‘এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ’

সেলিম মাহমুদ

‘এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রদ্রোহীদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ’

জাতির পিতার প্রতি অবমাননাকারী রাষ্ট্রদ্রোহীদের আমি শুধু কঠোর শাস্তিই দাবি করছি না, রাষ্ট্রের মর্যাদা ও অস্তিত্বের স্বার্থেই এই নিকৃষ্ট নরপশুদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ 'Quarsive Power' অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রয়োগ করা উচিত। অপরাধের জন্য শাস্তি প্রয়োগ জুরিসপ্রুডেন্স তথা আইন বিজ্ঞানের একটি সনাতনী বিষয়। কিন্তু যখন কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠী স্বয়ং রাষ্ট্রের উপর আঘাত হানে, এটি তখন শুধু শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ন্যায় বিচারের সাধারণ নীতি এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না।

রাষ্ট্রকে তখন নিবর্তনমূলক, প্রতিরোধমূলক ও আক্রমণাত্মক হতে হয়। আধুনিক আইন বিজ্ঞানের মূলমন্ত্রই এটি। বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর সকল দেশের লিগ্যাল সিস্টেম অর্থাৎ আইনি ব্যবস্থায়ই এই বিধান রয়েছে।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক এবং বাঙালি জাতির পিতা। এই রাষ্ট্র তিনিই প্রতিষ্ঠা করেছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন সত্ত্বা। বঙ্গবন্ধুর উপর আঘাত মানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উপর আঘাত, বাংলাদেশের অস্তিত্বের উপর আঘাত। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বে যারা বিশ্বাসী, তারা কখনো এই ধরণের কাজ করতে পারে না। এই ধরনের কাজ সবচেয়ে ঘৃণ্যতম রাষ্ট্রদ্রোহিতা। রাষ্ট্রদ্রোহী এই দুস্কৃতিকারীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে রাষ্ট্র তার Quarsive power অর্থাৎ শক্তি প্রয়োগ করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের জনগণকে এই অপশক্তিকে মূলোৎপাটনের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, মূলত স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির কারণেই পঁচাত্তুরে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হয়েছিল। তারপর দীর্ঘ তিন দশক খুনি চক্র আর তাদের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার আর মিথ্যাচার করেছে। পনেরোই আগস্টের পর থেকে এই চক্র জাতির পিতার নাম মুছে ফেলার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। তারা সফল হয়নি, কারণ জাতি বেঁচে থাকলে জাতির পিতাও বেঁচে থাকেন, রাষ্ট্র বেঁচে থাকলে রাষ্ট্রের জনকও বেঁচে থাকেন। 

কুষ্টিয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, এই সমাজে জাতির পিতার হত্যাকারীরা এখনো বিচরণ করছে। এই হামলা পঁচাত্তুরের হামলারই এক নতুন সংস্করণ। এদের নির্মূল করতে হবে। ভাস্কর্য ইস্যুটা নিছক ধর্মীয়  অপব্যাখ্যার বিষয় ছিল না। আমরা অনেকেই এটিকে ধর্মান্ধতা বা ধর্মীয় কুপমণ্ডকতা হিসেবে দেখছি। আসলে এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অদম্য বাংলাদেশকে থামিয়ে দেওয়ার এক সুগভীর ষড়যন্ত্র এটি। জাতির পিতার নেতৃত্বে মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ থেকে বাংলাদেশকে বিচ্যুত করার এক ষড়যন্ত্র এটি। শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধাভোগী এই প্রজন্মের তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচিত্র দেখিয়ে দিলো যে, পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলিম প্রধান দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে।

আমরা দেখলাম, বহু আগে থেকেই এই সকল দেশ তাদের জাতীয় বীর এবং জাতীয়তাবাদী নেতাদের ভাস্কর্য নির্মাণ করে আসছে। আমার কাছে সেই সকল উদাহরণও গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, স্বাধীন বাংলাদেশের নিজস্ব সত্ত্বা রয়েছে। বাংলাদেশেই যুগ  যুগ ধরে ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে।  এই নিয়ে ধর্মান্ধ গোষ্ঠী কখনো কোনো প্রশ্ন তোলেনি। মুজিব বর্ষে এসে হঠাৎ তারা এটি আবিষ্কার করলো ? 

আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্রের সকল আচার অনুষ্ঠানাদি রাষ্ট্রীয় সংবিধান এবং তার আওতাধীন বিধি বিধানের মাধ্যমেই অনুষ্ঠিত হয়। এই রাষ্ট্র কী এবং তার মালিকানা কার - এই বিষয়গুলো আমাদের সংবিধানে পরিস্কারভাবে উল্লেখ রয়েছে।

অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসছেন খণ্ডিত ভাবে। জাতির পিতা আমাদের যে সংবিধান আর আইন ব্যবস্থা দিয়ে গেছেন, সেটি সহজাতভাবে ধর্মনিরপেক্ষ। সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। সংবিধানে আলাদাভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা যদি বলা নাও থাকতো, তাহলেও এই রাষ্ট্র সবসময়ই ধর্মনিরপেক্ষ। কারণ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সংবিধান অনুযায়ী আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো জনগনের সার্বভৌমত্বের  (Sovereignty of People) উপর প্রতিষ্ঠিত। এর আইনি ব্যবস্থা এবং কাঠামোও একই ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। আবার, পৃথিবীর কিছু কিছু দেশের আইনি ব্যবস্থা মুলত ধর্মভিত্তিক যাকে 'divine law' বলা হয়। এই ধরনের আইনি ব্যবস্থা ঈশ্বরের সার্বভৌমত্বের (Sovereignty of God) নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। আমাদের সংবিধান ও আইনি ব্যবস্থায় এই ধরনের ব্যবস্থার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু প্রণীত সংবিধানের প্রস্তাবনায় এবং পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কর্তৃক সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ধর্মনিরপেক্ষতার বিধান পুন:অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সংবিধান সহ অন্যান্য আইনে যা-ই থাকুক না কেন, রাষ্ট্র পরিচালনা সহ অন্যান্য সকল প্রাসংগিক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আইনের কোনো বিধান প্রযোজ্য হবে না।

কারণ  প্রস্তাবনা হচ্ছে সংবিধানের হৃদপিন্ড। প্রস্তাবনার সাথে সংবিধানের অন্যান্য বিধান এবং অপরাপর আইনের সাথে কোন বিরোধ দেখা দিলে প্রস্তাবনার বিধান প্রাধান্য পাবে।

