মোসতাক ‘জামিন’ পেয়েছেন, ‘মুক্তি’ পেয়েছেন

আলী রিয়াজ

মোসতাক ‘জামিন’ পেয়েছেন, ‘মুক্তি’ পেয়েছেন

কী লিখবেন? কি লিখবো? মুসতাকের নাম লিখবেন? লিখবো মুসতাক আহমেদ নামে একজন লেখক ছিলেন? ‘রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র’-এর অভিযোগ মাথায় নিয়ে কার্যত বিনা বিচারে তাঁকে মরতে হয়েছে কারাগারের প্রকোষ্ঠে, আদালত তাঁকে জামিন দেয়নি কেননা জামিনের ‘যোগ্য’ বলে বিবেচিত হননি, সেই সময়ে অনেকেই জামিন পেয়েছেন। মোসতাকের জামিনের আবেদনের বিরোধিতা করেছে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি – এটা তো আমরা জানি। রাষ্ট্র চায়নি, কিন্ত রাষ্ট্র তো একটা বায়বীয় বিষয় নয়। কে চায়নি সেটা তো বুঝতে পারি – সরকার চায়নি। গত মে মাস থেকে তাঁকে যে আইনের অধীনে কারাগারে থাকতে হয়েছে সেই আইনের উদ্দেশ্য বুঝতে যদি এতদিনেও কারো সংশয় থাকে তবে আরেকবার মনে করুন – এই আইন কাকে নিরাপত্তা দেয় আর কার জীবন ‘নিরাপত্তাহীন’ করে তোলে, কাকে ‘মৃত্যুর দিকে’ ঠেলে দেয়? 

মুসতাক কী ভাবে মারা গেছেন তাঁর চেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে তিনি রাষ্ট্রের হেফাজতে ছিলেন, তাঁর দায়িত্ব নিয়েছিলো সরকার – এই মৃত্যুর দায় – হত্যার দায় সরকারের। কিন্ত এটা দায়িত্বহীনতার বিষয় নয়, এর মধ্যে একটা বার্তা আছে। আপনি – আমি সেই বার্তা পাচ্ছি তো? আপনি-আমি সচেতনভাবে স্বীকার করি না করি আমাদের হাড়ে-মাংসে-মজ্জায়-শিরায় সেই বার্তা পৌছে যায়নি? আমাদের মগজে সেই বার্তা পৌঁছায় নাই? এই আইনে আপনি আটক হলেন কিনা, আপনি কারাগারে গেলেন কিনা, আপনি নির্যাতিত হলেন কিনা – সেগুলো এখন আর বিষয় নয়। কেননা আপনার/আমার মগজের ভেতরে ভয় তৈরি করে দেয়া হয়েছে – কী লিখবেন কী লিখবেন না সেটা রাষ্ট্র আর বলবেনা, সরকার আর বলবেনা; বলার দরকার হবে না। প্রতিটি অক্ষর লেখার সময় আপনি মনে করবেন মোসতাকের কথা। সেটাই রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য, সরকারের উদ্দেশ্য।

সহিংসতার উদ্দেশ্য কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, অন্যদের জানিয়ে দেয়া যে এই পরিণতি তারও হতে পারে। এরপরেও যারা বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কল্প-কাহিনী শোনান তাঁদের নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই, কিন্ত যারা এখনও ভাবছেন যে কেবল মানবিকতার আবেদনই যথেষ্ট তাঁরা বুঝতে অনীহ যে মানবিকতা দিয়ে ক্ষমতার উগ্র আকাঙ্ক্ষা দমন করা যায়না। মোসতাকের মৃত্যুর পর পোস্ট-মর্টেম হবে কিনা, তা স্বচ্ছ হবে কিনা জানিনা কিন্ত এটা বুঝতে পারি – পোস্ট-মর্টেম দরকার আমাদের, চিন্তার, কাজের। 

বাংলাদেশে অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনা স্বাভাবিক, চিন্তার কারণে হত্যা করার ঘটনা বিরল নয়, বিচার বহির্ভূত হত্যার ঘটনা ঘটে অহরহ। কিন্ত আইনের মোড়কে ঢাকা হয়েছে মোসতাকের বিচার বহির্ভূত হত্যাকে, এটা বোঝা জরুরি। মোসতাক নেই, কিংবা বলতে পারেন শেষ পর্যন্ত মোসতাক ‘জামিন’ পেয়েছেন, ‘মুক্তি’ পেয়েছেন। আপনি কিন্ত জামিন পাননি, আমরা কেউ জামিন পাইনি।

লেখক : অধ্যাপক, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি

news24bd.tv তৌহিদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

মাস্ক সামাজিক দূরত্ব আর হাত ধোয়াই সমাধান

অনলাইন ডেস্ক

মাস্ক সামাজিক দূরত্ব আর হাত ধোয়াই সমাধান

ল্যান্সেট এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধ যা  আলাদাভাবে কোন গবেষণা নিবন্ধ নয় বরং বিভিন্ন গবেষকদেরে অনেকগুলি আলাদা আলাদা দুর্বল গবেষণার ভিত্তিতে লেখা হয়েছে, সেটাকে গণমাধ্যমে এমনভাবে প্রচার করা হচ্ছে যেন মনে হয় লকডাউন না করে বাইরে বাইরে ঘুরলে করোনা ভাইরাস থেকে বেশী নিরাপদ থাকা যাবে। 

এটাও বলা হচ্ছে করোনা ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়। বিজ্ঞান বিষয়ক নিবন্ধ বোঝার ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে লকডাউনের বিপক্ষে জনমত গঠনে এই প্রবন্ধটি ব্যবহার করে সেনসেশন তৈরীর চেষ্টাও সামাজিক মাধ্যমে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

১. প্রবন্ধটির শুরুতেই বলা হয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অর্থায়নে হেনেহান ও তার সহকর্মীদের গবেষণায় বলা হয়েছে বাতাস থেকে ভাইরাল স্যাম্পল কালচার করা না যাওয়ায় কোভিড ভাইরাসের বায়ুনির্ভর সংক্রমণের বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমান করা সম্ভব না।
তারপর তারা বলেছেন ড্রপলেট ইনফেকশনের ক্ষেত্রে যা করা হয় সেসব ঠিকই আছে। তবে যদি প্রমাণিত হয় যে কোভিড ভাইরাস মূলত বাতাসে ভেসে থাকে তাহলে এটা প্রতিরোধের জন্য ভেন্টিলেশন , অ্যারোসল তৈরী যাতে না হয় সে চেষ্টা করা, ভীড় কমানো, বদ্ধঘরে না থাকা এসব করতে হবে।

