মানুষ কাজ করলে চলমান অর্থনীতি সচল হয়

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

মানুষ কাজ করলে চলমান অর্থনীতি সচল হয়

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

২০২০ চলে গেছে। প্রকৃতির নিয়মেই সবকিছু বিদায় নেয়। মানুষ যেমন বিদায় নেয়, তেমনি করে সময়ও বিদায় নেয়। মানুষ চলে গেলে আর ফিরে আসে না। সময় চলে গেলে সেও আর ফিরে আসে না। মানুষ চলে যায়। সবাইকে চলে যেতে হয়। চলে যেতে হবেই। প্রকৃতি কোনো কিছুকে চিরদিনের জন্য ধরে রাখতে পারেনা। তারপরেও নদী মরে গেলে যেমন তার চলার সরল রেখা রেখে যায় । মানুষ চলে গেলে রেখে যায় তার কর্ম সমূহ। সময় চলে গেলে তার দিন ক্ষন মাস বৎসরের মাধ্যমে তার স্মৃতি চিহ্ন রেখে যায়। সময়কে আমরা ভাগ করে নেই দিন, ক্ষন, মাস ও বৎসরের রূপ রেখায়।

খুব সম্ভব আমাদের যৌবনের প্রিয় কবি নির্মলেন্দু গুন, তাঁকে যৌবনের প্রিয় কবি বলছে কেন, যত দিন আমাদের প্রজম্মের ছেলেমেয়েরা বেঁচে থাকব, ততদিন তিনি আমাদের প্রাণের কবি হয়ে থাকবেন। নির্মলেন্দু গুনের এক কবিতায় মনে হয় এরকম পড়েছিলাম। তিনিও তার এক কবিতায় বলেছিলেন, সময়কে আমরা এভাবেই ভাগ করে নেই। এবার আসা যাক মূল কথায়। ২০২০ সাল যেমন আমাদের কাছে তমসায় আবৃত বিভীষিকার মত এসেছিল, তেমনি করে ২০২০ সাল আমাদেরকে হাতে ধরে শিখিয়েছে অনেক কিছু। যা আমরা গত জীবনে পার করা সময়ে শিখতে পারিনি। আবার ২০২০ সাল আমাদেরকে অনেক কিছু দিয়ে গেছে। আমাদেরকে একটি কথা মানতেই হবে।

২০২০ সাল আমাদেরকে আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, মানুষ কখনো পরাজিত হয় না। মানুষ পরাজিত হতে পারে না। যত বড়ই বিরুদ্ধ শক্তি মানুষের সামনে তার কালো হাত মেলে ধরুক না কেনো, মানুষে সেই বিরুদ্ধ শক্তির কালো হাত ভেঙ্গে চুরমার করে তার আপন শক্তিকে জয়ের রথে তুলে দিয়ে আপন গন্তব্যে নিয়ে গেছে। বিরুদ্ধ শক্তি যতই ভয়ানক হোক না কেন, সে বিরুদ্ধ শক্তি মানুষের প্রাণের শক্তির কাছে হেরে গেছে বার বার। 

মূল কথা হল কোনো বিরুদ্ধ শক্তিই মানুষের চলার গতিকে রুদ্ধ করতে পারে না। কোভিড-১৯ এর তান্ডবে মানুষ যখন দিশেহারা, তখন মানুষ শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় বলেছে, আমরা ঘরে বসে থাকব না। আমাদেরকে বাঁচতে হবে। বাঁচতে হলে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। কাজ না করলে বাঁচা যাবে না। কেননা কাজ করলেই পকেটে পয়সা কড়ি আসে। সেই পয়সা-কড়ি দিয়েই বৌ-বাচ্চা নিয়ে মানুষ ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ কাজ করলে চলমান অর্থনীতি সচল হয়। দেশের চলমান অর্থনীতি সচল হলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থাও শক্তিশালী হয়। আমরা সবাই জানি মানুষের জীবন নদীর মতো প্রবাহমান। কেউ যদি তা না মানেন, তাতে নদীর মতো প্রবাহমান জীবনের কিছু যায় আসে না। নদীকে যেমন কোনো কিছু আটকে রাখতে পারেনা, তেমনি করে মানুষের জীবনের গতিকে কোনো কিছু বাধাগ্রস্ত করতে পারেনা। নদীর স্রোত কোথাও বাধা ফেলে নদীর  স্রোতআটকে থাকেনা।

বাধা প্রাপ্ত নদীর  স্রোত বাধাকে অতিক্রম করে তার গন্তব্যের দিকে চলে যায়। মানুষের জীবনকে যদি কোথাও কখনো প্রকৃতির বিরুদ্ধ শক্তি এক জায়গায় আটকে রাখতে চায়, মানুষ তখন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। সেই বিদ্রোহী মানুষ সকল বিরোধী শক্তিকে ভেঙ্গেচুরে তার আপন বিজয়ের ধ্বনি ঘোষনা করে থাকে। নদী কোথাও আটকে গেলে নদী মরে যায়। তেমনি করে মানুষের জীবনও তখনই শেষ হয়ে যায়, যখন মানুষ তার মন থেকে মরে যায়। মানুষ মন থেকে মরে গেলে আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। নদী তার  স্রোত হারিয়ে মরে গেলে তার সকল প্রাণ শক্তি হারিয়ে মরা খালে পরিনত হয়। 

