ঈশ্বর কি মৃত?

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

ঈশ্বর কি মৃত?

জার্মান দার্শনিক ফেডারিক নিটশে'র 'ঈশ্বরের মৃত্যু'র ধারণা খুব সুখকর ছিল না। একজন ঈশ্বরের অস্তিত্ব ছাড়া পশ্চিম ইউরোপের মৌলিক বিশ্বাসের কাঠামো বিপর্যযের মধ্যে পড়বে বলে মনে করতেন। তা সত্বেও তিনি ১৩৪ বছর আগে ঘোষণা করেছিলেন- 'ঈশ্বর মারা গেছেন।' তার ঘোষণা দর্শনের ছাত্রদের কাছে উনবিংশ শতাব্দীতে যে যৌথ শিরপীড়ার কারণ হয়ে ওঠেছিল তা এখন পর্যন্ত দূর হয়নি।

এটি সম্ভবত দর্শন শাস্ত্রের ইতিহাসে অন্যতম পরিচিত বক্তব্য, যা এমনকি যারা কখনো নিটশে'র এ বক্তব্যের উৎস তার গ্রন্থ 'দ্য গে সায়েন্স' ছুঁয়েও দেখেননি, তাদের কাছেও সুপরিচিতি। কিন্তু অধিকাংশ লোকই জানেন না যে এর দ্বারা তিনি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছেন এবং তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আমাদের কাছে এ বক্তব্যের অর্থ কী?

নিটশে তার বয়স্ক জীবনে আস্তিক ছিলেন এবং তিনি একথা বোঝাতে চাননি যে একজন ঈশ্বর ছিলেন, যার মৃত্যু ঘটেছে। আধুনিক বিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের যুগে বিশ্ব-ব্রক্ষ্মান্ড ঐশ্বরিক আদেশের অধীনে নয় বরং ভৌত আইন দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ধারণার উদ্ভব হয়েছে সেটিই বিজ্ঞান ভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত বিবেচনা করা হচ্ছে। আধুনিক দর্শনও মনে করে যে সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে আর ঐশ্বরিক অধিকারের কোনো বৈধতা নেই, বরং শাসিতের সম্মতি ও যুক্তি দ্বারা পরিচালিত এবং ঈশ্বরের উপস্থিতি বা ঐশ্বরিক আদেশ ছাড়াই নৈতিক তত্ত্ব দ্বারা সরকার ব্যবস্থা পরিচালিত হয়। এটি অদ্ভুত এক ঘটনা ছিল।

ইউরোপে নীতি-নৈতিকতার উৎস হিসেবে ঈশ্বরের আর প্রয়োজন ছিল না। দর্শন ও বিজ্ঞান আমাদের জন্য মূল্যবোধ অথবা বিশ্বে শৃঙ্খলার বিধিবিধান দেওয়ার জন্য সমর্থ। পাশ্চাত্যে চিন্তাভাবনার ক্রমবর্ধমান ধর্মনিরপেক্ষতা নিটশেকে এ উপলব্ধিতে পৌঁছতে বাধ্য করে যে, শুধু যে ঈশ্বর যে মৃত্যুবরণ করেছেন তা নয়, মানুষই বিজ্ঞানের বিপ্লব এনে পৃথিবীকে আরো ভালোভাবে জানার আকাঙ্ক্ষায় ঈশ্বরকে হত্যা করেছে। 

তিনি তার 'টোয়াইলাইট অফ দি আডলস' এ লিখেছেন- 'খ্রিষ্টবাদে বিশ্বাসী কেউ যখন তার বিশ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তিনি কারো পায়ের নিচ থেকে খ্রিস্টান নৈতিকতার অধিকারকে টেনে নেন। খ্রিস্টবাদ একটি ব্যবস্থা, সবকিছুকে সামগ্রিক দৃষ্টিতে দেখা। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রধান ধারণা ‘ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস’কে ভেঙে ফেলার অর্থ হচ্ছে সমগ্র বিশ্বাসকে চুরমার করে ফেলা।'

নিউইয়র্কের রচেষ্টার কাউন্টির ডন হ্যামিল্টন ১৯৬৬ সালের দিনটিকে ভুলতে পারেননি। তার বয়স তখন ১২ বছর। এক সহপাঠি তাকে প্রশ্ন করে- 'তোমার বাবা কি মনে করেন যে ঈশ্বর মারা গেছেন?' হ্যামিল্টন ‘হ্যা’ সূচক উত্তর দিয়েছিলেন। কিছুদিন পর তার আরেক বন্ধুর দাদিমার নেতৃত্বে হ্যামিল্টনের বাবা রচেস্টার ডিভাইনিটি স্কুলের শিক্ষক উইলিয়াম হ্যামিল্টনের বক্তব্যের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তাকে চাকুরিচ্যুত করেন। 

১৯৬৬ সালের ৮ এপ্রিল সংখ্যা ‘টাইম’ ম্যাগাজিন “ঈশ্বর কি মৃত?” শীর্ষক কভার স্টোরি করার পর হ্যামিল্টনের পরিবারকে রচেস্টার ত্যাগ করতে হয়। নিবন্ধটি লিখেছিলেন ‘টাইম’ এর ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক জন এলসন। পাঠকদের কাছ থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানিয়ে ৩,৪২১টি চিঠি আসে টাইম দফতরে। অধিকাংশ প্রতিবাদের ভাষা ছিল- “তোমাদের কুৎসিত কভার ধর্মদ্রোহমূলক।” ‘দ্য ন্যাশনাল রিভিউ” ম্যাগাজিন ‘টাইম’কে প্রশ্ন করে যে আসলে ‘টাইম’ মরে গেছে কিনা। 

২০১৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি ও সঙ্গীত শিল্পী বব ডিলান ১৯৭৮ সালে প্লেবয় ম্যাগাজিনে এক সাক্ষাৎকারে ‘টাইম’ এর নিবন্ধের সমালোচনা করে বলেন- “আপনি যদি ঈশ্বর হতেন, তাহলে নিজের সম্পর্কে অমন লেখা দেখে আপনার কেমন লাগত?” ৫৫ বছর পরও ‘টাইম’ এর সেই কভার ম্যাগাজিনটির ইতিহাসে প্রকাশিত সবচেয়ে অনন্য কভার হিসেবে বিবেচিত। 

‘টাইম’ ম্যাগাজিনের কভারের তিনটি শব্দ “Is God Dead?” (ঈশ্বর কি মৃত?) নিয়ে কিছু খ্রিস্টান মৌলবাদী ধমতাত্ত্বিক বিতর্কে অবতীর্ণ হন এবং গোটা আমেরিকা জুড়ে ভীতি-মিশ্রিত তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নিবন্ধে টমাস অ্যালটাইজার নামে “ঈশ্বরের মৃত্যু” বিষয়ক তাত্ত্বিকের বক্তব্য ছিল; তিনি বহু বছর পর ঈশ্বরের মৃত্যু প্রসঙ্গে তার সুর পাল্টে বলেন, “আমি অন্তত এটা কল্পনা করতে পারি না। আমরা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতে বাস করছি।” 

১৯৬৬ সালে ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের বিতর্কিত সংখ্যাটি প্রকাশিত হওয়ার পর কাছাকাছি সময়ে অ্যালটাইজার ও হ্যামিল্টন এ বিষয়ের ওপর একটি নিবন্ধ সংকলন প্রকাশ করেছিলেন, “র‌্যাডিক্যাল থিওলজি এন্ড ডেথ অফ গড” নামে। ‘টাইম’ এর কভারের বক্তব্যের সঙ্গে তাদের বক্তব্যে সুক্ষ ব্যবধান ছিল। যদিও তারা ঈশ্বরের মৃত্যু সম্পর্কিত তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এড়িয়ে যাননি, কিন্তু তাদের বক্তব্যকে রূপক অর্থে গ্রহণ করতে বলেছেন। ঈশ্বরের অস্তিত্বে তারা অস্বীকার বা অবিশ্বাস করেননি। ঈশ্বর ছিলেন, কিন্তু তিনি মারা গেছেন।

হ্যামিলটনের কাছে ‘ঈশ্বরের মৃত্যু’ ব্যাপক অর্থে একটি নীতিগত সমস্যা। মানুষের দ্বারা যে কাজ করা প্রয়োজন সেজন্য যিশু খ্রিস্টই বরং ঈশ্বরের চেয়ে উত্তম মডেল। বিশেষ করে হ্যামিল্টনের ক্ষেত্রে আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্ট একটি দৃষ্টান্ত ছিল, যখন তিনি ধর্মের স্থান দেখেছেন পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে; স্বর্গে নয়। অ্যালটাইজার আরেক ধাপ এগিয়ে গেছেন- “ইস্টারের আগে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার জন্য যিশু খ্রিস্টকে মরতে হয়েছে, এবং একইভাবে ঈশ্বরকে মরতে হবে বিপর্যয়ের জন্য।” এ বক্তব্যের কারণে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের নিবন্ধ নিয়ে বিতর্ক চলাকালে তাকে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছে।   

১৯৬৬ সালে আমেরিকানদের জন্য বিশ্বাস করা সহজ ছিল না যে একজন কল্যাণকামী ঈশ্বর সক্রিয়ভাবে মানুষের জীবন পরিচালনা করছে। বহু বছর দেশের বাইরে অবস্থান করে আমেরিকানরা দেখেছে যে ঈশ্বরহীন কমিউনিজম বিশ্বজুড়ে অশুভ পর্দা টেনে দিয়েছে এবং আমেরিকায় লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিদিন অমানবিকতার শিকারে পরিণত হচ্ছে, তাদের নিজ জাতি শুধু ত্বকের ভিন্ন রঙ এর কারণে নিজেদের নাগরিকদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে। 


করোনা মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি নিয়ে আজ থেকে মাঠে পুলিশ

সেন্টমার্টিনে সিয়াম ও পূজা চেরি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে কোন খারাপ সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত আছি: রাশিয়া

মোদি ও শাল্লা ইস্যুতে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে হেফাজত


‘টাইম’ ম্যাগাজিন পাঠকের ক্ষোভ প্রশমন করতে পরবর্তীতে ব্যাখ্যা দেয়- “অন্ধকারের অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্বাস সবসময় ‘ঈশ্বরের’ দান হিসেবে অযৌক্তিক অবদান রাখে। আগের শতাব্দীগুলোর মতো চার্চের পক্ষে এখন আর মানুষকে হুমকি দেওয়া বা বাধ্য করার উপায় নেই। ডাচাও এর হত্যাকাণ্ড (১৯৪৫ সালে জার্মাানির ব্যাভারিয়ায় ডাচাও এ জার্মান যুদ্ধবন্দী শিবিরে আমেরিকানদের দ্বারা পরিচালিত হত্যাকাণ্ড) ও হিরোশিমা-নাগাসাকির তাৎক্ষণিক মৃত্যুর ঘটনা পৃথিবীতে নরকের বহু প্রকৃত সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে।”

আমেরিকান আধ্যাত্মিকতার নতুন ইতিহাসের লেখক পিটার ম্যানসেয়াও তার “ওয়ার নেশন, আন্ডার গড” গ্রন্থে বলেছেন- “বিংশ শতাব্দীর নৃশংসতাই শেষ উপাদান নয়। আরো খবর রয়েছে - মোহাম্মদ আলীর ইসলাম ধর্ম গ্রহণ অথবা ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশগ্রহণ কি আমেরিকানদের খিস্টধর্মের পরিবর্তে অন্য ধর্মের কথা ভাবতে বাধ্য করবে? পুরোনো যুগের জরিপে দেখা গেছে যে ৯৭ শতাংশ আমেরিকান ঈশ্বরে বিশ্বাস করে। কিন্তু সে বিশ্বাস হ্রাস পেয়েছে। 

২০১৪ সালের পিউ রিসার্চ এর জরিপে ধর্মে বিশ্বাসী আমেরিকানের সংখ্যা নেমে এসেছে ৬৩ শতাংশে। আধ্যাত্মিকতার দাবি করেন বহু আমেরিকান, নিজেদেরকে কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে পরিচয় দেন না। সে প্রেক্ষিতে দেখা যায়, ঈশ্বরের প্রতি আমেরিকানদের বিশ্বাস হ্রাস পেয়েছে, যদিও যারা ধর্মে বিশ্বাসী তারা কট্টর অবস্থানে রয়েছেন। ধর্মের উপস্থিতি রয়েছে রাজনীতি, শিক্ষা এবং পপ কালচারে। 

রাব্বাই ডোনিয়েল হার্টম্যান তার 'পুটিং গড সেকেন্ড' গ্রন্থে বলেছেন, “এখন কেউ আর প্রশ্ন করে না যে ঈশ্বর মারা গেছেন কিনা। কেউ যদি ইশ্বরকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনকারী হিসেবে স্বীকার না করে তাহলে তার পক্ষে পৃথিবীর তিন-চতুর্থাংশ দ্বন্দ্ব-সংঘাত উপলব্ধি করা সম্ভব হবে না।” 

ধর্মততত্ত্ববিদ ও একেশ্বরবাদী ধর্মীয় চিন্তাবিদদের অনানুষ্ঠানিক জরিপে প্রধান কিছু বিষয় বের হয়ে এসেছে, যার প্রতিটির মধ্যে বিগত ৫০ বছরের মধ্যে জাগতিক ও পরজাগতিক উপায়গুলোর প্রতিফলন ঘটেছে। বৈচিত্রের উত্থান বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী আমেরিকানদের বাধ্য করেছে পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করতে।

কিন্তু তা সকল ক্ষেত্রে এক নয়। কারণ ইব্রাহিম থেকে উৎসারিত এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী ধর্মে বিশ্বাসীরা সংঘাতময় বিশ্ব সম্পর্কে অর্থ্যাৎ যা হওয়া উচিত সে সম্পর্কে ভিন্নভিন্ন ধরনের ভাবনা পোষণ করেন। মুসলিম ও খ্রিস্টানরা একই ঈশ্বরের প্রার্থনা করে মর্মে বক্তব্য দেওয়ার কারণে কয়েক বছর আগে হোয়েটন কলেজের এক প্রফেসরকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। 

অন্যদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও সিভিল রাইটস মুভমেন্ট  “ঈশ্বরের মৃত্যু” আন্দোলনের অংশ ছিল; মানুষের বিশ্বাসের মাঝেও সবসময় একটি প্রশ্ন ঝুলতো, যিনি সর্বময় ক্ষমতার মালিক, সেই ঈশ্বর পৃথিবী জুড়ে এতো দুর্দশা-যাতনা ও অন্যায়ের মধ্যে কীভাবে বিরাজ করেন? ধর্মীয় চিন্তাবিদরাও কূলকিনারা করতে পারছিলেন না মানুষের মাঝে কীভাবে তারা বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখবেন। অন্যেরা দুর্ভোগ দেখে ও বিশ্বাসীরা দুর্ভোগ বন্ধে ভূমিকা রাখছে না তাতে যে শুধু বিস্মিত হয় তাই নয়, ঈশ্বরের কোনো বিঘ্ন ঘটেছে কিনা তাও ভাবে। 

উইলিয়াম হ্যামিলটন ১৯৮৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে এই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ঈশ্বর হয়তো মারা যাননি, কিন্তু তিনি ভুল মানুষের হাতে আছেন এবং তাকে হত্যা করা হতে পারে। কিছু লোকের কাছে এই প্রশ্নের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

news24bd.tv আয়শা
  

পরবর্তী খবর

দুনিয়ার কোথাও তো বয়স যোগ‍্যতার মাপকাঠি নয়?

রউফুল আলম

দুনিয়ার কোথাও তো বয়স যোগ‍্যতার মাপকাঠি নয়?

দেশের পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে কি কোন শিক্ষকের ছাত্র, সেই শিক্ষকের আগে প্রফেসর হতে পারে? বা হয়েছে?  আমি দেখিনি। এবং আমার জানা মতে কোন উদাহরণ নেই।

যদি না হয়ে থাকে, তাহলে সেটার কারণ কি? 

বয়স কি যোগ‍্যতার কোন মাপকাঠি? দুনিয়ার কোথাও তো বয়স যোগ‍্যতার মাপকাঠি নয়? কিংবা সার্ভিস পিরিয়ডও যোগ‍্যতার মাপকাঠি নয়। 
পিএইচডি করার সময় ডিপার্টমেন্টের হেড ছিলেন পার উঙ্গার। তিনি কখনো প্রফেসর হতে পারেননি। কিন্তু তার পরে জয়েন করা বহু শিক্ষক প্রফেসর হয়ে গিয়েছিলো।  

এমন বহু উদাহরণ আমি দেখেছি।
কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে এটা আরো কমন! বয়স কিংবা সার্ভিস পিরিয়ড যোগ‍্যতার মাপকাঠি হয় না। আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে কাজ করি, এখানে প্রমোশনের জন‍্য কোন নিদির্ষ্ট সময় বাঁধা নেই। 

আমি যদি জেনেই থাকি যে, চাকরির তিন বছর না হলে আমার প্রমোশন হবে না, তাহলে আমার ভিতর ড্রাইভিং ফোর্স থাকবে না। আমার ভিতর কাজের নেশা থাকবে না। আমার ভিতর কমিটমেন্ট, ইনোভেশন, সিন্সিয়ারিটি এগুলো হ্রাস পাবে। অর্থাৎ নেট প্রোডাক্টিভিটি কমে যাবে। আর নেট প্রোডাক্টিভিটি কমে গেলে প্রতিষ্ঠান ঝিমিয়ে পড়ে।

আমাদের সচিবালয়, পুলিশ প্রশাসন কিংবা অন‍্যান‍্য সরকারী প্রতিষ্ঠানেও কি একই অবস্থা? সেখানেও কি বয়স কিংবা সার্ভিস টাইম দেখে প্রমোশন হয়? সার্ভিস টাইম যদি প্রমোশনের অন‍্যতম ক্রাইটেরিয়া হয়, তাহলে একজন মানুষ তো চাকরিকে ইনজয় না করে শুধু সাল গণনা করবে। 
বয়স যদি যোগ‍্যতার মাপকাঠি হয়, তাহলে সেখানে আধুনিক ও বৈশ্বিক চ‍্যালেঞ্জ নেয়ার মতো মানুষ তৈরি হয় না। ইমপসিবল! 

রউফুল আলম, নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক হাকিম নয়

মিল্লাত হোসেন

জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, বিচারিক হাকিম নয়

বাংলাদেশের বিচার বিভাগে 'বিচারিক হাকিম', "জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম", "মহানগর হাকিম'; "অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম", "অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম", "মুখ্য বিচারিক হাকিম" বা "মুখ্য মহানগর হাকিম" বলে কোন পদ নেই। 

তাসত্ত্বেও, খবরের কাগজসহ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও বিচারিক হাকিম বা মহানগর হাকিম এসব পদবি উল্লেখ করতে দেখা যায় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এর বদলে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলতে হয়- Magistrate পদবিটিকে 'হাকিম' বলে এবং 
Judicial, Senior, Additional ও Chief শব্দগুলোকে যথাক্রমে বিচারিক, জ্যেষ্ঠ, অতিরিক্ত ও মুখ্য বলে স্বেচ্ছাকৃত অনুবাদ করে লিখা হতে দেখা যায়। অবশ্যই প্রাগুক্ত ইংরেজি শব্দগুলোর বঙ্গানুবাদ এমনই যেমনটি লেখা হয়। কিন্তু, তা পৃথক-পৃথকভাবে। যদি কোন পদ নাম হিসেবে এগুলো একত্রে ব্যবহৃত হয় তখন স্বেচ্ছাকৃত বঙ্গানুবাদ শুধু যে করা যাবে না, তা নয়, করলে বেআইনিও হবে। 

দেশের সর্বোচ্চ আইন বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদে বাংলাতেই আছে- 'ম্যাজিস্ট্রেট' শব্দটি। ১১৫, ১১৬ ও ১১৬ক অনুচ্ছেদে আছে- 'বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব পালনকারী ম্যাজিস্ট্রেট', 'ম্যাজিস্ট্রেট' ইত্যাদি। হাকিম বলে অনুবাদ করা হয়নি। 

The Code of Criminal Procedure, 1898 আইনটি ইংরেজি ভাষায় প্রণীত হয়ে সেভাবেই বহাল আছে এখনো পর্যন্ত। এই আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী 
Judicial Magistrate, 
Metropolitan Magistrate,
Additional Chief Judicial Magistrate, 
Additional Chief Metropolitan Magistrate, 
Chief Judicial Magistrate ও 
Chief Metropolitan Magistrate নামের পদই কেবল আছে। 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস গঠন, সার্ভিস পদে নিয়োগ ও সাময়িক বরখাস্তকরণ, বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা, ২০০৭ সহ
বিচারকদের জন্য প্রণীত অন্যান্য চাকুরি বিধি অনুযায়ী 
জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, 
সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, 
মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট,
এডিশনাল চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, 
এডিশনাল চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, 
চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট  ও 
চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নামের পদই কেবল আছে। 

এগুলোর কোনো বাংলা অনুবাদ করা হয়নি আইনে বা বিধিতে। আবার, বাংলার ক্ষেত্রেও শুধু প্রতিবর্ণীকরণ করা হয়েছে। ফলে, আনুষ্ঠানিকভাবে যখন এসব পদের নাম লিখতে হবে তখন আইনানুযায়ীই লিখতে হবে। 

যে কোনো ব্যক্তি বা স্থানের নাম proper name হিসেবে হুবহু বানান ও উচ্চারণ করার বাধ্যবাধকতা থাকে। যেমন- কারো নাম যদি "শহীদ" বা "যুবরাজ" হয় তবে কেউ যদি তা "সহিদ" বা "ইয়ুবরাজ" লিখেন বা উচ্চারণ করেন তবে তা একদিকে যেমন হবে অসম্মানজনক; অন্যদিকে হবে- নিরেট ভুল। 

আর, কোনো নাম যদি আইনগতভাবে নির্দিষ্ট করা হয়, যেমন- "বাংলাদেশ" (Bangladesh) বা "Chattogram" (চট্টগ্রাম); তবে সেভাবেই লিখতে হবে। ইংরেজি ধ্বনি উচ্চারণ পদ্ধতি (IPA) অনুসারে এগুলো ভুল (চ্যাট্টোগ্র‍্যাম বা ব্যাংলাদেশ!) হলেও কিছু করার নেই। হ্যাঁ, এগুলো যারা ঠিক করেছেন তাদের জ্ঞান নিয়ে সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু এভাবেই লিখতে হবে যতোক্ষণ না সংবিধান বা অন্যান্য বিধিবিধানে সংশোধনী আনা হয়। কারণ, আইন as it is  প্রয়োগ করা হবে। 
মানে, কালো অক্ষরে যেভাবে আছে সেভাবেই ব্যবহার করার বাধ্যবাধকতা আছে। হ্যাঁ, সে আইনটা ভাল না মন্দ, সেই আলোচনা নিশ্চয় করা যাবে। তবে, সেটা আইন প্রণয়ন বা সংশোধনের পর্যায়ে, প্রয়োগের ক্ষেত্রে as it is। 

ফলে, আইন অনুসরণ না করে যে কোনো পর্যায়ের সরকারি বা বেসরকারি যে সব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিশেষতঃ সংবাদ মাধ্যমগুলো "বিচারিক হাকিম" বা "মুখ্য মহানগর হাকিম" ইত্যাদি লিখছেন তারা- 
১মতঃ ভুল করছেন; 
২য়তঃ আইন লঙ্ঘন করে যাচ্ছেন এবং
সর্বশেষে, ভুল নামে ডেকে বা লিখে আদবেরও যে ব্যত্যয় ঘটাচ্ছেন, তা বলাই বাহুল্য। এই বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

মিল্লাত হোসেন, বিচারক।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

করোনাকালে সঠিক তথ্য হচ্ছে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের ব্যবধান

শওগাত আলী সাগর

করোনাকালে সঠিক তথ্য হচ্ছে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের ব্যবধান

সকাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর কয়েকটি স্টেটমেন্টই ইমেইলে এসেছে। কানাডায় এটি ’মানসিক স্বাস্থ্য সপ্তাহ’- মেন্টাল হেলথ উইক, সে উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছেন। কোভিড মহামারীর সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমার নজর ছিলো ’ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে ‘ উপলক্ষে কানাডীয়ান প্রধানমন্ত্রী কি বলেন, সেদিকে। 

জাস্টিন ট্রুডোর বিবৃতিটা কয়েকবার পড়লাম। বাংলাদেশের গত কয়েকদিন ’সাংবাদিকতা যে কতো নিকৃষ্টতম পেশা’ আর ‘সাংবাদিকরা কতো নিকৃষ্ট’ তার বয়ানের তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। অনেক সংবাদকর্মীও ‘নিজেরা সাংবাদিক হয়েছেন বলে লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলেছেন’- এমন একটা  সেন্স দেয়ার চেষ্টা করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।  ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস  ফ্রিডম ডে’ তেও তার ব্যতিক্রম হয়েছে বলে চোখে পরেনি।

ট্রুডোর বিবৃতিটার দিকে মনোযোগ দেই। বিবৃতিটা শুরু হয়েছে এইভাবে“Today, on World Press Freedom Day, we celebrate the invaluable role that journalists play in Canada and around the world, and honour all those who have lost their lives in pursuit of the truth. We also rededicate ourselves to a fairer and more inclusive future where everyone, everywhere, is free to make their voices heard.” কানাডা এবং সারা বিশ্বে প্রতিটি সংবাদকর্মী আলাদা আলাদাভাবে যে ভূমিকা রাখেন সেটিকে উদযাপনের কথা বলছেন কানাডীয়ান প্রধানমন্ত্রী।

ইউনেস্কো এবারের ’ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে ‘র মূল প্রতিপাদ্য ঘোষনা করেছে জনস্বার্থে তথ্য- ‘Information as a Public Good’. সমাজ বিনির্মানের কথা বাদ দেই, গত এক বছরের করোনা মাহামারীতে সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতার কি কোনো ভূমিকা ছিলো? জাস্টিন ট্রুডো অবশ্য তার বিবৃতিতে  কভিডে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকার কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন। 

তিনি বলছেন, ‘‘গত প্রায় এক বছর ধরে অসংখ্য সাংবাদিক দিনে রাতে কভিডের তথ্য - উপাত্ত বিশ্লেষণ, পর্যালোচনা করে, ভুল এবং মিথ্যা তথ্যের বিপরতে সঠিক তথ্য তুলে ধরে আমাদের সুস্থ থাকতে, জীবন বাঁচাতে সহায়তা করে যাচ্ছেন।যেই সময়ে যে কোনো তথ্য বিকৃত করা এবং ভুল তথ্য জনগনের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়া খুবই সহজ , সেই সময়ে আমাদের জীবন এবং সমাজকে  সুস্থ রাখতে সাংবাদিকরা যে ভুমিকা রাখছেন তা অনন্য।” 

তিনি মনে করিয়ে দেন, করোনা মাহামরীকালে সঠিক তথ্য হচ্ছে জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের ব্যবধান।জাষ্টিন ট্রুডো কানাডা এবং বিশ্বের প্রত্যেক স্থানের সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন  সটিক তথ্য তুলে ধরায় তাদের ভুমিকার জন্য। 

’ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ তে জাস্টিন ট্রুডোর বিবৃতিটা পড়তে পড়তে ভাবছিলাম বাংলাদেশের সাংবাদিকতার কি এমন সামান্য অবদান নেই যার জন্যে ’ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে ‘র মতো বৈশ্বিক একটি দিনে তাদের সব সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে হলেও কেউ তাদের  বলবে- তোমাদের এই ভুমিকাটার জন্য জাতি হিসেবে তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। তোমাদের ধন্যবাদ দেই।

 ট্রুডোর মতো ” They are democracies’ first line of defence, and the cornerstone of any fair, strong, and vibrant society.” বলতে না পারি,  একটি আন্তর্জাতিক দিবস উদযাপনে উল্লেখ করার মতো একটি অবদানও কি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার নেই! থাকলে সেটি কি আমরা স্বীকার করেছি! স্বীকার করছি!

শওগাত আলী সাগর, প্রধান সম্পাদক, নতুনদেশ, কানাডা।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

সাংবাদিকতা কেন করি?

খালেদ মুহিউদ্দীন

সাংবাদিকতা কেন করি?

আমরা সাংবাদিক, খুব অল্প লোকই আমাদের ভাল বলে। আজকে মুক্ত গণমাধ্যম দিবস বলে হয়ত আমাদের আরও বেশি গালাগাল হজম করতে হচ্ছে। 

কিন্তু কেন? অনেকরকম উত্তর হয়। আমি একটু ঘুরিয়ে বলি, এখনকার বাংলাদেশে আপনি একটি পেশা দেখাতে পারবেন না যে পেশার মানুষেরা সমালোচিত নন। হয়ত আপনি পারবেন, আমি পারছি না। 

আমি দেখি, পুলিশ, আমলা, মিলিটারি, উকিল, ডাক্তার, যাজক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, জেলে, চাষী, রিক্সাওয়ালা, গৃহকর্মী, নাপিত, দারোয়ান, পালোয়ান, নায়ক, গায়ক, পাচক, বিচারক, লেখক, প্রকাশক, ব্যাংকার বা ক্রিকেটার সবাই একেকজন যেন একেকটি ভয়াল অধ্যায় আর ভয়ঙ্কর এক চরিত্র। এই জঙ্গলে আমরা সকলেই উদ্যত হায়েনা চোখ রাখি সারাক্ষণ মৃত আর জখমের উপর।

বন্ধুরা, আপনাদের মধ্যে যারা এমন পেশায় আছেন, যা নিয়ে সমালোচনা নেই বা যা করার জন্য কোনো গ্লানি বোধ করতে হয় না, আমাকে একটু জানাবেন।

আমি সাংবাদিকতা করি, কারণ আমি ১৯৯৩ সাল থেকে সাংবাদিকতা পড়ি-পড়াই, করি-করাই। অন্তত আরও তিনটি ভিন্ন ধরনের চাকরি চেষ্টা করেছি, পারি নাই। সাংবাদিকতা করি, কারণ তা আমার জন্য সহজ। আমার কোনো বাড়তি গুণের জন্য আমি তা করি না। অন্যকিছু বেশি ভাল পারলে বা এককথায় বেশি পোষালে বা সরল করে বললে কম কাজ করে বেশি পয়সা পেলে হয়ত অন্য কিছু করব।

মুক্ত বা চাপমুক্ত গণমাধ্যম আমার কাছে সোনার পাথরবাটির মত লাগে। আপনি সকলের ফুটো অনুসন্ধান করবেন আর কেউ আপনাকে চাপ দেবে না এটা হতেই পারে না। চাপে না থাকলে বুঝবেন আপনি এখন খানিক ইতিহাস পুরাই অপ্রাসঙ্গিক। 

সেই চাপের মুখে আপনি, আমি কি করি তাই হয়ত লেখা থাকে স্পর্শের বাইরে কোনো মলাটে অথবা কোনো অদৃশ্য ললাটে। আমি অবশ্য সবসময় মনে করি, না পোষালে মানে আপনার পছন্দ না হলে ছেড়ে দেওয়া ভাল। যেকোনো অজুহাতে ধরে রাখলে ধরে নিতে হবে আপনি কাজটি পছন্দ করছেন।
আপনাদের সকলকে শুভেচ্ছা!

 

ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান খালেদ মুহিউদ্দীন

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

রাজনীতির হেফাজত! যেখান থেকে পচন শুরু

আশরাফুল আলম খোকন

রাজনীতির হেফাজত! যেখান থেকে পচন শুরু

আশরাফুল আলম খোকন

২০১৩ সালের ৫ মে’র আগেও হেফাজত ছিল। হয়তো রাজনীতির অন্দর মহলের হিসাব নিকাশে ছিল। রাজনীতির মাঠে তাদের প্রকাশ্য পদচারণা ছিলো না। তাদেরকে সবাই কওমী মাদ্রাসা ভিত্তিক সংগঠন হিসাবেই জানতো। ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরের আশপাশ এলাকায় দিনব্যাপী সহিংসতা দিয়েই তারা আলোচনায় আসেন। তখনো আগের ধর্মীয় ইমেজের কারণে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের দুর্বলতা ছিল। 

তারা কিভাবে মসজিদ মাদ্রাসার আঙ্গিনা ছেড়ে সহিংসতা নিয়ে রাজপথে আসলো এবং নিজেদের অবস্থান থেকে সরে গিয়ে বিতর্কের মুখে পড়লো- এটা নিয়ে আমার কোনো গবেষণা নাই। ঘটনা প্রবাহ যতটুকু মনে পড়ে সেটাই বলবো। আজকে কেন তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ওই দুর্বলতাটুকু যে নাই এর জন্য হেফাজত নেতৃত্বই দায়ী। এর বিন্দুমাত্র দায় অন্যকারও নেই। 

দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে তখন উত্তাল শাহবাগ। সারা দেশের সাধারণ মানুষ, পেশাজীবী, মিডিয়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শুধু যুদ্ধাপরাধী ও বিএনপি-জামাতের মুখপাত্র দৈনিক আমারদেশ, দৈনিক সংগ্রাম, দিগন্ত টেলিভিশনসহ কিছু মিডিয়ার অবস্থান ছিল শুরু থেকেই শাহবাগের বিপক্ষে। তারা শুরু থেকেই শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করে আসছিল। গণজাগরণের অবস্থান কিছুদিন অতিবাহিত হবার পরই তারা মিডিয়াতে এসে বলতে থাকেন শাহবাগে সব নাস্তিকদের সম্মিলন হয়েছে। এই নাস্তিকরা জাতিকে ধর্মহীণ করতে চায়। 

আমার দেশ পত্রিকাতে শাহবাগের নেতৃত্বিদানকারী কিছু তরুণকে নাস্তিক উপাধি দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যা সাংবাদিকতার কোনো নীতি নৈতিকতার মধ্যে পরে না। ওই সময় চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে গিয়ে হেফাজত নেতৃত্বের সাথেও বৈঠক করেন আমাদের দেশের তৎকালীন সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। যেই বৈঠকের ছবিগুলো পরে প্রকাশিত হয়েছে। পশ্চিমা কিছু এম্বাসির কর্মকর্তাদের বৈঠকের ছবিও পরে প্রকাশিত হয়েছে। বিপুল অংকের টাকা বিনিয়োগের অভিযোগও আছে। 