ভালো করে বোঝেন যদি প্রমাণ করা যায় অর্থাৎ বিষয়টা হাইপোথিসিস। কোন অকাট্য প্রমাণ নাই। আর প্রমাণ হলেও যা করছিলাম সেটাই করতে হবে। যেমন মাস্ক, সামাজিক দূরত্ব ও হাত ধোয়া।
২. এরপর তারা বলেছেন বায়ুনির্ভর সংক্রমণ সরাসরি প্রমাণ করা দু:সাধ্য।
৩. তারা বলেছেন যে বায়ুনির্ভর সংক্রমন প্রমান করা যায় না । অধিকাংশ গবেষণায় যেহেতু বাতাস থেকে জীবন্ত ভাইরাস সংগ্রহ করার উপায় নাই এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রে যদি গবেষণায় ড্রপলেট ইনফেকশন এর পক্ষেই প্রমানাদি থাকে তবে এটা প্রমাণ করা কষ্টকর যে জীবানুটি বাতাসে ভেসে ছড়ায়।অতীতে এরকম হয়েছে যে কিছু কিছু জীবানুর ক্ষেত্রে বহুদিন পরে বোঝা গেছে যে এটা বাতাসে ভেসে ছড়ায়।
এটাও কিন্তু অনুমান নির্ভর মন্তব্য।
৪. এরপর তারা বলেছেন যে দশটি নিবন্ধ আছে যা কোভিড ভাইরাসের বাতাসে ভেসে থাকা বা এয়ারবোর্ন সংক্রমনের যে হাইপোথিসিস বা অনুমানকে সমর্থন করে। 
লক্ষ্য করুন, অনুমানকে সমর্থন করে, প্রমাণ করে না।
এরপর তারা দশটি গবেষণার বিষয় বলেছেন
ক) সুপারস্প্রেডিং প্রমাণ করে যে এটা বায়ুনির্ভর। 
# এটা মোটেও সেটা প্রমাণ করে না। বরং ভীড় এর মধ্যে মানুষে মানুষে শারিরীক স্পর্শ বাড়া, নিরাপদ দূরত্ব না রাখা, হাঁচি কাশি সরাসরি দেয়া, এসব এর মাধ্যমে সুপারস্প্রেডিং বেশী প্রমাণিত।
খ) তারা বলেছেন ক্রুজ শিপ, কনসার্ট, কেয়ার হোম, জেলখানা এসব জায়গায় সংক্রমণ বায়ুবাহিত। এটা কিন্তু নি:সন্দেহ নয় কারণ এই বদ্ধ এলাকাগুলিতে ভীড় হয়। 
# ভীড়ের মধ্যে বায়ুবাহিত না ড্রপলেট ইনফেকশন সেটা আলাদাভাবে কোন গবেষণায় প্রমাণিত না। বহু জায়গাতে বদ্ধ জায়গায় এয়ারকুলার এর কমন ভেন্ট আছে। এটাকে তারা বায়ুবহনের প্রমান হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু একটা মেকানিকাল কারণ কিন্তু ভাইরাসটির নিজস্ব বায়ুবাহিত হবার প্রমাণ না। যেমন আপনি যদি একটা স্প্রেগান দিয়ে কিটনাশক ছিটান সেটা গানটার কারণে বায়ুবাহিত হয়, কীটনাশক নিজে বায়ুবাহিত না।
গ) কোয়ারেন্টিন হোটেলে এক ঘর থেকে অন্য ঘরে ইনফেকশন গেছে বলে তারা উল্লেখ করেছেন। এজন্য এটা এয়ার বোর্ণ। 
# কিন্তু এখানেও কমন ভেন্ট দিয়ে দুটো ঘরের সংযোগকে তারা আমলে নেন নাই। সমস্যাটা ভেন্টিলেশনের, ভাইরাসের না।
ঘ) এরপর তারা বলেছেন কম্যুনিটি ট্রান্সমিশন শূণ্য হলেই কেবল সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা যায় যে ভাইরাসটি বায়ুবাহিত। 
# সেই প্রমাণ তারা দিতে পারেন নাই।
ঙ) কোভিড ভাইরাস উপসর্গহীণ রোগীদের মাধ্যমে ছড়ায়। এটা তারা বলেছেন। হাঁচি কাশি না দিলেও এটা কিভাবে বায়ুবাহিত হয় সেটা তারা ব্যাখ্যা করেন নাই।তারা বলেছেন এর কারন হলো কথা বললে ভাইরাসটি অ্যারোসল তৈরী করে।
# কথা বললে অ্যারোসল তৈরী হয় এটা সত্য। কিন্তু তাতে ভাইরাসটি অ্যারোসলের মাধ্যমে ছড়ায় এটা কিন্তু প্রমাণিত হয় না। Philip Anfinrud and Adriaan Bax এই দুই গবেষক কিন্তু এটাও বলেছেন যে সাধারন কথোপকথনে ড্রপলেটই বেশী হয় । তারা এটাও বলেছেন এই অ্যারোসল পরীক্ষাগারে ৯ মিনিট বাতাসে ছিল কিন্তু তারা বলেছেন যে এরজন্য মাস্ক ব্যবহার করাই সবচেয়ে ভালো প্রতিষেধক। বাড়ীর বাইরে যেতে বলেন নাই।
চ) তারা বলেছেন ঘরের ভেতরে এটা বেশী ছড়ায়। এটা কিন্তু বাসার ঘর না। মল, অডিটোরিয়াম, সিনেমা হল এসব।
ছ) তারা বলেছেন হাসপাতালে পিপিই পরার পরেও ইনফেকশন হয়েছে।এটাও বায়ুবাহিত হবার প্রমাণ। 
# কিন্তু এর জন্য সরাসরি বাতাসকে দায়ী করা বুদ্ধিমানের কাজ না। কারণ পিপিই খোলার সময় ও অসাবধানতায় এই ইনফেকশন হবার অকাট্য প্রমাণ আছে।
জ) ল্যাবরেটরীতে বায়ুতে এই ভাইরিাস তিনঘন্টা ভেসে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। 
#  এটা যেমন পাওয়া গেছে আরেকজন বলেছেন সময়টা নয় মিনিট। বুঝতেই পারছেন এর বিশ্বাসযোগ্যতা কতটা?
ঝ) গাড়ীতে ও ঘরে যেখানে কোভিড রোগী ছিল এমন জায়গার বাতাসে কোভিড ভাইরাস পাওয়া গেছে। 
এখানেও কিন্তু বদ্ধ এলাকা ও এয়ারকুলারের ব্যবহার আছে।
ঞ) তারা বলেছেন বাতাস থেকে ভাইরাস আলাদা করা খুব কঠিন হাম ও যক্ষাকে কখনোই বাতাস থেকে আলাদা করা যায় নাই। একটা হলো ভাইরাস ও আরেকটা ব্যাকটেরিয়া । তাই এটাকেও না পেলে সমস্যা নাই। তারা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দেবেন কোভিড ভাইরাস বায়ুবাহিত।
# বলা বাহুল্য যে এই বক্তব্যটা গোঁজামিল।
ত) কোভিড ভাইরাসকে হসপিটালের ডাক্টে ওিএয়ার ফিল্টারে পাওয়া গেছে। তাই এটা বায়ুবাহিত।
# হাসপাতালে এটা হতেই পারে কারণ রোগীদের ইনটিউবেশন করা হয়, নেবুলাইজ করা হয়, উচ্চচাপে সি প্যাপ বাই প্যাপ ব্যবহার করা হয়। এটা কোন প্রমাণ না আসলে।
থ) চিড়িয়াখানার জানোয়ারদের বেলায় ভেন্টিলেশন ডাক্ট দিয়ে এর সংক্রমন হতে দেখা গেছে।
# জানোয়ারদের হাঁচি কাশির জোর ও তাদের খাঁচার দেয়াল বেয়ে উপরে ওঠা এসব তো মানুষ করে না। তাই এটা কোন অকাট্য প্রমাণ না। আর এখানেও কিন্তু ডাক্ট এর বিষয়টা আছে।
দ)তারা বলেছেন যে কিছূ ‍কিছু ক্ষেত্রে এক ঘরে থাকার পরেও দুজন ইনফেকটেড হয় নাই। তারপর বলেছেন যে এর কারন হতে পারে যে তাদের ভাইরাল শেডিং কম ছিলো। 
# এটাও একটা অনুমান নির্ভর কথা। যে প্রমাণ তাদের বিপক্ষে গেছে সেটাকে তারা এরকম অদ্ভুত কথা দিয়ে প্রতিহত করেছেন। যার কোন প্রমাণ নাই।
ধ) এয়ারবোর্ণ ভাইরাসের আর নট বেশী হয়। অথচ কোভিড ভাইরাসের আর নট হলো ২.৫। আর হামের ১৫। এটাকে তারা যুক্তি দিয়েছেন কোভিড রোগীর ভাইরাল লোড সমান না। এই যুক্তিটা বড়ই মাজুল ।  
ন) এরপর তারা ড্রপলেটের সাইজ ও কনসেন্ট্রেশন নিয়ে কথা বলেছেন। যেটা সাধারন মানুষের বোঝা কঠিন। 
# তবে যে কথাগুলি বলেছেন তার কোনটাই গবেষণা নয় বরং ধারণা থেকে বলা। 

