নিজেকে জানাটা সবচেয়ে কঠিন

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

নিজেকে জানাটা সবচেয়ে কঠিন

সক্রেটিসের সব সময় বলতেন ‘নিজেকে জানো’। খুব কঠিন একটা কথা। আমৃত্যু মানুষ নিজেকে জানার প্রাণপণ চেষ্টা করে যায় কিন্তু নিজেকে কি জানতে পারে। প্রশ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো একটা অবস্থা হয়তো তৈরি হয় তবে সত্যটা বেরিয়ে আসার আগেই মুখ থুবড়ে মাটিতে পড়ে যায়। পৃথিবীতে অন্যকে জানা যতটা কঠিন নিজেকে জানা তার থেকেও আরও কঠিন।

পৃথিবীর প্রথম বিজ্ঞানী গ্রিসের থেলিস বলতেন, সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে নিজেকে চেনা এবং সবচেয়ে সহজ কাজ হচ্ছে অন্যদেরকে উপদেশ দেওয়া। যদিও প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ তার জীবনবোধের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষকে সত্যিকারভাবে জানার উপায় হচ্ছে তার স্বপ্নটা জানা। হয়তো অন্যকে স্বপ্ন দেখানো যায়, অন্যের স্বপ্নটা বোঝার মতো করে নিজের দৃষ্টিভঙ্গির তৈরি করা যায়, কিন্তু নিজের স্বপ্নটা মানুষ কি কখনো নিজে দেখতে পারে।

নিজেকে জানা যতটা কঠিন নিজের স্বপ্নকে জানাও ততটা কঠিন। কারণ মানুষ যখন নিজের স্বপ্নকে দেখার চেষ্টা করে তখন কঠিন বাস্তবতা সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিজেকে আমরা যতটুকু দেখি ততটুকু না দেখার মতো। নিজেকে জানার জন্য যে নিজের গভীরে যেতে হয় সে যাওয়াটা হয়তো কখনোই হয়ে ওঠে না। বরং নিজেকে জানাটা অনেকটা ভাসা ভাসা ‘জলে ভাসা পদ্ম আমি শুধুই পেলাম ছলন ‘ এর মতো।

বোধ হয় নিজেকে চেনাটা, নিজের স্বপ্নটাকে খোঁজাটা আইসবার্গ থিওরির মতো। যেখানে বলা হচ্ছে, একটি বরফ খণ্ডের ১০০ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ সমুদ্র পৃষ্ঠের ওপরে থাকে। বাকি ৯৫ ভাগ সমুদ্র পৃষ্ঠের নিচে থাকে। অধিকাংশ মানুষই সমুদ্র পৃষ্ঠের ওপরের এই ৫ ভাগকেই সমগ্র বরফখণ্ড হিসেবে ভেবে নেন এবং ভুলে যান যে এর বেশিরভাগ অংশই অদৃশ্য। এই  আইসবার্গ থিওরির মতো নিজেকে জানার দৃশ্যমান সামান্য অংশটুকু দেখে আমরা নিজের অদৃশ্যমান বেশিরভাগ অংশটুকু দেখতে পাইনা।

ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তে বলতেন ‘আমি চিন্তা করি তাই আমি আছি।’ তবে এই চিন্তাটা মন না আত্মা থেকে আসে সেটার কোনো বিহিত তিনি করতে পারেননি। মন ও আত্মা ভিন্ন হলেও তিনি দুটোকে এক ভেবে গুলিয়ে ফেলেছেন। তবে যার মধ্যে চিন্তা করার শক্তি আছে সে যে নিজেকে জানার জানালাটা খুলতে পারবে তা বোধ হয় বলা যায়। তবে দেকার্তের চিন্তার সূত্রটা যখন উল্টে ফেলে নিজের দিকে তাকাই, তখন কথাটা খুব সম্ভবত আমি আছি তাই চিন্তা করতে পারি এমন করেই বলতে হয়। কোনটা নিজেকে জানা আর কোনটা অজানা সেটা একটার পর একটা থিওরির দিয়ে ব্যাখ্যা করাটা সম্ভব নয় যতটা সম্ভব ততটাও নয়।

লিও তলস্তয় বলতেন, ‘সবাই ভাবে পৃথিবীকে বদলে দেবে, কিন্তু কেউই নিজেকে বদলানোর কথা ভাবে না। কথাটা অমৃত সমান। যে নিজেকে চেনে না সে নিজেকে বদলাতে পারে না। পৃথিবী বদলানোর মতো শক্তিও তার থাকে না। বাস্তবে মানুষ  নিজেকে হয়তো জানতে পারে। তবে সে জানাটা মানুষকে সাহসী না করে ভীত করে। নিজেকে জেনে মানুষ পিছিয়ে পড়ে। ভয়ে কেঁপে ওঠে। কারণ সে জানাতে হয়তো আলো থাকে না, অন্ধকার থাকে। পুণ্য থাকে না, পাপ থাকে। মানুষের মতো মানুষটা থাকে না, দৈত্যের মতো দানবটা থাকে। যে মানুষটা জানে তার ভেতর যা কিছু আছে তার সব মন্দ, সে নিজেকে কখনো জানতে চাইবে না। একজন অপরাধীর অপরাধবোধ থাকতে পারে, সে জানে অপরাধবোধ অনুশোচনার জন্ম দেয়, সে বোধটা ভালো। তবে তা দিয়ে তো অপরাধ মোচন হবে না। প্রতিটা মানুষ হয়তো নিজেকে একটা সময়ে এসে জানে। সেটা কখনো আলো দেখে না, গোপন দহনের তীব্র আগুনে প্রতিদিন নিঃশব্দে গুমরে গুমরে মরে হয়তোবা। ইতিহাস থেকে অনেক প্রেমপত্র আমরা খুঁজে পাই। তবে সেটা কতটা নিজেকে জানা, কতটা আবেগ, কতটা কল্পনা তা যে লিখে সে হয়তো জানে আর পৃথিবীর কারো পক্ষে তা জানা সম্ভব হয় না। যেমন সত্যটা কতটা সত্য, কতটা মিথ্যা তা হয়তো সময় জানে। প্রকৃতি জানে মানুষ জানে না।

জন কীটস  ফ্যানি ব্রাউনিকে চিঠি লিখেছিলেন, ভালোবাসা আমাকে স্বার্থপর করেছে ৷ তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব নেই৷ আমি প্রায় সবকিছুই ভুলে যাই, কিন্তু তোমাকে আবার দেখার কথা ভুলতে পারি না৷ এলিজাবেথ টেলরের সৌন্দর্যের উপাসনা করে রিচার্ড বার্টন লেখেন, তুমি অবশ্য জানবে না, তুমি চিরকাল কী আশ্চর্যরকম সুন্দর৷ এও জানবে না যে, কী চমৎকার বিপজ্জনক রমণীয়তা তোমার অর্জিত, যা তুমি যোগ করেছ তোমার লাবণ্যে৷

চার্চিল তাঁর স্ত্রীকে লিখেছিলেন, ভালোবাসার যদি কোনও অ্যাকাউন্ট থেকে থাকে, তবে তোমার কাছে ঋণে আমি যার পর নাই খুশি৷ তোমার সঙ্গে আর তোমার হদয়ে বেঁচে থাকার এ অনুভূতি, আমি কোনো ভাষায় বা প্রকাশ করব৷ সব চিঠির মধ্যে যে ব্যাকুলতা আছে তাতে ভালোবাসা কতটা সত্য, কতটা মিথ্যা তা যারা লিখেছেন তারা হয়তো জানতেন। তবে  নিজের ভেতরের সত্যটা কতটা কঠিন সত্যের সাথে লড়েছে সেটা বোধ হয় ইতিহাস বিচার করবে। যে বেকার ছেলেটার পায়ের জুতো পিচ ঢালা কঠিন রাস্তায় ঘুরে ঘুরে ক্ষয়ে গেছে। সে জানে না তার চাকরিটা হবে কিনা। যে মধ্যবিত্ত মানুষটা দিন আনে দিন খায় সে জানে না আগামীকালটা তার কী হবে। যে মানুষটা ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুর দিন গুনছে সে জানে না কখন তার মৃত্যু হবে। যে মানুষটা প্রতিদিন সত্যের জন্য লড়াই করছে সে জানে না এই সত্যের জন্য চরম মূল্য তাকে দিতে হবে কিনা। মায়ের মুখটা যে ছেলেটা অনেকদিন দেখেনি সে জানে না তার মাকে আর কোনোদিন দেখবে কিনা। বাবার ক্লান্ত দেহটা আর কখনো মায়াবী চোখে সন্তানদের মুখ দেখবে কিনা বাবা তা জানে না। এই না জানাটাই হয়তো নিজেকে জানা। সব হারিয়ে যে পথে নেমেছে তার মূল্য কতটুকু সে কি কখনো জানতে পারে। মানুষের দুঃখে যে ঝাঁপিয়ে পড়তো আজ তাকে দেখার ও জানার কেউ নেই। আপন কখন পর হয়েছে কেউ জানেনি, বোবা কান্নাটা হয়তো জেনেছে। সব জানাগুলো কখন যেন নদীর জলে ডুবে মরেছে। মাটিতে আছড়ে পড়েছে বিবর্ণ গিটার কোনো হারানো পথে। এমন করে নিজেকে জানতে গিয়ে মানুষের প্রতিদিন হারিয়ে যাওয়া আর শুন্যতায় ঝুলে ঝুলে বাদুড়ের মতো নিজেকে খোঁজা।

