সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অসাধারণ একজন রাজনীতিবিদ

শরিফুল হাসান

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অসাধারণ একজন রাজনীতিবিদ

সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এই বাংলাদেশের অসাধারণ একজন রাজনীতিবিদ। সততা, আদর্শ, বিনয় সব দিক থেকেই অসাধারণ।‌ ক্ষমতায় গেলে অন্য প্রায় সবার সম্পদ যখন হু হু করে বাড়ে, তখন আপনারটাই শুধু কমেছে। যেটুকু ছিল তাও বিলিয়ে দিয়ে সব সময় ডুবে থাকতেন বইয়ের মধ্যে।

প্রিয় আশরাফ ভাই, বাংলাদেশের প্রথম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপ‌তি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে আপ‌নি। সবচেয়ে বড় রাজনৈ‌তিক দ‌ল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রায় এক দশক। পাঁচবারের এম‌পি আপনি, তিনবারের মন্ত্রী। কিন্তু এতো কিছুর পরেও আপনার বিনয় ছিল অসাধারণ। এতো সব পদে থাকার পরেও নিজের চি‌কিৎসার জন্য শহরের  বা‌ড়িটা বি‌ক্রি কর‌ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। আপনি সৈয়দ আশরাফ বলেই এটা সম্ভব। কারণ রাজনৈ‌তিক সততার উজ্জ্বল ও বিরল এক দৃষ্টান্ত আপনি।

আশরাফ‌ ভাই, মাত্র ১৯ বছর বয়সেই আপ‌নি যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। আজীবন মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনা লালন করেছেন। সততা ও আদর্শের সাথে কোনরকম আপোষ করেননি। প্রতিক্রিয়াশীলতাকে কোন স্থান দেননি। অসাধারণ এক রাজনৈতিক আদর্শের পুরোপুরি চর্চা করে গেছেন। কিন্তু  কোন‌দিন কাউকে অসম্মান করে কথা বলেননি। এমন‌কি বিরোধী দলকেও  না। 

প্রিয় আশরাফ ভাই, আপনি তখন জনপ্রশাসন মন্ত্রী।‌ বিসিএস সংক্রান্ত একটা নিউজে আপনার বক্তব্য নেয়ার জন্য আপনার বেই‌লি রোডের বাসার সামনে সারা‌দিন দাঁ‌ড়িয়ে ছিলাম। সম্পাতক মতি ভাই সেদিন বলেছিলেন আপনার বক্তব্য নিতে হবে। সবাই জানে আপনার বক্তব্য পাওয়া কঠিন কাজ। ‌এই জায়গা ওই জায়গা ঘুরে না পেয়ে অ‌ফিসার্স ক্লাবে গিয়েছিলাম। কারণ ময়মন‌সিংহ স‌মি‌তির একটা অনুষ্ঠা‌নে আপনার সেখানে যাওয়ার কথা। অনুষ্ঠান শেষে আপনার কাছে প্রশ্নটা করেছিলাম। আপনি সেদিন আমার প্রশ্ন শুনলেও উত্তর না দিয়ে হেসে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আমি খুব অবাক হয়েছিলাম আপনি উত্তর না দিলেও যথাযথ ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এই না হলে নেতা!

আশরাফ ভাই, আপনার সম্পর্কে আমি সবচেয়ে বেশি শুনেছি প্রয়াত শা‌কিল ভাইয়ের কাছে। তিনি আপনার কথা বলতেন বলতেন অনেক বেশি। এ ছাড়াও আপনার অনেক গল্প শুনেছি সাবেক সহকর্মী প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি প্রিয় Jahangir Alam ভাইয়ের মুখে। গল্প শুনেছি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ভৈরবের Imranভাই ও সাংবাদিক Hasan Jahid Tusher তুষার ভাইয়ের কাছে যিনি এখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব। সবার কাছে গল্প শুনে প্রায়ই মনে হতো, যদি আপনার সঙ্গে কোন একদিন গল্প করে যদি কাটিয়ে দিতে পারতাম!  

অ‌াশরাফ ভাই, ২০১৭ সা‌লের ২৫ অ‌ক্টোবর আপনা‌কে নিয়ে আমি একটা লেখা লিখেছিলাম। তাতে বলেছিলাম, আমাদের রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ডাক্তার, পুলিশ, আইনজীবী, বিচারক, প্রকৌশলী, সরকারি কর্মচারী, উন্নয়ন কর্মী, ব্যবসায়ী সব পেশার মানুষেরই সততা, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, পেশাদারিত্ত্ব দিনকে দিন নামছে। কমতে কমতে এমন অবস্থা যে এখন আর অনুসরণ করার মতো খুব বে‌শি কাউকে পাওয়া যায় ন‌া। তবে এই নষ্ট সমাজেও আপ‌নি সৈয়দ আশরাফের মতো মানুষ ছিলেন। কিন্তু খারাপ মানুষের চাপে আপনারা পিষ্ট। সমাজের চোখে আপনারা কখনো মাতাল, কখনো বোকা, কখনো ব্যর্থ কখনো আবেগি। তবে আপনাদের মতো বোকা আবেগিরা আছে বলেই এখনো এই দেশটা টিকে আছে। আমি চাই এই দেশে আরো দুই একজন সৈয়দ আশরাফের সংখ্যা বাড়ুক। 