২০২০ সাল আমাদেরকে  দিয়েছে অনেক কিছু। আমাদের চিন্তা শক্তিকে এক লাফে হাজার হাজার  মাইল দূরে নিয়ে গেছে। প্রগতির অগ্রযাত্রাকে আরও গতিময় করেছে মানুষের চিন্তা শক্তি মসৃন হওয়ার জন্যে। মানুষ চিন্তা করে বুঝেছে মানুষের চেহারা মুখের ভাষা ভিন্ন ভিন্ন হলেও সকল মানুষ একই সমস্যার সম্মুখীন। আজ কোভিড-১৯ ভাইরাসের মত মহামারী কিংবা প্রাণঘাতী সমস্যায় ছোট বড় ধনী গরীব রাষ্ট্র সমূহের বসবাসকারী সকল মানুষেই আক্রান্ত।

এই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে মানুষ বুঝতে পারছে সকল রাষ্ট্রের মানুষই মহাবিপদে আছে। শুধু আমাদের মত রাষ্ট্রগুলোর মানুষই নয়, সকল রাষ্ট্রের মানুষই একটা বিষয় অনুধাবন করতে পারেছে, আর তা হল প্রাকৃতিক সমস্যা যখন মানুষের মধ্যে আসে, তখন সমস্ত পৃথিবীর মানুষ একই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে অন্যের দ্বারস্ত হয়ে থাকে। 

মানুষের শরীরের বর্ণ থেকে শুরু করে কোন রকমের ভেদাভেদ মানুষের ঐক্যকে ভাঙ্গতে পারে না। আজকের পৃথিবী কোভিড-১৯ ভাইরাস আক্রান্ত মানুষকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখানে মানুষ বুঝতে পারছে মানুষের সামগ্রীক ঐক্য ছাড়া এই প্রাণঘাতী কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে না। মানুষের এই শিক্ষা মানুষকে বুঝিয়ে দিয়েছে অহংকার কিংবা অস্বাভাবিক ঐশ্চর্য্য মানুষকে মরণঘাতী কোনো ভাইরাস বা অন্য কোনো সমস্যা থেকে রক্ষা করতে পারে না। তাই দেখা যায় আজ পৃথিবীর সকল প্রান্তের মানুষ কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এক হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিকরা কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য গবেষনাগারে বসে রাতদিন পরিশ্রম করে কাজ করে যাচ্ছেন মানুষকে রক্ষা করার জন্য। আজ ইউরোপের গবেষনাগারে কিংবা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের গবেষনাগারে তৈরি হওয়া ভ্যাকসিন কেবল ইউরোপের মানুষকেই রক্ষা করবে না কিংবা পৃথিবীর যে প্রান্তের বৈজ্ঞানিকরাই মরণঘাতী কোভিড-১৯ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য প্রতিষেধক আবিষ্কার করুন না কেন, তা কেবল আবিষ্কার হওয়া প্রান্তের মানুষকেই রক্ষা করবে না, বরং সমগ্র পৃথিবীর সকল মানব জাতিকেই রক্ষা করবে। 

কথায় বলে চোরে না শুনে ধর্মের বাণী। মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখেছে মানুষের দুর্বলতাকে পুঁজি করে একশ্রেণীর মানুষ সকল মানবতাকে ভুলে রাষ্ট্রের সম্পদ লুন্ঠণ করার জন্য উন্মাদ নৃত শুরু করে দিয়েছে। কোভিড-১৯ ভাইরাস পরীক্ষার নামে ভদ্রবেশী এক ধরনের চোর বাটপার (যারা শিক্ষিত কিংবা উচ্চ পদে কর্মরত) কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষের শরীরে আছে কিনা, তা পরীক্ষা না করেই মানুষকে পজিটিভ কিংবা নেগেটিভের রির্পোট দিতে থাকেন। এই শ্রেণির লোকেরা মানুষের অসহায়ত্বকে নিজেদের লাভ-লোকসানের মাধ্যম হিসাবে ধরে নিয়ে লুটে নিয়েছে মানুষের পকেটের টাকা। কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষকে শিখিয়েছে মানুষের চরিত্র সংকট কালে কেমন হয়ে থাকে কিংবা কোভিড-১৯ ভাইরাস মানুষকে এটাই বুঝিয়ে দিয়েছে, মানুষ হয়ে জন্ম গ্রহণ করলেই মানুষ হওয়া যায় না। মানুষ হতে গেলে মানুষের মধ্যে মানুষের সুচরিত্রটুকু বিরাজমান থাকতে হয়। 

যারা বলে থাকেন ২০২০ সাল শুধু আমাদেরকে অন্ধকারের দিকেই নিয়ে গেছে, কেন জানি মনে হয় তাদের এই কথাটি সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব এসেছে বলেই, পৃথিবীর বিজ্ঞানের গবেষনাগারে নতুন সৃষ্টির চিন্তা চেতনা মানুষের মেধা ও মননকে প্রগতির নতুন দিকে ধাবিত করেছে। মানুষ অনুধাবন করেছে বিপদ কালে মানুষকেই মানুষের পাশে যেতে হয়। একশ্রণির মানুষ অন্ধকারে বসে যতই মানুষের বিরুদ্ধে কিংবা জগৎ সংসারের বিপরীতে ষড়যন্ত্র করে যাক না কেন, ষড়যন্ত্রকারীরা কখনোই সমষ্টিগত মানুষের শুভ চিন্তার ঐক্যের মিছিলকে মাঝ পথে ছত্রভঙ্গ করতে পারে না। সমষ্টিগত মানুষের ঐক্যবদ্ধ আলোর মিছিল ঠিকই তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়। 