আরও পড়ুন: ‘৩০ বছর মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন জিয়া, এরশাদ ও খালেদা’

বিত্তশালী মানুষ গুণি তুলনায় বেশি প্রাধান্য পায়

‘গবেষণা আমাদের বিশ্বাস ও বিজয়’

একটু উদার হই

সে যাই হোক, মানুষ নিজেকে না জেনেও জানুক। আরো জানুক, অনেক বেশি করে জানুক। নিজের জানাটাকে আত্মশুদ্ধির শক্তি হিসেবে নিজের ভেতর থেকে বের করে আনুক। নিজের জানাটাকে নিজের জ্ঞানের গভীরতা থেকে টেনে এনে আয়নার কৃত্রিম কাচটাকে ভেঙে ফেলুক। মানুষ স্বপ্ন থেকে জানুক। আলো থেকে জানুক। অন্ধকার থেকে জানুক। শহরের রাজপথের মানুষের কোলাহল থেকে মানুষ নিজেকে জানুক। হোক সেটা ভালো কিংবা মন্দ।

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

আশা করি জীবদ্দশায় নারীপ্রগতির উল্লম্ফন দেখে যেতে পারবো

মিল্লাত হোসেন

আশা করি জীবদ্দশায় নারীপ্রগতির উল্লম্ফন দেখে যেতে পারবো

পার্পল পোশাকে নারীদের বেশ লাগে। ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে এসব পরিধানের সাথে সাথে বছরের বাকি ৩৬৪/৩৬৫ দিনে ৩ টি কাজ গুরুত্বের সাথে করে দেখতে পারেন-

১. শৈশব থেকেই ছেলেশিশুদের হেঁশেলের কাজে মানে রান্না-বান্না, বাটনা-কুটনা অর্থাৎ খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনের কাজে অভ্যস্ত করে তুলবেন; 

২. তার সাথে সাথে শিশু লালনপালনের কাজেও ছেলেদের অংশগ্রহণ করতে দেবেন। এসব শুধু মেয়েলি কাজ, এই ধারণা ঝেড়ে ফেলুন। 

৩. নিজের রক্তসম্পর্কীয়া (মা, বোন, মেয়ে, খালা, দাদী, নানী)-কে  প্রতি সকলেই; কানুনিসম্পর্কীয়া বা in law's (স্ত্রী, শাশুড়িসহ তাদের সাথে সম্পর্কীয় সকল নারী)-কে কমবেশি সবাই; মনঃসম্পর্কীয়া বান্ধবী, ফ্যান-ফলোয়ার; প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কীয়া (সহকর্মী, সহপাঠিনী, ছাত্রী, মুরিদান)দের অনেকেই শ্রদ্ধা-সম্মান করে, ভালবাসে। এটাই স্বাভাবিক। 

কিন্তু, অন্যের রক্তীয়া, আত্মীয়া বা সম্পর্কীয়াদেরও, ভালবাসা না হলেও সমান সম্মান প্রাপ্য। সেই পাওনা মেটাতে সন্তানদের শেখানো হচ্ছে কী না- সেটাই গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস, এগুলো পালন করা গেলে নারী-পুরুষ বৈষম্য কমবে আর নারীকে সম্মান করার হার বাড়বে। 

আর সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরেকটা কাজ করা দরকার বলে আমার মনে হয়। সেটা হলো- নারী ও পুরুষের স্বাতন্ত্র্যকে মেনে নেয়া। জীববিজ্ঞানের বিচারে নারী ও পুরুষ আমরা উভয়েই Homo গোত্রের sapiens প্রজাতি; বড়জোর এপিঠ-ওপিঠ বলা যায়। 

কিন্তু অবৈজ্ঞানিক হলেও সত্য যে, চোখ আর মনন এটা বিশ্বাস করতে চায় না- নারী-পুরুষে কোনো ভেদাভেদ নেই! অনেক পার্থক্য খালি চোখেই দেখা যায়। যেমন- বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ শারিরীক গঠনে নারী-পুরুষের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য আছে। পিরিয়ড ও সন্তানধারণের ক্ষমতা এখনব্দি কেবল নারীদেরই আছে। 


চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেওয়া হলো প্রতিবন্ধী নারীকে

অর্থনীতির নতুন পথ সন্ধানের এখনই সময়

৫ বছরে লাশ হয়ে দেশে ফিরেছেন ৪৮৭ নারী শ্রমিক

সন্তানদের নিয়ে রাজনীতি করবেন না : শ্রীলেখা


আরেকটা উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হবে। বাংলাদেশ সরকার ৬ মাস পূর্ণবেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি দেন নারীদের। পুরুষদের দেন না। কোনো কোনো দেশে কিঞ্চিৎ পিতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হচ্ছে অবশ্য; তবে অত লম্বা সময়ের এবং একই উদ্দেশ্যে নয়। এটা নারীর প্রতি অনুগ্রহ বা উপহার নয়; এটা তাদের অধিকার। কেনো, তার কারণ ব্যাখ্যার বোধয় আর দরকার নেই। 

আশা করি, আমার জীবদ্দশায় নারীপ্রগতির উল্লম্ফন দেখে যেতে পারবো। জগতের সকল (মৃত ও জীবিত) নারীকে সেলাম ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

মিল্লাত হোসেন, বিচারক

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv নাজিম

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

অর্থনীতির নতুন পথ সন্ধানের এখনই সময়

প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস

অর্থনীতির নতুন পথ সন্ধানের এখনই সময়

করোনাভাইরাস মহামারি পৃথিবী জন্য এক নজিরবিহীন সংকট সৃষ্টি করেছে। এই সংকট আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ব্যর্থতাগুলোর পাশাপাশি আমাদের চিন্তা প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতাও দিন দিন উন্মোচিত করে তুলছে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের অবস্থান একনজরে দেখতে পাই। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা যেসব সমস্যা তৈরি করেছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোকে তার একটি তালিকা হিসেবে দেখা যায়। একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এই সমস্যাগুলোর সমাধান নিশ্চিত করতে এগুলোকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে মূলত আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য।

জাতিসংঘ এই সমস্যাগুলো তুলে ধরার আগেও আমরা এগুলো সম্বন্ধে সম্যক অবহিত ছিলাম এবং এগুলোর সমাধানের তাগিদও অনুভব করে আসছিলাম। তবু আমরা সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে গিয়েছি এবং পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে দিয়েছি। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সম্পদ কেন্দ্রীকরণের বিপদ সম্বন্ধে আমরা ভালোভাবেই জানতাম। একইভাবে দারিদ্র্য, স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার-বৈষম্য ও অন্যান্য বিষয়ে সমস্যাগুলো সম্বন্ধেও আমরা জানতাম। এগুলোর সমাধানও আমাদের জানা ছিল।

কিন্তু, সমস্যা সমাধানের জন্য আমরা কোনো উদ্যোগ নিইনি। মানুষ ইচ্ছা করলে যেকেনো কিছুই অর্জন করতে পারে, তার অসাধ্য কিছুই নেই। কিন্তু, এরপরও আমরা সমস্যাগুলো উপেক্ষা করে গেছি। কিন্তু কেন? এর একটি ব্যাখা হতে পারে এই যে, আমরা আমাদের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েছি যে এর থেকে বের হয়ে আসার কোনো চিন্তাই আমরা করতে পারছি না। এই ব্যবস্থা যেসব সমস্যা সৃষ্টি করছে সেগুলোর সমাধানে কোনো ইচ্ছাকেই আমরা মনে স্থান দিতে পারছি না। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো বিভিন্ন দেশের সরকার ও তাদের জনগণকে এগুলোর সমাধান করার চিন্তা মাথায় জাগিয়ে দেওয়ার একটি প্রয়াস।

কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির চাকা অচল করে দিয়েছে। পৃথিবীর সব জাতি তাদের অর্থনীতির চাকা আবারও সচল করতে এবং মহামারি-পূর্বের অবস্থায় ফিরে যেতে প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

প্রশ্ন হলো— আমরা কেন এক বছর আগে পৃথিবীকে যেখানে রেখে এসেছিলাম, আবারও সেখানটাতেই ফিরিয়ে নিয়ে যেতে যাচ্ছি? আমরা তখন যেপথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিলাম, সেটা কি আমাদেরকে কোনো শুভ গন্তব্যে নিয়ে যাচ্ছে, এটা বিশ্বাস করছিলাম? আমরা তো পরিষ্কার জানি আমাদের সেই যাত্রাপথ আমাদেরকে এই পৃথিবীতে আমাদের অস্তিত্বের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাচ্ছিল; সেই যাত্রাপথ মানবজাতিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিপন্ন প্রজাতিগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। এটা কি আমাদের বুঝতে কষ্ট হওয়ার বিষয় যে আমাদের পথ হতে হবে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী? আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আমাদের পথ হওয়া উচিত এর বিপরীত। পুরনো পথে আর নয়। পূর্বের সেই আত্মাহুতির পথে ফিরে যাওয়া পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়।

