ছাত্রীর দুঃখজনক মৃত্যু, দিহান ও ভরসার প্রেম

আনোয়ার সাদী

প্রিন্ট করুন printer
ছাত্রীর দুঃখজনক মৃত্যু, দিহান ও ভরসার প্রেম

করোনার এই সময়ে একটা চাপা আতঙ্ক নিয়ে আমরা এখন বসবাস করছি। একটু গভীর রাতে কেউ ফোন দিলে অন্যপ্রান্তের মানুষটা একরাশ আতঙ্ক নিয়ে ’হ্যালো’ বলে। না জানি কী খারাপ খবর শুনতে হয়, সে টেনশন এখন প্রায় সবারই মনে কাজ করে। এজন্যই বোধহয় এমন সময়টাকে মহামারী বলা হয়।

এরমাঝে কলাবাগানে এক ছাত্রীর মৃত্যু সমাজকে নীরবে বিরাট এক ধাক্কা দিয়ে গেছে। পিতা-মাতা বুকের ভেতরে তার মেয়েটার নিরপাত্তা নিয়ে একটা হাহাকার টের পেয়েছেন। অনেক ছেলে সন্তানের বাবা –মা হয়তো এখন উঁকি দিচেছ নিজের ছেলের ঘরে, আর ভাবছে ঠিকঠাক বড় হচ্ছে তো ছেলে!

ধর্ষণ ও এরপর হত্যা, বিকৃত যৌনাচারে হত্যা, প্রেমে প্রলুব্ধ করে হত্যা, অপহরণ করে ধর্ষণ ও হত্যা নাকি স্বেচ্ছায় প্রেমের ফাঁদে জীবন বলি – এমন নানা বিশ্লেষন নানা কথা, চারদিকে শুনেছি, পড়েছি আরো শুনবো হয়তো পড়বো। আমি সে সব নিয়ে কিছু বলতে চাই না। পুরো বিষয়টি আদালতের হাতে ছেড়ে দিতে চাই। চাই সঠিক তদন্ত হোক, আদালত অপরাধের প্রকৃত ধরণ চিহ্নিত করুক, সে অনুয়ায়ী আইন যা সিদ্ধান্ত দিয়ে রেখেছে তা বাস্তবায়িত হোক। তদন্ত ও বিচার যেন নিজের গতিতে চলে। আমার কথা বলার জায়গাটি ভিন্ন।

ছাত্রীর মৃত্যূ একটি আস্থাহীনতার গল্পকে সামনে আনে। সম্পর্ক যা-ই হোক, বন্ধুত্ব বা প্রেম, একটা মেয়ে পরিপূর্ণ আস্থা না রাখলে একটা ছেলের ডাকে সাড়া দিয়ে তার বাড়ি, বা পার্ক বা হোটেল বা মাঠে দেখা করতে যায় না। আমাদের সমাজে মেয়েরা এতোটাই দূর্বল থাকে নিজেরা একটু বেড়াতে গেলেও এমনকী শপিং এ গেলেও সঙ্গে একজনকে নিয়ে যেতে পছন্দ করে। আর অপহরণের ভয় মেয়েদেরকে ছোটবেলা থেকেই দেখানো শুরু হয়।

বাচ্চাদের বলা হয় ওখানে যেও না তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। একা যেও না তোমাকে চুরি করে নিয়ে যাবে। অপহরণের শিকার হলে মেয়েদের দুর্গতি কী হয়, তা প্রকাশের ভাষা আমার নেই।  আমি ভাবি, এসব কথা না বলে, মেয়েদের যদি দৌড়াতে দেওয়া হয়, ছেলে বাচ্চাদের মতো শারীরিক শক্তি অর্জনের তাগিদ দেওয়া হয়, মানসিক দক্ষতা আরো বাড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, দেশের কতোই না উপকার হতো। ধনীদেশের মেয়েদেরকে কী ‘অবলা’ বলা হয়? এটাই বোধহয় আমাদেরই ধনধান্যপুষ্প ভরা দেশ, যাদের পেটে মানুষ হয়, তাদের জন্য ‘অবলা’ শব্দ বরাদ্দ করে রেখেছি।   
 
আজ থেকে বিশ বছর আগেও সহপাঠিরা মেয়েদের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা ছিলো। বন্ধুরা বন্ধুদের বড় সমর্থন ও নিরাপদ জায়গা ছিলো বলে এখন দাবী করা যায়। বন্ধুর কাছে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হওয়া, শরীরের বিশেষ জায়গা থেকে রক্তক্ষরণে চিকিৎসা পাওয়ার আগেই মরে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনকার বন্ধুত্ব ও প্রেমকে অনিরাপদ হিসাবে চিহ্নিত করে দিচ্ছে না কি?

গ্রুপ স্টাডি বা বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছি বলে, প্রেম করতে যাননি এমন প্রেমিক বা প্রেমিকা কয়জন আছে? তারা হয়তো একটু হাত ধরতে পারলে সুখে বর্তে যেতো। কেউ হয়তো একটা চিঠি দিয়ে আসতো । কী জানি ব্যতিক্রমতো আছেই কেউ কেউ হয়তো আরো সাহসী হয়ে শারীরিক সম্পর্কে যেতো, তাতে মরে যেতো কী ?

কলাবাগানের ঘটনায় যে অবিশ্বাস মানুষের মনে গেঁথে দিয়ে গেলো, তা মেগা সিটির মানুষের গৌরব মোটেও বাড়ায়নি, এ কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায়।

বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। দ্রুত বদলে যাচ্ছে সব। পৃথিবীর প্রয়োজনে এখন আমাদের মাঝে বিশ্ব নাগরিক হওয়ার প্রবণতা আছে। বিশ্বায়নের জানালা দিয়ে শুধু উন্নত জীবনবোধই আসবে তা কেন? বিশ্বের সমস্যাগুলোও তো আসবে। সত্য সুন্দর মানবিক বিনোদন শুধু আসছে তা নয়, অপসংস্কৃতিও আসছে, স্বাভাবিক সুন্দরের পাশাপাশি বিকৃতিও গ্রহন করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সে সব বেছে নেওয়ার দক্ষতা কী আমাদের তরুণরা অর্জন করতে পারছে? সেই দক্ষতা অর্জনের পরিবেশ কী আছে?  
এখন প্রশ্ন আসে, বড়রা কী ছোটদেরকে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো সহযোগিতা করছে? এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া জরুরি। সমাজের বড়রা মানে অভিভাবক, চোখের সামনে আদর্শ হওয়া লোকটি যদি নিজে ঠিক থেকে ছোটদের ঠিক রাখার পথটি দেখিয়ে দিতে না পারে, তাহলে ছোটদের ভবিষ্যৎ কী হতে পারে? এ এক প্রশ্ন । 

কলাবাগানের ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা কেউ চাই না। কিন্তু আমাদের চাওয়া বাস্তবায়নের উদ্যোগ কেউ কী নিয়েছে ? জানি এর জবাব নীরবতা। আপনার সন্তান যেহেতু আপনার সবচেয়ে প্রিয়, তাকে রক্ষা করতে তার সঙ্গে কথা বলুন। কথা বললে দূরত্ব কমে আসবে। দূরত্ব কমে আসা মানে সন্তানকে সুরক্ষা দিতে পারার বুদ্ধি দেওয়ার মতো পরিবেশে থাকা, নিজের মনকেও নিরাপত্তার প্রশান্তিতে রাখা । 

আনোয়ার সাদী, সিনিয়র নিউজ এডিটর, নিউজ টোয়েন্টিফোর।

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য