যারা কোভিড-১৯ ভাইরাসকে পুঁজি করে মানুষের পকেটের টাকা লুন্ঠন করতে উলঙ্গ নৃত্য শুরু করেছিলেন, তারা কেবল মানুষের ধিক্কার আর ঘৃণাটুকুই পেয়েছেন। যারা কোভিড-১৯ ভাইরাসকে পুঁজি করে রাষ্ট্রের টাকা এবং অসহায় গরীব মানুষের পকেটের টাকা চুরি করতে ব্যস্ত ছিলেন, তাদেরকে মানুষ চোর বাটপার ছাড়া আর কিছুই ভাবে না। কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব কালে সাধারণ মানুষ সাময়িক কালের জন্য ভীত হয়ে পড়লেও, এক সময় কিন্তু মানুষ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সাহসী মানুষের দল সাময়িক কালের সকল ভীতি ও বিভ্রান্তি কাটিয়ে কোভিড-১৯ ভাইরাসের বিষাক্ত ছোঁবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সাহসী মনোবৃত্তি নিয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। মানুষের মেধা ও বুদ্ধিমত্তার কাছে কোভিড- ১৯ ভাইরাসের বিষাক্ত নীল ছোঁবল একদিন পরাজিত হবে, মানুষ তা অব্যশই বিশ্বাস করে। সাহসী মানুষের বিশ্বাসের কর্মকান্ড মানুষকে আলোর পথে নিয়ে যাবে, তা ইতিবাচক মানুষের দল সরল মনে বিশ্বাস করে।


কেমন চলছে প্রমিলা ক্রিকেটারদের ক্যাম্প

গুলির শব্দের সূত্র ধরে মিলল বড়সড় অস্ত্র কারখানার সন্ধান

দিল্লিতে ইসরায়েলের দূতাবাসের সামনে বিস্ফোরণ


২০২০ সাল কোভিড-১৯ ভাইরাসের তান্ডব লীলায় কেটে গেছে। আমাদের জীবন যাপনের আকাশে ২০২১ এর উদীয়মান সূর্য্য নতুনের বার্তা নিয়ে তার আলোক রাশি আমাদের মাঝে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ২০২১ এর সূর্য্যরে পবিত্র আলোক রেখা আমাদের চলমান কোভিড-১৯ ভাইরাসের আতংকের দুষ্ট ছায়া দূর করে, মানুষের জীবন যাপনকে অবশ্যই আবার স্বাভাবিক করে তুলবে। এই আশা নিয়ে পৃথিবীর মানুষ ২০২১ এর যাত্রাপথের সঙ্গী হয়েছে।

তাই বলছিলাম, ২০২০ সাল যেমন আমাদেরকে আতংকের মাঝে ফেলেছে, ঠিক তেমনি করে ২০২০ সালই আমাদেরকে হাতে ধরে অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমরা পৃথিবীর মানুষ ২০২০ এর সকল শিক্ষা এবং অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ২০২১ এর আলোক রাশিতে স্নাত হয়ে আবার পবিত্র হয়ে উঠব, এই বিশ্বাস যেন আমরা মনের মধ্যে রাখি। বিশ্বাস হারালে মানুষের আর কিছুই থাকে না। কথাটা যেন আমরা পৃথিবীর মানুষ সকল সময় মনের গভীরে লালন করি। ২০২১ সাল অবশ্যই আমাদের শুভ স্বপ্নের সফলতার পথ দেখাবে।

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল:-আইনজীবী, কবি,গল্পকার, কালীবাড়ী রোড, হবিগঞ্জ।

news24bd.tv নাজিম

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ব্যতিক্রমী এক ব্যতিক্রম

শওগাত আলী সাগর

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ব্যতিক্রমী এক ব্যতিক্রম

আর্থিকখাতের অনাচার, দুরাচার নিয়ে কথা বলার মানুষ এমনিতেই কম। হাতে গোনা যে কয়েকজন আছেন, তাদের অনেকেই আবার স্পষ্টভাবে নিজের ভাবনাগুলো বলেন না, বা বলতে পারেন না। খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এই জায়গাটায় ব্যতিক্রমী এক ব্যতিক্রম।

ঋনখেলাপীদের বিরুদ্ধে, ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের পক্ষে, শেয়ারবাজারের কারসাজির বিরুদ্ধে তার মতো এমন অকুতোভয় যোদ্ধা আর কে আছে? অর্থপাচারের বিরুদ্ধে এমন অসম সাহসিকতায় আর কে কথা বলেছে?