এবার উপসংহারে তারা বলেছেন, তারা মনে করেন যে কোভিড ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় এর স্বপক্ষে সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমানের অভাবের কারণে এটা বলা যাবে না যে কোভিড বাতাসে ভেসে ভেসে ছড়ায় না। তারা মনে করেন যে তাদের প্রমাণগুলি শক্তিশালী। তারা বিশ্বাস করেন যে এই ভাইরাস বাতাস দিয়েই ছড়ায়।

এবার আমার কথা শোনেন।

সমস্যা হলো দুর্বল ও সন্দেহাতীতভাবে অপ্রমাণিত গবেষণা দিয়ে এই বিশ্বাস একধরনের বায়াস বা পক্ষপাত। ল্যান্সেটের এই নিবন্ধ কোন গবেষণা প্রবন্ধ না বরং অনেকগুলি দুর্বল গবেষণার ভিত্তিতে বলা একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ। এটা কোন সরাসরি গবেষণার ফলাফল না। তাই পত্রিকাতে যে লেখা হচ্ছে ঘরে বিপদ বেশী , এই কথাটা সত্য না।

এখানে ইনডোর মানে বাসা বোঝায় নাই। এখানে বোঝানো হয়েছে সেইসব  ইনডোর যেখানে ভীড় হয় ও কৃত্রিম বাতাস ব্যবহার করা হয়। 
যেমন সিনেমা হল, মল, হাসপাতাল, জনসভা, অডিটোরিয়াম এসব। বাসায় লকডাউন করলে যে সংক্রমন কমে এটা হাজার বছরের প্রমাণিত বৈজ্ঞানিক সত্য। আর এটা যেভাবেই ছড়াক, মাস্ক সামাজিক দূরত্ব আর হাত ধোয়াই সমাধান। 

ল্যান্সেটের আগে এটা সায়েন্স ডিরেক্ট নামে আরেকটা প্রকাশনায় ছাপা হয়েছে, সেটাও এলসেভিয়েরের একটি পত্রিকা। আর গত কয়েক বছর ধরে এলসেভিয়েরকে একটি প্রেডেটরি পাবলিশিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইওরোপে সমালোচনা করছে। যারা কাটতি বাড়ানোর জন্য মাঝে মাঝেই এরকম গোঁজামিল প্রবন্ধ ছাপে। এলসেভিয়ের এর জার্নালগুলির মধ্যে ৯ টা জার্নাল ফেক প্রবন্ধ ছাপে বলে সরাসরি অভিযোগ আছে। এমনকি তাদের টাকা দিলে তারা আপনার লেখা বইও ছাপে। কেবল ভুল থাকলে সেটা সম্পাদনা করে দেয়।

ল্যান্সেট অবশ্য সরাসরি এটা করে না। তবে মাঝে মাঝে এরকম আরেক জায়গা থেকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ ছেপে দেয় যাতে সবাই ল্যান্সেটের নাম নিয়ে কথা বলে। এবার যেমন নিয়েছে সায়েন্স ডিরেক্ট থেকে যেটা তাদেরই আরেকটা জার্নাল। এটা হলো প্রচারণার অংশ। এগুলো সিরিয়াস কোন প্রবন্ধ না।

 লেখক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক আব্দুন নূর তুষার।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

মানুষের কতো বিপদ, আসুন পাশে দাঁড়াই

শরীফুল হাসান

মানুষের কতো বিপদ, আসুন পাশে দাঁড়াই

‘কতোটা সংকটে আছি বলে বোঝাতে পারবো না। বন্ধুবান্ধবরা আমাকে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হিসেবেই জানে। কিন্তু করোনা মহামারিতে আমরা প্রায় শেষ। ঢাকায় মেসে থেকে লেখাপড়া করতাম। মেস ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্য নেই বলে গ্রামের বাড়িতে চলে এসেছি। পরিবারের অবস্থাও খুব খারাপ। বৃদ্ধ বাবা আমাদের নিয়ে আর সংসার চালাতে পারছে না। অনার্স শেষ হয়নি। আমি নিজেও কিছু করতে পারছি না। মাঝে মধ্যে মনে হয় বাড়ি ছেড়ে চলে যাই। কারও কাছে সাহায্য চাইতে সম্মানে বাঁধে। আপনাকে ভিন্ন নামে মেসেজ দিচ্ছি।’

আমার ইনবক্সে এসেছে মেসেজটা। করোনার এই মহামারিকালে গত এক বছরে আমি এমন কতো মেসেজ যে পেয়েছি! বিশেষ করে লকডাউনে। আমার ভীষণ কষ্ট লাগে। ভীষণ কান্না পায়। আমি সব বাদ দিয়ে আমার সীমিত সামর্থ্য অনুযায়ী যার জন্য যতোটুকু পারি করার চেষ্টা করি। কিন্তু বহুক্ষণ আমার ভীষণ মন খারাপ থাকে। কোন কিছুতে মনোযোগ দিতে পারি না।

আমাকে যারা কাছ থেকে চেনেন তারা জানে বিলাসিতা আমার জীবনে নেই বললেই চলে। আমি নিজের জন্য সব ধরনের অতিরিক্ত খরচ পরিহার করি। মাঝে মধ্যে বই কেনা ছাড়া আমার নিজের জন্য আমি কখনো খরচ করি না। নিজের খুব বেশি শখ-আল্লাদ আমার নেই। অপচয় তো পরের কথা, সামান্য দাম দিয়ে কিছু কিনতে গেলেই আমার খারাপ লাগে। তার মানে না এই নয় যে আমার টাকা নেই। বরং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া, আমি অনেকের চেয়ে ভালো আছি। আমার যে আয় তা দিয়ে মোটামুটি একটা ভালো জীবন যাপন করা যায়। কিন্তু আমার নিজের জন্য টাকা খরচ করতে ভীষণ যন্ত্রণা লাগে। আমার বারবার মনে হয়, চারপাশে কতো লোকের কতো সংকট! তখন মনে হয় নিজের জন্য না খরচ করে যা আছে সব তাদের দিয়ে দেই!

জানি না আপনাদের এমন হয় কী না! না আমার বাড়ি নেই, গাড়ি নেই, সম্পদ নেই তারপরেও দেখেন শুক্রবার আমি যখন বাজার করি আমার সেদিনও খারাপ লাগে। না আমি বিরাট ধনীর মতো বাজার করি না। মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের যতোটুকু লাগে ততোটাই। কিন্তু মাছ-মাংস কিনতে গেলেই আমার মন খচখচ করে।

আমার মনে হয়, আমি সৌভাগ্যবান যে জীবনে কখনো খাওয়ার কষ্ট করতে হয়নি। কিন্তু কতো লোক তো দুবেলা সামান্য খেতে পারছে না। জানি না আপনাদের এমন হয় কী না! আমার চারবছরের ছেলেটা যখন খেতে চায় না কিংবা ঠিকমতো খায়, দুই সময়েই আমার মনে হয়, এই পৃথিবীতে কতো শিশু আছে যাদের খাবার নেই। অমার মনে হয়, এই করোনায় কতো মানুষের কতো ধরনের বিপদ!

এই যে গতকাল নাম পরিচয়হীন ছেলেটার মেসেজ আসার পর থেকে ভীষণ খারাপ লাগছে। না এটাই প্রথম নয়। এই ধরনের মেসেজ আমি প্রায়ই পাই। কিন্তু এই যে একটা মানুষ নিজের পরিচয় দিয়ে সাহায্য চাইতে পারছে না সেটাও তো একটা যন্ত্রণা!

একবার ভাবেন! এই দেশে একটা শিক্ষিত ছেলে রিকশা চালাতে গেলে বা কায়িক পরিশ্রম করতে গেলে তাকে দশবার ভাবতে হয়! ওই যে হুমায়ুন আহমেদের নাটকে একটা লাইন ছিল, মামা রিকশা চালালে তো লোকে দেখবে, চলেন চুরি করি। কেউ দেখবে না। কিন্তু তারপরেও তো অনেক লোকে রিকশা চালায়। এর মধ্যে কতোজন আছে হয়তো বাধ্য হয়ে চালায়। মাঝে মধ্যে যখন দেখি রিকশা উল্টানো ভীষণ খারাপ লাগে। জীবনের তাগিদে কতো মানুষকে কতো কষ্ট করতে হয়!

এসব ভাবলে আজকাল আমার ভীষণ অসহায় লাগে! ওপরওয়ালা জানেন, সারাজীবন আল্লাহর কাছে চেয়েছি, হে আল্লাহ! আমাকে সম্পদশালী বানানোর দরকার নেই কিন্তু আমাকে সেই পরিমান টাকা দাও যেন যেন আরেকজন মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে পারি। আল্লাহ আমাকে নিরাশ করেননি। দুই-চারজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্য দিয়েছেন। কিন্তু করোনার এই মহামারি, লকডাউনে তো চারপাশে হাজার হাজার মানুষের সংকট! আমি তাদের কয়জনের পাশে দাঁড়াতে পারছি! আমার তো যন্ত্রণা লাগে।

হ্যা, অনেকেই আমাকে বলেন, মানুষ বিপদে পড়েছে এমন কোন ঘটনা জানলে যেন তাদের বলি। তারাও সাহায্য করবেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমি চেষ্টা করি একা সামলানোর। আমার মনে হয় যেই মানুষটা আমাকে বলেছে সে হয়তো চায় না অন্য কেউ ঘটনা জানুক। আমার তখন বারবার মনে হয়, আমার যদি কয়েকশ কোটি টাকা থাকতো! আমি সারাক্ষণ মানুষের কথা শুনবো, আর যার বিপদ তার পাশে দাঁড়াবো! আমি সেটা পারি না। আমার তাই অসহায় লাগে!


আরও পড়ুনঃ


বাঙ্গি: বিনা দোষে রোষের শিকার যে ফল

আপনি কী করেন? এটি মোটেও নিরীহ প্রশ্ন নয়

সড়ক দুর্ঘটনায় রাস্তাটি গুরুতরভাবে আহত হয়েছে: নোবেল

লকডাউনে 'বান্ধবীর' সাথে দেখা করতে যুবকের আকুতি, পুলিশের রোমান্টিক জবাব!


আমি বিশ্বাস করি আমার মতো আরও অনেক মানুষ নিশ্চয়ই আছেন যাদের একইভাবে অসহায় লাগে, যারা মানুষের জন্য কষ্ট পান। আমরা সবাই মিলে কী সবার মুখে হাসি ফোটাতে পারি না? এমন অনেক মানুষ নিশ্চয়ই আছেন যাদের আসলেই বিপুল সম্পদ আছে। অনেকের হয়তো বিপুল না হলেও নিজের বাড়ি গাড়ি আছে। অনেকেই হয়তো, আছেন ঈদে পাবর্ণে বা যে কোন সময় দামী দামী জিনিষ কেনেন। নানা শখ মেটান।

আমি বলছি না শখ মেটাবেন না। একটু ভালো জীবন যাপন করবেন না। অবশ্যই করবেন। কিন্তু তারপরেও আমরা সবাই যদি যার যায় জায়গা থেকে একটু ছাড় দেই, সবাই মিলে যদি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি, নিশ্চয়ই অনেক মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব!

আমি বিশ্বাস করি, এই পৃথিবীতে সম্পদের অভাব নেই। আমি বিশ্বাস করি এই বাংলাদেশেও যে সম্পদ আছে তাতে সবাইকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়। পৃথিবীর যে সম্পদ আছে তাতে গোটা পৃথিবীর মানুষকে আজীবন ভালো রাখা যায়। দরকার শুধু মানবিকতা। পরষ্পরের পাশে দাঁড়ানো। দরকার খোঁজ রাখা কে কেমন আছে! আমাদের আত্মীয়-স্বজন-পাড়া প্রতিবেশী-দেশের মানুষ সবার খোঁজ রাখা।

ওই যে ছোটবেলায় পড়েছিলাম, কারো প্রতিবেশি যদি পেটে ক্ষুধা নিয়ে রাত যাপন করে, কেউ যদি কোনো পথশিশুকে ক্ষুধার তড়নায় কাতরাতে দেখে, আর সে যদি ক্ষুধার্ত প্রতিবেশি কিংবা ক্ষুধার্ত পথশিশুর পাশে এসে না দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে তার মাঝে মানবতার লেশমাত্রও নেই।

দেখেন পৃথিবীর প্রত্যেকটা ধর্মে মানুষকে, মানবতাকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি আমরা সবাই সবার পাশে থাকতে পারি। যে বলতে পারছে তার যেমন খোঁজ নিতে পারি যে বলতে পারছে না তারও খোঁজ নিতে পারি। আমরা যদি মন থেকে চাই, আরেকজন মানুষের কষ্ট যদি আমাদের স্পর্শ করে, সবাই মিলে একসাথে নিশ্চয়ই বাঁচতে পারি। আল্লাহ আমাদের রহম করুন।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv / নকিব

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

আপনি কী করেন? এটি মোটেও নিরীহ প্রশ্ন নয়

মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

আপনি কী করেন? এটি মোটেও নিরীহ প্রশ্ন নয়

আপনি কী করেন? এ প্রশ্নটি যিনি করেন তার দিকে আমি অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকি। এটি মোটেও নিরীহ কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্নকর্তা একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে এ প্রশ্নটি করেন, এবং উদ্দেশ্যটি অত্যন্ত অসৎ। তিনি নিশ্চিত হতে চান যে, আমি তার চেয়ে ক্ষমতাধর কেউ কি না। এ প্রশ্নটির উত্তরই নির্ধারণ করে, তিনি আমার সাথে কেমন ব্যবহার করবেন।

তিনি যদি বুঝতে পারেন আমি সাধারণ গফুর, আমার আয় সামান্য, আমি টেনেটুনে চলি, যাকে পাই তাকেই সালাম দিই, আমার পড়াশুনো কম, আমার কোট-টাই নেই, আমাকে কেউ স্যার ডাকে না, আমার আত্মীয়দের মধ্যে কেউ অস্ত্র বহন করে না, আমার ব্যাংক হিশাবে খরা লেগে আছে, আমাকে একটি চড় দিলে প্রতিবাদ করার কেউ থাকবে না— তাহলে তিনি খুব খুশি হন। তিনি নিরাপদ বোধ করেন, এবং নিজের কাজে মন দেন। আমার প্রতি তার আর কোনো কৌতুহল থাকে না। আমার ওজন তার কাছে এক লাফে শূন্যে গিয়ে ঠেকে।

কিন্তু যদি টের পান আমি বড় শিল্পপতি, আমি একটি মন্ত্রণালয় চালাই, একটি জেলার মালিকানা আমার ঘাড়ে, আমি অনেকগুলো সমিতির সভাপতি, আমি মানিক মিয়া এভিন্যুতে বকাবকি করি, অস্ত্রের সাথে আমার আত্মীয়তা আছে, আমাকে টিভিতে দেখা যায়, লন্ডন আমেরিকা নিয়মিত দৌড়ঝাঁপ করি, লোকজন আমাকে স্যার ডাকে, আমার নামের আগে মাননীয় বসানো হয়, ব্যাংক হিশাব নয়, আমার নিজেরই একটি ব্যাংক আছে— তাহলে তিনি লাফ দিয়ে উঠেন। চেয়ার এগিয়ে দেন, হাত বাড়িয়ে দেন, তোলপাড় করে তুলেন চারপাশ, এবং মনে মনে অনিরাপদ ও বিপন্ন বোধ করেন।

এর কারণ তিনি একটি সংকটে ভোগেন, এবং তার সংকটটি সরল নয়। তিনি একই সাথে ক্ষমতাকে পছন্দ ও ঘৃণা করেন। যদি তিনি ক্ষমতাকে শুধুই পছন্দ, কিংবা শুধুই ঘৃণা করতেন তাহলে তার এ সংকট হতো না। এমন কি ক্ষমতার প্রতি ভাবলেশহীন থাকলেও তার চলতো। তখন 'আমি কী করি', এ নিয়ে তাকে উদ্বেগে থাকতে হতো না। আমার ক্ষমতার অস্তিত্বও তাকে আলোড়িত করতো না। তিনি আমার সাথে করতে পারতেন সাধারণ ও স্বাভাবিক আচরণ।

কিন্তু একই সাথে প্রীতি ও ভীতিতে আক্রান্ত হয়ে তিনি ক্ষমতাকে করে তোলেন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আগন্তুকের সাথে সাক্ষাতের শুরুতেই তিনি উদগ্রীব হয়ে উঠেন তার ক্ষমতা নিরূপণে।

কেন একজন মানুষ একই সময়ে ক্ষমতাকে পছন্দ ও ঘৃণা করেন? অথবা গুরুত্বহীন ক্ষমতাকে করে তোলেন গুরুত্বপূর্ণ?

এর প্রধান কারণ তিনি একটি রাষ্ট্রের বাসিন্দা। রাষ্ট্র তার উপর কিছু সংস্কৃতি আরোপ করে। একটি সংস্কৃতি হলো— রাষ্ট্র উৎপাদনকে উৎসাহিত করে। কিন্তু আপনি আপনার পরিবারের জন্য যতোটুকো প্রয়োজন ঠিক ততটুকো উৎপাদন করলে রাষ্ট্র খুশি হয় না। রাষ্ট্র খুশি হয় তখন, যখন আপনি আপনার প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন করেন। কারণ:

কেবল প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন করলেই আপনি কিছু পণ্য ও সেবা বিক্রি করবেন, এবং লিপ্ত হবেন বেচাকেনায়। রাষ্ট্র তার পরিচালনা খরচ আহরণ করে নাগরিকদের বেচাকেনা থেকে। যে-রাষ্ট্রে বেচাকেনা শূন্য, সে-রাষ্ট্র মৃত রাষ্ট্র। এ জন্য রাষ্ট্র চায় যেকোনো মূল্যে বেচাকেনা চালু রাখতে। এর সাথে রাষ্ট্র যারা চালায় তাদের আরাম-আয়েশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

রাষ্ট্র প্রশংসা করে শুধু দুটি গোষ্ঠিকে—

এক: যারা অতিরিক্ত উৎপাদন করেন, এবং উৎপাদিত পণ্য ও সেবা বেচাকেনা করেন। কৃষক, স্বর্ণকার, শিল্পপতি, দোকানদার, ট্রাভেল এজেন্সি, বেসরকারি চাকুরীজীবী, স্বাধীন পেশাজীবী, বেসরকারি ভোক্তা, এরা হলো এ শ্রেণীর নাগরিক। এ শ্রেণী ভোগযোগ্য সম্পদ সৃষ্টি করেন, এবং রাষ্ট্র পরিচালনার খরচের যোগান দেন।

দুই: যারা প্রথম গোষ্ঠির অতিরিক্ত উৎপাদন থেকে রাষ্ট্রের জন্য ট্যাক্স আহরণ করে তা খরচ ও অপচয় করেন। যে-রাষ্ট্র যতো উন্নত সে-রাষ্ট্রে অপচয় ততো কম ঘটে। দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাটও এ অপচয়ের অন্তর্ভুক্ত। রাষ্ট্র যারা চালান তারা এ শ্রেণীর নাগরিক। রাষ্ট্র কারা চালান? রাষ্ট্র চালান তারা যারা রাষ্ট্র থেকে বেতন নেন, কিংবা বেতনের সমতুল্য বৈষয়িক সুবিধাদি গ্রহণ করেন।

এই দুই শ্রেণীর মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর প্রশংসা রাষ্ট্র সবসময় করে, এবং প্রথম শ্রেণীর প্রশংসা শুধুমাত্র শর্তসাপেক্ষে করে। শর্তটি হলো অতিরিক্ত উৎপাদন ও ভোগ। কোনো রাষ্ট্রে প্রথম শ্রেণীটি বিলুপ্ত হলে দ্বিতীয় শ্রেণীটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়।


আরও পড়ুনঃ


২৫ এপ্রিল থেকে দোকানপাট ও শপিংমল খোলা

বান্দরবান সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' রোহিঙ্গা নিহত

শ্যামনগরে মাছের ঘের থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার

বাগেরহাটে শিশু ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার ২


প্রথম শ্রেণীটি হলো রাষ্ট্রের আর্থিক যোগানদাতা, এবং দ্বিতীয়টি ওই যোগানকৃত অর্থের ভোক্তা ও পাহারাদার। রাষ্ট্র তার টিকে থাকার স্বার্থে দ্বিতীয় শ্রেণীটিকে প্রথম শ্রেণীর চেয়ে বাড়তি নিরাপত্তা দিয়ে থাকে। এ উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয় বৈষম্যমূলক আইন ও বিধি। দ্বিতীয় শ্রেণীর অনেকে ভোগ করতে থাকেন অতুলনীয় রাষ্ট্রীয় সুবিধা।

