মেয়েরা যে আমাকে এতো এতো জামা কাপড় গিফট দেয় অনেক প্যাকেট তিন বছরেও খোলা হয়নি আমার। যখন ঢাকা শহরে আমার থাকার জায়গা ছিল না, খাওয়ার পয়সা ছিল না তখন যারা আমার পাশে থেকেছিল আমি তাদের কথা কি করে ভুলি! প্রথম দিন যে বন্ধুর জামা পড়ে প্রেমিকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম তার কথা কি ভোলা যায়! বিয়ের সময় যে বন্ধুরা বিভিন্নভাবে হেল্প করেছিল তারাও থাকে হৃদয়ের গভীরে। 

এমনি অনেক কিছুই জড়িয়ে থাকে এক জীবনে। ব্যাক্তি জড়িয়ে থাকে, ঘটনা জড়িয়ে থাকে। সেখানে বঞ্চনা আর অপমান যেমন থাকে আনন্দও থাকে। মোটা দাগের সে সব অপমানের কথা মনে করে আমি কখনো নিজের জীবনকে বিষিয়ে তুলিনি। এসব সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এখনও করে। যারা আমাকে তাচ্ছিল্য করেছিল বা অবহেলা আমি সেইসব মানুষদের গিয়ে কখনো বলিনি তোমরা আমার সাথে এমন কেনো করেছিলে! কেনো কষ্ট দিয়েছিলে! বরং সেসব মানুষই যখন আমাকে ভালোবেসে কাছে টানতে চায় বা সম্মান দেখায় তখন আমি পেছনের সবকিছু ভুলে যাই। হ্যাঁ কিছু কষ্ট থাকে যা সহজে ভোলা যায় না। কিছু বঞ্চনা থাকে যা মনের গভীরে দাগ ফেলে দেয়। সবকিছু মনে রাখলে মানুষ যেমন বাঁচতে পারত না আবার সবকিছু ভুলেও যাওয়া যায় না। ভুলতে পারলে ভালো হতো। ভুল ত্রুটি নিয়ে এই জীবন।

কিছু মানুষ থাকে সারাজীবনই অন্যকে ছোট করে দেখে, তাচ্ছিল্য করে। এই ধরনের মানুষ আমি অনেক দেখেছি। সেসব মানুষদের কাছ থেকে দূরে থাকাই শ্রেয় মনে করেছি। কারো সাথে লড়াই করার চেয়ে এভোয়েড করা ভাল সমাধান মনে করি। অনেক কাছের মানুষরাও আমার সাথে এমন আচরণ করে, দূরের মানুষরাও করে। আমার প্রতি নির্বিকার থাকে। আমি সবসময় তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই। তাদের প্রতি আমি কোনো ক্ষোভ নিয়ে বসে নেই। আমি আমার নিজের মধ্যে একটা জগত তৈরি করে নিয়েছি। সেই  জগতে আমার বসবাস। বাঁচার জন্য আমাকে এমনটা করতে হয়েছে। এই একাকী জীবনে হঠাৎ হঠাৎ এক একজন আমার জীবনে দেবদূতের মতো আবির্ভূত হয়। আমার জগতটা আলোকিত হয়ে ওঠে। সাধারণ এই জীবনে অসাধারণ অনুভূতি দেয়। সকল গ্লানি মুছে যায়।

আবুল হাসানের কবিতার লাইন দিয়ে শেষ করছি…

হলুদ সন্ধ্যায় একা একা, হায় কার অভিশাপে  এত নির্জ্জনতা, বিমর্ষ সঙ্গতা এই আমার রক্তের, করছি কেবল পান, আমায় কি একবারও মনে পড়ে না সেই হলদে পাখির মুখোমুখি নীল ঘাসে ঢাকা, শাক ও সবজীর শ্যামলে বিছানো হাত আর পায়ের ক্রন্দন।

টরন্টো, ২০ অক্টোবর, ২০২০

লেখক, সাংবাদিক, কানাডা

আরও পড়ুন: শহুরে ফিটবাবু হতে চাইনি কখনো

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য