আমাদের আইন ব্যবস্থা অনুযায়ী ধর্মীয় বিধান শুধুমাত্র personal law বা ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ সম্পত্তির উত্তরাধিকার, বিবাহ ও বিবাহ বিচ্ছেদ, ভরণপোষন, অভিভাবকত্ব ইত্যাদি ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান প্রযোজ্য। এর বাইরে দেশে প্রচলিত অন্যান্য কোনো  আইনে ধর্মীয় বিধান নেই। গুটি কয়েক স্বাধীনতা বিরোধী দুষ্কৃতিকারী আজকে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে সেটি পরিস্কার ভাবে রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক অপরাধ। তারা একদিকে ইসলামী আইনের অপব্যাখ্যা দিচ্ছে।

অন্যদিকে রাতের অন্ধকারে রাষ্ট্রের উপর আঘাত করছে। আসলে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার বিষয়টি একটি আবরণ মাত্র। প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সৃষ্ট রাষ্ট্র বাংলাদেশের উপর আঘাত করা যেটি তারা পঁচাত্তুরের আগস্ট থেকে শুরু করেছিল।

আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, এই হামলায় বিএনপি-জামাতের ষড়যন্ত্র আছে। বাংলাদেশের উপর এই আঘাত আমরা মেনে নেবো না। জাতি হিসেবে পঁচাত্তুর থেকে পিতৃহত্যার কলংকের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি আমরা। হাজার বছর পরও এই কলঙ্ক মোচন হবে কিনা আমার জানা নেই। এর মধ্যে পিতার জন্ম শতবার্ষিকীতে পিতার উপর এই আঘাতে আমাদের  হৃদয়ে নতুন করে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। এই রক্তক্ষরণ কিছুতেই থামছে না। কোনো কিছুতেই না। তবে সারা দেশে নতুন প্রজন্ম আজ যেভাবে জেগে উঠেছে, তাতে আমি আশাবাদী। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে, শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে আজ নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তির বদৌলতে সব তথ্য জানতে পারছে। পঁচাত্তুরের খুনি চক্র আর তাদের সুবিধাভোগী ও লিগেসি বহনকারী দুষ্টচক্রের ইতিহাস বিকৃতি আর মিথ্যাচারের দিন শেষ। এই বিষয়ে বাইবেলের একটি ভার্স অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

সেখানে বলা হচ্ছে, "ye shall know the truth and the truth shall make you free."  অর্থাৎ একদিন তুমি সব সত্য জানতে পারবে এবং সেই সত্যই তোমাকে মুক্তি দেবে"। আমার বিশ্বাস, ষড়যন্ত্রকারীদের বিষ দাঁত আমরা ভেঙে দেব ইনশাল্লাহ।

আরও পড়ুন: শেখ হাসিনার রাষ্ট্রে মাস্তানী চলে না

পৃথিবীর দেশে দেশে রাষ্ট্রবিরোধী গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় এই ধরণের ভাস্কর্যের উপর হামলা চালিয়েছিল। কারণ দুস্কৃতিকারী ও রাষ্ট্রবিরোধী চক্র পৃথিবীর অনেক দেশেই আছে। জাতীয় বীরদের ভাস্কর্যসহ সকল ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সম্পদ রক্ষার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৪ সালে Veterans Memorial Preservation Act প্রণীত হয়। ভারতে ১৯৭১ সালে অনুরূপ আইন
The Prevention of Insults to National Honour Act প্রণীত হয়। রাষ্ট্রবিরোধী এই রকম গোষ্ঠী গত বছর ভারতের উত্তর প্রদেশে ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী এবং ভারতের সংবিধান প্রণেতা ড۔ অম্বেদকরের ভাস্কর্যে রাতের অন্ধকারে হামলা চালানো হয়েছিল। আমাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী জাতির পিতার ভাস্কর্যের উপর হামলার মতো অপরাধ রাষ্ট্রদ্রোহিতা মূলক অপরাধ। এই ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে।

লেখক: সেলিম মাহমুদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার

লাভা মাহমুদা

প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার

গত বছর নারী দিবসে লেখাটি লিখেছিলাম। এই এক বছরে তাৎপর্যগত দিক থেকে সংস্কারের ভাবনার একটুও হেরফের হয়নি। বরং বলা যায় বেড়েছে। তাই সঙ্গত কারণে লেখাটি আবার দিলাম। শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েই যাব মৃত্যু অবধি। 

'প্রজন্ম হোক সমতার,
সকল নারীর অধিকার'

কথাগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগে, কেমন যেন নান্দনিকতার ছোঁয়া আছে। কিন্তু সমতাটা কোথায়? আবার সমতার অধিকার? তাও আবার সকল নারীর? 

নারীতে পুরুষে, মানুষে মানুষে সমতা হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কোথাও কি সমতা আছে? স্বামীর অনুমতি না নিয়ে বাইরে যাওয়া, বাচ্চাদের প্রতি যত্নশীল না হওয়া, স্বামীর সঙ্গে তর্ক করা, যৌন সম্পর্ক করতে অস্বীকৃতি জানানো, খাবার পুড়িয়ে ফেলার মতো অতি তুচ্ছ যে কোন অন্তত একটি কারণে পুরুষের কাছে মার খায় নারী এবং এই মার খাওয়াকেও যৌক্তিক মনে করে এ দেশের ২৫.৪ শতাংশ নারী।

যাদের বয়স ১৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে এবং যারা বিবাহিত । হিসেবটি সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। পুরুষেরা মার দিচ্ছে এবং নারীরা তাতে সমর্থন দিচ্ছে। কী ভয়াবহ অবস্থা !!