 

সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ আর নেই

বুধবার রাজধানীর যেসব এলাকার মার্কেট বন্ধ থাকবে

আমেরিকার ইরানবিরোধী নীতি ব্যর্থ হয়েছে: রাশিয়া

টিকা নিয়ে এ পর্যন্ত ৬৩০ জনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া


সন্ধ্যা থেকেই (টরন্টো সময়) ফেসবুকের নিউজ ফিডে তাঁর ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে। কতোজন তাকে নিয়ে কতো কিছু বলছেন। ফেসবুকের নিউজফিডে কান পাতলে স্পষ্ট শোনা যায়, মানুষগুলো স্বজন হারানোর বেদনায় কি কষ্টটাই না চেপে রেখেছে।

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এমন সময় চলে গেলেন,যখন কীনা বাংলাদেশের আর্থিকখাতসহ সামগ্রিক সুশাসনের পক্ষে উচ্চস্বরে কথা বলার মানুষের সংখ্যাই কমে যাচ্ছে।

আপনাকে শ্রদ্ধা খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ।

শওগাত আলী সাগর, প্রধান সম্পাদক, নতুন দেশ 

news24bd.tv আয়শা

 

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

মকসুদ ভাই, আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

মকসুদ ভাই, আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না

মকসুদ ভাই চলে গেলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) আমি প্রায় ছয় বছর তাঁর জুনিয়র সহকর্মী ছিলাম। ১৯৮৩ সালে আমি তাঁকে জানতাম না। বাংলাদেশে আমি তাঁর নামের সঙ্গেও পরিচিত ছিলাম না। তাঁর নামের সঙ্গে পরিচয় ঘটে দেশ থেকে বহুদূরে ওই সময়ের প্রাচীর ঘেরা জার্মান সিটি পশ্চিম বার্লিনে। সাংবাদিকতার ওপর তিন মাসের এক কর্মসূচিতে বার্লিনের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর জার্নালিজমে’ যাই ১৯৮৩ সালের জুন মাসে।

বাংলাদেশ থেকে আমার সঙ্গে ওই কর্মসূচিতে অংশ নেন অধূনালুপ্ত বাংলাদেশ টাইমসের সাব-এডিটর আনোয়ারা বেগম। তিন মাসের জন্য আমাদের আবাস ছিল ইন্সটিটিউট থেকে একটু দূরে বার্লিনের ক্রুয়েজবার্গ এলাকায় ‘কলপিং হাউজে’। দূর বলে লাঞ্চের বিরতির সময় হোস্টেলে ফেরা হতো না। কিছু খেয়ে পাশেই কুরফুরস্ট্যানডাম এলাকার শপিং মলগুলোতে ঘুরতাম, কখনো ইন্সটিটিউটের লাউঞ্জে বসে টিভি দেখতাম বা আমাদের সতীর্থ আফ্রিকানদের সঙ্গে কথা বলতাম।

বইয়ে ঠাসা কয়েকটি বুক শেলফ ছিল। জার্মান ও ইংরেজি ভাষার বই। মাঝে মাঝে বই ঘাটি। মোটামোটা বইয়ের সারির ফাঁকে ছোট বই নজরে পড়ার কথা নয়। কিন্তু বইটির বাঁধাই দৃষ্টিনন্দন নয় বলেই হয়তো চোখে পড়েছে। টেনে নিলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। বইটি বাংলায়। লেখকের নাম হিসেবে লেখা আছে ‘সৈয়দ আবুল মকসুদ’। পড়তে শুরু করলাম। তিনি বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) কাজ করেন। আমি বার্লিনের ওই ইন্সটিটিউটে যাওয়ার পাঁচ-ছয় বছর আগে তিনি এবং দৈনিক ইত্তেফাকের রাহাত খান এক সঙ্গে সেখানে গিয়েছিলেন। সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদ জার্মানিতে তাঁর অবস্থানের ওপর ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন। সেই প্রথম তাঁর নামের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ঘটে। আমি আনন্দিত হওয়ার পাশাপাশি একটু দু:খ বোধ করি। কারণ, আমার ইচ্ছা ছিল, জার্মানি থেকে দেশে ফিরে একটি ভ্রমণ কাহিনি লেখার। কলেজে থাকাকালে প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁর ‘ইস্তাম্বুল যাত্রীর পত্র’, ‘বেদুইনের দেশে’, এবং প্রফেসব আবদুল হাই এর ‘বিলেতে সাড়ে সাতশ’ দিন’ পড়ার পর মনে হতো কখনো বিদেশে গেলে এ ধরনের একটি বই লিখবো। কিন্তু মকসুদ ভাইয়ের কারণে আমার জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমণের ওপর আমার কোনোকিছু লেখা হয়নি। 

দেশে ফিরেও মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়নি। বাসস এর সব রিপোর্টারের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্টতা থাকলেও মকসুদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় বার্লিন থেকে ফিরে আসার ১৯ বছর পর ২০০২ সালে আমি বাসস এ যোগ দেওয়ার পর। তিনি বাসস এর ইংরেজি বিভাগে তিনি সিনিয়র নিউজ এডিটর, আমি ইংরেজি বিভাগে যোগ দেই জুনিয়র নিউজ এডিটর হিসেবে। বাসস এর আগে আমি কখনো ইংরেজি সাংবাদিকতা করিনি। সেজন্য প্রথম কয়েকটি মাস একটু দ্বিধার মধ্যে ছিলাম। সেখানকার পুরোনো দু’একজন যারা জানতেন যে আমি বরাবর বাংলা সংবাদপত্রে কাজ করেছি, তারা আমার প্রতি একটু অবজ্ঞার ভাবও প্রকাশ করেন। কিন্তু সৈয়দ আবুল মকসুদ কখনো তা করেননি। আমরা যদি এক শিফটে থাকতাম, তাহলে তিনি সহায়তা করতেন এবং আমাকে সঙ্গে প্রথম কয়েকটি মাস সতর্কতার কাজ করে সকলের প্রিয়ভাজন হওয়ার জন্য পরামর্শ দিতেন। তাঁর পরামর্শ মেনে আমি উপকৃত হয়েছি এবং সম্ভবত বাসস এ কমবেশি সবার প্রিয়পাত্রই ছিলাম। 

সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদও সবার প্রিয়পাত্র ছিলেন। কেউ তাঁকে হাসিমুখে ছাড়া কথা বলতে দেখেনি। তিনি কখনো উচ্চকণ্ঠ ছিলেন না। সবসময় মৃদুভাষী ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন ২০০৩ সালে ইরাকে হামলা চালালে মকসুদ ভাই এ হামলার প্রতিবাদে পাশ্চাত্যের পোশাক বর্জন করে হজ্ব পালনকারীদের ইহরাম বাঁধার মতো দুই প্রস্থ শ্বেত বস্ত্র ধারণ করেন। তখন থেকে এ পোশাকই তাঁর প্রধান পরিচয় হয়ে ওঠেছিল। বাসস এ কাজ করার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাঁর লেখায় সরকারের বিভিন্ন গণবিরোধী কাজের যথেষ্ট সমালোচনা থাকতো। সাংবাদিক নেতা আমানুল্লাহ কবীর যতোদিন বাসস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক ছিলেন তিনি নিউজরুমের মাঝ দিয়ে তাঁর রুমে আসা-যাওয়ার সময়ে মকসুদ ভাইকে দেখলে, ‘মকসুদ ভাই, আমাদের সরকার কী এতো খারাপ!’ অথবা ‘একটু রয়ে সয়ে লিখুন, মকসুদ ভাই,’ এ ধরনের কথা বলতেন। এর বেশি কিছু নয়। আমানুল্লাহ কবীরের পর বিএনপি সরকার বাসস এর প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিলেন গাজীউল হাসান খানকে। বিএনপি সরকারের বেনিফিশিয়ারি হিসেবে এর আগে তিনি ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রেস মিনিষ্টার ছিলেন। 

গাজীউল হাসান খান মারদাঙ্গা গোছের মানুষ। তিনি যোগ দিয়ে প্রায় একতরফাভাবে ও অনেক ক্ষেত্রে বিধি বহির্ভূতভাে নিজের সুযোগ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করে কাকে কী করা যায়; অর্থ্যাৎ কাকে সুযোগ দেয়া যায় ও কাকে সাইজ করা যায়, সেদিকে মনোযোগ দেন। আমাকেও যে সুযোগ দিয়েছেন তা অস্বীকার করবো না। তিনি সব সিনিয়র নিউজ এডিটরদের ডিঙিয়ে আমাকে ‘ডেপুটি চিফ নিউজ এডিটর’ হিসেবে পদোন্নতি দেন এবং একই সাথে আমার ওপর চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব ন্যস্ত করেন। আমি অত্যন্ত বিব্রত বোধ করি। কারণ বাংলাদেশে দুটি ক্ষেত্রে সিনিয়রদের ডিঙিয়ে পদোন্নতি দেয়া হলে তা নিয়ে প্রচুর কানাঘুষা হয়, এবং তা হলো প্রধান বিচারপতির পদ ও সেনাবাহিনী প্রধানের পদ। যাদের ডিঙিয়ে যাওয়া হয় তাদের অনেকে ভগ্ন হৃদয়ে পদত্যাগ করেছেন এমন ঘটনাও আছে। 

গাজীউল হাসান খান তার রুমে ডাকেন সৈয়দ সৈয়দ আবুল মকসুদকে। বাইরের কারও সঙ্গে মিটিং না থাকলে আমরা তার অফিসে হরহামেশাই যাই। বিশেষ করে কফি পান করার ইচ্ছা হলে আরও বেশি যাই। কিন্তু কাউকে ডেকে পাঠালে তার অর্থ ভিন্ন হয়। মকসুদ ভাই ফিরে আসলে তার কাছে জানতে চাই। তিনি বলেন গাজীউল হাসান খান তাকে বলেছেন সরকারের সমালোচনা করে কলাম লেখা বন্ধ করতে অথবা পদত্যাগ করতে। তার ওপর নাকি ওপরের মহল থেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তিনি তাকে ক’দিন পর সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলে এসেছেন। আমাদের বললেন যে নীতির সঙ্গে তিনি আপোষ করবেন না। যা তার দৃষ্টিতে সমালোচনাযোগ্য মনে হবে তিনি তা লিখবেন। সিদ্ধান্ত নিতে খুব বিলম্ব করেননি মকসুদ ভাই। তিনি পদত্যাগ করেন।   