আমরা এখন মহামারিকে ধন্যবাদ জানাতে পারি যে, মহামারি আমাদের পুরনো যাত্রাপথ রুদ্ধ করে দিয়ে আমাদেরকে নতুন পথে চলার একটি সুযোগ করে দিয়েছে। এখন ঘুরে দাঁড়ানোটা আমাদের জন্য সহজ হবে। আগামী অনেকগুলো প্রজন্ম ধরে অপেক্ষা করলেও এমন একটি সুযোগ আমাদের জন্য আর নাও আসতে পারে। এই সুযোগ হাতছাড়া করা আমাদের জন্য একেবারেই ঠিক হবে না।

পুরনো পথে ফিরে যাওয়া মানে তো সেই পুরনো ব্যবস্থা, পুরনো অবকাঠামো, পুরনো ধ্যান-ধারণা, পুরনো ব্যবসায়িক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা, যেগুলো আরও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, আরও সম্পদ কেন্দ্রীকরণ ইত্যাদি সৃষ্টি করবে, যা পৃথিবীকে মানুষের জন্য একেবারে বসবাস-অযোগ্য করে দেবে।

ভাগ্যক্রমে, আমরা কিন্তু জানি নতুন পথে যেতে হলে কীভাবে বর্তমান ব্যবস্থাটির পুনর্বিন্যাস করতে হবে। এটা করতে হবে মানুষকে বিকল্প পথে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে। বর্তমান ব্যবস্থাটি ব্যক্তির জন্য কোনো বিকল্প রাখেনি, প্রত্যেক মানুষকে পূর্বনির্ধারিত পথে চলতে বাধ্য করেছে। ব্যবসার ক্ষেত্রে শুধু এক ধরনের ব্যবসা, মুনাফা সর্বোচ্চকরণের ব্যবসা। পেশা হিসেবে একটাই পেশা। চাকরি করা।

আমরা এমন একটি ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে পারি যেখানে মৌলিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষের জন্য বিকল্প উন্মুক্ত থাকবে। আর তাদের সম্মিলিত এই সিদ্ধান্তগুলো অর্থনীতির বৈশ্বিক গতিধারা নির্ধারণ করে দেবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এই বিকল্পগুলো মানুষের মধ্যে পরিচিত করা যেতে পারে, যা প্রত্যেক তরুণকে যার যার পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেবে। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় তরুণদের সামনে কোনো বিকল্প দেওয়া থাকে না, বাছাই করার কোনো সুযোগ থাকে না।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীদেরকে এটি বলা যে, পৃথিবীতে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই, যদি তারা সম্মিলিতভাবে তা অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়। তরুণদেরকে এটা বুঝিয়ে দেওয়া উচিত যে, তারা তাদের পছন্দমতো করে একটা পৃথিবী তৈরি করে নিতে পারে। তারা এই পৃথিবী নামক মহাকাশযানের ‘যাত্রী’ নয়, তারা এর চালক। তারা এটাকে নিত্য নতুনভাবে তৈরি করে নিতে পারে এবং যেখানে যেতে চায় সেখানে নিয়ে যেতে পারে। এটা ভুল পথে গেলে এর জন্য কাউকে দায়ী করার কোনো উপায় নেই। প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব তারা পৃথিবীকে যেভাবে পেয়েছে তার চেয়ে নিরাপদ ও ভালো পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং যে গন্তব্যে পৌঁছাতে চায় সে গন্তব্যে মসৃণভাবে নিয়ে যাওয়া।

নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করতে হলে ব্যবসা সম্বন্ধে আমাদের সনাতন ধ্যান-ধারণা বদলে ফেলতে হবে। আমাদের এখন শিখিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, ব্যবসার লক্ষ্য একটাই, আর তা হচ্ছে ব্যক্তিগত মুনাফা সর্বোচ্চ করা। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদেরকে শিখিয়ে দিতে হবে যে, তাদের কাছে দু’টি বিকল্প আছে, আর তা হচ্ছে— প্রথমত, সর্বোচ্চ মুনাফার ব্যবসা; আর দ্বিতীয়ত, মুনাফাবিহীন সামাজিক ব্যবসা।

মানুষ শুধু ব্যক্তিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়, শিক্ষার্থীদের শুধু এটা না শিখিয়ে আমাদের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা তাদের এই শিক্ষা দেবে যে, মানুষ দুই ধরনের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সমষ্টিগত স্বার্থ। এবং প্রত্যেক মানুষ বেছে নেবে সে কোন স্বার্থ পূরণে ব্যবসা করবে। এরকম পছন্দ করার সুযোগটা মানুষের সামনে দিলে এটাই ব্যবসার জগতে একটি মৌলিক পরিবর্তন এনে দেবে। সমষ্টিগত স্বার্থ ও ব্যক্তিগত স্বার্থের (অর্থাৎ ব্যক্তিগত মুনাফার) মধ্যে একটি পরিষ্কার বিরোধ রয়েছে। এই দু’টির মধ্যে তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে প্রত্যেক মানুষের কাছে। এর সঙ্গে অবশ্য আরও একটি বিকল্প এসে যাবে। একজনের সামনে বিকল্প থাকবে এটা করা বা অন্যটা করা, অথবা একইসঙ্গে এটা করা এবং অন্যটাও করা।


সমালোচনা আমাদের কাজের সফলতা : কবীর চৌধুরী তন্ময়

পাবনায় থাকছেন শাকিব খান

সাধ্যের মধ্যে ৮ জিবি র‍্যামের রেডমি ফোন

কমেন্টের কারণ নিয়ে যা বললেন কবীর চৌধুরী তন্ময়


 

সমষ্টিগত স্বার্থ অর্জনের জন্য আমাদের প্রয়োজন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের একটি ব্যবসা। এমন এক ব্যবসা যেখানে বিনিয়োগকারীর ব্যক্তিগত মুনাফার কোনো অভিপ্রায় থাকবে না, যেখানে ব্যবসার উদ্দেশ্য হবে সমাজের সমষ্টিগত কোনো সমস্যার সমাধান করা। আমরা এর নাম দিয়েছি ‘সামাজিক ব্যবসা’। মানুষের সমস্যার সমাধান করতে লভ্যাংশবিহীন ব্যবসা। আমরা প্রত্যেকে বেছে নিতে পারি আমরা কে কতটুকু ব্যক্তিগত মুনাফা-প্রত্যাশী ব্যবসা আর কতটুকু সমষ্টিগত স্বার্থ অর্জনকারী ব্যবসা সৃষ্টি করব। অবশ্য সেগুলোকে আলাদাভাবে করতে হবে। আমাদেরকে একথা মনে রাখতে হবে যে, ব্যক্তিগত মুনাফা-প্রত্যাশী ব্যবসাও সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টি করতে পারে এবং সামাজিক ব্যবসাও মুনাফা-প্রত্যাশী ব্যবসা সৃষ্টি করতে পারে।

আর এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূলে থাকবে, একজন ব্যক্তি কোন ধরনের পৃথিবী গড়ে তুলতে চান সেই মৌলিক লক্ষ্যটি। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় বিষয় হতে হবে এই প্রশ্নটি। সকল পর্যায়ের ছাত্রদের জন্য প্রতি বছর প্রতি ক্লাসে অন্তত এক সপ্তাহের জন্য একটি তুমুল পর্যালোচনার ব্যবস্থা রাখতে হবে যেখানে তারা একটি প্রশ্নের জবাব খুঁজবে— ‘আমরা কোন ধরনের পৃথিবী সৃষ্টি করতে চাই?’। আলোচনা শেষে তাদের এই সিদ্ধান্ত লিখে রাখা হবে, পরবর্তী বছর আবার সে বিষয়ে তাদের চিন্তাগুলোকে পরিচ্ছন্ন করার জন্য।

প্রত্যেক তরুণকেই সে কোন জীবিকা বেছে নেবে তা বাছাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। এখন তরুণদের সামনে বেছে নেওয়ার জন্য কোনো বিকল্প নেই। তাদেরকে এখন একটি লক্ষ্যেই প্রশিক্ষিত করা হয়, আর তা হলো লেখাপড়া শেষ করে চাকরি খুঁজে নেওয়া। আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই যেন ‘চাকরির জন্য সর্বোতভাবে প্রস্তুত’ এমন একটি তরুণ সমাজ তৈরি করতে ডিজাইন করা হয়েছে। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রত্যেক ছাত্রই পরিষ্কারভাবে জানবে যে, প্রতিটি মানুষই উদ্যোক্তা হয়ে জন্মগ্রহণ করে। তার মধ্যে সৃজনশীলতার সীমাহীন সম্ভাবনা নিহিত আছে।