এই যে সমর্থন দেওয়া নারীরা আসলে কারা? নিশ্চিতভাবে এরা পুরুষতন্ত্রের প্রতিভূ। এদের সমর্থনের কারণে পুরুষেরা অনায়াসেই সেই অপকর্মটি করে পার পেয়ে যায়। এদেশের নারীদের মানসিকতার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে বোঝা যায়, নারীরা নিজেরাই তাদের অধিকার এবং মর্যাদার বিষয়ে সচেতন নয়। 

এমন মানসিকতা যে দেশের নারীদের, সে দেশে পুরুষ ওৎ পেতে থাকবেই। তাই জন্ম থেকে শুরু হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত নারীর আর মানুষ হওয়া হয় না। এখনও ভূমিষ্ট হওয়ার পর সন্তানটি ছেলে হলে পরিবারে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। কন্যা হলে এমনটি দেখা যায় না। তখন পরিবারের অনেকেই ব্যর্থ ফিকে হাসি দিয়ে বলে, " সমস্যা নাই, পরেরবার নিশ্চয়ই ছেলে হবে'। 


বিশ্ব নারী দিবস আজ

নারীর কর্মসংস্থান হলেও বেড়েছে নির্যাতন নিপীড়ন

অস্তিত্ব রক্ষায় এখনো সংগ্রামী নারী, তবে আজো ন্যয্যতা আর নিরাপত্তা বঞ্চিত

সাইবার অপরাধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারীরা


এই যে সংরক্ষিত অধিকার নিয়ে কন্যা সন্তানটি পৃথিবীর মুখ দেখলো, মৃত্যু অবধি তার আর পরিবর্তন ঘটলো না। দুঃখের বিষয়, নারী বুঝতেই পারে না বা তাকে বুঝতে দেওয়া হয় না, যে সে তীব্র বৈষম্যের শিকার। 

পিতার সম্পতিতে সে ভাইয়ের সমান হলো না, স্বামীর সংসারেও সে অপাংক্তেয়ই থেকে গেল। 'নারীর পূর্ণতা মার্তৃত্বে'..... জাতীয় বাক্যে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। সেই পূর্ণতাও আবার পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্যে নিহিত।

সাফল্যের চূড়ায় বসে থাকা অল্প কয়েকজন নারী গোটা সমাজের প্রতিনিধি নয়। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থানের সূচকই নারীর বাস্তবতা। আর গোটা কয় নারীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পেছনের কাহিনীটাও কম কষ্টসাধ্য নয়। নারীদের শিক্ষিত এবং সচেতন হওয়ার আনুপাতিক হার বাড়ার কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে নারীকে শৃঙ্খলিত করার ধরন ও প্রকৃতিও। 

নারী মাত্রই জানে প্রতিনিয়ত কতটা অবহেলা, অসম্মান আর আত্মগ্লানির ভেতর দিয়ে যেতে হয় । কত নারী বুক সমান হতাশা, দীর্ঘশ্বাস, অবহেলা, আক্ষেপ নিয়ে নির্ঘুম রাত পার করে, সে হিসেবটা শুধু নারীরাই জানে। যে দেশে, সমাজে, পরিবারে আজও মেয়েদের মানুষ ভাবতেই শেখেনি, তার ইচ্ছা–অনিচ্ছার মূল্যায়ন করতে জানে না, সেখানে মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাববার সময় কই ! 

এতো মানুষের ভিড়ে একাকিত্ব আর তীব্র দহনে নারীদের দীর্ঘশ্বাস শুধু চার দেয়ালের ভেতরেই ঘুরপাক খায়। যাইহোক, অধিকার কেউ দেবে না, আদায় করতে হবে। কিভাবে? যোগ্য হয়ে। কার কাছে যোগ্য হতে হবে? নিজের কাছে। 

তীব্র ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তার আগে নারীকে বুঝতে হবে পুরুষশাসিত সমাজ কিছু সস্তা অজুহাতে শৃঙ্খল পড়িয়েছে নারীকে, নিজের স্বার্থে। সে অধিকার বঞ্চিত, উপেক্ষিত, অবহেলিত।
 
সংস্কারের পলেস্তারা খসাতে হবে নারীকেই। শিরদাঁড়া সোজা করে তাকাতে হবে সামনের পানে। হার ভাঙা খাটুনি দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে প্রতিদিন যুদ্ধ তো করতেই হয়। এবার যুদ্ধটা হোক নিজের সাথে, জীবন জয়ের যুদ্ধ।

news24bd.tv/আয়শা

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

সারাবছর গালি খাওয়া নারীরা আজ কিছুটা ছাড় পাবেন

ইশরাত জাহান ঊর্মি

সারাবছর গালি খাওয়া নারীরা আজ কিছুটা ছাড় পাবেন

সারাবছর গালি খাওয়া, ঘৃণার শিকার হওয়া নারীবাদীরা আজ কিছুটা ছাড় পাবেন। “নারী হলো মায়ের জাত” বলা  ঘরে নির্ভরতার স্ত্রী টি না থাকলে পুরুষেরা কি কি সমস্যায় পড়তে পারতো তার আবেগপ্রবন কিছু কিছু বর্ণনা আসবে পুরুষদের দিক থেকে। ওদিকে পার্পল বা ল্যাভেন্ডার কালারে ছেয়ে যাওয়া কিছু লীন ইন ধরনের কর্পোরেট নারীবাদ আমরা দেখতে পাবো। অনেক আগে গোধুলী আপার তোলা একটা ছবির কথা আমার মনে পড়বে।

পেছনে লাক্স এর নারী দিবস পালনের বিরাট বিলবোর্ড এর সামনে গোলাপের বালতি মাথায় ফুল বিক্রেতা নারীর গর্বিত দাঁড়িয়ে থাকা। ছবিটা বার্তা দিচ্ছিল, "সংগ্রাম নেবেন না সৌন্দর্য্য?" বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হবে। সারাবছর মেয়েদের ঊনচোখে দেখা কিছু মিডিয়া হাউজ “আজ হাউজ চলবে নারীর নেতৃত্বে” মার্কা ফাইজলামী করবে। তবু তো উদযাপন! 

জানিনা বায়োলজিকালি নারী না হলে নারীর অধ:স্থনতার বেদনা বুঝতাম কি না। জীবনের মোটামুটি বড় একটা পথ হেঁটে এসে, নারীবাদকে এক ভিন্নতর চেহারায় চাক্ষুষ  করার অভিজ্ঞতা হলো। প্রচুর শাড়ি পরা পুরুষ দেখলাম। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ দেখলাম, নারীবাদকে ব্যবহৃত হতে দেখলাম। রাজনীতি নিয়ে উচ্চকিত লিজেন্ডদের দেখলাম নারীর অধিকার নিয়ে টুঁ শব্দটিও না করতে। 

গতবছর একটা বুক ক্লাব এর আমন্ত্রণে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে লেখক হয়ে ওঠার গল্প বলতে বলতে পাঠকের প্রশ্নের উত্তর দেয়া। একজন অল্পবয়সী তরুণ, নাম জুয়েল-খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন-পুরুষ নির্যাতন কি পরিমাণ হয় আপনার ধারনা আছে? বেকার আমাকে কি একটা চাকরীজীবী মেয়ে বিয়ে করে দায়িত্ব নেবে? 