পদত্যাগ করলেও তিনি প্রায়ই বাসস এর আসতেন। তিনি কলাম লেখায় নিয়মিত হয়ে যান। মানবতাবাদী আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হন। তাঁকে মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে ও পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে শরীক হয়ে মিছিলে, মানবন্ধনে ও অনশনে যোগ দিতেন। 

মকসুদ ভাই মাওলানা ভাসানীর একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং বাংলাদেশে মাওলানার ওপর এককভাবে তার গবেষনা ও প্রকাশনা সম্ভবত সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ অথবা ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রস্থ মাওলানা ভাসানী ফাউন্ডেশন তাকে আমন্ত্রণ জানায় নিউইয়র্কে ভাসানীর ওপর আয়োজিত সেমিনারে অংশগ্রহণ করতে। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার পর আমরা আলিঙ্গনবদ্ধ হই, স্মৃতিগুলো রোমন্থন এবং ওজোন পার্কে আরেকজন ভাসানী প্রেমিক সৈয়দ টিপু সুলতানের বাগানে মধ্যাহ্ন ভোজে অংশগ্রহণ করি। পরবর্তী যে ক’দিন তিনি নিউইয়র্কে ছিলেন, প্রতিদিন সময় করে তার সঙ্গে দেখা করেছি। 

আজ ২৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে ওঠে ফেসবুকে প্রথমেই চোখে পড়ল বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজামের পোস্টে মকসুদ ভাইয়ের মৃত্যুর খবর। একসাথে অনেক স্মৃতি ভিড় করলো। তাঁর ওপর কিছু কথা লেখার তাগিদ অনুভব করলাম। বিদায় মকসুদ ভাই। এ পৃথিবীতে আপনার সঙ্গে আর দেখা হবে না। পরজগতে আল্লাহ আপনাকে সুখে রাখুক।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

কাজ করলে একসঙ্গে করতে হবে এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য

শওগাত আলী সাগর

কাজ করলে একসঙ্গে করতে হবে এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য

১. চীনে উইঘুর মুসলমানদের উপর চীন সরকারের নিপীড়নকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হাউজ অব কমন্সে প্রস্তাব তুলেছিলো কানাডার কনজারভেটিভ পার্টি। সংসদের প্রধান বিরোধী দলের তোলা প্রস্তাবটির ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান আগেই জানিয়ে দিয়েছিলো ক্ষমতাসীন  লিবারেল পার্টি। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুরো ক্যাবিনেট এই প্রস্তাবের ভোটাভুটিতে পক্ষে বা বিপক্ষে থাকবে না- সেটি ঘোষণা দেয়াই ছিলো।

শেষ পর্যন্ত হাউজ অব কমন্সে ভোটাভুটিতে সর্বসম্মতি ক্রমেই প্রস্তাবটি পাশ হয়। প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা ভোট দানে বিরত থাকলেও লিবারেল পার্টির প্রায় সব এমপিই ভোটে অংশ নেন এবং কনজারভেটিভ পার্টির প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। ভোটের হিসেবে ২৬৬ টি ভোট পরে প্রস্তাবের পক্ষে, বিপক্ষে একটি ভোটও পরেনি।

২.জাস্টিন ট্রুডো এবং তার মন্ত্রীরা কেন এই প্রস্তাবের পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিলেন না? জাস্টিন ট্রুডো ব্যাখ্য দিয়েছেন, তিনি অন্যান্য দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে এ ব্যাপারে কাজ করতে চান। গ্রহণযোগ্য এবং যথাযথ আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্তের পরই তিনি এই ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়ার পক্ষে।

জাস্টিন ট্রুডোর কথায় যুক্তি আছে অবশ্যই। রাষ্ট্র যখন অন্য একটি দেশের ব্যাপারে কোনো অবস্থান নেয়- তখন সেটি আন্তর্জাতিক ফোরামের যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে হওয়াই সমীচীন। নিদেনপক্ষে নিজেদের উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগও হতে পারে। কনজারভেটিভ পার্টি প্রস্তাবটি এনেছে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্য এবং মানবাধিকার সংস্থার অভিযোগের প্রেক্ষিতে। 

৩. প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রী পরিষদের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে লিবারেল পার্টির এমপিরা এই ভোটে অংশ নিয়েছেন এবং বিরোধীদলের প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পার্লামেন্টারি সেক্রেটারিও প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এটিই হচ্ছে কানাডীয়ান গণতন্ত্রের সংস্কৃতি। সংসদীয় কার্যক্রমে এমপিরা নিজেদের মতো করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং তার প্রয়োগ ঘটাতে পারেন।

আরও পড়ুন:


আচরণগত অর্থনীতি: উভয়সঙ্কটের নৈতিক সমস্যা

ঢাকার সাত কলেজের পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আজ

ভারত থেকে এলো আরও ২০ লাখ ডোজ টিকা

৬ ঘণ্টা পর খুলনার সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক


৪. কানাডার কনজারভেটিভ পার্টি এবং কনজারভেটিভ পার্টির নেতা এরিন ও টুল উইঘুর মুসলমানদের প্রতি আন্তরিকতার কারণে বা মানবাধিকারের চেতনা থেকে এই প্রস্তাবটি এনেছেন- রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা তা মনে করছেন না। কনজারভেটিভের নতুন এই  নেতা এরিন ও টুল শুরু থেকেই প্রবল চীন বিরোধী এবং ছোটোখাটো নানা ইস্যুতেই তিনি প্রবলভাবে চীনের বিরোধীতা করছেন।

কানাডার সাথে চীনের সম্পর্কে যে টানাপড়েন চলছে, সেটিকে আরো উসকে দেয়ার একটা চেষ্টা তার মধ্যে আছে। চীনের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পরলে ট্রুডোর লিবারেল চাপে পরবে- এমন একটি চিন্তা তার মনে কাজ করে থাকতে পারে বলেও অনেকে মনে করেন। কানাডার মিডিয়া অবশ্য অনেক আগেই তাকে ‘কানাডার ডোনাল্ড ট্রাম্প’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

শওগাত আলী সাগর, প্রধান সম্পাদক, নতুনদেশ

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

আচরণগত অর্থনীতি: উভয়সঙ্কটের নৈতিক সমস্যা

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

আচরণগত অর্থনীতি: উভয়সঙ্কটের নৈতিক সমস্যা

নীচের সমস্যাটি বাস্তব জীবনেও ঘটে, তবে একটু গোলমেলে। তা নাহলে এটুকুর সমাধান করেই কেনো John Nash অর্থনীতির নোবেল পেলেন,  এবং তাঁকে নিয়ে Beautiful Mind এর মতো ভালো একটি ফিল্ম হবে। তবে এ নিয়ে বেশি চিন্তা করলে John Nash এর মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে! কাজেই খুব কৌতূহল না হলে এর ভেতর না ঢোকাই ভালো। 

সমস্যাটি এরকম:

আমি আর আমার এক বন্ধু একটা বিশেষ পারিস্থিতিতে পড়েছি। আমাদের একে অপরকে না জানিয়ে দুটো সিদ্ধান্তের যে কোনো একটি নিতে হবে। দুজনের সিদ্ধান্ত মিলে যে ফলাফল তার উপর দুজনের লাভ-ক্ষতি নির্ভর করবে, অর্থাৎ আমার কী হবে তা শুধু আমার সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করবে না। একেক জনের দুটি বিকল্প সিদ্ধান্তের সঙ্গে অন্য জনের দুটি বিকল্প সিদ্ধান্ত মিলিয়ে মোট চারটি সম্ভাব্য বিকল্প সমাধান হতে পারে। ধরা যাক এই চারটি সমাধানের ফলাফল নিম্নরূপ:

(১) আমরা দুজনেই প্রথম সিদ্ধান্ত নিলে দুজনেরই সামান্য লাভ হবে। 
(২) দুজনেই দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত নিলে দুজনেরই আরও অনেক বেশী লাভ হবে। 
(৩) আমি দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত কিন্তু বন্ধু প্রথম সিদ্ধান্ত নিলে বন্ধুর সবচেয়ে বেশী লাভ হবে, কিন্তু আমার লাভের বদলে বরং ক্ষতি হবে। 
(৪) এর ঠিক বিপরীতে বন্ধু দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত কিন্তু আমি প্রথম সিদ্ধান্ত নিলে আমার সবচেয়ে বেশী লাভ হবে, কিন্তু বন্ধুর ক্ষতি হবে।

আমাদের আলাপ আলোচনা করে সিধান্ত নেবার সুযোগ নাই, যদিও দুজনের নেয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে উপরের যে চারটি ফলাফল হতে পারে তা আমরা আগে থেকে জানি; তবে কে কী সিধান্ত নেব তা ফালাফল ভোগ করার আগ পর্যন্ত  জানতে পারব না l  বন্ধু হলেও আমরা একজন আরেকজনকে কিছুটা সন্দেহের চোখেই দেখি এবং নিজের স্বার্থেই সিদ্ধান্ত নেই। মনে রাখতে হবে এটা অর্থনীতির সমস্যা, ন্যায়শাস্ত্র (ethics) এর নয়। অবশ্য, এটা মনোবিজ্ঞানেরও বিষয়, কিছুটা নির্ভর করবে বন্ধুদের মধ্যে কোন জন উত্তর বঙ্গের সরল মনের আর কে আমার মতো নোয়াখালীর!

আরও পড়ুন:


ঢাকার সাত কলেজের পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত আজ

ভারত থেকে এলো আরও ২০ লাখ ডোজ টিকা

৬ ঘণ্টা পর খুলনার সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক

তায়াম্মুমের কিভাবে করবেন, এর বিধি-বিধান কি?