তাদের সামনে দু’টি বিকল্প রয়েছে। প্রথমত, তারা উদ্যোক্তা হতে পারে অথবা চাকরি করতে পারে। চাকরির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার সংঘর্ষের বিষয়টিও তাকে জ্ঞাত করা হবে। তার নিজেকে আবিষ্কারের পথে অপরের হুকুম মেনে চলা বাধার সৃষ্টি করতে পারে। উদ্যোক্তা হওয়ার মধ্যে কত রকম ঝুঁকি আছে, সেটাও তাকে বুঝিয়ে বলা হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় দুই ধরনের শিক্ষার সুযোগ থাকবে। উদ্যোক্তা হওয়ার শিক্ষা এবং চাকরিজীবি হওয়ার শিক্ষা। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই ঠিক করবে তারা কোন পথে যাবে। ‘চাকরিই জীবন’র ভিত্তিতে গড়ে তোলা শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে হবে।

নতুন পৃথিবী গড়তে হলে আমাদেরকে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে। নতুন ধরনের প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হলে প্রয়োজন হবে নতুন আইনের। সকল সম্পদকে মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে গিয়ে সম্পদ কেন্দ্রীকরণের বর্তমান যে বিরামহীন প্রক্রিয়া তাকে উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দিতে হবে, যাতে সম্পদ ও মানুষ একীভূত হতে পারে, পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে পরস্পরমুখী করে দিয়ে। তার জন্য সর্বপ্রথম দরকার একটি নতুন ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। আমাদের বিদ্যমান ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পদ ও মানুষকে বিচ্ছিন্ন করার একটি হাতিয়ার মাত্র। আমাদের প্রয়োজন হবে নতুন ধরনের ব্যাংকিং ব্যবস্থা। যা আয়ের দিক থেকে নিচের অর্ধেক জনগণের সেবায় কাজ করবে, বিশেষ করে নারীদের জন্য। এবং এ ব্যবস্থা সবচেয়ে নিচের ১০ শতাংশ মানুষকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।

পৃথিবীর সকল দেশে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা মানুষদের জন্য আমাদেরকে সামাজিক ব্যবসার ভিত্তিতে ‘নবীন উদ্যোক্তা ব্যাংক’ সৃষ্টি করতে হবে। একই ভিত্তিতে অর্থাৎ সামাজিক ব্যবসার ভিত্তিতে পুঁজি সরবরাহের জন্য ‘নবীন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড’ গঠন করতে হবে। তাদের দায়িত্ব হবে দেশের যেকোনো মানুষকে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য উৎসাহিত করা এবং তার জন্য ঋণ ও পুঁজি সরবরাহ নিশ্চিত করা। তারা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতিনিয়ত ছাত্র-ছাত্রীদের জানাবে যে তারা অপেক্ষায় আছে তাদের জন্য। যেকোনো সময়ে তারা যেকোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিতে চাইলে তারা সেজন্য ঋণ ও পুঁজি নিয়ে অপেক্ষা করছে। এই ব্যবস্থা সকল দেশের জন্য প্রযোজ্য হবে, তা ধনী দেশই হোক বা দরিদ্র। এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, অর্থায়নের অভাবে কোনো দেশে কাউকে যেন উদ্যোক্তা হওয়ার পথ ছেড়ে চাকরি খুঁজতে বের-হতে না হয়।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক ব্যবসার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করা খুবই জরুরি। তা নইলে আবার এরাই মুনাফার সন্ধানে বড় ব্যবসায়ীদের ঋণ ও পুঁজি সরবরাহের জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়বে এবং ব্যাখ্যা দেবে যে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কাজ করা সম্ভব নয়। এটা আর্থিকভাবে টেকসই হয় না। যে ব্যাখ্যা আমরা বরাবরই শুনে আসছি।

ক্রমাগতভাবে সম্পদ ও মানুষের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টির প্রক্রিয়ার ফলে মানুষ ও সম্পদের মধ্যে একটি বিশাল দূরত্ব বিশালতর হয়ে চলেছে। মাত্র গুটিকয়েক মানুষের হাতে পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়েছে, আর পৃথিবীর ৯৯ শতাংশ মানুষ আয়স্তরের একেবারে নিচে ঠাসাঠাসি করে জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে। পৃথিবীকে রক্ষা করতে হলে আমাদেরকে সম্পদ ও মানুষের মধ্যকার দূরত্ব শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। এর ফলে যেকোনো দশ শতাংশ মানুষের কাছে দশ শতাংশ সম্পদ থাকবে। সেই দশ শতাংশ মানুষ পৃথিবীর যে অঞ্চলেই বসবাস করুক না কেন। এটা মোটেই অসম্ভব কিছু নয়। পৃথিবীতে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। এজন্য যা দরকার তা হলো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সিদ্ধান্ত।

আবার অর্থনীতির পুরনো পথে ফিরে যাওয়ার কথায় আসি।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না ‘পুরনো পথে ফিরে যাওয়া’র অর্থ কী। এর মানে সেই একই ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া, একই ব্যবসায়িক লক্ষ্য, সেই একই পদ্ধতিতে একই প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের কাছে নিজেদের সোপর্দ করা, একই জিনিসগুলো করে যাওয়া যার অর্থ আরও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, মানুষ ও সম্পদের মধ্যে দূরত্ব ক্রমাগতভাবে বাড়িয়ে সম্পদকে মানুষের ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে নিয়ে যাওয়া, সেই সম্পদের মতিগতির সঙ্গে পৃথিবীর ও মানুষের ভবিষ্যতকে সঁপে দেওয়া, আর্টিফিসিয়াল ইনটেলিজেন্স কর্তৃক আরও বেশি মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়া।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নতুন কিছু নয়। এ বিষয়ে আমাদের যা জানা দরকার তার সবই আমরা জানি। এটি পৃথিবীর অস্তিত্বের জন্য একটি বিরাট হুমকি। আমরা এ বিষয়ে যতই জানছি আমাদের কাছে এটা ততই ভীতিকর মনে হচ্ছে। কিন্তু, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দুশ্চিন্তা বা শঙ্কার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। আমরা এই ভেবে নিজেদের দায়মুক্ত রাখতে চাইছি যে, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছুই করার নেই। আমাদের সরকার কখনো আমাদেরকে এ বিষয়ে কিছু করতে বলেনি। তারা নিশ্চয়ই এ ব্যাপারে কিছু করছে। অবস্থা এতই খারাপ হলে তারা অবশ্যই আমাদেরকে জানাত। আমার কাজ আমার নিজের জীবন নিয়ে ভাবা।’

কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমাদের ঘরে আগুন লেগেছে, আমরা এটা জেনেও না জানার ভান করছি, সবাইকে বোঝাবার চেষ্টা করছি যে আমরা এ নিয়ে মোটেই উদ্বিগ্ন নই। আমরা সেই জ্বলন্ত গৃহেই বিরামহীন উৎসব পালনে ব্যস্ত। এই উৎসবই আবার ঘরে লাগা আগুনে ক্রমাগত ঘৃতাহুতি দিয়ে চলেছে। এটি একটি আত্ম-বিধ্বংসী চক্রে পরিণত হয়েছে। আর আমরা এই অজুহাতে নির্বিকার আছি যে, অবস্থা এতই খারাপ হলে সরকারই নিশ্চয়ই কিছু একটা করবে। ব্যাখ্যাগুলো পরিণত হয়েছে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর খেলায়, আর এভাবেই সমস্যাগুলো উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

আমরা অন্য প্রেক্ষাপট থেকে পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত করতে পারি। যে ব্যবসাগুলো বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঘটাচ্ছে, সেগুলো আমাদেরই তৈরি, অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসা আমাদের কোনো শত্রু এগুলো সৃষ্টি করেনি। এই ব্যবসাগুলো আমরা নিজেরাই পরিচালনা করছি। আর ভোক্তা হিসেবে তাদের উৎপাদিত পণ্য ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহার করে আমরা বরং এই ব্যবসাগুলোকে আরুও উৎসাহিত করছি, বড় করছি। আমরা বাংলাদেশ, ফান্স বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেখানেই থাকি না কেন, তাতে কিছু এসে-যায় না। আমাদের গৃহে আগুন লেগেছে আর আমরা এই গৃহেরই ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে অবস্থান করছি। ঘরে আগুন লাগলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমরা যেভাবে পারি আগুন নেভাতে যেমন এগিয়ে আসি, এক্ষেত্রেও আমাদের তাই দায়িত্ব। সরকার আমাদেরকে এটা করতে বলুক বা না বলুক। আগুন নেভানোর জন্য আমাদের হাতে সময় খুবই কম এবং এরই মধ্যে আগুন না নেভালে সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগই আমাদের হাতে আর থাকবে না।

আমাদের কিশোররা বড়দের চেয়ে পরিস্থিতি অনেক ভালোভাবে উপলদ্ধি করতে পারছে। তারা প্রতি শুক্রবার রাস্তায় নেমে মিছিল করছে, তারা নিজেদের নাম দিয়েছে ‘ফ্রাইডেস ফর ফিউচার’। তারা কুণ্ঠাহীনভাবে তাদের বাবা-মা ও অন্যান্য মুরব্বিদের এই বলে অভিযুক্ত করছে যে, তাদের দায়িত্বহীন, স্বার্থপর আচরণ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যত ধ্বংস করছে। আমাদের কিশোররা বিপদ বুঝতে পারছে এবং তারা এ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছে। তারা তাদের সরকার তাদেরকে কিছু বলার জন্য অপেক্ষা করছে না। আমাদের সময় হয়েছে তাদের কথা শোনার, সংকটের গুরুত্ব উপলদ্ধি করার এবং বিপদ মোকাবিলায় আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করার।

আমি কিশোর-কিশোরীদের সচেতনতার প্রশংসা করি, যেখানে বড়রা নির্ভর করছে প্যারিস চুক্তির সফলতার ওপর। প্যারিস চুক্তি আমাদের জন্য একটি বড় অর্জন। এর লক্ষ্যগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নীতি নির্ধারণ এবং কর্মকাঠামো গড়ে তোলার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি কর্মপন্থাগুলোও সুনির্দিষ্ট। কিন্তু, জনগণের ভূমিকা এখানে কী? সমস্যাগুলো মূলত জনগণই নানাভাবে তৈরি করেছে। আর এগুলোর সমাধানে প্রাথমিক দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। আমি মাদকাসক্ত, আমি অপেক্ষা করছি কেউ আমার হাত থেকে মাদকটা জোর করে কেড়ে নিয়ে আমাকে বাঁচাক। এই অপেক্ষা সমস্যাকে শুধু জটিলতর করবে। সমাধান হলো আমাকেই আমার আসক্তি থেকে মুক্ত করে আনতে হবে। আমার আসক্তিকে চিনে নিতে হবে। তার থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে।

তরুণরা সমস্যাগুলো বুঝতে পারছে। তারা বড়দের জাগ্রত করতে এগিয়ে এসেছে। এতে আমি উৎসাহিত বোধ করছি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে তরুণদের বর্তমান প্রজন্মই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম। এর কারণ এই নয় যে, তারা বেশি বুদ্ধিমান। এর কারণ এই যে, তাদের হাতে রয়েছে অত্যাধুনিক সব প্রযুক্তি, এমনকি গ্রামের দরিদ্র মেয়েটির কাছেও, যা মাত্র কয়েক বছর আগেও পৃথিবীর কারো কাছে ছিল না। প্রতিটি তরুণের কাছে এখন পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই এখন আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের মতো অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী। নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের মধ্যে এই বোধ জাগ্রত করতে হবে যে, তারা আগের প্রজন্মগুলোর চেয়ে শুধু আলাদাই নয়, চিন্তা ও প্রযুক্তির শক্তিতে বহুগুণে শক্তিশালীও। তরুণদেরকে তাদের শক্তি অনুধাবন করার ক্ষমতা দেওয়া এবং শিক্ষাকালীন সময়ে সে ক্ষমতা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করাও নতুন শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাদের শক্তির বিন্দুমাত্র অংশ যেন তারা ব্যবহার না করে অপচয় করে ফেলে।

তরুণদেরকে অবশ্যই বড় কাজ করার জন্য মানসিকভাবে তৈরি হতে হবে। তাদের নিশ্চিতভাবে বুঝতে হবে যে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তাদের রয়েছে। তাদেরকে সাহসী হতে, বিনা প্রশ্নে যেকোনো কিছু মেনে না নিতে এবং পুরনো আপ্তবাক্য বিনা পরীক্ষায় গ্রহণ না করতে এবং প্রয়োজনে বড়দের সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। যে ধরনের পৃথিবী তারা দেখতে চায়, তা তৈরির কাজ শুরু করে দিতে হবে এবং তা করতে হবে এখনই। একথা বলে দেরি করা যাবে না যে, বড় হয়ে করব। তাদেরকে সবকিছু এখনই শুরু করার জন্য তৈরি হতে হবে। উত্তরাধিকার সূত্রে তারা যা পেয়েছে, তার সবকিছুই তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো কিছুই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয়। তাদেরকে বলতে হবে যে, পুরনো পথ তাদেরকে কেবল পুরনো গন্তব্যেই নিয়ে যাবে। নতুন পথ তাদেরকেই তৈরি করে এগোতে হবে। তাদের বিশ্বাস করতে হবে যে, তারা সে কাজ করতে পারবে।

কল্পনার শক্তিতে তাদের বিশ্বাস করতে হবে। তাদেরকে সীমাহীন কল্পনায় অভ্যস্ত হতে হবে। তাদের মনে এই বিশ্বাস ঢুকিয়ে দিতে হবে যে, তারা কল্পনা করলেই একদিন তা বাস্তবে রূপ নেবে। তাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে যে, তাদের কল্পনা কল্পনাবিলাসীর কল্পনা হবে না। এই কল্পনা হবে কল্পনাতাড়িত তরুণের নতুন পৃথিবী রচনার কল্পনা। তাদেরকে বুঝতে হবে যে জিনিস কোনোদিন কল্পনা করা হয়নি, সে জিনিস কখনো বাস্তবে সৃষ্টি হয় না।

সাইন্স ফিকশন যেমন বিজ্ঞানের শক্তি জোগায়, তেমনি তাদেরকে সোশ্যাল ফিকশন রচনা করে সমাজ পরিবর্তনের শক্তি সংগ্রহ করতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বাস করতে হবে যে, যে-মানুষ কিছুদিনের মধ্যে অসাধ্যকে সাধ্য করবে, সে এখন তার শিক্ষাব্যবস্থার আওতাতেই বেড়ে উঠছে। শিক্ষা ব্যবস্থা কি তার জন্য সহায়ক পরিবেশ দিচ্ছে, নাকি তাকে দমিয়ে দেওয়ার, এমনকি তার স্বপ্ন ভণ্ডুল করার কাজে নিয়োজিত আছে। তাকে তার মতো করে প্রস্তুতি নেওয়ার সকল সুযোগ দিতে হবে।

লেখক প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। ফেসবুক থেকে নেওয়া।

news24bd.tv/আলী

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার

লাভা মাহমুদা

প্রজন্ম হোক সমতার, সকল নারীর অধিকার

গত বছর নারী দিবসে লেখাটি লিখেছিলাম। এই এক বছরে তাৎপর্যগত দিক থেকে সংস্কারের ভাবনার একটুও হেরফের হয়নি। বরং বলা যায় বেড়েছে। তাই সঙ্গত কারণে লেখাটি আবার দিলাম। শৃঙ্খল ভাঙার গান গেয়েই যাব মৃত্যু অবধি। 

'প্রজন্ম হোক সমতার,
সকল নারীর অধিকার'

কথাগুলো শুনতে বেশ ভালো লাগে, কেমন যেন নান্দনিকতার ছোঁয়া আছে। কিন্তু সমতাটা কোথায়? আবার সমতার অধিকার? তাও আবার সকল নারীর? 

নারীতে পুরুষে, মানুষে মানুষে সমতা হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কোথাও কি সমতা আছে? স্বামীর অনুমতি না নিয়ে বাইরে যাওয়া, বাচ্চাদের প্রতি যত্নশীল না হওয়া, স্বামীর সঙ্গে তর্ক করা, যৌন সম্পর্ক করতে অস্বীকৃতি জানানো, খাবার পুড়িয়ে ফেলার মতো অতি তুচ্ছ যে কোন অন্তত একটি কারণে পুরুষের কাছে মার খায় নারী এবং এই মার খাওয়াকেও যৌক্তিক মনে করে এ দেশের ২৫.৪ শতাংশ নারী।

যাদের বয়স ১৫ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে এবং যারা বিবাহিত । হিসেবটি সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)। পুরুষেরা মার দিচ্ছে এবং নারীরা তাতে সমর্থন দিচ্ছে। কী ভয়াবহ অবস্থা !!

এই যে সমর্থন দেওয়া নারীরা আসলে কারা? নিশ্চিতভাবে এরা পুরুষতন্ত্রের প্রতিভূ। এদের সমর্থনের কারণে পুরুষেরা অনায়াসেই সেই অপকর্মটি করে পার পেয়ে যায়। এদেশের নারীদের মানসিকতার যে ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে, তাতে বোঝা যায়, নারীরা নিজেরাই তাদের অধিকার এবং মর্যাদার বিষয়ে সচেতন নয়। 

এমন মানসিকতা যে দেশের নারীদের, সে দেশে পুরুষ ওৎ পেতে থাকবেই। তাই জন্ম থেকে শুরু হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত নারীর আর মানুষ হওয়া হয় না। এখনও ভূমিষ্ট হওয়ার পর সন্তানটি ছেলে হলে পরিবারে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়। কন্যা হলে এমনটি দেখা যায় না। তখন পরিবারের অনেকেই ব্যর্থ ফিকে হাসি দিয়ে বলে, " সমস্যা নাই, পরেরবার নিশ্চয়ই ছেলে হবে'। 


বিশ্ব নারী দিবস আজ

নারীর কর্মসংস্থান হলেও বেড়েছে নির্যাতন নিপীড়ন

অস্তিত্ব রক্ষায় এখনো সংগ্রামী নারী, তবে আজো ন্যয্যতা আর নিরাপত্তা বঞ্চিত

সাইবার অপরাধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারীরা


এই যে সংরক্ষিত অধিকার নিয়ে কন্যা সন্তানটি পৃথিবীর মুখ দেখলো, মৃত্যু অবধি তার আর পরিবর্তন ঘটলো না। দুঃখের বিষয়, নারী বুঝতেই পারে না বা তাকে বুঝতে দেওয়া হয় না, যে সে তীব্র বৈষম্যের শিকার। 