আশরাফ ভাই শুনে খুব ভালো লেগেছিল, আমার ফেসবুকের সেই লেখাটা আপনাকে পৌঁছে দি‌য়ে‌ছি‌লেন আপনার বড় বোনের এক অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বন্ধু পলি আপা। সেই লেখা পড়ে হয়তো মুচ‌কি হেসেছিলেন আপনি। কিন্তু সত্যি বলছি, এই দেশে আপনার মতো নেতা বিরল। 

আশরাফ ভাই, ২০১৬ সালের কাউন্সিলের আগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আপনাকে সরিয়ে দেয়া, এরপর দল‌ীয় সাধারণ সম্পাদ‌কের পদ থেকে কোনটাই আমার ভালো লাগেনি। আমি বলবো আপনি কষ্ট পেয়েছিলেন ভীষণ কিন্তু হাসিমুখে সব মেনে নিয়েছিলেন। তবে ভীষণ নিঃসঙ্গ হয়ে গিয়েছিলেন। এরপর স্ত্রীর মৃত্যু আপনাকে আরো নিঃসঙ্গ করল। সেই নিঃসঙ্গতা নিয়েই সবার অগোচরে চলে গেলেন দুই বছরে আগে আজকের দিনে। 


আরও পড়ুন: সরকার কারা ডুবায় কীভাবে ডুবায়

মরদেহ পোড়ানোকালে হঠাৎ ভেঙ্গে পড়ল ছাদ, নিহত ১৯

আরও পড়ুন: ধর্ষকের গোপনাঙ্গ কাটার আইন চেয়ে আদালত প্রাঙ্গণে তিনি

ওরা আমার বুক, গোপনাঙ্গ পুড়িয়ে দিয়েছে : সৌদি ফেরত তরুণী



আশরাফ ভাই, আজ আপনার মৃত্যুবার্ষিকী। কিন্তু আপনি তো পঙ্গপালের মতো কর্মী রাখতেন না। তারাই আপনার কাছে থাকতেন যারা দলটাকে ভালোবাসতো। এই যে দেখেন আজকে আপনার মৃত্যুবার্ষিকী অথচ  আপনাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ফেসবুক ভেসে যাচ্ছে না। আপনার স্মরণে বড় কোন অনুষ্ঠান চোখে পড়েনি। শ্রদ্ধা জানাতে আওয়ামী লীগের কোন কেন্দ্রীয় নেতা কবরে যাননি। অবশ্য কারও থাকা না থাকায় সৈয়দ আশরাফের কিছু যায় আসে না। বেঁচে থাকতেই তিনি এসব করেননি, দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর আর তার দরকার কী? 

আশরাফ ভাই বনানী কবরস্থানে ফুল দিয়ে আজ সকালে শ্রদ্ধা জানিয়ে আপনার বোন ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দা জাকিয়া নূর বলেছেন, আগামী প্রজন্মের কাছে আমার এটাই আবেদন থাকবে যে, আমার ভাই সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সবাই যেন সৎ ও আদর্শের রাজনীতি করে। এটাই আসলে জরুরী। 
কিন্তু আপনার আদর্শ ছড়াবে কী করে? আপনাকে নিয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কোন আলোচনা অনুষ্ঠান আজ আছে কী না জানি না।  আপনার আদর্শের চর্চার জন্য কী কী হয়েছে জানি না। অথচ আওয়ামী লীগটাকে দারুণভাবে অনুভব করতেন তিনি। আপনার আদর্শের চর্চা যে আসলেই জরুরী। 

আশরাফ ভাই, আওয়ামী লীগের ২০১৬ সালের কাউন্সিলে আপনার বলা কথা গুলো আজও আমার কানে বাজে। আপনি বলেছিলেন, আওয়ামী লী‌গের ঘরে আমার জন্ম। আওয়ামী লীগ যখন ব্যথা পায়, আমারও কিন্তু হৃদয়ে ব্যথা লাগে। আওয়ামী লীগের একটা কর্মী যদি ব্যথা পায় সেই ব্যথা আমিও পাই। আপনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ শুধু একটা রাজনৈতিক দল নয়। হাজারো শহীদের রক্ত, জাতির পিতার রক্ত, জাতীয় চার নেতার রক্ত, হাজার হাজার নেতাকর্মীর আত্মত্যাগ। আওয়ামী লীগ একটা অনুভূতি। 

প্রিয় আশরাফ ভাই, বুকের মধ্যে কতটা ভালোবাসা থাকলে এমন ভাবে কথা বলা যায় সেটা অনেকেই বুঝবে না। আশরাফ ভাই, দোয়া ক‌রি ভালো থাকুন পরপা‌রে। বঙ্গবন্ধু, জাতীয় চার নেতাসহ সবাইকে আল্লাহ ভালো রাখুন। আজকে দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে আপনাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। আপনার মত রাজনীতিবিদকে স্যালুট।

news24bd.tv আয়শা

 
 

 

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

মানুষের ভালোবাসাটা এভাবেই ভালো থাক চিরকাল

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

মানুষের ভালোবাসাটা এভাবেই ভালো থাক চিরকাল

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

পৃথিবীতে সবাই ভালোবাসার মূল্য দিতে পারে না। কারণ ভালোবাসার মূল্য দিতে হলে একটা ভালো মন থাকতে হয়। যে মনটা স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো হতে হয়। স্বার্থরা যখন ভালো মনকে আক্রমণ করে তখন সে ভালো মনের  স্বার্থদের সাথে জীবনবাজি রেখে লড়াই করার মতো শক্তি অর্জন করতে হয়। মানুষের তো মন থাকে। মানুষের স্বার্থও থাকে। 