এটি হলো পরস্পরের উপর প্রভাব ফেলে, কিন্তু পরস্পরের অজান্তে নেয়া, বিকল্প আচরণবিধির সমস্যা; বাস্তব জীবনে এরকম অনেক সময়েই ঘটে। চারটি বিকল্প সমাধান চিন্তা করলে দেখা যাবে যে সমাধান (১) হল দুজনেই অন্যজনকে বিশ্বাস না করে নিজের ক্ষতি এড়ানোর কৌশল নিয়েছে। সমাধান (২) হলো দুজনেই অন্যজনের সহযোগিতার উপর পুরো বিশ্বাস রেখে দুজনের সবচাইতে ভালো হয় সেরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে; এটাই হলো এক্ষেত্রে দুজনের জন্য সবচেয়ে ভালো সম্ভাব্য সমাধান।  (৩) আর  (৪) হলো অন্যজনের সহযোগিতার সুযোগে তার ক্ষতি করে নিজে সব থেকে লাভ করা।

আমরা এখন প্রত্যেকে প্রথম ও দ্বিতীয় সিদ্ধান্তের মধ্যে কোন সিধান্তটি নেব ?
এরকম পারিস্থিতিতে আমরা যদি বার বার পড়ি তাহলে আগের অভিজ্ঞতাকে কি ভাবে কাজে লাগাব ?
অনেকবার এই পারিস্থিতিতে পড়ার পর শেষ পর্যন্ত আমরা কেমন ধরনের সিধান্ত নিতে শিখব ? 

এরকম পারিস্থিতিতে বার বার পড়লে:

ইসলাম ধর্ম মতে কেউ তোমার সাথে যেমন আচরণ করে তুমি প্রতিদানে তেমন আচরণ করবে l খ্রিস্টান ধর্মমতে তোমার এক গালে চড় দিলে অন্য গাল এগিয়ে দেবে। কোন কৌশলটি শেষ পর্যন্ত দুজনের জন্য ভালো হবে?

লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

নিজের অক্ষমতাকে ঢাকতেই ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সংযুক্তি

জসিম মল্লিক

নিজের অক্ষমতাকে ঢাকতেই ক্ষমতাবানদের সঙ্গে সংযুক্তি

জসিম মল্লিক

মানুষের মধ্যে একটা অদ্ভুত প্রবণতা কাজ করে। যুগে যুগেই এমনটা ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে সেটা আরো স্পষ্ট। সেটা হচ্ছে ক্ষমতাবানদের তোয়াজ করা, নতজানু হওয়া। 

যারা যে ক্ষেত্রে ক্ষমতাবান তাদেরকে আমরা সবসময় পিঠ চাপরাই। ভাল কিছু করলে যেমন বাহবা দেই না করলেও দেই। স্বার্থ বিবেচনা করে আমরা ভালবাসা চর্চা করি। পুলিশ, আমলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, কবি, আইনজীবি, আর্মি, রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা বা ব্যবসায়ী এদের মধ্যে যারা পাওয়ারফুল তাদের আমরা তোয়াজ করি। 

আমার মতো এলেবেলে মানুষেরা তাদের সবকিছু পছন্দ করে। তারা যা পোস্ট দেয় তাতেই হাজার হাজার লাইক কমেন্টস থাকে। ধরা যাক একজন সাংবাদিক লিখলেন,  ‘আজ সূর্য পূর্ব দিক থেকে উঠেছে’। তিনি লাইক পেলেন আড়াই হাজার, কমেন্টস সাতশ। 

একজন সাধারণ মানুষ  লিখলেন, ‘সময় আমাকে প্রসব বেদনায় জর্জরিত নারীর মতো করে তোলে অতিষ্ঠ’। তিনি লাইক পেলেন একশ তেইশ, কমেন্টস সতেরো। সাধারণ মানুষ যতই ভাল কিছু করুক তার বাজার ভ্যালু কম।

কেনো মানুষের এই প্রবণতা! কেনো ক্ষমতবানদের সবকিছু আমাদের ভাল লাগে! আসলেই কি আমরা সবাই তাদের ভালবেসে লাইক কমেন্টস করি! আমার তা মনে হয় না। 

এমনকি আপনজন যারা তারাও সবসময় সবকিছু না পড়ে না বুঝে লাইক দেয়। এটা করে খুশি করার জন্য। মানুষ ক্ষমতানদের সাথে সংযুক্ত থেকে নিজের অক্ষমতাকে ঢাকতে চায়।


দলকে শুভকামনা জানিয়ে ঢাকা ছাড়লেন সাকিব

সুন্দরবন এক্সপ্রেসের বগি লাইনচ্যুত

মানুষ ভোট দিচ্ছে না, মানতে একেবারেই রাজি না আমি: সিইসি

সাকিব ৩ বছর আগেই টেস্ট খেলতে চায়নি : পাপন


আবার কিছু ক্ষমতাবান মানুষ শুধু ক্ষমতাবানদের সাথেই যুক্ত থাকতে ভালবাসে। তাদের সাথে ছবি পোস্ট দিতে পছন্দ করে। তারা আপনার আমার মতো লোকদের সাথে যুক্ত থাকবে না। আবার কিছু মানুষ এটা বোঝাতে চায় যে, ক্ষমতাবান বা সেলিব্রেটিদের সাথে তার সখ্যতা আছে। এর অর্ন্তনিহিত কারণ স্বার্থ, প্রত্যাশা বা আত্মতৃপ্তি। 

এই প্রত্যাশা অবচেতন মনেই কাজ করে। পৃথিবী একটা বিচিত্র জায়গা, বিচিত্র সব মানুষ, বিচিত্র অভিব্যক্তি, বিচিত্র চাওয়া পাওয়া, বিচিত্র হিসাব নিকাশ। এতো সরলীকরণ কিছুই না এবং আমি আপনি এই প্রবণতার অংশ।

লেখক, সাংবাদিক, কানাডা

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv নাজিম

মন্তব্য

পরবর্তী খবর