পিতার সম্পতিতে সে ভাইয়ের সমান হলো না, স্বামীর সংসারেও সে অপাংক্তেয়ই থেকে গেল। 'নারীর পূর্ণতা মার্তৃত্বে'..... জাতীয় বাক্যে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা মাত্র। সেই পূর্ণতাও আবার পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়ার মধ্যে নিহিত।

সাফল্যের চূড়ায় বসে থাকা অল্প কয়েকজন নারী গোটা সমাজের প্রতিনিধি নয়। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থানের সূচকই নারীর বাস্তবতা। আর গোটা কয় নারীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পেছনের কাহিনীটাও কম কষ্টসাধ্য নয়। নারীদের শিক্ষিত এবং সচেতন হওয়ার আনুপাতিক হার বাড়ার কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে নারীকে শৃঙ্খলিত করার ধরন ও প্রকৃতিও। 

নারী মাত্রই জানে প্রতিনিয়ত কতটা অবহেলা, অসম্মান আর আত্মগ্লানির ভেতর দিয়ে যেতে হয় । কত নারী বুক সমান হতাশা, দীর্ঘশ্বাস, অবহেলা, আক্ষেপ নিয়ে নির্ঘুম রাত পার করে, সে হিসেবটা শুধু নারীরাই জানে। যে দেশে, সমাজে, পরিবারে আজও মেয়েদের মানুষ ভাবতেই শেখেনি, তার ইচ্ছা–অনিচ্ছার মূল্যায়ন করতে জানে না, সেখানে মেয়েদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাববার সময় কই ! 

এতো মানুষের ভিড়ে একাকিত্ব আর তীব্র দহনে নারীদের দীর্ঘশ্বাস শুধু চার দেয়ালের ভেতরেই ঘুরপাক খায়। যাইহোক, অধিকার কেউ দেবে না, আদায় করতে হবে। কিভাবে? যোগ্য হয়ে। কার কাছে যোগ্য হতে হবে? নিজের কাছে। 

তীব্র ঘাত প্রতিঘাত উপেক্ষা করে অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে, নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। তার আগে নারীকে বুঝতে হবে পুরুষশাসিত সমাজ কিছু সস্তা অজুহাতে শৃঙ্খল পড়িয়েছে নারীকে, নিজের স্বার্থে। সে অধিকার বঞ্চিত, উপেক্ষিত, অবহেলিত।
 
সংস্কারের পলেস্তারা খসাতে হবে নারীকেই। শিরদাঁড়া সোজা করে তাকাতে হবে সামনের পানে। হার ভাঙা খাটুনি দিয়ে বিনা পারিশ্রমিকে প্রতিদিন যুদ্ধ তো করতেই হয়। এবার যুদ্ধটা হোক নিজের সাথে, জীবন জয়ের যুদ্ধ।

news24bd.tv/আয়শা

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

সারাবছর গালি খাওয়া নারীরা আজ কিছুটা ছাড় পাবেন

ইশরাত জাহান ঊর্মি

সারাবছর গালি খাওয়া নারীরা আজ কিছুটা ছাড় পাবেন

সারাবছর গালি খাওয়া, ঘৃণার শিকার হওয়া নারীবাদীরা আজ কিছুটা ছাড় পাবেন। “নারী হলো মায়ের জাত” বলা  ঘরে নির্ভরতার স্ত্রী টি না থাকলে পুরুষেরা কি কি সমস্যায় পড়তে পারতো তার আবেগপ্রবন কিছু কিছু বর্ণনা আসবে পুরুষদের দিক থেকে। ওদিকে পার্পল বা ল্যাভেন্ডার কালারে ছেয়ে যাওয়া কিছু লীন ইন ধরনের কর্পোরেট নারীবাদ আমরা দেখতে পাবো। অনেক আগে গোধুলী আপার তোলা একটা ছবির কথা আমার মনে পড়বে।

পেছনে লাক্স এর নারী দিবস পালনের বিরাট বিলবোর্ড এর সামনে গোলাপের বালতি মাথায় ফুল বিক্রেতা নারীর গর্বিত দাঁড়িয়ে থাকা। ছবিটা বার্তা দিচ্ছিল, "সংগ্রাম নেবেন না সৌন্দর্য্য?" বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান হবে। সারাবছর মেয়েদের ঊনচোখে দেখা কিছু মিডিয়া হাউজ “আজ হাউজ চলবে নারীর নেতৃত্বে” মার্কা ফাইজলামী করবে। তবু তো উদযাপন! 

জানিনা বায়োলজিকালি নারী না হলে নারীর অধ:স্থনতার বেদনা বুঝতাম কি না। জীবনের মোটামুটি বড় একটা পথ হেঁটে এসে, নারীবাদকে এক ভিন্নতর চেহারায় চাক্ষুষ  করার অভিজ্ঞতা হলো। প্রচুর শাড়ি পরা পুরুষ দেখলাম। বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ দেখলাম, নারীবাদকে ব্যবহৃত হতে দেখলাম। রাজনীতি নিয়ে উচ্চকিত লিজেন্ডদের দেখলাম নারীর অধিকার নিয়ে টুঁ শব্দটিও না করতে। 

গতবছর একটা বুক ক্লাব এর আমন্ত্রণে একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে লেখক হয়ে ওঠার গল্প বলতে বলতে পাঠকের প্রশ্নের উত্তর দেয়া। একজন অল্পবয়সী তরুণ, নাম জুয়েল-খুব উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বললেন-পুরুষ নির্যাতন কি পরিমাণ হয় আপনার ধারনা আছে? বেকার আমাকে কি একটা চাকরীজীবী মেয়ে বিয়ে করে দায়িত্ব নেবে? 

আমাকে কিন্তু ঠিকই বউ পালতে হবে। জানেন আমার এক বন্ধু রাতে ঘরে থাকতে পারে না বউ এর নির্যাতনে? বউ ঘ্যানঘ্যান করে, সহ্য হয় না ওর। আরেকজন বললেন, পুরুষেরাও বউ এর হাতে মার খায়, একটা বউ মার খেলে যেমন সহজে বলতে পারে, একটা পুরুষ কিন্তু মার খেলে তা বলতে পারে না…”

অনেকগুলো পয়েন্ট। জানিনা অন্যরা কি বলবেন, আমি কিন্তু সত্যিই মনে করি, এবার কাজ করা দরকার পুরুষের উপরে। নারীর উন্নয়ন, ক্ষমতায়ন অনেক হয়েছে, এইবার নজর দেয়া উচিত পুরুষের বেদনার দিকে। এটা খুবই অপমানজনক যে একজন পুরুষকে সফল হবার মাপকাঠি হিসেবে সবসময় প্রমান করতে হয় যে সে অর্থনৈতিকভাবে সফল। 


বিশ্ব নারী দিবস আজ

নারীর কর্মসংস্থান হলেও বেড়েছে নির্যাতন নিপীড়ন

অস্তিত্ব রক্ষায় এখনো সংগ্রামী নারী, তবে আজো ন্যয্যতা আর নিরাপত্তা বঞ্চিত

সাইবার অপরাধের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারীরা


তাকে ব্রেড আর্নার হতেই হয়। নো অল্টারনেটিভ। এই ভার যতদিন না নামছে পুরুষের কাঁধ থেকে পারিবারিক নির্যাতন কমবে না বোধহয়। যে আপনাকে খাওয়াবে পরাবে সে নির্যাতনও করবে এই সেদিনও এক জরিপে এই ভয়ংকর ভাবনা উঠে আসছে। 

কাজ করা দরকার শাড়ি বা মেয়েদের পোশাক পরা শরীরে নারী কিন্তু মননে ব্যাটাগুলো নিয়েও। যারা শুধুই দমন করতে চান, দমনে খোঁজেন নিজের স্বাধীনতা। 

আমার প্রতিদিনের যুদ্ধ, আমার প্রতিদিনের বেদনা আমাকে একটা নারী দিবসের সামনে আর দাঁড়াতে দ্যায় না। গণ পরিবহনে ৯৪ ভাগ নারী হয়রানী হন, পরিবারে ৮৪ ভাগ নারী নির্যাতনের শিকার হন, ধর্ষনের হিসাব ভীতিকর, ধর্ষণের মামলার বিচার হয় না ৯৩ ভাগ- সারাদেশ তোলপাড় করা পাঁচ বছরের শিশু পূজার ধর্ষনের বিচার হয়নি।

তার শরীর থেকেও আসে পেশাবের তীব্র গন্ধ, নারী বান্ধব প্রশাসন নেই, কর্মক্ষেত্রে হয়রানীর শিকার অসংখ্য নারী, স্কুলে যাবার পথে নিজেকে হিজাবে বোরখায় মুড়িয়েও রক্ষা পাচ্ছেন না ৯০ ভাগ ছাত্রী, যৌন হয়রানীর শিকার হচ্ছেন, ওয়াজ মাহফিল আর জুম্মা নামাজের খুতবায় প্রায় শতভাগ জুড়ে নারী অবমাননা-এগুলো কোনটাই বায়বীয় হিসাব নয়, সব পরিসংখ্যান, রিসার্চ। আমার কাছে প্রতিটা দিনই নারী দিবসের কথাগুলো বলার মতো জরুরী।

আসেন সাইবার বুলিং এ। অন্যপক্ষের প্রতিটা ভিডিও লিংকের নিচে অতিথিদের সহ আমার কপালে সবচেয়ে কমন যে মন্তব্যটি জোটে, তা হলো- বেশ্যা। অতিথি সে রোকেয়া কবীরের মতো বর্ষীয়ান কেউ হোন, জিনাত আরা হকের মতো প্রায় মাঝবয়সী অথবা তরুনী কোনও নারী- যেই হোন- গালি বাঁধা। আমি এইসব মনে রাখি। কোন সমাজটাকে আমরা নারীর বাসযোগ্য করতে চাইছি, কোন অন্ধের দেশে বেঁচতেছি আয়না- তা আমি মনে রাখি। 

ভয়ংকর এক নারী বিদ্বেষী সমাজে বাস করে আমরা যেভাবে সিমপ্যাথাইজড হই পুরুষের প্রতি, পুরুষের দায়িত্বের বোঝার প্রতি, পুরুষ কি এ্যামপ্যাথাইজড হয় সেরকমই? না কি নারীকে ঊন চোখে দেখে দয়া করে মাত্র? ধর্ম কেন চিরকাল পুরুষের পক্ষে থাকে? রাষ্ট্র কেন কেবলই সংবিধানে সকল নারীই সমান বলে খালাস পায়?

কেন আইন আর বিচার নারীর পক্ষে থাকে না? বাপের সম্পত্তি মেয়ে সন্তান কেন পায় না নিয়ম অনুযায়ী? সন্তানের কাস্টডি কেন হয় বাবার? এইসব অতি পুরোন, ক্লিশে অথচ অমিমাংসিত প্রশ্নের জবাব এখন রাষ্ট্র, সমাজ, সমাজপতি, আইনপ্রণেতাদের কলজের ভেতর থেকে টেনে বের করার সময় আসছে। 

লং ওয়ে টু গো। এখনই যেন ক্লান্ত হোসনে আমার মন! সবাইকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা। প্রতিবছর পাশে থাকা পুরুষদেরও আমি নারী দিবসের শুভেচ্ছা জানাই। কিন্তু ক্রমশ তারা বিরল প্রজাতিতে পরিণত হচ্ছেন।  তাদের আর দেখা যায় না বিশেষ। তবু। তবু শুভেচ্ছা।

ইশরাত জাহান ঊর্মি, সাংবাদিক
news24bd.tv/আয়শা

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

সাত মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে কারণে

সোহেল সানি

সাত মার্চের ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল যে কারণে

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীর প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ যখন জাতিসংঘ কর্তৃক "বিশ্বের ভাষণ" বলে সুমহান মর্যাদার অভিষিক্ত। কিন্তু সেই ভাষণের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল কিভাবে, ঘরে-বাইরে কি কি ঘটেছিল এবং যেসব বিষয় মনস্তাত্ত্বিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে প্রস্তুত করে তুলেছিল, সেসবের অনেক অজানা-অপ্রকাশিত ঘটনাই চমকপ্রদ।

মহান মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রে সেসব খন্ড খন্ড চিত্রের দেখা না মিললেও তা সামগ্রিক ইতিহাসেরই উপাদান। সেসব তথ্য-উপাত্ত ইতিহাসকে সমৃদ্ধি করতে পারে এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বিকৃত ইতিহাস রোধে অবিস্ফোরিত অবিস্মরণীয় ভূমিকা রাখতে পারে। পহেলা মার্চ থেকে টানা সপ্তাহব্যাপী রাজনীতির অন্দরমহলে ঘটে যাওয়া সেসবের ঘটনার বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করছি।

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আসা এ ঘোষণাকে জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ্যদলের নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাগত জানালেও সংখ্যালঘু দলের নেতা পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো বেঁকে বসেন। তিনি পেশোয়ারে সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, "মুজিব ৬ দফার পক্ষে আপোষ না করলে তার দল অধিবেশনে যোগদান করবে না।"

১৮ ফেব্রুয়ারি বললেন, "ঢাকা পশ্চিম পাকিস্তানি সদস্যদের জন্য কসাইখানা হবে।" প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহবান জানান অধিবেশন স্থগিত করতে। এসময় প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে গোপনে সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় পাখী শিকারে গেছেন মর্মে খবর রটে যায়। অধিবেশনের দুদিন আগে পহেলা মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে অধিবেশন বাতিল ঘোষণা করেন। ওই মূহুর্তে বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীতে শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরিতে সহকর্মীদের সঙ্গে সকাল নয়টা থেকে বৈঠক করছিলেন। সেই নীতিনির্ধারণী বৈঠকে ছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এএইচএম কামরুজ্জামান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও ডঃ কামাল হোসেন। 

পহেলা মার্চ দুপুর বারোটার দিকে তাঁরা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বাতিলের খবরটি পান। প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণার বিরুদ্ধে হাজার হাজার ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে পড়েন। বঙ্গবন্ধু হোটেল পূর্বাণীর সামনে ছাত্রজনতার সম্মুখে হাজির হয়ে বলেন, অধিবেশন বাতিল করার ঘোষণা গভীর ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতি। বাঙালিরা এই ষড়যন্ত্রকে জীবন দিয়ে হলেও প্রতিহত করবে। ২ মার্চ ঢাকায়, ৩ মার্চ দেশব্যাপী হরতাল এবং ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জনসভা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে ছাত্র-জনতাকে আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান।

৩ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এডমিরাল আহসানকে পদচ্যুত করে তার স্থলে জেনারেল ইয়াকুব খানকে ভারপ্রাপ্ত করেন। ৪ মার্চ থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত একনাগাড়ে দেশব্যাপী স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। ৪ মার্চ ইয়াহিয়া খান জেনারেল টিক্কা খানকে গভর্নর করেন। ৫ মার্চ টিক্কা খান ঢাকায় পৌঁছেন। ৬ মার্চ শপথ নেয়ার কথা থাকলেও জনরোষের মুখে  হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বি এ সিদ্দিক তাকে শপথ পড়াতে অস্বীকৃতি জানান। ৬ মার্চ বিকেল পাঁচটায় প্রেসিডেন্ট জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন এমন বার্তা ঘোষণা করা হয় ৫ মার্চ।

স্বভাবতই গোটা দেশবাসীর দৃষ্টি তখন ভাষণের দিকে। বঙ্গবন্ধু ওদিন তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। এটা ৫ মার্চের কথা। হঠাৎ ঢাকাস্থ পূর্বাঞ্চলীয়  সামরিক প্রশাসক জেনারেল ইয়াকুবের ফোন আসে। বঙ্গবন্ধুর জামাতা ডঃ এম এ ওয়াজেদ মিয়া ফোন রিসিভ করলে ওপাশ থেকে বলা হয় শেখ সাহেবের সঙ্গে মাননীয়  প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন। বঙ্গবন্ধু "কিছু শুনতে পাচ্ছি না, কিছু শুনতে পাচ্ছি না" বলে প্রেসিডেন্টকে বলেন। একটু পরে জেনারেল রাও ফরমান আলীর ফোন।

বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্টের কন্ঠ শুনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি অবহিতপূর্বক তদন্ত কমিশন গঠন ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানের কথা বলেন। ৬ মার্চ বিকেলে প্রেসিডেন্টের ভাষণ শোনার জন্য বঙ্গবন্ধু একটি ট্রানজিস্টার নিয়ে তাঁর শয়নকক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করে দেন। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে বলেন ভাষণটি টেপ করে রাখার জন্য। প্রেসিডেন্ট বলেন, আওয়ামী লীগের একগুয়েমির জন্য ৩ মার্চের অধিবেশন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন। ১০ মার্চ ঢাকায় গোলটেবিল সম্মেলন ডেকে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের প্রশ্নে সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা অনুষ্ঠানের কথাও বলেন তিনি।

ইয়াহিয়া ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবানের কথাও ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু ভাষণ শেষ হওয়ার পর দরজা খুলে ব্যক্তিগত সহকারি মোহাম্মদ হানিফকে শীর্ষ ছয় নেতাকে ডেকে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ঘন্টাব্যাপী আলোচনা শেষে কতিপয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এর পর পরই বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি হন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ভাষণের জবাব দিতে ইংরেজিতে একটি ইশতেহার তৈরি করেন তাজউদ্দীন আহমদ ও ডঃ কামাল হোসেন। যাতে বলা হয় "শহীদের রক্তে রঞ্জিত রাস্তার রক্ত এখনো শুকোয়নি। পবিত্র রক্তের ওপর পা রেখে ১০ মার্চ গোল টেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগ যোগদান করতে পারেনা।" ৭ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে লোকে লোকারণ্য। 