তবে স্বার্থপরতা মানুষের অস্তিত্বের একটা অংশ। কোথাও কম কোথাও বেশি। এটা কি শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব। মনস্তত্বের গবেষণা এটা নিয়ে ভাবতে পারে তবে সেটার সংখ্যাগত মান পরিমান করা হয়তো কঠিন। মনের ভালো মন্দ থাকলেও স্বার্থের ভালো নেই,  মন্দ আছে। যদিও ব্যাপক অর্থে বিবেচনা করলে স্বার্থেরও হয়তো ভালো একটা দিক কোনো না কোনো জায়গায় থাকে। যেমন একটা নতুন আবিষ্কারের পর বিজ্ঞানীরা বিনীতভাবে বলেন মানুষের কল্যাণের স্বার্থে আমাদের এই নতুন আবিষ্কার। তাহলে স্বার্থটা যখন নিজের না হয়ে অন্যের ভালোর জন্য হয় তখন সেটা স্বার্থ না হয়ে  ভালোবাসা হয়ে যায়। কি অদ্ভুত রূপান্তর। ভাবতেও শরীর শিহরিত হয়ে যায়।

অন্যের স্বার্থে যদি কেউ ত্যাগ করে তবে তা ভালোবাসা, নিজের স্বার্থে কেউ যদি ভোগ করে  তবে তা স্বার্থপরতা। রক্তের সম্পর্কের বাইরেও ভালোবাসা বাসা বাধে। অচিনপুরের অদেখা একটা মানুষের প্রতিও ভালোবাসা তৈরী হতে পারে। আবার যোজন যোজন দূরের দুই ভুবনের দুই বাসিন্দার মধ্যেও ভালোবাসা গড়ে উঠতে পারে। সেই মানুষটা যখন কাছে আসে তখন একটা ভালোবাসার টান মনকে আকুলি বিকুলি করে। সবটাই হয়তো কল্পনা, তারপরও মনে হয় কল্পনাটা স্বপ্নের ঘুম ভাঙিয়ে বাস্তবতাকে টেনে হেঁচড়ে এনেছে ভালোবাসার কাঙাল মানুষটার কাছে।

প্রাণের আকুলতা ও মনের ব্যাকুলতা দিয়ে যে মানুষটাকে মানুষ ভালোবাসে তার কাল্পনিক কিংবা বাস্তব উপস্থিতি মানুষের হৃদয়ের শূন্যতাকে  অপার আনন্দের ঝিকিমিকি আলোয় ভরিয়ে দেয়। চোখের পলকেই ভালোবাসার প্রার্থনায় বসে থাকা মানুষটার অসম্পূর্ণ সত্ত্বাকে ভালোবাসার আকাঙ্খিত মানুষটা  সঙ্গ দিয়ে  করে তোলে পরিপূর্ণ।  এ মানুষটিকেই প্লেটোর দর্শন নাম দিয়েছে  সোলমেট। 

সোলমেটের সান্নিধ্য কেন মানুষের  হৃদয়কে উদ্বেলিত করে তোলে। বিন্দু বিন্দু জলকণা আগুনের তীব্র দহনে যেমন বুদ্ বুদ্ করে উঠে তেমনি তা মানুষের মনে শ্রাবনের বৃষ্টি হয়ে পরিপূর্ণতার অনুভূতি জাগ্রত করে। সোলমেটকে মানুষ  কেন বেটার হাফ হিসেবে পেতে আগ্রহী হয়? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দর্শনতত্ত্বের ভিত্তিতে দিয়েছেন  গ্রিক দার্শনিক প্লেটো।  এই সোলমেটকে খুঁজতে গিয়ে প্লেটো  বলেছেন আরো বিচক্ষণতার সাথে আমাদের ভালোবাসতে হবে। প্লেটো মানবিক  সম্পর্কগুলোকে তাত্ত্বিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করেছে। তার সিম্পোজিয়াম বইটিতে  ভালোবাসা আসলে কি  সেটা তিনি বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। একটি গল্পকে উপজীব্য করে তিনি এটির  ব্যাখ্যা দিয়েছেন। প্লেটো মানবিক সম্পর্কগুলোকে তাত্ত্বিকভাবে বিচার করার চেষ্টা করেছে | তার সিম্পোজিয়াম বইটিতে ভালোবাসা আসলে কি সেটা তিনি বুঝানোর চেষ্টা করেছেন। একটি গল্পকে উপজীব্য করে তিনি এটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এখানে সুদর্শন কবি আগাথনের একটি নৈশভোজের দৃশ্যের অবতারণা করা হয়েছে। মূলত আগাথন এই ভোজে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন খাওয়া, পান করা ও ভালোবাসা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য। মূলত আগাথন এই ভোজে বন্ধুদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন খাওয়া, পান করা ও ভালোবাসা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য। 

ভালোবাসা কি সে বিষয়ে একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি একেকরকম ছিল। সেখানে প্লেটোর শিক্ষক সক্রেটিসের ভালোবাসা সংক্রান্ত দর্শন তত্ত্বটি অন্যদের চিন্তাধারা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। সক্রেটিস ভালোবাসা সমন্ধে যা বলতে চেয়েছেন তা হলো একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে তখনই ভালোবাসে যখন সে মানুষটির মধ্যে ভালো কিছু গুণাবলী লক্ষ্য করে যা তার মধ্যে অনুপস্থিত থাকে। ভালোবাসার অন্তর্নিহিত সত্যটি  হচ্ছে সেই  মানুষটির সংস্পর্শে আসার মাধ্যমে যে মানুষটি তাকে ভালোবাসে সে  কিছুটা তার মতো হয়ে উঠতে পারে। সে মানুষটির গুণাবলী ভালোবাসার জড়তায় আক্রান্ত অপূর্ণ মানুষটির বিকাশের সম্ভাবনাকে বাস্তবে পরিণত করে।

অন্যদিকে প্লেটো ভালোবাসাকে একধরণের শিক্ষা বলেছেন। মানুষ তখনই আরেকটি মানুষকে ভালোবাসতে পারে যখন সে তার দ্বারা নিজের ঘাটতিগুলো পুষিয়ে উঠে চায় এবং ক্রমান্বয়ে নিজের বিকাশকে নিশ্চিত করতে আগ্রহী হয়। ভালোবাসা হওয়া দরকার দুটি মানুষের  একে অন্যকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে একসাথে বেড়ে উঠার প্রচেষ্টা। এর অর্থ হচ্ছে মানুষকে এমন কোনো মানুষের কাছাকাছি আসতে হবে যে কিনা তার বিবর্তন  বা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন অনুপস্থিত অংশটিকে ধারণ করে। যেমন একজন মানুষের নতুন ধারণা তৈরির সক্ষমতা আছে কিন্তু সেটি আরেকজন মানুষের মধ্যে নেই। যে মানুষটির নতুন ধারণা তৈরির গুণাবলী নেই সে মানুষটি যে মানুষটির এই গুণাবলী আছে  তাকে ভালোবেসে বা তার সান্নিধ্যে এসে এই গুণাবলীটি অর্জনের চেষ্টা করবে।


নাসিরের স্ত্রীকে ‘জাতীয় ভাবী’ আখ্যা দিয়ে সুবাহ'র স্ট্যাটাস

বিএনপির সমাবেশ ঘিরে খুলনায় পরিবহন চলাচল বন্ধ

১৩৮ বছরের পুরনো পরিত্যক্ত আদালত ভবনে চলে বিচার কাজ

নাইজেরিয়ায় হোস্টেল থেকে কয়েকশ ছাত্রীকে অপহরণ


আবার যে মানুষটির জীবনবোধ নেই, সে মানুষটি যে মানুষটির জীবনবোধ আছে তাকে ভালোবেসে তার জীবনবোধের ঘাটতি পূরণের প্রচেষ্টা চালাবে। এমন অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। তবে সব মানুষ সব বিষয়ে পূর্ণতা অর্জন করতে পারেনা। এই সীমাবদ্ধতার জায়গাটিতে এসে মানুষ তার প্রয়োজনের পরস্পর পরস্পরকে ভালোবেসে ও সাহচর্যে এসে নিজেদের মধ্যকার অনুপস্থিত গুণাবলীকে অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে পরস্পরের উন্নতি সাধনে ভূমিকা রাখবে। প্লেটো সম্পর্কে জড়ানোর ক্ষেত্রে সহনশীল হবার কথা বলেছেন। যেখানে অহংকার ও আগ্রাসী মনোভাব পরিত্যাগ করাকে উপযুক্ত উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো মানুষই সম্পূর্ণ নয়। যে মানুষটাকে মানুষ ভালোবাসবে তার কাছ থেকে শেখার মতো একটা সৃজনশীল মন থাকতে হবে। সেটা থাকলে  মানুষ তার অপূর্ণতাকে পূরণ করতে সক্ষম হবে। 

মানুষ ভালোবাসার মানুষটির কাছ থেকে শিখতে শিখতে একদিন তার সেরা সংস্করণে পরিণত হবে। এটি সহজে অর্জিত হবেনা বরং ভালোবাসার মানুষটির সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে তা অর্জন করতে হবে। এ যাত্রাপথ খুব জটিল ও বিপদসংকুল। তবে তা অসাধ্য নয়। মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে মানুষের প্রয়োজনে।  মানুষ মানুষকে ভালোবাসবে মানুষের নিজের  প্রয়োজনে।  সক্রেটিস ও প্লেটোর ভালোবাসার দর্শনেও তাই স্বার্থের পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। তবে সে স্বার্থের ভিতরে নিঃস্বার্থ শক্তি  হচ্ছে ভালোবাসার উদার মানুষটি। যে জানেনা তাকে যে ভালোবেসেছে সে ভালোবাসার অন্তরালে তার কোনো কোনো ভালো গুনকে চুরি করে নিচ্ছে।

মানুষ যদি মানুষকে ভালোবেসে তার কাছ থেকে শিখতে পারে তবে তা দোষের কিছু নয়। বরং তা অনেক মহত্বের। তবে অসম্পূর্ণ মানুষটি যখন সব শিখে গিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে উঠে তখন যদি সে ভালোবাসার মানুষটিকে আঘাত দেয় তখন সে ভালোবাসার আর মূল্য থাকেনা। ভালোবাসায় কৃতজ্ঞতা থাকতে হয়। ভালোবাসায় প্রতিদান থাকতে হয়। কাটার সাথে ফুল থাকতে হয়। ফুলের সাথে ফুলের সুগন্ধ থাকতে হয়। 

ভালোবাসাকে ঘাতকেরা যতবার আঘাত করে ভালোবাসা তত মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে উঠে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন, বাস্তবতা এতই কঠিন যে কখনও কখনও বুকের ভিতর গড়ে তোলা বিন্দু বিন্দু ভালবাসাও অসহায় হয়ে পড়ে। যেমন অসহায় হয় সময়। যেমন অসহায় হয় প্রকৃতি। যেমন অসহায় হয় মানুষ। তবুও দর্শন, মনস্তত্ব, বিজ্ঞান, অর্থনীতি সব পরীক্ষায় জিততে জিততে ভালোবাসা শক্ত শেকড়ের উপর মেরুদন্ড শক্ত করে দাঁড়াক।