আমাকে কিন্তু ঠিকই বউ পালতে হবে। জানেন আমার এক বন্ধু রাতে ঘরে থাকতে পারে না বউ এর নির্যাতনে? বউ ঘ্যানঘ্যান করে, সহ্য হয় না ওর। আরেকজন বললেন, পুরুষেরাও বউ এর হাতে মার খায়, একটা বউ মার খেলে যেমন সহজে বলতে পারে, একটা পুরুষ কিন্তু মার খেলে তা বলতে পারে না…”

অনেকগুলো পয়েন্ট। জানিনা অন্যরা কি বলবেন, আমি কিন্তু সত্যিই মনে করি, এবার কাজ করা দরকার পুরুষের উপরে। নারীর উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন অনেক হয়েছে, এইবার নজর দেয়া উচিত পুরুষের বেদনার দিকে। এটা খুবই অপমানজনক যে একজন পুরুষকে সফল হবার মাপকাঠি হিসেবে সবসময় প্রমান করতে হয় যে সে অর্থনৈতিকভাবে সফল। 


বিশ্ব নারী দিবস আজ

নারীর কর্মসংস্থান হলেও বেড়েছে নির্যাতন নিপীড়ন

অস্তিত্ব রক্ষায় এখনো সংগ্রামী নারী, তবে আজো ন্যয্যতা আর নিরাপত্তা বঞ্চিত

সাইবার অপরাধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারীরা


তাকে ব্রেড আর্নার হতেই হয়। নো অল্টারনেটিভ। এই ভার যতদিন না নামছে পুরুষের কাঁধ থেকে পারিবারিক নির্যাতন কমবে না বোধহয়। যে আপনাকে খাওয়াবে পরাবে সে নির্যাতনও করবে এই সেদিনও এক জরিপে এই ভয়ংকর ভাবনা উঠে আসছে। 

কাজ করা দরকার শাড়ি বা মেয়েদের পোশাক পরা শরীরে নারী কিন্তু মননে ব্যাটাগুলো নিয়েও। যারা শুধুই দমন করতে চান, দমনে খোঁজেন নিজের স্বাধীনতা। 

আমার প্রতিদিনের যুদ্ধ, আমার প্রতিদিনের বেদনা আমাকে একটা নারী দিবসের সামনে আর দাঁড়াতে দ্যায় না। গণ পরিবহনে ৯৪ ভাগ নারী হয়রানী হন, পরিবারে ৮৪ ভাগ নারী নির্যাতনের শিকার হন, ধর্ষনের হিসাব ভীতিকর, ধর্ষণের মামলার বিচার হয় না ৯৩ ভাগ- সারাদেশ তোলপাড় করা পাঁচ বছরের শিশু পূজার ধর্ষনের বিচার হয়নি।

তার শরীর থেকেও আসে পেশাবের তীব্র গন্ধ, নারী বান্ধব প্রশাসন নেই, কর্মক্ষেত্রে হয়রানীর শিকার অসংখ্য নারী, স্কুলে যাবার পথে নিজেকে হিজাবে বোরখায় মুড়িয়েও রক্ষা পাচ্ছেন না ৯০ ভাগ ছাত্রী, যৌন হয়রানীর শিকার হচ্ছেন, ওয়াজ মাহফিল আর জুম্মা নামাজের খুতবায় প্রায় শতভাগ জুড়ে নারী অবমাননা-এগুলো কোনটাই বায়বীয় হিসাব নয়, সব পরিসংখ্যান, রিসার্চ। আমার কাছে প্রতিটা দিনই নারী দিবসের কথাগুলো বলার মতো জরুরী।

আসেন সাইবার বুলিং এ। অন্যপক্ষের প্রতিটা ভিডিও লিংকের নিচে অতিথিদের সহ আমার কপালে সবচেয়ে কমন যে মন্তব্যটি জোটে, তা হলো- বেশ্যা। অতিথি সে রোকেয়া কবীরের মতো বর্ষীয়ান কেউ হোন, জিনাত আরা হকের মতো প্রায় মাঝবয়সী অথবা তরুনী কোনও নারী- যেই হোন- গালি বাঁধা। আমি এইসব মনে রাখি। কোন সমাজটাকে আমরা নারীর বাসযোগ্য করতে চাইছি, কোন অন্ধের দেশে বেঁচতেছি আয়না- তা আমি মনে রাখি। 

ভয়ংকর এক নারী বিদ্বেষী সমাজে বাস করে আমরা যেভাবে সিমপ্যাথাইজড হই পুরুষের প্রতি, পুরুষের দায়িত্বের বোঝার প্রতি, পুরুষ কি এ্যামপ্যাথাইজড হয় সেরকমই? না কি নারীকে ঊন চোখে দেখে দয়া করে মাত্র? ধর্ম কেন চিরকাল পুরুষের পক্ষে থাকে? রাষ্ট্র কেন কেবলই সংবিধানে সকল নারীই সমান বলে খালাস পায়?

কেন আইন আর বিচার নারীর পক্ষে থাকে না? বাপের সম্পত্তি মেয়ে সন্তান কেন পায় না নিয়ম অনুযায়ী? সন্তানের কাস্টডি কেন হয় বাবার? এইসব অতি পুরোন, ক্লিশে অথচ অমিমাংসিত প্রশ্নের জবাব এখন রাষ্ট্র, সমাজ, সমাজপতি, আইনপ্রণেতাদের কলজের ভেতর থেকে টেনে বের করার সময় আসছে। 

লং ওয়ে টু গো। এখনই যেন ক্লান্ত হোসনে আমার মন! সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা। প্রতিবছর পাশে থাকা পুরুষদেরও আমি নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু ক্রমশ তারা বিরল প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছেন।  তাদের আর দেখা যায় না বিশেষ। তবু। তবু শুভেচ্ছা।

ইশরাত জাহান ঊর্মি, সাংবাদিক
news24bd.tv/আয়শা

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

সাত মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে কারণে

সোহেল সানি

সাত মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে কারণে

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ যখন জাতিসংঘ কর্তৃক "বিশ্বের ভাষণ" বলে সুমহান মর্যাদার অভিষিক্ত। কিন্তু সেই ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল কিভাবে, ঘরে-বাইরে কি কি ঘটেছিল এবং যেসব বিষয় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তুত করে তুলেছিল, সেসবের অনেক অজানা-অপ্রকাশিত ঘটনাই চমকপ্রদ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে সেসব খন্ড খন্ড চিত্রের দেখা না মিললেও তা সামগ্রিক ইতিহাসেরই উপাদান। সেসব তথ্য-উপাত্ত ইতিহাসকে সমৃদ্ধি করতে পারে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস রোধে অবিস্ফোরিত অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পারে। পহেলা মার্চ থেকে টানা সপ্তাহব্যাপী রাজনীতির অন্দরমহলে ঘটে যাওয়া সেসবের ঘটনার বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করছি।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আসা এ ঘোষণাকে জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ্যদলের নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাগত জানালেও সংখ্যালঘু দলের নেতা পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো বেঁকে বসেন। তিনি পেশোয়ারে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, "মুজিব ৬ দফার পক্ষে আপোষ না করলে তার দল অধিবেশনে যোগদান করবে না।"

১৮ ফেব্রুয়ারি বললেন, "ঢাকা পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের জন্য কসাইখানা হবে।" প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহবান জানান অধিবেশন স্থগিত করতে। এসময় প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে গোপনে সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় পাখী শিকারে গেছেন মর্মে খবর রটে যায়। অধিবেশনের দুদিন আগে পহেলা মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন। ওই মূহুর্তে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীতে শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরিতে সহকর্মীদের সঙ্গে সকাল নয়টা থেকে বৈঠক করছিলেন। সেই নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও ডঃ কামাল হোসেন। 

পহেলা মার্চ দুপুর বারোটার দিকে তাঁরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিলের খবরটি পান। প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণার বিরুদ্ধে হাজার হাজার ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে পড়েন। বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীর সামনে ছাত্রজনতার সম্মুখে হাজির হয়ে বলেন, অধিবেশন বাতিল করার ঘোষণা গভীর ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি। বাঙালিরা এই ষড়যন্ত্রকে জীবন দিয়ে হলেও প্রতিহত করবে। ২ মার্চ ঢাকায়, ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে ছাত্র-জনতাকে আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।

৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এডমিরাল আহসানকে পদচ্যুত করে তার স্থলে জেনারেল ইয়াকুব খানকে ভারপ্রাপ্ত করেন। ৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত একনাগাড়ে দেশব্যাপী স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। ৪ মার্চ ইয়াহিয়া খান জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর করেন। ৫ মার্চ টিক্কা খান ঢাকায় পৌঁছেন। ৬ মার্চ শপথ নেয়ার কথা থাকলেও জনরোষের মুখে  হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিক তাকে শপথ পড়াতে অস্বীকৃতি জানান। ৬ মার্চ বিকেল পাঁচটায় প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন এমন বার্তা ঘোষণা করা হয় ৫ মার্চ।

স্বভাবতই গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি তখন ভাষণের দিকে। বঙ্গবন্ধু ওদিন তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এটা ৫ মার্চের কথা। হঠাৎ ঢাকাস্থ পূর্বাঞ্চলীয়  সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াকুবের ফোন আসে। বঙ্গবন্ধুর জামাতা ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া ফোন রিসিভ করলে ওপাশ থেকে বলা হয় শেখ সাহেবের সঙ্গে মাননীয়  প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন। বঙ্গবন্ধু "কিছু শুনতে পাচ্ছি না, কিছু শুনতে পাচ্ছি না" বলে প্রেসিডেন্টকে বলেন। একটু পরে জেনারেল রাও ফরমান আলীর ফোন।

বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টের কন্ঠ শুনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি অবহিতপূর্বক তদন্ত কমিশন গঠন ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের কথা বলেন। ৬ মার্চ বিকেলে প্রেসিডেন্টের ভাষণ শোনার জন্য বঙ্গবন্ধু একটি ট্রানজিস্টার নিয়ে তাঁর শয়নকক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে বলেন ভাষণটি টেপ করে রাখার জন্য। প্রেসিডেন্ট বলেন, আওয়ামী লীগের একগুয়েমির জন্য ৩ মার্চের অধিবেশন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। ১০ মার্চ ঢাকায় গোলটেবিল সম্মেলন ডেকে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠানের কথাও বলেন তিনি।

ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের কথাও ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ হওয়ার পর দরজা খুলে ব্যক্তিগত সহকারি মোহাম্মদ হানিফকে শীর্ষ ছয় নেতাকে ডেকে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ঘন্টাব্যাপী আলোচনা শেষে কতিপয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর পর পরই বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি হন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণের জবাব দিতে ইংরেজিতে একটি ইশতেহার তৈরি করেন তাজউদ্দীন আহমদ ও ডঃ কামাল হোসেন। যাতে বলা হয় "শহীদের রক্তে রঞ্জিত রাস্তার রক্ত এখনো শুকোয়নি। পবিত্র রক্তের ওপর পা রেখে ১০ মার্চ গোল টেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগ যোগদান করতে পারেনা।" ৭ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। 

বঙ্গবন্ধু প্রথমেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক ও ডঃ কামালের সঙ্গে লাইব্রেরি রুমে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এরপর বৈঠকে মিলিত হন যুব-ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে। এরা হলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন। দুপুরে এসব বৈঠকে বঙ্গবন্ধুকে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার পক্ষে মত দেন। বঙ্গবন্ধু এরপর সমবেত সকলের উদ্দেশ্যে শুধু বলেন, আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। ছাত্রজনতার দাবি অনুযায়ী চার দফা দাবির প্রতি সমর্থনের কথাও বলেন বঙ্গবন্ধু।

দুপুরে আহারের জন্য নেতারা নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান। বঙ্গবন্ধু আহার শেষে বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় ডঃ কামাল প্রস্তাবিত ঘোষণাপত্রের খসড়াটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন। একান্ত সহকারি মোহাম্মদ হানিফকে টাইপ করতে দিয়ে ডঃ কামাল তাঁর বাসায় চলে যান। বিকেল  তিনটায় আসেন খন্দকার মোশতাক। পরক্ষণেই ডঃ কামাল।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার আগে চারদফা ঘোষণাপত্রটি জনসভাস্থলে বিতরণ করার নির্দেশ দেন ছাত্র নেতাদের। দফাগুলো হলো এক, সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া, দুই যাদেরকে হত্যা করা হয় তা তদন্ত করতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন, তিন, সামরিক আইন প্রত্যাহার ও চার, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