বঙ্গবন্ধু প্রথমেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক ও ডঃ কামালের সঙ্গে লাইব্রেরি রুমে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এরপর বৈঠকে মিলিত হন যুব-ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে। এরা হলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন। দুপুরে এসব বৈঠকে বঙ্গবন্ধুকে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার পক্ষে মত দেন। বঙ্গবন্ধু এরপর সমবেত সকলের উদ্দেশ্যে শুধু বলেন, আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। ছাত্রজনতার দাবি অনুযায়ী চার দফা দাবির প্রতি সমর্থনের কথাও বলেন বঙ্গবন্ধু।

দুপুরে আহারের জন্য নেতারা নিজ নিজ বাড়িতে চলে যান। বঙ্গবন্ধু আহার শেষে বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। এমন সময় ডঃ কামাল প্রস্তাবিত ঘোষণাপত্রের খসড়াটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন। একান্ত সহকারি মোহাম্মদ হানিফকে টাইপ করতে দিয়ে ডঃ কামাল তাঁর বাসায় চলে যান। বিকেল  তিনটায় আসেন খন্দকার মোশতাক। পরক্ষণেই ডঃ কামাল।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে যাওয়ার আগে চারদফা ঘোষণাপত্রটি জনসভাস্থলে বিতরণ করার নির্দেশ দেন ছাত্র নেতাদের। দফাগুলো হলো এক, সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নেয়া, দুই যাদেরকে হত্যা করা হয় তা তদন্ত করতে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন গঠন, তিন, সামরিক আইন প্রত্যাহার ও চার, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার কাছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা হস্তান্তর করা।

এরপর বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দান অভিমুখে একটা ট্রাকে করে রওয়ানা হন। ওই ট্রাকে ছিলেন গাজী গোলাম মোস্তফা, শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রউফ, খালেদ মোহাম্মদ আলী, নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখন প্রমুখ।

পেছনের ট্রাকে ছিলেন আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ, মোস্তফা মোহসীন মন্টু, কামরুল আলম খান খসরু ও মহিউদ্দিন আহমেদ। বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছার আগেই সেখানে হাজির হয়ে যান বঙ্গবন্ধুর জামাতা এম এ ওয়াজেদ মিয়া, শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা, শেখ জেলি (শেখ হাসিনার খালাতো বোন) ও এটিএম সৈয়দ হোসেনের বড় মেয়ে শেলি।

সেদিনের রেসকোর্স ময়দানে নৌকা আকৃতির সভামঞ্চটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমান শিশুপার্কের দক্ষিণ -পূর্ব অংশে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্প্রচারিত হবে রেডিও বারবার এমন ঘোষণা হচ্ছিল। শেখ হাসিনা এ কারণে একটি রেডিও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরুর কয়েক মিনিটের মধ্যে রেডিও নিস্তব্ধ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী ভাষণে "এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম.. উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লাখো লাখো জনতার জনসমুদ্র থেকে জয় বাংলা শ্লোগান ভেসে আসে। বঙ্গবন্ধুও প্রত্যুত্তরে জয়বাংলা বললে এর ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে আকাশবাতাসকে অনুরণিত করে তোলে।

বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দান থেকে বাড়িতে ফেরেন। রাত আটটার দিকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন জনপ্রিয় বাংলা সংবাদ পাঠক ইকবাল বাহার চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান রেডিও ঢাকাস্থ কেন্দ্রের কর্মকর্তা ও কর্মচারিরা। তারা জানান, সেনাবাহিনীর হাইকমান্ডের নির্দেশে তারা ভাষণ সম্প্রচার করতে পারেনি। এখন ভাষণ সম্প্রচারের অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট করার কথা বলেন তারা। ফলে সকল অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। ৮ মার্চ সকাল আটটায় হঠাৎ পাকিস্তান রেডিও ঘোষণা করে যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে প্রদত্ত আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ নয়টায় প্রচার করা হবে।

বঙ্গবন্ধু রাতে সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ছেলে-মেয়ে শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রেহানা, শেখ রাসেলের উপস্থিতিতে বলেন, " আমার যা বলার তা প্রকাশ্যে বলে ফেলেছি -সরকার এখন আমাকে যেকোনো মূহুর্তে হয় গ্রেফতার নয়তো হত্যা করবে। আজ থেকে প্রতিদিন আমার সঙ্গে খাবে। ২৪ মার্চ পর্যন্ত সবাই এক সঙ্গে খেয়েছেন। কিন্তু ২৫ মার্চ ব্যতিক্রম ঘটে। বঙ্গবন্ধু রাত ১১টা পর্যন্ত বাড়ির নীচতলায় আওয়ামী লীগ,ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করেন। ৭ মার্চের ভাষণের পর থেকে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। কার্যত বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করেন।

আরও পড়ুন:


চাকরি দেবে এসিআই লিমিটেড

ইরানের রেলপথ যাবে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : ইন্দিরা থেকে শেখ হাসিনা

নামাজের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত সমূহ


৯ মার্চ পল্টন ময়দানে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, "প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে বলি, অনেক হয়েছে আর নয়। তিক্ততা বাড়াইয়া আর লাভ নাই। লা কুম দ্বিনুকুম ওয়ালইয়া দ্বিন(তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার) - এর নিয়মে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা স্বীকার করিয়া লও। মুজিবের নির্দেশমত আগামী ২৫ তারিখের মধ্যে কোন কিছু করা না হইলে আমি শেখ মুজিবুর রহমানের সহিত হাত মিলাইয়া ১৯৫২ সালের ন্যায় তুমুল আন্দোলন শুরু করিব। খামাকা কেহ মুজিবকে অবিশ্বাস করিবেন না, মুজিবকে আমি ভালো করিয়া চিনি। ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন। ১৬ ও ১৭ মার্চ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাউসে (বর্তমান সুগন্ধা)  ইয়াহিয়া-মুজিব বৈঠক হলো। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ছাত্রজনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে। কারফিউ জারি করা হয়। ২০ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ও ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতাদের মধ্যে পৃথক বৈঠক হয়। ইতিমধ্যে পশ্চিম পাকিস্তানের ৩৫ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য অধিবেশনে যোগদান করতে ঢাকায় এসে পৌঁছেন।

বঙ্গবন্ধু বাড়ি আক্রমণের আশঙ্কা করে ডঃ ওয়াজেদকে বাসা নিতে বলেন। সাত মসজিদ রোডের ওপর ধানমন্ডির (পুরাতন) ১৫ নম্বর রোডস্থ (নতুন ৮/এ-১৭৭ নম্বর) নীচতলাটি মাসিক ৯ শত টাকায় ভাড়া নেয়া হয়। ২১ মার্চ জুলফিকার আলি ভুট্টো ঢাকায় এসে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ওঠেন। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে তিনি গোপন শলাপরামর্শ করেন। ২২ মার্চ বঙ্গবন্ধু বলেন, " লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। এদিন মুজিব-ভুট্টো বৈঠক হয়। একই দিন ইয়াহিয়া-মুজিব-ভুট্টো বৈঠক হলে আবারও সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে। বলা হয় ২৫ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বিস্তৃত আলোচনার জন্য বাতিল করা হলো।

বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ থেকে অবরোধ আন্দোলন শুরু করার জন্য জনগণের প্রতি আহবান জানান। ২৩ মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের জনসভায় "আমার সোনার বাংলা" গানটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে বাজিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন ছিলেন ছাত্রলীগের প্রধান নেতা। গাঢ় সবুজ কাপড়ের মাঝখানে লাল গোলাকার বলয়ের ভেতর সোনালী রং-এ অঙ্কিত বাংলাদেশের মানচিত্রসহ তৈরি করা পতাকাটি বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেন তাঁর বাড়িতে এসে। সামরিক কায়দায় একটি বিশেষ দল বঙ্গবন্ধুকে অভিবাদন জানায়। ওদিন সচিবালয়, হাইকোর্ট ভবনসহ সর্বত্র বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। উল্লেখ্য, ছাত্রলীগের পক্ষে ২ মার্চ ডাকসুর ভিপি আসম আব্দুর রব প্রথম পতাকাটি উত্তোলন করেন। ৩ মার্চ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করেন।

২৫ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধু নিজ বাড়িতে  নেতাদের সঙ্গে কাটান। সবার চোখে মুখে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়ে চলে যেতেন বলেন। বিকেল তিনটায় শেখ মনি বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ছিলেন। রাত আটটার আবার বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামান। রাত ১১ টার  দিকে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে সিরাজুল আলম খান, আসম আব্দুর রব ও শাজাহান সিরাজের সঙ্গে কথা বলেন।

লন্ডন আওয়ামী লীগ নেতা জাকারিয়া চৌধুরীর ভাই পরিচয় দিয়ে ঝন্টু নামের এক ব্যক্তি মহিউদ্দিন আহমেদের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি হন। সে জানায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। আপনাকে হত্যা করার জন্য তারা আসছে। বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনাকে  বলে তোমরা চলে যাও।আমার অন্যত্র  চলে যাওয়ার উপায় নেই। তারা মারতে চাইলে আমাকে এ বাড়িতেই মরতে হবে । কামাল চলে গেছে। জামাল ওর মাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। মুখে একথা শুনে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলেন। একদিকে গণহত্যার তান্ডবলীলা, আরেকদিকে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের ইতিহাস। গ্রেফতারের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক বার্তা আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর