সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ভাস্কর্য: ছুরি দেবদূত

হারুন আল নাসিফ

প্রিন্ট করুন printer
সন্ত্রাস ও সহিংসতার বিরুদ্ধে ভাস্কর্য: ছুরি দেবদূত

যুক্তরাজ্যে কেবল ছুরি দিয়ে ২৭ ফুট উঁচু একটি বিশাল ফেরেশতা বা দেবদূতের ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে। এক লাখ ছুরির সাহায্যে তৈরি এই ভাস্কর্যটি সহিংসতা ও আগ্রাসন বিরোধী জাতীয় স্মৃতিসৌধ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বিশেষ করে ছুরি সন্ত্রাস বিরোধী জাতীয় প্রতীকে পরিণত হয়েছে এটি। দেশটিতে ক্রমবর্ধমান ছুরি সহিংসতায় হতাহতদের স্মরণ এবং ব্রিটিশ সমাজের একটি মারাত্মক সমস্যা চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির আবশ্যকতার চেতনা থেকে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান আয়রনওয়ার্কের উদ্যোগে ভাস্কর অ্যালফি ব্র্যাডলি ও তার টিমের দুবছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল এ নাইফ এঞ্জেল।

এঞ্জেল বা দেবদূতের ভাস্কর্যের কমতি নেই পৃথিবীতে। বিশেষ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নির্মিত হয়েছে ডানাওয়ালা দেবদূতের অসংখ্য ভাস্কর্য। উদ্যান ও অন্যান্য জনসমাগম স্থল, গীর্জা, রাজপ্রাসাদ ও জাদুঘরে রক্ষিত এসব ভাস্কর্যের অনেকগুলোই জগৎখ্যাত। এইসব ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে পাথর, কংক্রিট, লোহা, স্টিল, তামা, ব্রোঞ্জ কিংবা সোনা-রুপা দিয়ে। কিন্তু কেবল ছুরি দিয়ে দেবদূতের ভাস্কর্য যুক্তরাজ্য তথা বিশ্বে এই প্রথম।

ইংল্যান্ডের ওসওয়েস্ট্রির শ্রপশায়ার ভিত্তিক একটি ব্রিটিশ পরিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘আয়রনওয়ার্ক’ ২০১৪ সালে ৪৪ হাজার চামচ দিয়ে ১৩ ফুট উঁচু একটি সিলভারব্যাক গরিলা তৈরি করে। এসময় ছুরি অপরাধের বিষয়টি ঘন ঘন সংবাদ শিরোনাম হচ্ছিলো। তাই একটি অর্থবহ ভাস্কর্যের মাধ্যমে ছুরিকাঘাতের মতো নৃশংস সহিংসতার বিষয়টিতে সচেতনতা সৃষ্টির কথা মাথায় আসে। বিষয়টি সমাজের সামনে নিয়ে আসতে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের লক্ষ্যে আয়রনওয়ার্কের টিম ও শিল্পী অ্যালফি ব্র্যাডলি পুরোপুরি ছুরি দিয়ে একটি দেবদূতের ভাস্কর্য তৈরির ধারণা নিয়ে আলোচনা করেন। উভয় পক্ষ সম্মত হন।

তো, এতো ছুরি কোথায় পাওয়া যাবে? পুলিশ বাহিনীর কাছ থেকে ছুরি সংগ্রহের অনুমতি চেয়ে ও অনুরোধ করে স্বরাষ্ট্র দপ্তরে যোগাযোগ করা হয়। আয়রনওয়ার্ক পুলিশবাহিনিকে ছুরি সংগ্রহের জন্য সম্পূর্ণ নিখরচায় বিন বা ঝুড়ি সরবরাহের প্রস্তাব দেয়। সাথে যারা সংরক্ষিত ঝুড়িতে ছুরি সমর্পণ করবে বা রেখে যাবে তাদের সাধারণ ক্ষমা করারও অনুরোধ জানানো হয়। স্থানীয় পুলিশবাহিনি ও ক্রাইম কমিশনারের অনুমতি পাওয়ার পর আয়রনওয়ার্কের নিজ খরচে প্রায় দুইশ’টি ছুরি ব্যাংক তৈরি করা হয়। একাজে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। এক-একটি ছুরি ব্যাংক তৈরিতে চার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত খরচ পড়ে যায়।

এসব ছুরি ব্যাংক পুলিশবাহিনির বিভিন্ন স্টেশনে ভেতরে বা বাইরে স্থাপন করা হয়। শ্রপশায়ারের ব্রিটিশ আয়রন সেন্টারের সহায়তায় ‘একটি জীবন বাঁচান, আপনার ছুরি সমর্পণ করুন’ শীর্ষক সাধারণ ক্ষমা কার্যক্রমের আওতায় লোকজন বেনামে এই প্রকল্পে স্বতস্ফূর্তভাবে ছুরি ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র জমা দিয়ে যায়। এছাড়া দুর্ঘটনার পর মামলার আলামত হিসেবে পুলিশের জব্দ করা কিংবা রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া ছুরিও এ ভাস্কর্য নির্মাণে দান করা হয়েছে। এগুলো সংগ্রহ করে আয়রনওয়ার্কের ওয়ার্কশপে নিয়ে যাওয়া হয়। শিল্পী অ্যালফি কাজ শুরু করেন।


আরও পড়ুন: নন্দিত শিল্পী সিয়ানফানেলির কলাম ভাস্কর্য: অধরা মায়াচিত্র


ইংল্যান্ড ও ওয়েলস জুড়ে সহিংস অপরাধে ব্যবহৃত ছুরিগুলো এতে ব্যবহৃত হয়েছে। ব্যবহৃত ছুরিগুলোর ৩০ শতাংশে এর আঘাতের শিকার ব্যক্তির শরীরের রক্ত বা ফ্লইুড লেগে ছিলো। এর মধ্যে কয়েকটি ব্লেডের ওপর খোদাই করে নিহতদের নাম লেখা হয়েছে। এছাড়া অনেক পরিবার ছুরি সহিংসতায় হারানো প্রিয়জনদের স্মরণে এবং প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করে আবেগঘন বার্তা লিখে পাঠিয়েছেন। এমনকি, এ অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিন্তু পরে ভুল বুঝতে পেরে অনুতাপ ও অনুশোনা করছেন এমন অনেকেও তাদের বার্তা পাঠিয়েছেন। এসব বার্তা খোদাই করে লেখা হয়েছে দেবদূতের ডানার ব্লেডে।

এ কাজে প্রতিটি ছুরি জীবাণুমুক্ত করে পরিষ্কার করার পাশাপাশি ছুরিগুলো যাতে আর কোনো  ক্ষতির কারণ না হয় তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকটি ছুরি সযত্নে ভোঁতা করতে হয়েছে। শিল্পী  প্রথমে স্টিল দিয়ে একটি কাঠামো এবং স্টিলের শিট দিয়ে বেসিক শেপটি তৈরি করেন। এর ওপর পরে ছুরিগুলো ঝালাই করা হয়। দেবদূতের ডানায় পালকের চেহারা দিতে কেবল ছুরির ব্লেড ব্যবহার করা হয়েছে। মাথার চুল বানানো হয়েছে ছুরর ব্লেড বাঁকিয়ে। ছুরির নানা রঙের বাট বা ডাঁটগুলো ব্যবহার করা হয়েছে হাত-পাসহ পুরো শরীরে। দেবদূতের মাথা ঈষৎ হেলানো, ভ্রু কুঞ্চিত, চেহারা বেদনাহত, দৃষ্টি আনত। হাতজোড়া সামনের দিকে এমন ভঙ্গিতে বাড়িয়ে দেয়া, যেনো বলতে চাইছে, ‘কেনো এমন করো, কেনো এমন করলে?’ ভাস্কর্যটির নকশা ও নির্মাণে শিল্পীর পুরো দুই বছর ব্যয় হয়। ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত চার বছর পরিশ্রমের পর ভাস্কর্যটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। এর ওজন দাঁড়ায় সাড়ে তিন টন।

নির্মাণের পর ২০১৮ সালে দেবদূত জাতীয় সহিংসতা বিরোধী সফরের মাধ্যমে তার সহিংসতা বিরোধী বার্তা ছড়িয়ে দিতে সব ধরনের হিংসাত্মক ও আক্রমণাত্মক আচরণের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান নিয়ে ইংল্যান্ডজুড়ে সফর শুরু করে। এ পর্যন্ত এটি মোট এগারোটি শহর ও নগর পরিদর্শন করেছে। প্রত্যেক জায়গায় বিপুল মানুষের সমাগম হয়েছে এবং ছুরি সন্ত্রাস বন্ধে এটি ব্যাপক সমর্থন লাভ করেছে। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এটি বর্তমানে শ্রপশায়ারে আয়রনওয়ার্ক সেন্টরের বাইরে রাখা হয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। ইংল্যান্ড ভ্রমণ শেষে আয়রনওয়ার্ক এ ভাস্কর্যটিকে লন্ডনের বিখ্যাত ট্রাফালগার স্কয়ারে স্থাপনের আবেদন জানিয়েছে।

হারুন আল নাসিফ, কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য