এরপর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দান অভিমুখে একটা ট্রাকে করে রওয়ানা হন। ওই ট্রাকে ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফা, শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ।

পেছনের ট্রাকে ছিলেন আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, মোস্তফা মোহসীন মন্টু, কামরুল আলম খান খসরু ও মহিউদ্দিন আহমেদ। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছার আগেই সেখানে হাজির হয়ে যান বঙ্গবন্ধুর জামাতা এম এ ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, শেখ জেলি (শেখ হাসিনার খালাতো বোন) ও এটিএম সৈয়দ হোসেনের বড় মেয়ে শেলি।

সেদিনের রেসকোর্স ময়দানে নৌকা আকৃতির সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান শিশুপার্কের দক্ষিণ -পূর্ব অংশে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচারিত হবে রেডিও বারবার এমন ঘোষণা হচ্ছিল। শেখ হাসিনা এ কারণে একটি রেডিও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে রেডিও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী ভাষণে "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম.. উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখো লাখো জনতার জনসমুদ্র থেকে জয় বাংলা শ্লোগান ভেসে আসে। বঙ্গবন্ধুও প্রত্যুত্তরে জয়বাংলা বললে এর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে আকাশবাতাসকে অনুরণিত করে তোলে।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দান থেকে বাড়িতে ফেরেন। রাত আটটার দিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ পাঠক ইকবাল বাহার চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান রেডিও ঢাকাস্থ কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। তারা জানান, সেনাবাহিনীর হাইকমান্ডের নির্দেশে তারা ভাষণ সম্প্রচার করতে পারেনি। এখন ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করার কথা বলেন তারা। ফলে সকল অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ৮ মার্চ সকাল আটটায় হঠাৎ পাকিস্তান রেডিও ঘোষণা করে যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ নয়টায় প্রচার করা হবে।

বঙ্গবন্ধু রাতে সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ছেলে-মেয়ে শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেলের উপস্থিতিতে বলেন, " আমার যা বলার তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি -সরকার এখন আমাকে যেকোনো মূহুর্তে হয় গ্রেফতার নয়তো হত্যা করবে। আজ থেকে প্রতিদিন আমার সঙ্গে খাবে। ২৪ মার্চ পর্যন্ত সবাই এক সঙ্গে খেয়েছেন। কিন্তু ২৫ মার্চ ব্যতিক্রম ঘটে। বঙ্গবন্ধু রাত ১১টা পর্যন্ত বাড়ির নীচতলায় আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করেন। ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। কার্যত বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন:


চাকরি দেবে এসিআই লিমিটেড

ইরানের রেলপথ যাবে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : ইন্দিরা থেকে শেখ হাসিনা

নামাজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত সমূহ


৯ মার্চ পল্টন ময়দানে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, "প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে বলি, অনেক হয়েছে আর নয়। তিক্ততা বাড়াইয়া আর লাভ নাই। লা কুম দ্বিনুকুম ওয়ালইয়া দ্বিন(তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার) - এর নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও। মুজিবের নির্দেশমত আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে কোন কিছু করা না হইলে আমি শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত হাত মিলাইয়া ১৯৫২ সালের ন্যায় তুমুল আন্দোলন শুরু করিব। খামাকা কেহ মুজিবকে অবিশ্বাস করিবেন না, মুজিবকে আমি ভালো করিয়া চিনি। ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন। ১৬ ও ১৭ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাউসে (বর্তমান সুগন্ধা)  ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক হলো। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রজনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। কারফিউ জারি করা হয়। ২০ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ও ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতাদের মধ্যে পৃথক বৈঠক হয়। ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের ৩৫ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য অধিবেশনে যোগদান করতে ঢাকায় এসে পৌঁছেন।

বঙ্গবন্ধু বাড়ি আক্রমণের আশঙ্কা করে ডঃ ওয়াজেদকে বাসা নিতে বলেন। সাত মসজিদ রোডের ওপর ধানমন্ডির (পুরাতন) ১৫ নম্বর রোডস্থ (নতুন ৮/এ-১৭৭ নম্বর) নীচতলাটি মাসিক ৯ শত টাকায় ভাড়া নেয়া হয়। ২১ মার্চ জুলফিকার আলি ভুট্টো ঢাকায় এসে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ওঠেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তিনি গোপন শলাপরামর্শ করেন। ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেন, " লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এদিন মুজিব-ভুট্টো বৈঠক হয়। একই দিন ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো বৈঠক হলে আবারও সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বলা হয় ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বিস্তৃত আলোচনার জন্য বাতিল করা হলো।

বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ থেকে অবরোধ আন্দোলন শুরু করার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানান। ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় "আমার সোনার বাংলা" গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বাজিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছিলেন ছাত্রলীগের প্রধান নেতা। গাঢ় সবুজ কাপড়ের মাঝখানে লাল গোলাকার বলয়ের ভেতর সোনালী রং-এ অঙ্কিত বাংলাদেশের মানচিত্রসহ তৈরি করা পতাকাটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন তাঁর বাড়িতে এসে। সামরিক কায়দায় একটি বিশেষ দল বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানায়। ওদিন সচিবালয়, হাইকোর্ট ভবনসহ সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। উল্লেখ্য, ছাত্রলীগের পক্ষে ২ মার্চ ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব প্রথম পতাকাটি উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করেন।

২৫ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু নিজ বাড়িতে  নেতাদের সঙ্গে কাটান। সবার চোখে মুখে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে চলে যেতেন বলেন। বিকেল তিনটায় শেখ মনি বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ছিলেন। রাত আটটার আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। রাত ১১ টার  দিকে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে সিরাজুল আলম খান, আসম আব্দুর রব ও শাজাহান সিরাজের সঙ্গে কথা বলেন।

লন্ডন আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়া চৌধুরীর ভাই পরিচয় দিয়ে ঝন্টু নামের এক ব্যক্তি মহিউদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি হন। সে জানায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। আপনাকে হত্যা করার জন্য তারা আসছে। বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনাকে  বলে তোমরা চলে যাও।আমার অন্যত্র  চলে যাওয়ার উপায় নেই। তারা মারতে চাইলে আমাকে এ বাড়িতেই মরতে হবে । কামাল চলে গেছে। জামাল ওর মাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। মুখে একথা শুনে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। একদিকে গণহত্যার তান্ডবলীলা, আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের ইতিহাস। গ্রেফতারের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক বার্তা আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রধানমন্ত্রী ঠিকই দক্ষ মানুষ চিনেছিলেন

আশরাফুল আলম খোকন

প্রধানমন্ত্রী ঠিকই দক্ষ মানুষ চিনেছিলেন

এইচটি ইমাম

লিখতে একটু সময় লাগে। দেখে বুঝে লিখতে হয়। কাজের চাপে সময় করে উঠতে পারিনি। দায়িত্ব,কর্তব্য পালন করার জন্য শুধু লিখে দিলেই হয় না। আর বিষয় যদি হোন হোসেন তৌফিক ঈমাম অর্থাৎ এইচটি ইমাম স্যার, তাহলে অবশ্যই লেখাটা দায়সারা গোছের হওয়া উচিত না।

২০১৩ সালের ১৮ই আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যোগদান করার আগে পর্যন্ত স্যার এর নামে ভালো খুব কম শুনেছি। আরও ছিলাম দেশের বাইরে,বিপক্ষেই বেশি শুনেছি। বলতে সংকোচ নেই,কিছু সময় হয়তো আমিও বিপক্ষবাদীদের কথায় হুজুগে তাল মিলিয়েছি। যার জন্য এখনো নিজে নিজেই লজ্জা পাই। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যোগদান করার পরও ওনার সম্পর্কে কিছুটা নেতিবাচক মানসিকতা ছিল আমার। সেই সবই তাঁর সম্পর্কে না জানা না বুঝা’র ফল।

স্যার এর সাথে স্মৃতিচারণ করতে গেলে শেষ হবে না। সরাসরি আসল কথায় আসি। ওনার নির্দেশনায় অনেক কাজ করেছি। অনেক কাজে ওনার পরামর্শ নিয়েছি। অনেক কাজে আটকে গিয়ে তাঁর উপদেশ নিয়ে কঠিন কাজ’টা সহজেই করেছি।

আপাদমস্তক একজন কাজের মানুষ বলতে যা বুঝায় তিনি ছিলেন তাই। যেকোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এই ৮০/৮২ বছর বয়সেও তিনি ছিলেন অনেক তরুনের চেয়ে আধুনিক চিন্তাভাবনার মানুষ। বিশেষ করে দল ও সরকারের প্রচারের বিষয়ে তাঁর আইডিয়া ছিল অন্যমাত্রার। আর যেকোনো কাজ বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।


মশা মারতে গিয়ে পুড়ে গেলেন মা ও দুই মেয়ে

ভাসানচর পুরোপুরি নিরাপদ ও বাসযোগ্য এক দ্বীপ

মশা মারতে গিয়ে পুড়ে গেলেন মা ও দুই মেয়ে

আস্থা ভোটে জিতলেন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান

চিকিৎসাপত্র ছাড়াই ওষুধ কিনছেন ক্রেতারা, রোগী দেখছেন ফার্মেসি মালিকরা


তাঁর কাজ করার যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখেই বুঝেছি, “যে গাছে ফল হয় মানুষজন সেই গাছেই ঢিল ছোড়ে। ফলহীন গাছে কেউ ঢিল ছোড়েনা।” মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিকই দক্ষ মানুষ চিনেছিলেন। আমরা অনেকেই কান দিলেও, বিএনপি জামাত ছাগু গোষ্ঠীর অপপ্রচারে কান দেননি। এই বিএনপি জামাতও জানে সরকারের কাকে নিয়ে অপপ্রচার করতে হবে। মৃত্যুর পরও কিছু অমানুষ অপপ্রচার চালিয়েছে।

ওপারে ভালো থাকবেন স্যার...

news24bd.tv নাজিম

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রকৃতি যা শেখায় মানুষ তা পারে না

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

প্রকৃতি যা শেখায় মানুষ তা পারে না

পৃথিবীতে কিছু কিছু বিষয় থাকে যেখান থেকে মানুষ অনেক কিছু শিখতে পারে। মানুষ যদি একটি বিষয় হয়। তবে অনেকসময় মানুষের থেকেও অনেক বেশি সে বিষয়গুলো মানুষকে শেখাতে পারে। একটা উদ্ভিদ, হয়তো অনেকের কাছে মূল্যহীন। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বস যদি না বলতেন উদ্ভিদের জীবন আছে। কিংবা উদ্ভিদের যে জীবন আছে তা প্রমান করে না দেখাতেন, তবে হয়তো সবাই উদ্ভিদকে জড় পদার্থ বলেই উপহাস করত। উদ্ভিদের ভাগ্য ভালো, বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসের মতো উদার চিন্তার মানুষ উদ্ভিদের ভিতরটাকে প্রাণ দিয়ে দেখার দুঃসাহস দেখিয়েছেন। তাই আজ উদ্ভিদ জড়ের জড়তার প্রাচীর ভেঙে জীবের মর্যাদা ও অধিকার অর্জন করেছে। উদ্ভিদকে কেউ ডাকে বৃক্ষ বলে, কেউ ডাকে গাছ বলে কিংবা অন্যকিছু। সবগুলোই সমার্থক ও একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। একটি বৃক্ষ বা গাছের ভিত্তি হলো তার মূল বা শেকড়। শেকড় কেবল মাত্র গাছটিকে মাটির উপর শক্ত করে শুধু দাড় করিয়েই রাখে না, সঠিক খাদ্য দ্রব্য, খনিজ সরবরাহ করে তার পরিপূর্ণ বিকাশের সুযোগ করে দেয়। উদ্ভিদ নিজের শেকড়কে চিনে ও শেকড়কে আপন সত্তার অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ বলে মেনে নেয় হয়তোবা আমরা মানুষ কি কখনো আমাদের শেকড়কে খুঁজি।

সে শেকড়কে খোঁজার মতো মন কি আমাদের আছে। হয়তো নেই। তাই হয়তো মানুষের মানবিক দেওয়ালগুলোতে অদৃশ্য ফাটল ধরেছে। মানবিক মূল্যবোধে পচনটা মানুষ থেকে মানুষে স্থানান্তরিত হয়েছে। ব্যক্তিত্ব ধসে পড়েছে বাস্তবতার চিলেকোঠায়। ফলটা যা হবার তাই হয়েছে। মানুষ এখন মন্দের দাসত্ব স্বীকার করেছে। সব অন্ধকার জেঁকে বসেছে মানুষের ঘাড়ের ওপর। সে অন্ধকার মানুষকে তার হাতের অদৃশ্য সুতোর পুতুল বানিয়ে খেলছে নিজের মতো করে। মানুষ আছে তবে সে মানুষের মৌলিক সত্তার অস্তিত্ব নেই। সব যেন রঙ্গমঞ্চ, মানুষ যা না তা হয়ে রীতিমতো অভিনেতা হয়ে উঠছে। সুবিধাবাদী হয়ে উঠেছে। মুখটা এখন আর মানুষের নেই, মুখটা হয়ে গেছে মুখোশের। যা কিছু ভালো তাতেই তা মানুষের শেকড় থাকে। শেকড়ের শক্তি থাকে। সেটা এখন দ্বীপান্তরে নির্বাসিত হবার মতো। উদ্ভিদ মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করে। মানুষের মধ্যে সৃষ্টির নতুন চিন্তা তৈরি করে। 

একটা উদ্ভিদ মানুষের মধ্যে সৃষ্টির নতুন নতুন চিন্তা তৈরি করে দিলেও মানুষ মানুষের মধ্যে তা তৈরি করতে পারছে না। একটা উদ্ভিদ দিনে দিনে শিক্ষক হয়ে উঠেছে যা মানুষ পারেনি। রসায়ন, পদার্থ বিদ্যা , চিকিৎসা বিজ্ঞান, প্রকৌশল, মেটেরিয়াল সাইন্স, এনার্জি জেনারেশন সহ বিজ্ঞানের সব শাখাতেই উদ্ভিদ মানুষের মধ্যে নতুন জ্ঞান তৈরি করে গবেষণার ভাবনাকে এগিয়ে নিচ্ছে। সাহিত্য, দর্শন, চিত্রকলা, মনস্তত্ব, অর্থনীতি, সমাজতত্ত্ব  সহ জীবনের সকল মহতী চিন্তায় উদ্ভিদ মানুষের মনকে এমনভাবে আলোড়িত করে চলেছে যা বিস্ময়কর ও অভূতপূর্ব। উদ্ভিদ মানুষের খাদ্যের যোগান দিয়ে চলেছে নিঃস্বার্থভাবে। আর উল্টোদিকে মানুষের মধ্যে কাজ করছে স্বার্থপরতা, লোভ, প্রতিহিংসা। একটা উদ্ভিদ মানুষের কাছে হতে পারে নগন্য কিন্তু মানুষকে পরোপকারের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে উদারভাবে। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ ত্যাগ করে নিঃস্বার্থ হবার প্রেরণা জুগিয়ে যাচ্ছে অপার দৃষ্টিভঙ্গিতে। একটা নদী সমুদ্রে ভেসে গিয়ে মহাসমুদ্রের জন্ম দিচ্ছে। নদী প্রাণের টানে যেটা করতে পারছে মানুষ তো সেটা পারছে না। মানুষ মানুষ হয়ে জন্ম নিলেই তো মানুষ হয়ে উঠেনা। মানুষের মধ্যে মনুষত্ব থাকলেই মানুষ হয়। 

মানুষের ভিতরে আগাছা জন্মেছে, পরগাছা জন্মেছে। মানুষ পরজীবী প্রাণীও হয়েছে। কিন্তু মানুষের ভিতরের মানুষটা কেন যেন মানুষ হয়ে উঠছে না। মানুষ কি প্রকৃতি নাকি প্রকৃতি মানুষ। সব যেন ওলোটপালোট। যুক্তি তর্কের বাইরে। তারপরও একটা সহজ সমীকরণ মানুষ আর প্রকৃতির কোরিলেশন তৈরি করে মানুষের ভিতরের অদেখা মানুষটাকে টেনে বের করে আনুক মাটির পৃথিবীতে। কারণ মাটিও যে প্রকৃতির অংশ হয়ে পদচিহ্ন রেখে দেয় মাটিতে। যে মাটিতে মানুষের  বিকাশ সে মাটিতেই মানুষের একটু একটু করে মিলিয়ে যাওয়া। হয়তো সময় সেখানে চোখ খোলা রেখেছে আরেক নতুন সময় দেখবে বলে। সময় হয়তো প্রকৃতি কিংবা প্রকৃতি সময়। যেখানে কোনো একটা অনিশ্চিত জায়গায় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে একটা অদৃশ্য রেলগাড়ির অপেক্ষায়। মানুষের চোখের জল আর প্রকৃতির জল হয়তো সেখানটায় একটা যোগসূত্র গড়ে রেলগাড়ির সহযাত্রী হবে। কোনো একদিন। হঠাৎ বৃষ্টির জলের মতো করে। হয়তো অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখবে একে অন্যকে। কিন্তু সেখানে দুটো সত্তা একক সত্তা হয়ে খুঁজে পাবেনা কাউকেই। হয়তো একটা জাদুর আয়না খুঁজবে সবাই। তখন হয়তো মানুষের ভিতরের প্রকৃতি ঢুকে যাবে অবলীলায়। প্রকৃতির বিচারটা খুব কঠিন। কিন্তু প্রকৃতি তো উদার। সে উদারতার বন্যায় মানুষের ভিতরের সব অন্ধকার ভেসে গিয়ে আলো হয়ে জন্ম নিবে আবার।

প্রকৃতির এমন অসংখ্য উপাদান আছে যেখান থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। আজকের এই মানবিক সংকটের সময়ে সারা পৃথিবীতে প্রকৃতি শিক্ষক হয়ে উঠেছে। এমনটা মানুষ আগে কখনো ভাবেনি। কিন্তু এখন ভাবতে হচ্ছে। হয়তো এমন করে ভাবতে ভাবতেই একদিন সমাধান সূত্রটা প্রকৃতির মাথা থেকে নিঃসৃত হয়ে মানুষের মাথা থেকে বেরিয়ে আসবে বিজ্ঞানের মৌলিক আবিষ্কারের রং মেখে। হয়তো এটা স্বপ্ন আর স্বপ্নই তো একদিন সত্য হয়। যেমন সত্য হয় প্রকৃতির আদরে বড় হয়ে উঠা মূর্খ ও দরিদ্র মানুষটা। যার বড় বড় মানুষ শিক্ষক ছিল না। কিন্তু প্রকৃতির মতো শক্তি শিক্ষক ছিল। যার অর্থ সম্পদ ছিল না কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের অহংকার ছিল।

লেখক: অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী
বিভাগীয় প্রধান, শিল্প ও উৎপাদন প্রকৌশল বিভাগ, ডুয়েট
সদস্য, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ

news24bd.tv / কামরুল 

মন্তব্য

পরবর্তী খবর