মা আর প্রেয়সীর বাস্তবতার টানাপোড়েন ভালোবাসার শক্তির  কাছে পরাভূত হোক। ভোগবাদী চরিত্র ভালোবাসার শক্তিতে ত্যাগের কাছে আত্মসমর্পণ করুক। সূর্যের আলো ভালোবাসার শক্তিতে নেমে আসুক পৃথিবীতে। মাটির গন্ধে সে সূর্যের আলো  মোহিত হয়ে মানুষের অন্তরে ঢেলে দিক অলৌকিক চিন্তার আনন্দ। যে চিন্তার আনন্দ ভালোবাসা হয়ে মানুষকে আবার মানুষ করে তুলবে। নগরের ইট পাথর ভেঙে গড়ে তুলবে  ভালোবাসার এক মাটির পৃথিবী। যার জন্ম আছে মৃত্যু নেই। মানুষের ভালোবাসাটা এভাবেই ভালো থাক চিরকাল।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

news24bd.tv নাজিম

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

মোসতাক ‘জামিন’ পেয়েছেন, ‘মুক্তি’ পেয়েছেন

আলী রিয়াজ

মোসতাক ‘জামিন’ পেয়েছেন, ‘মুক্তি’ পেয়েছেন

কী লিখবেন? কি লিখবো? মুসতাকের নাম লিখবেন? লিখবো মুসতাক আহমেদ নামে একজন লেখক ছিলেন? ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র’-এর অভিযোগ মাথায় নিয়ে কার্যত বিনা বিচারে তাঁকে মরতে হয়েছে কারাগারের প্রকোষ্ঠে, আদালত তাঁকে জামিন দেয়নি কেননা জামিনের ‘যোগ্য’ বলে বিবেচিত হননি, সেই সময়ে অনেকেই জামিন পেয়েছেন। মোসতাকের জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেছে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি – এটা তো আমরা জানি। রাষ্ট্র চায়নি, কিন্ত রাষ্ট্র তো একটা বায়বীয় বিষয় নয়। কে চায়নি সেটা তো বুঝতে পারি – সরকার চায়নি। গত মে মাস থেকে তাঁকে যে আইনের অধীনে কারাগারে থাকতে হয়েছে সেই আইনের উদ্দেশ্য বুঝতে যদি এতদিনেও কারো সংশয় থাকে তবে আরেকবার মনে করুন – এই আইন কাকে নিরাপত্তা দেয় আর কার জীবন ‘নিরাপত্তাহীন’ করে তোলে, কাকে ‘মৃত্যুর দিকে’ ঠেলে দেয়? 

মুসতাক কী ভাবে মারা গেছেন তাঁর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে তিনি রাষ্ট্রের হেফাজতে ছিলেন, তাঁর দায়িত্ব নিয়েছিলো সরকার – এই মৃত্যুর দায় – হত্যার দায় সরকারের। কিন্ত এটা দায়িত্বহীনতার বিষয় নয়, এর মধ্যে একটা বার্তা আছে। আপনি – আমি সেই বার্তা পাচ্ছি তো? আপনি-আমি সচেতনভাবে স্বীকার করি না করি আমাদের হাড়ে-মাংসে-মজ্জায়-শিরায় সেই বার্তা পৌছে যায়নি? আমাদের মগজে সেই বার্তা পৌঁছায় নাই? এই আইনে আপনি আটক হলেন কিনা, আপনি কারাগারে গেলেন কিনা, আপনি নির্যাতিত হলেন কিনা – সেগুলো এখন আর বিষয় নয়। কেননা আপনার/আমার মগজের ভেতরে ভয় তৈরি করে দেয়া হয়েছে – কী লিখবেন কী লিখবেন না সেটা রাষ্ট্র আর বলবেনা, সরকার আর বলবেনা; বলার দরকার হবে না। প্রতিটি অক্ষর লেখার সময় আপনি মনে করবেন মোসতাকের কথা। সেটাই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, সরকারের উদ্দেশ্য।

সহিংসতার উদ্দেশ্য কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, অন্যদের জানিয়ে দেয়া যে এই পরিণতি তারও হতে পারে। এরপরেও যারা বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কল্প-কাহিনী শোনান তাঁদের নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই, কিন্ত যারা এখনও ভাবছেন যে কেবল মানবিকতার আবেদনই যথেষ্ট তাঁরা বুঝতে অনীহ যে মানবিকতা দিয়ে ক্ষমতার উগ্র আকাঙ্ক্ষা দমন করা যায়না। মোসতাকের মৃত্যুর পর পোস্ট-মর্টেম হবে কিনা, তা স্বচ্ছ হবে কিনা জানিনা কিন্ত এটা বুঝতে পারি – পোস্ট-মর্টেম দরকার আমাদের, চিন্তার, কাজের। 

বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক, চিন্তার কারণে হত্যা করার ঘটনা বিরল নয়, বিচার বহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটে অহরহ। কিন্ত আইনের মোড়কে ঢাকা হয়েছে মোসতাকের বিচার বহির্ভূত হত্যাকে, এটা বোঝা জরুরি। মোসতাক নেই, কিংবা বলতে পারেন শেষ পর্যন্ত মোসতাক ‘জামিন’ পেয়েছেন, ‘মুক্তি’ পেয়েছেন। আপনি কিন্ত জামিন পাননি, আমরা কেউ জামিন পাইনি।

