বৃদ্ধাশ্রমের জীবন কেমন হবে..!

জসিম মল্লিক

বৃদ্ধাশ্রমের জীবন কেমন হবে..!

বিষয়টা নিয়ে অনেক ভেবেছি। সেটা হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রম। সবকিছু আগাম চিন্তা করার একটা বাতিক আছে আমার। আগামীকাল বা পরশু কী ঘটতে পারে এরকম চিন্তাও আমি করি এবং প্রায় ক্ষেত্রেই আমার ধারণা সঠিক হয়। এইসব কারণে আমি অনেক অঘটন থেকে রেহাই পাই। মানুষের ক্ষেত্রেও আমি আগাম ধারণা করতে পারি। শতভাগ না হলেও অনেকটাই সত্য হয়। যত কাছের মানুষই হোক বা দূরের আমার মন আগাম বলে দেয় তার সাথে সম্পর্ক কতদূর পর্যন্ত টেনে নেওয়া যাবে।

সম্পর্ক বিষময় হয়ে উঠবে কিনা বা কোনো স্বার্থে আছে কিনা আমি বুঝতে পারি। আমার নিজের কোনো স্বার্থ আছে কিনা তাও আমি টের পাই। সম্পর্ককে আমি অনেক মূল্য দেই। সহজে কেনো সম্পর্ক ভেঙ্গে ফেলি না। কিছু ক্ষতি স্বীকার করে হলেও মানুষের প্রতি সহজে আস্থা নষ্ট হয় না বা মুখ ফিরিয়ে নেই না। আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। আমার জন্য কখনো কিছু করে নাই, কোনো অনুকম্পা দেখায় নাই তারাও যখন আমার স্মরণাপন্ন হয় আমি তাদের ফিরিয়ে দিতে পারি না বা পুরনো প্রসঙ্গ টেনে আনি না। অভিযোগ করতে আমার লজ্জা লাগে। কে কি ভাবে!


বৈষয়িক কিছু নিয়ে আমি কখনো এডভাঞ্চ চিন্তা করিনি অথচ করা উচিত। আচ্ছা যখন বৃদ্ধ হবো তখনকার জীবন কেমন হবে! আজকাল এসব আমাকে ভাবাচ্ছে। খুউব ভাবাচ্ছে। তখন কী অন্যের উপর নির্ভর করতে হবে! আর এখানেই আমার আপত্তি। আমি একদম অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে চাই না। আমার জীবনে অনেক লড়াই সংগ্রাম, না পাওয়ার বেদনা আছে। কিন্তু আমি কখনো নিজের জন্য কারো কাছে হাত পাতিনি। চেয়ে নেওয়ার মতো গ্লানিকর আর কিছু নেই। চেয়ে না পাওয়ার বেদনা আমি সহ্য করতে পারব না।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার অর্ধেক জীবন গ্রন্থে বলেছেন, প্রত্যাখ্যাত হওয়ার সম্ভবনা আছে এমন কারো কাছে কখনো চুম্বন প্রার্থনাও করিনি। আমিও তাই। আমি কারো কাছে কোনো প্রতিদান চাই না। কোনো কিছু পাওয়ার আশা নিয়ে আমি কিছু করি না। এমনকি আমি আমার সন্তানদের কাছেও কিছু চাই না। তারা কিছু করবে এই আশা নিয়ে আমি বসে নেই। আজকালকার অনেক মামা মায়েরাই এমনটা ভাবে। অনেকের সাথেই আমার কথা হয়। তারা পরনির্ভরশীল হতে চায় না।


তাহলে আমাদের এই জেনারেশন যখন বুড়ো হবে বা অথর্ব হবে তখন কেমন হবে তাদের জীবন! কোনো অলৌকিক কেউ এসে কি হাত ধরে বলবে কোনো চিন্তা নাই, আমি পাশে থাকব, সেবা করব, রাত জেগে বসে থাকব, পায়খানা প্রস্রাব পরিষ্কার করব! এমন ঘটনা পৃথিবীতে সম্ভব। তবে আমি সবসময় নিজের জন্য যেটা প্রার্থনা করি সেটা হচ্ছে আমি যেনো সুস্থ্য অবস্থায় ঘুমের মধ্যে বিদায় নিতে পারি। এরচেয়ে সুন্দর চাওয়া আর কিছু নেই। রোগে শোকে কষ্ট পাওয়া নেই, কাউকে কষ্ট দেওয়াও নেই। কিন্তু কোনো কিছু আমাদের হাতে নেই। আমার মা শেষ সময়টায় খুউব কষ্ট পেয়েছিলেন। মায়ের সেই কষ্টের পান্ডুর মুখ আমি ভুলতে পারি না। তখন ভাবতাম এতো কষ্ট পাওয়ার চেয়ে চলে যাওয়াই ভাল। অথচ আমি সবসময় মনে করতাম মা আমাকে ছেড়ে যাবেন না কোনো দিন। এমন হতে পারে না। মা যখন মৃত্যুর কথা বলতেন আমি রাগ করতাম। বলতাম, আপনি কখনো মরবেন না। আমি সেটা মেনে নেবো না। মা আমার কথা শুনে হাসতেন।


সেই থেকে আমার মধ্যে একটা ভয় ঢুকে আছে; শেষ জীবনটা কেমন হবে! খুউব কি একলা হয়ে যাব! খুউব কি কষ্টের হবে! ছেলে মেয়ে বা স্ত্রী কি বিরক্ত হবে! তাদের কি পাশে পাব! কে জানে! স্বামী বা স্ত্রীর চেয়ে আপন কেউ নাই এটা যেমন সত্যি তেমনি যাদের কোনো একজন নাই তাদের শেষ জীবনটা কেমন হবে! আমি বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার বন্ধু আলম এই বিষয়টা নিয়ে অনেকবার আমার সাথে কথা বলেছে। আজকেও আমাদের কথা হয়েছে। অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল বা ধনী শ্রেণির বাবা-মায়েরা বৃদ্ধ বয়সে বেশি একলা হয়ে যায়। উন্নত দেশগুলোতে অতি উন্নতমানের বৃদ্ধাশ্রম আছে। কানাডাতেও আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এমনটা গড়ে ওঠেনি। দরিদ্রদের জন্য অনেকেই বৃদ্ধাশ্রম করেছেন কিন্তু স্বচ্ছলদের জন্য এমন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না। এই কনসেপ্ট এখনও কেউ মেনে নেয়নি। ধনীরা তাদের প্যারেন্টসদের বৃদ্ধাশ্রমে থাকাকে অসম্মানজনক মনে করে। বরঞ্চ তাদের একলা, নিঃসঙ্গ এপার্টমেন্টে থাকাকে বেশি সম্মানের মনে করে। অনেকটা নির্বাসনে দেওয়ার মতো। সপ্তাহান্তে একদিন দেখতে যায়। অথচ বৃদ্ধাশ্রমে সবার সাথে মিলে মিশে থাকলে অনেক আনন্দ হয়। খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া, গল্প, আড্ডায় মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, নিঃসঙ্গতা থাকে না এবং সেবাও পাওয়া যায়। আশা করি এই ব্যপারটা নিয়ে বাংলাদেশের ধনী শ্রেণিরা ভাববেন।

টরন্টো ২৬ অক্টোবর ২০২০

লেখক, সাংবাদিক, কানাডা

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য