প্রথম শ্রেণীর নাগরিকেরা হয়ে থাকেন নিরস্ত্র (একমাত্র ব্যতিক্রম আমেরিকা, আমেরিকায় সাধারণ নাগরিকেরাও অস্ত্র বহন করতে পারেন), এবং দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকেরা নিজে অস্ত্র বহন করেন অথবা অন্য অস্ত্রবাহকের দ্বারা সুরক্ষিত থাকেন। তবে প্রথম শ্রেণীর নাগরিকেরাও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের অস্ত্রের সুরক্ষা পান, যেমন পুলিশের, কিন্তু সেটিও নির্বিঘ্ন উৎপাদন ও বেচাকেনার স্বার্থে।

ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের মনে একটি হীনমন্যতার জন্ম হয়। হীনমন্যতা থেকে জাগে ক্ষমতাপ্রীতি ও ভীতি। তাদেরও লোভ জাগে, প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে যাওয়ার। শ্রেণীবদলের এ স্বপ্ন কারও কারও সফল হয়, কিন্তু অধিকাংশেরই সফল হয় না। কারণ দ্বিতীয় শ্রেণীর চেয়ে প্রথম শ্রেণী সংখ্যাবহুল, এবং দ্বিতীয় শ্রেণীতে লোকবলের চাহিদা কম। চাহিদার চেয়ে আগ্রহীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় তৈরি হয় জুতোক্ষয়ী প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশে সরকারি চাকুরির জন্য যে-মরিয়া যুদ্ধ তার মূল কারণ প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের এই শ্রেণী পরিবর্তনের লোভ।

আবার প্রথম শ্রেণীর কিছু সদস্য খুব সহজে দ্বিতীয় শ্রেণীতে যেতে পারেন। যেমন- ধনী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, প্রভাবশালী টিভিমুখ, ও পেশাজীবী। উদাহরণ হিশেবে বাংলাদেশের সংসদের কথা বলা যায়। এ আইনসভার সিংহভাগ সদস্য ধনী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি।

যেহেতু অধিকাংশই শ্রেণী পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়, সেহেতু ব্যর্থ দ্বিতীয়শ্রেণীলোভী প্রথম শ্রেণীর নাগরিকেরা শুরু করেন ক্ষমতাকে ঘৃণা। এ ঘৃণার জন্ম হয় হিংসা থেকে। কিন্তু একই সাথে তারা ক্ষমতাকে ভালোও বাসতে থাকেন। প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তরণের স্বপ্নকে তারা ভেতরে ভেতরে বাঁচিয়ে রাখেন।

মর্মান্তিক হলো, প্রথম শ্রেণী থেকে যারা দ্বিতীয় শ্রেণীতে সফলভাবে গমন করেন, তারাও সমানভাবে ভুগেন এ অসুখে। তারা আতংকে থাকেন, কে কখন এসে কেড়ে নিয়ে যায় তার ক্ষমতা।

এটি একটি সংকটময় পরিণতি। এ সংকট থেকেই কেউ কেউ আমাকে জিগ্যেস করেন— আপনি কী করেন?

জিগ্যেস করে নিশ্চিত হতে চান যে, তার ক্ষমতা আমি কেড়ে নেবো কি না।

তবে এ প্রশ্নের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। ইশকুলে গিয়েই তারা শোনে— তোমার বাবা কী করেন? শিশুরা নিজে যেহেতু কিছু করে না (যদিও আমি জানি শিশুরা অনেক কিছুই করে), তাই প্রশ্নকর্তা শিশুটির ক্ষমতা মাপতে চান শিশুটির বাবার ক্ষমতা দিয়ে। বাবার পেশা ও পরিচয়ই নির্ধারণ করে শিশুটিকে ইশকুলে কতোখানি সমীহ, ও কতোখানি অবহেলা করা হবে।

এটি শুধু ইশকুলে নয়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এ চর্চা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। যাদের জন্ম কৃষক ও শ্রমিক পরিবারে, তারা ‘তোমার বাবা কী করেন’ এ প্রশ্নে খুবই বিব্রত হন, এবং যাদের জন্ম স্যার পরিবারে, তারা এ প্রশ্নে খুব খুশি হন। এর কারণ কী?

এর কারণ রাষ্ট্রের আচরণ। রাষ্ট্র সবার সাথে একই আচরণ করে না। কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, দোকানদার, ছোট উদ্যোক্তা, গরুর দালাল, ট্রাকচালক, মেথর, মুচি, রিকশাওয়ালা, রাজমিস্ত্রী, কাঠমিস্ত্রী, সবজি পাইকার, প্রাইভেট টিউটর, নাপিত, বাবুর্চি, নার্স, ভ্যানচালক, ফেরিওয়ালা, বাসচালক, ঝাড়ুদার, বিড়িওয়ালা, চৌকিদার, লেখক, তাদের সাথে রাষ্ট্রের আচরণ একরকম; আর মন্ত্রী, সাংসদ, রাষ্ট্রপতি, মেয়র, শিল্পপতি, উপাচার্য, গভর্ণর, সচিব, ডিসি, চেয়ারম্যান, ইউএনও, অভিনেতা, দালাল, ভাড়াটে লেখক, সাংবাদিক, ছদ্মকবি, আমদানীকারক, শিল্পী, নাট্যকার, চলচ্চিত্রকার, বিউটিশিয়ান, বৈমানিক, পুলিশ, আর্মি, ন্যাভি, রাজনীতিক, অধ্যাপক, ঠিকাদার, ফায়ার সার্ভিস, ম্যাজিস্ট্রেট, ব্যারিস্টার, বিচারপতি, বাবুল হুদা, সংঘবাদী, খেলোয়াড়, চিকিৎসক, লিপস্টিক, ব্যাংকার, প্রশংসাকার, তাদের সাথে রাষ্ট্রের আচরণ অন্যরকম।


আরও পড়ুনঃ


বাঙ্গি: বিনা দোষে রোষের শিকার যে ফল

৫৩ জন নাবিকসহ নিখোঁজ ইন্দোনেশিয়ার সাবমেরিন

ভিক্ষা করে হলেও অক্সিজেন সরবরাহের নির্দেশ ভারতে

১৫ বছর ধরে কাজে যান না, বেতন তুললেন সাড়ে ৫ কোটি টাকা!