লেখক : অধ্যাপক, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ব্যতিক্রমী এক ব্যতিক্রম

শওগাত আলী সাগর

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ব্যতিক্রমী এক ব্যতিক্রম

আর্থিকখাতের অনাচার, দুরাচার নিয়ে কথা বলার মানুষ এমনিতেই কম। হাতে গোনা যে কয়েকজন আছেন, তাদের অনেকেই আবার স্পষ্টভাবে নিজের ভাবনাগুলো বলেন না, বা বলতে পারেন না। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এই জায়গাটায় ব্যতিক্রমী এক ব্যতিক্রম।

ঋনখেলাপীদের বিরুদ্ধে, ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের পক্ষে, শেয়ারবাজারের কারসাজির বিরুদ্ধে তার মতো এমন অকুতোভয় যোদ্ধা আর কে আছে? অর্থপাচারের বিরুদ্ধে এমন অসম সাহসিকতায় আর কে কথা বলেছে?


 

সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ আর নেই

বুধবার রাজধানীর যেসব এলাকার মার্কেট বন্ধ থাকবে

আমেরিকার ইরানবিরোধী নীতি ব্যর্থ হয়েছে: রাশিয়া

টিকা নিয়ে এ পর্যন্ত ৬৩০ জনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া


সন্ধ্যা থেকেই (টরন্টো সময়) ফেসবুকের নিউজ ফিডে তাঁর ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। কতোজন তাকে নিয়ে কতো কিছু বলছেন। ফেসবুকের নিউজফিডে কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যায়, মানুষগুলো স্বজন হারানোর বেদনায় কি কষ্টটাই না চেপে রেখেছে।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এমন সময় চলে গেলেন,যখন কীনা বাংলাদেশের আর্থিকখাতসহ সামগ্রিক সুশাসনের পক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলার মানুষের সংখ্যাই কমে যাচ্ছে।

আপনাকে শ্রদ্ধা খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।

শওগাত আলী সাগর, প্রধান সম্পাদক, নতুন দেশ 

news24bd.tv আয়শা

 

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

মকসুদ ভাই, আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

মকসুদ ভাই, আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না

মকসুদ ভাই চলে গেলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) আমি প্রায় ছয় বছর তাঁর জুনিয়র সহকর্মী ছিলাম। ১৯৮৩ সালে আমি তাঁকে জানতাম না। বাংলাদেশে আমি তাঁর নামের সঙ্গেও পরিচিত ছিলাম না। তাঁর নামের সঙ্গে পরিচয় ঘটে দেশ থেকে বহুদূরে ওই সময়ের প্রাচীর ঘেরা জার্মান সিটি পশ্চিম বার্লিনে। সাংবাদিকতার ওপর তিন মাসের এক কর্মসূচিতে বার্লিনের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর জার্নালিজমে’ যাই ১৯৮৩ সালের জুন মাসে।

বাংলাদেশ থেকে আমার সঙ্গে ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন অধূনালুপ্ত বাংলাদেশ টাইমসের সাব-এডিটর আনোয়ারা বেগম। তিন মাসের জন্য আমাদের আবাস ছিল ইন্সটিটিউট থেকে একটু দূরে বার্লিনের ক্রুয়েজবার্গ এলাকায় ‘কলপিং হাউজে’। দূর বলে লাঞ্চের বিরতির সময় হোস্টেলে ফেরা হতো না। কিছু খেয়ে পাশেই কুরফুরস্ট্যানডাম এলাকার শপিং মলগুলোতে ঘুরতাম, কখনো ইন্সটিটিউটের লাউঞ্জে বসে টিভি দেখতাম বা আমাদের সতীর্থ আফ্রিকানদের সঙ্গে কথা বলতাম।

বইয়ে ঠাসা কয়েকটি বুক শেলফ ছিল। জার্মান ও ইংরেজি ভাষার বই। মাঝে মাঝে বই ঘাটি। মোটামোটা বইয়ের সারির ফাঁকে ছোট বই নজরে পড়ার কথা নয়। কিন্তু বইটির বাঁধাই দৃষ্টিনন্দন নয় বলেই হয়তো চোখে পড়েছে। টেনে নিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বইটি বাংলায়। লেখকের নাম হিসেবে লেখা আছে ‘সৈয়দ আবুল মকসুদ’। পড়তে শুরু করলাম। তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) কাজ করেন। আমি বার্লিনের ওই ইন্সটিটিউটে যাওয়ার পাঁচ-ছয় বছর আগে তিনি এবং দৈনিক ইত্তেফাকের রাহাত খান এক সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদ জার্মানিতে তাঁর অবস্থানের ওপর ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন। সেই প্রথম তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। আমি আনন্দিত হওয়ার পাশাপাশি একটু দু:খ বোধ করি। কারণ, আমার ইচ্ছা ছিল, জার্মানি থেকে দেশে ফিরে একটি ভ্রমণ কাহিনি লেখার। কলেজে থাকাকালে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর ‘ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র’, ‘বেদুইনের দেশে’, এবং প্রফেসব আবদুল হাই এর ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ’ দিন’ পড়ার পর মনে হতো কখনো বিদেশে গেলে এ ধরনের একটি বই লিখবো। কিন্তু মকসুদ ভাইয়ের কারণে আমার জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণের ওপর আমার কোনোকিছু লেখা হয়নি। 