পশ্চিমবঙ্গ কার, জানা যাবে আজ

আজ হতে পারে ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড়

সূরা তাওবার শেষ দুই আয়াতের ফজিলত

কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন আজ


আমার পাশের গ্রামের একটা ছেলে যাত্রাবাড়ীতে একটি কওমি মাদ্রাসাতে পড়তো। শাপলা চত্বরে হেফাজতের জমায়েতে গিয়ে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ায় আহত হয়েছে। আমি তখন আমেরিকা থেকে দেশে বেড়াতে গিয়েছি। তার বাবা দিন আনে দিন খায়। আমার কাছে এসেছে চিকিৎসার সাহায্যের জন্য। আমি প্রথম প্রশ্নই ছিলো, আপনার ছেলে ওই খানে গেলো কেন? ওনার উত্তরে অবাক হইনি। উনি বললেন ঐটা নাকি ছিল তাদের ঈমানী দায়িত্ব। হেফাজতের হুজুররা তাদেরকে নাকি বলেছিলো ঢাকা শহর নাস্তিকরা দখল করে নিয়েছে। এই নাস্তিকদের খতম করতে হবে। একটা গল্প বললাম। সবগুলো গল্প এই রকমই ছিল। 

হেফাজতের এই নেতারা কোমলমতি শিশুদের বিভ্রান্ত করেছে। স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে তাদের মাথা বিক্রি করে দিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটেছে। একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হয়ে রাজনীতির হাতিয়ার হয়েছে। বাংলাদেশকে মূল চেতনা থেকে সরিয়ে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছে। মূলত তাদের ক্ষমতা লিপ্সা, অন্যের হাতিয়ার হিসাবে রাজনীতিতে ব্যবহার হওয়াই হেফাজত ইসলামকে বিতর্কিত করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হবার আগ পর্যন্ত হেফাজত কোনো আলোচনায়ই ছিল না। আগেও তাদের সংগঠন ছিল, লোকবলও ছিল। তবে, মাঠে তাদের নিয়ে খুব একটা বিতর্ক ছিল না। 

মূলত: তারা ওই সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিপক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের কলাকুশলীরা জানতো যে, বিএনপি-জামাতের আন্দোলন জনগণ গ্রহণ করবে না। তাই সেখানে তারা হেফাজতকে কিনে নিয়েছিল। যদি সরকারকে অস্থিতিশীল করা যায় তাহলে হয়তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ভেস্তে যাবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও রাজনীতির চালের কাছে সবই ধরা খেয়েছে। 

এরপর দীর্ঘ দিন তারা চুপ ছিল। হেফাজতের নতুন কমিটি হবার কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে হুঙ্কার দিয়ে মামুনুল হকের মত কিছু ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলের নেতা লাইম লাইটে আসে। সেই প্রভাবের পুরোটাই তারা কমিটি হবার সময় ব্যবহার করেছে। মূলত: হেফাজত ছিল অরাজনৈতিক সংগঠন। কিন্তু হেফাজতের গত কমিটির প্রায় অর্ধেক নেতার সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততা ছিল। অনেকের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ততার শক্ত অভিযোগও আছে। 

বিএনপি-জামাত জোটের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে না পেয়ে তারা হেফাজত ইসলামকেই নিরাপদ আশ্রয় বানিয়েছিলো। 
হেফাজতকে তারা ব্যবহার করেছে এবং সফলও হয়েছে। যেমন, মামুনুল হকের এতো অপকর্মের পরও হেফাজতের পুরা কমিটি তার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কিছু নেতা বিপক্ষে থাকলেও বাবুনগরী- মামুনুল গংদের তোপের মুখে অসহায় ছিলেন। তাই তারা গণহারে পদত্যাগ শুরু করে দিয়েছিলেন। আর এটা বুঝতে পেয়েই তড়িঘড়ি করে বাবুনগরী কমিটি ভেঙে দিয়েছেন। 

হেফাজতের নতুন কমিটি হবার পরদিন আমি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। লিখেছিলাম “এই কমিটি অনুমোদন করে হেফাজত তাদের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকেছে। কারণ এই কমিটির মাধ্যমে হেফাজত ইসলাম একটি রাজনৈতিক ও জঙ্গিবাদী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। জনগণের সহানুভূতিটাও হারিয়েছে।” হিসাবটা খুব সহজ। যেমন, নিরীহ ভালো ইমেজ সম্পন্ন একজন মানুষ। সন্ত্রাসীরা যদি তাকে নিরাপদ আশ্রয় মনে করে নিরাপত্তার জন্য ওই বাসায় আশ্রয় নেয় এবং তিনি আশ্রয় দেন।

পরে সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে যদি ওই আশ্রয়কারী ব্যাক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন কিন্তু মানুষ ওই নিরীহ ভালো ইমেজ সম্পন্ন মানুষটির পক্ষে অবস্থান নিবে না। তখন জনগণই বলবে উনি এইসব বাজে মানুষগুলোকে আশ্রয় দিলেন কেন। নিশ্চয়ই কোনো স্বার্থ আছে। দেখেন, এখন হেফাজতের এতো নেতা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য গ্রেফতার হচ্ছে কিন্তু তারা কারো কোনো সহানুভূতি পাচ্ছে না। কারণ তাদের পচনটা অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। এখন সেই পচনের গন্ধ বের হচ্ছে। সেই পচনের গন্ধে সহানুভূতিগুলোও দূরে সরে গেছে।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv নাজিম

পরবর্তী খবর