রাষ্ট্রের আচরণই এখানে নির্ধারণ করছে মানুষের সামাজিক নিয়তি। শিশুদের বোকা ভাবার কোনো কারণ নেই। তারা বুঝতে পারে, তার বাবা-মা সমাজে গৃহীত না কি নিগৃহীত। সে যদি টের পায়, রাষ্ট্রের চোখে তার বাবা-মা একটি ভাঙা ছাতার সমান, তাহলে সে আর ইশকুলে ওই প্রশ্নটি শুনতে চায় না। এটি তার ভেতরে একটি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সে মনে মনে সংকল্প করে, আমাকেও তাদের মতো হতে হবে, যারা রাষ্ট্রের চোখে ভাঙা ছাতা নয়। এ সংকল্প শিশুটিকে নষ্ট করে ফেলে। সে আর সে থাকে না।

তার স্বাভাবিক প্রতিভাগুলো বিকৃত হতে শুরু করে। তার হয়তো ভালো লাগতো ঘুড়ি উড়ানো, কিন্তু তার আর ঘুড়ি উড়াতে ইচ্ছে করে না। সে ছবি আঁকা ছেড়ে দেয়, খেলাধুলো ছেড়ে দেয়, ছড়া লেখা ছেড়ে দেয়, গান গাওয়া ছেড়ে দেয়, প্রশ্ন করা ছেড়ে দেয়, তার যা যা করতে ভালো লাগতো তার সবই ছেড়ে দেয়। সে ধীরে ধীরে, মানুষ থেকে হয়ে উঠে প্রতিযোগী। সে অংশ নেয় শ্রেণী পরিবর্তনের একটি কুৎসিত ইঁদুর দৌড়ে।

এ দৌড়ে জয়ী হওয়া ছাড়া, তার সামনে আর কোনো বিকল্প থাকে না। সে জানে, বিয়ের সময় তার পাত্রীও বলবে, আপনি কী করেন? তাই, এ প্রশ্নের একটি ভালো উত্তর খোঁজাই, শিশুটির জীবনের লক্ষ্য হয়ে ওঠে।

— মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv / নকিব

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

ইহুদী দেশ অর্থ অপচয় করে আমরা মানুষ অপচয় করি

রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী

ইহুদী দেশ অর্থ অপচয় করে আমরা মানুষ অপচয় করি

$২৭ মিলিয়ন ডলার। মানে বাংলাদেশের টাকাতে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা। এই টাকা একটা পরিবারকে দিচ্ছে মিনিয়াপুলিশ শহরের কর্তৃপক্ষ। 
কেনো দিচ্ছে? 

কারণ তাদের শহরের পুলিশ , জর্জ ফ্লয়েড নামে একজন কৃষনাঙ্গ কে অন্যায় ভাবে হত্যা করেছে। তাই সিভিল ল মামলা সেটেল করার জন্য  শহর কতৃপক্ষ এই টাকা দিচ্ছে। এটা কি হত্যা মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য?  মোটেই না। 
এই অর্থ দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র নাগরীক অধিকার রক্ষায় ব্যার্থতার জন্য। 


হত্যা মামলা চলছে।  জুড়ি এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারকে second-degree murder, third-degree murder and second-degree manslaughter দোষী হিসেবেই অভিযুক্ত করেছে।
Second-degree murder এর জন্য ৪০ বছর কারাদন্ড
Third-degree murder এর জন্য ২৫ বছর কারাদন্ড

second-degree manslaughter এর জন্য ১০ বছরের কারাদন্ড হতে পারে। 

পুলিশ অন্যায় ভাবে হত্যা করলে এ ধরনের শাস্তি তারা ( ইহুদী নাছারের দেশ) দেয় আর কি। এর আগের এক শ্বেতাঙ্গ কে $২০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলো তার নাগরীক অধিকার খর্ব হবার কারণে।
খবরটা পরে মনে হলো একটু স্টাটাসে লিখে রাখি। 

মানে এমনিতেই আর কি। ওসব ইহুদী দেশকে ৯০% মুসলিমের দেশের পছন্দ করে না। পছন্দ না করাই উচিত।
আমরা ওদের চেয়ে অনেক ভালো। আমরা অর্থ অপচয় করি না। অর্থ অপচয়কারী শয়তানের ভাই। 
আমরা মানুষ অপচয় করি। 

রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী: সহকারি অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনির্ভাসিটি, ঢাকা।

news24bd.tv/আলী

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

‘বানর থেকে মানুষ এসেছে’ এটি ডারউইন বা বিজ্ঞানের কেউ বলে নি

মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

‘বানর থেকে মানুষ এসেছে’ এটি ডারউইন বা বিজ্ঞানের কেউ বলে নি

মনে বিজ্ঞান বিদ্বেষ পোষণ করেন, এরকম কয়েকজন বাংলাদেশীর সাথে আমার কথা হয়েছে। তাদের দাবি— ‘বানর থেকে মানুষ এসেছে’ এরকম একটি কথা না কি বিজ্ঞান বলেছে, এবং এ কারণে তারা বিজ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছেন। শুনে আমি খুব অবাক হলাম। তাদের জিগ্যেস করলাম, এটি আপনারা কোথায় শুনেছেন বা পড়েছেন? তারা বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল ও পত্রপত্রিকার রেফারেন্স দিলো, এবং বললো— ডারউইন নামের একজন নাস্তিক বিজ্ঞানী এটি বলেছেন। আমি বললাম, কথাটি সত্য কি না তা কি আপনারা যাচাই করেছেন? তাদের উত্তর— না। যেহেতু কথাটি ছাপা অক্ষরে বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে বলা হয়েছে, এবং ওয়াজ মাহফিলের সত্যবাদীরা কথাটিকে বিজ্ঞানের বলে প্রচার করেছে, সেহেতু তারা ধরে নিয়েছেন যে কথাটি সত্য! 

তারপর আমি ওয়াজ করেন, এরকম একজন ভালো মৌলানার সাথে কথা বললাম, যিনি ‘বানর থেকে মানুষ এসেছে’ এ কথাটি বিভিন্ন মাহফিলে প্রচার করেছেন। জিগ্যেস করলাম, আপনি ডারউইনের ‘দি অরিজিন অব স্পিসিস’, ‘দি ডিসেন্ট অব ম্যান’, এবং ‘দি ভয়েজ অব দি বিগল’ বই তিনটি পড়েছেন কি না? তিনি স্বীকার করলেন, পড়া দূরের কথা, বই তিনটির নামও কখনও শোনেন নি। একই প্রশ্ন কয়েকজন শিক্ষককে করলাম, তারাও না-বোধক উত্তর দিলেন, কিন্তু তারা জানালেন যে এ বিষয়ে তারা বিভিন্ন টেক্সট বইয়ে পড়েছেন, কিন্তু ‘বানর থেকে মানুষ এসেছে’ এরকম কোনো কথা তারা পান নি। 

এ পর্যায়ে আমার একটি ছবির কথা মনে পড়লো। ছবিটি প্রথম দেখেছিলাম গাজী আজমলের একটি বইয়ে (সম্ভবত অন্যদের বইয়েও ছবিটি ছিলো)। বইটি উচ্চ মাধ্যমিকে আমাদের টেক্সট বই ছিলো। 

ওই বইয়ে একটি ছবি ছিলো এরকম:
বানর সদৃশ বা গরিলা সদৃশ একটি প্রাণী, ধীরে ধীরে, লাখ লাখ বছরের ব্যবধানে, তার আদল বদলিয়ে মানুষে পরিণত হচ্ছে।
ওয়ালেস, ডারউইন, ও ল্যামার্কের কাজের পর এ ধরণের ছবি বা ইলাস্ট্রেশন অনেক শিল্পীই এঁকেছেন। তবে সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিটি এঁকেছিলেন রুডলফ জালিঙ্গার। ছবিটির নাম ছিলো ‘মার্চ অব প্রোগ্রেস’। গাজী আজমল সম্ভবত ওই ছবিটিকেই, কোনো প্রকার ডিসক্লেইমার ছাড়া, তার বইয়ে ব্যবহার করেছিলেন। আমাদের যেহেতু কোনো কিছুকেই গভীরভাবে তলিয়ে দেখার অভ্যাস নেই, তাই আমরা ধরে নিলাম যে ওই ছবিটি নিশ্চয়ই ডারউনের আঁকা! ডারউইন নিশ্চয়ই বলেছেন ‘মানুষ এসেছে বানর থেকে! 

সত্য হলো, ‘বানর থেকে মানুষ এসেছে’ এটি ডারউইন বা বিজ্ঞানের কেউ বলে নি। ডারউইনের তিনটি বইয়ের কোথাও আমি এমনটি লেখা পাই নি। এটি রটিয়েছে কবিরাজেরা। কবিরাজেরা তাদের নিজেদের স্বার্থে, ধর্মপাগল মানুষদের লেলিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞানের পেছনে। ডারউইনের কোনো বই এ কবিরাজদের পক্ষে পড়া সম্ভব নয়। তারা পড়েছে তাদের আকৃতির পত্রিকা, তারা শুনেছে তাদের আকৃতির রটনা, আর মগজ ধুইয়েছে কোটি কোটি তরুণ ও বৃদ্ধের। এ অঞ্চলে মগজের ময়লা এতো দূর থেকে দেখা যায় যে, তা ধুইয়ে দিতে কাছে আসার প্রয়োজন নেই। দূর থেকে থুথু ছিটিয়ে দিয়েই এ মগজ ধুইয়ে দেয়া সম্ভব। 

যারা এ থুথু ছিটাচ্ছে, তাদের বিজ্ঞানভীতির প্রধান কারণ— বিজ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়। গামছার আড়ালের সত্যটুকো যেন মানুষ দেখে না ফেলে, এ জন্যই তাদের এ আয়োজন। একবার যদি মানুষ প্রশ্ন করা শিখে ফেলে, তাহলে তাদের অস্তিত্ব যে বিপন্ন হয়ে যাবে, তা তারা জানে। এজন্য সাধারণ মানুষদের তারা, বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে নানা কৌশলে উস্কে দিচ্ছে। এ কৌশলগুলোর একটি হলো, মানুষের কিছু অপকর্মকে বিজ্ঞানের অপকর্ম হিশেবে প্রচার করা, এবং বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের মনকে বিষিয়ে তোলা, যদিও তারা জানে, বিজ্ঞান ছাড়া আধুনিক মানুষ চলতে পারবে না একটি মিনিটও। 

বিজ্ঞান কোনো প্রাণী নয়, এর হাত পা চোখ দাঁত কোনোটিই নেই। এটি কোনো ভূতও নয় যে মানুষের শরীরে আছর করে, তাকে দিয়ে করিয়ে নেবে অপকর্ম। এটি একটি ধারণা মাত্র। এটি চিন্তা করার একটি বিশেষ প্রক্রিয়া, এবং মানুষের এটি অংশ, যাদের শরীরে মাংসের চেয়ে মগজের ক্রিয়া বেশি চলে, আদিকাল থেকে এ প্রক্রিয়ায় চিন্তা করে আসছে। এ প্রক্রিয়াতেই তারা পাথরের সাথে পাথর ঘষে আগুন জ্বালিয়েছে, রান্না করেছে, এবং মাঝে মাঝে দুর্ঘটনায় নিজেই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। 

মানুষের সাথে বিজ্ঞান কতোটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তা বুঝতে একটি সাধারণ উদাহরণ দিই:
ধরা যাক আধুনিক বিজ্ঞানের সকল অবদান থেকে আপনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন, এবং চলে গেলেন জঙ্গলে। আপনি ন্যাংটো। গায়ে শার্ট নেই, পরনে লুঙ্গি নেই, কোমরে ঘুনসি নেই। গোসলের জন্য সাবান নেই, চুল ধোয়ার জন্য শ্যাম্পু নেই। এ নিয়ে আপনি চিন্তিত নন, কারণ বেঁচে থাকাই আপনার কাছে মুখ্য। আপনি একটি বড়ই গাছ দেখলেন। বেঁচে থাকার জন্য আপনাকে বড়ই খেতে হবে। গাছে উঠতে গিয়ে দেখলেন কাঁটা আর কাঁটা। কী করা যায় কী করা যায় ভাবছেন। একদিন দুইদিন তিনদিন পর, ক্ষুধায় যখন প্রাণটি খাঁচাছাড়া হওয়ার উপক্রম, তখন হঠাৎ দেখলেন আপনার অদূরে পড়ে আছে একটি পাথরের নুড়ি। বিদ্যুতের মতো আপনার মাথায় খেলে গেলো, আরে, এটি দিয়ে তো বড়ই গাছে ঢিল ছোঁড়া যাবে! 
এই যে আপনি বড়ই গাছ থেকে বড়ই পেড়ে খাওয়ার একটি মামুলি কৌশল আবিষ্কার করলেন, এটিই বিজ্ঞান। বিজ্ঞান মানে শুধু তা নয়, যা ব্যবহার করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বা পারমাণবিক বোমা বানানো যায়। 

ধর্ম পালন করতে বিজ্ঞানের সাথে কলহে লিপ্ত হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। পৃথিবীর বহু বিখ্যাত বিজ্ঞানী, বৈজ্ঞানিক কাজকর্ম করেও ধর্ম পালন করেছেন। সম্ভবত তারা কবিরাজ নন বলেই পেরেছেন। 

কিন্তু কবিরাজদের জন্য এটি কঠিন। কবিরাজদের প্রধান কাজ মানুষকে বিভ্রান্ত করা। প্যারাসিটামল নয়, জ্বরে একটি ফুঁ অধিক কার্যকরী, এটি কাউকে না বুঝানো গেলে সে কবিরাজের কাছে যাবে না। এজন্য কবিরাজেরা, নানা প্রলাপ বকে, ‘বানর থেকে মানুষ এসেছে’ এ রটনায় বিশ্বাসীদের কাছ থেকে বাহ্বা কুড়াচ্ছে, এবং নিজেদের বামন মূর্তিটিকে পূজনীয় রাখতে, মানুষকে নানা কৌশলে বিভ্রান্ত করছে।

তারা জানে যে, বৈজ্ঞানিকভাবে চিন্তা করা বেশ পরিশ্রমের কাজ, এবং এ কাজে দরকার পড়ে পড়াশোনোর। এজন্য তারা, নিজেদের হীনমন্যতাকে ঢাকতে গামছা ছুঁড়ে দিয়েছে বিজ্ঞানের গায়ে। মুশকিল হলো, এ গামছা একটু ফুঁ দিলেই উড়ে যাচ্ছে। 
এ কবিরাজদের বলতে চাই, নিউটনের প্রিন্সিপিয়া ম্যাথম্যাটিকা গ্রন্থটি শুরু হয়েছে এডমুন্ড হ্যালির একটি কবিতা দিয়ে। হ্যালি, নিউটনের এ অসামান্য কাজের প্রশংসা করে কবিতাটি লিখেছিলেন। কবিতাটির শিরোনাম— “Ode on This Splendid Ornament of Our Time and Our Nation, the Mathematico-Physical Treatise by the Eminent Isaac Newton”। আমার কাছে প্রিন্সিপিয়ার যে-সংস্করণটি আছে, তার ২৫ পৃষ্ঠায় কবিতাটি আছে। আমি ছবি দিয়ে দিলাম। কোনো কবিরাজের পক্ষে নিউটনের প্রশংসা করা সম্ভব নয়। 

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

মহিউদ্দিন মোহাম্মদ 

news24bd.tv/আলী

মন্তব্য

পরবর্তী খবর