দেশে ফিরেও মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়নি। বাসস এর সব রিপোর্টারের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্টতা থাকলেও মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় বার্লিন থেকে ফিরে আসার ১৯ বছর পর ২০০২ সালে আমি বাসস এ যোগ দেওয়ার পর। তিনি বাসস এর ইংরেজি বিভাগে তিনি সিনিয়র নিউজ এডিটর, আমি ইংরেজি বিভাগে যোগ দেই জুনিয়র নিউজ এডিটর হিসেবে। বাসস এর আগে আমি কখনো ইংরেজি সাংবাদিকতা করিনি। সেজন্য প্রথম কয়েকটি মাস একটু দ্বিধার মধ্যে ছিলাম। সেখানকার পুরোনো দু’একজন যারা জানতেন যে আমি বরাবর বাংলা সংবাদপত্রে কাজ করেছি, তারা আমার প্রতি একটু অবজ্ঞার ভাবও প্রকাশ করেন। কিন্তু সৈয়দ আবুল মকসুদ কখনো তা করেননি। আমরা যদি এক শিফটে থাকতাম, তাহলে তিনি সহায়তা করতেন এবং আমাকে সঙ্গে প্রথম কয়েকটি মাস সতর্কতার কাজ করে সকলের প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য পরামর্শ দিতেন। তাঁর পরামর্শ মেনে আমি উপকৃত হয়েছি এবং সম্ভবত বাসস এ কমবেশি সবার প্রিয়পাত্রই ছিলাম। 

সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদও সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন। কেউ তাঁকে হাসিমুখে ছাড়া কথা বলতে দেখেনি। তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। সবসময় মৃদুভাষী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালালে মকসুদ ভাই এ হামলার প্রতিবাদে পাশ্চাত্যের পোশাক বর্জন করে হজ্ব পালনকারীদের ইহরাম বাঁধার মতো দুই প্রস্থ শ্বেত বস্ত্র ধারণ করেন। তখন থেকে এ পোশাকই তাঁর প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠেছিল। বাসস এ কাজ করার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাঁর লেখায় সরকারের বিভিন্ন গণবিরোধী কাজের যথেষ্ট সমালোচনা থাকতো। সাংবাদিক নেতা আমানুল্লাহ কবীর যতোদিন বাসস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি নিউজরুমের মাঝ দিয়ে তাঁর রুমে আসা-যাওয়ার সময়ে মকসুদ ভাইকে দেখলে, ‘মকসুদ ভাই, আমাদের সরকার কী এতো খারাপ!’ অথবা ‘একটু রয়ে সয়ে লিখুন, মকসুদ ভাই,’ এ ধরনের কথা বলতেন। এর বেশি কিছু নয়। আমানুল্লাহ কবীরের পর বিএনপি সরকার বাসস এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিলেন গাজীউল হাসান খানকে। বিএনপি সরকারের বেনিফিশিয়ারি হিসেবে এর আগে তিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস মিনিষ্টার ছিলেন। 

গাজীউল হাসান খান মারদাঙ্গা গোছের মানুষ। তিনি যোগ দিয়ে প্রায় একতরফাভাবে ও অনেক ক্ষেত্রে বিধি বহির্ভূতভাে নিজের সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করে কাকে কী করা যায়; অর্থ্যাৎ কাকে সুযোগ দেয়া যায় ও কাকে সাইজ করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেন। আমাকেও যে সুযোগ দিয়েছেন তা অস্বীকার করবো না। তিনি সব সিনিয়র নিউজ এডিটরদের ডিঙিয়ে আমাকে ‘ডেপুটি চিফ নিউজ এডিটর’ হিসেবে পদোন্নতি দেন এবং একই সাথে আমার ওপর চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। আমি অত্যন্ত বিব্রত বোধ করি। কারণ বাংলাদেশে দুটি ক্ষেত্রে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে পদোন্নতি দেয়া হলে তা নিয়ে প্রচুর কানাঘুষা হয়, এবং তা হলো প্রধান বিচারপতির পদ ও সেনাবাহিনী প্রধানের পদ। যাদের ডিঙিয়ে যাওয়া হয় তাদের অনেকে ভগ্ন হৃদয়ে পদত্যাগ করেছেন এমন ঘটনাও আছে। 

গাজীউল হাসান খান তার রুমে ডাকেন সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদকে। বাইরের কারও সঙ্গে মিটিং না থাকলে আমরা তার অফিসে হরহামেশাই যাই। বিশেষ করে কফি পান করার ইচ্ছা হলে আরও বেশি যাই। কিন্তু কাউকে ডেকে পাঠালে তার অর্থ ভিন্ন হয়। মকসুদ ভাই ফিরে আসলে তার কাছে জানতে চাই। তিনি বলেন গাজীউল হাসান খান তাকে বলেছেন সরকারের সমালোচনা করে কলাম লেখা বন্ধ করতে অথবা পদত্যাগ করতে। তার ওপর নাকি ওপরের মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি তাকে ক’দিন পর সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলে এসেছেন। আমাদের বললেন যে নীতির সঙ্গে তিনি আপোষ করবেন না। যা তার দৃষ্টিতে সমালোচনাযোগ্য মনে হবে তিনি তা লিখবেন। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বিলম্ব করেননি মকসুদ ভাই। তিনি পদত্যাগ করেন।   

পদত্যাগ করলেও তিনি প্রায়ই বাসস এর আসতেন। তিনি কলাম লেখায় নিয়মিত হয়ে যান। মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন। তাঁকে মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে শরীক হয়ে মিছিলে, মানবন্ধনে ও অনশনে যোগ দিতেন। 

মকসুদ ভাই মাওলানা ভাসানীর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং বাংলাদেশে মাওলানার ওপর এককভাবে তার গবেষনা ও প্রকাশনা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ অথবা ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রস্থ মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন তাকে আমন্ত্রণ জানায় নিউইয়র্কে ভাসানীর ওপর আয়োজিত সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর আমরা আলিঙ্গনবদ্ধ হই, স্মৃতিগুলো রোমন্থন এবং ওজোন পার্কে আরেকজন ভাসানী প্রেমিক সৈয়দ টিপু সুলতানের বাগানে মধ্যাহ্ন ভোজে অংশগ্রহণ করি। পরবর্তী যে ক’দিন তিনি নিউইয়র্কে ছিলেন, প্রতিদিন সময় করে তার সঙ্গে দেখা করেছি। 

আজ ২৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে ওঠে ফেসবুকে প্রথমেই চোখে পড়ল বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামের পোস্টে মকসুদ ভাইয়ের মৃত্যুর খবর। একসাথে অনেক স্মৃতি ভিড় করলো। তাঁর ওপর কিছু কথা লেখার তাগিদ অনুভব করলাম। বিদায় মকসুদ ভাই। এ পৃথিবীতে আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না। পরজগতে আল্লাহ আপনাকে সুখে রাখুক।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

কাজ করলে একসঙ্গে করতে হবে এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য

শওগাত আলী সাগর

কাজ করলে একসঙ্গে করতে হবে এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য

১. চীনে উইঘুর মুসলমানদের উপর চীন সরকারের নিপীড়নকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হাউজ অব কমন্সে প্রস্তাব তুলেছিলো কানাডার কনজারভেটিভ পার্টি। সংসদের প্রধান বিরোধী দলের তোলা প্রস্তাবটির ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান আগেই জানিয়ে দিয়েছিলো ক্ষমতাসীন  লিবারেল পার্টি। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুরো ক্যাবিনেট এই প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে পক্ষে বা বিপক্ষে থাকবে না- সেটি ঘোষণা দেয়াই ছিলো।

শেষ পর্যন্ত হাউজ অব কমন্সে ভোটাভুটিতে সর্বসম্মতি ক্রমেই প্রস্তাবটি পাশ হয়। প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা ভোট দানে বিরত থাকলেও লিবারেল পার্টির প্রায় সব এমপিই ভোটে অংশ নেন এবং কনজারভেটিভ পার্টির প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। ভোটের হিসেবে ২৬৬ টি ভোট পরে প্রস্তাবের পক্ষে, বিপক্ষে একটি ভোটও পরেনি।

২.জাস্টিন ট্রুডো এবং তার মন্ত্রীরা কেন এই প্রস্তাবের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিলেন না? জাস্টিন ট্রুডো ব্যাখ্য দিয়েছেন, তিনি অন্যান্য দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে এ ব্যাপারে কাজ করতে চান। গ্রহণযোগ্য এবং যথাযথ আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্তের পরই তিনি এই ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়ার পক্ষে।

জাস্টিন ট্রুডোর কথায় যুক্তি আছে অবশ্যই। রাষ্ট্র যখন অন্য একটি দেশের ব্যাপারে কোনো অবস্থান নেয়- তখন সেটি আন্তর্জাতিক ফোরামের যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে হওয়াই সমীচীন। নিদেনপক্ষে নিজেদের উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগও হতে পারে। কনজারভেটিভ পার্টি প্রস্তাবটি এনেছে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য এবং মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগের প্রেক্ষিতে। 

৩. প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে লিবারেল পার্টির এমপিরা এই ভোটে অংশ নিয়েছেন এবং বিরোধীদলের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পার্লামেন্টারি সেক্রেটারিও প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এটিই হচ্ছে কানাডীয়ান গণতন্ত্রের সংস্কৃতি। সংসদীয় কার্যক্রমে এমপিরা নিজেদের মতো করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং তার প্রয়োগ ঘটাতে পারেন।

আরও পড়ুন:


আচরণগত অর্থনীতি: উভয়সঙ্কটের নৈতিক সমস্যা

ঢাকার সাত কলেজের পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আজ

ভারত থেকে এলো আরও ২০ লাখ ডোজ টিকা

৬ ঘণ্টা পর খুলনার সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক


৪. কানাডার কনজারভেটিভ পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টির নেতা এরিন ও টুল উইঘুর মুসলমানদের প্রতি আন্তরিকতার কারণে বা মানবাধিকারের চেতনা থেকে এই প্রস্তাবটি এনেছেন- রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তা মনে করছেন না। কনজারভেটিভের নতুন এই  নেতা এরিন ও টুল শুরু থেকেই প্রবল চীন বিরোধী এবং ছোটোখাটো নানা ইস্যুতেই তিনি প্রবলভাবে চীনের বিরোধীতা করছেন।

কানাডার সাথে চীনের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, সেটিকে আরো উসকে দেয়ার একটা চেষ্টা তার মধ্যে আছে। চীনের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পরলে ট্রুডোর লিবারেল চাপে পরবে- এমন একটি চিন্তা তার মনে কাজ করে থাকতে পারে বলেও অনেকে মনে করেন। কানাডার মিডিয়া অবশ্য অনেক আগেই তাকে ‘কানাডার ডোনাল্ড ট্রাম্প’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

শওগাত আলী সাগর, প্রধান সম্পাদক, নতুনদেশ

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর