হুদা ভাইও চলে গেলেন

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

হুদা ভাইও চলে গেলেন

আমি হুদা ভাইয়ের সহকর্মী হওয়ার আগে দীর্ঘদিন তাঁর প্রতিবেশি ছিলাম। কিন্তু হৃদ্যতা চার দশকের। সব সম্পর্কের অবসান ঘটল গত ২১ মার্চ রোববার। তিনি ইন্তকাল করেছেন। আচরিত অভ্যাসবশত কারও মত্যু সংবাদ পেলে “ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইিহি রাজিউন” উচ্চারণ করি। এর বাংলা অর্থও বুঝি -- ‘আমরা তো আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী’। নিজেকে আশ্বস্ত করি “কুল্লু নাফসিন জায়েকাতুল মওত” -- ‘পৃথিবীর সকল জীবকে মৃত্যুর স্বাদ নিতে হবে’। তা সত্ত্বেও কারও কারও মৃত্যুতে বুকের ভেতরটা চিন চিন করে। অনেকের মৃত্যুতে নীরবে অশ্রু বিসর্জন করি। আমার মায়ের মৃত্যুতে ডুকরে কেঁদেছি। নূরুল হুদা ভাইয়ের মৃত্যু আমাকে কষ্ট দিয়েছে। তাঁর সাথে জড়িত স্মৃতিগুলো মনে পড়েছে।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে যখন টুকটাক রিপোর্টিং করতাম, তখন তিনি বাংলাদেশ অবজারভারের স্টাফ রিপোর্টার। মাঝে মাঝে বিভিন্ন এসাইনমেন্ট কভার করতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হতো। বিভিন্ন দৈনিকের রিপোর্টারদের মধ্যে বয়সে আমার চেয়ে সামান্য সিনিয়র হলেই সমীহ করতাম। বিশেষ করে ছাত্রত্ব শেষ না হওয়ার কারণে নিজেকে এমনিতেই জুনিয়র জুনিয়র লাগত। পুরনো রিপোর্টাররা বলতে গেলে ফিরেও তাকাতেন না। গায়ে পড়ে কথা বলার অভ্যাস নেই আমার, অতএব চুপচাপ বসে এসাইনমেন্ট কভার করে সিঙ্গারা-চা খেয়ে আগেভাগে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতাম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা যারা এক সঙ্গে বিভিন্ন সংবাদপত্রে রিপোর্টিং শুরু করেছিলাম -- আলমগীর হোসেন, হাসান হাফিজ, মনজুরুল আলম (মরহুম), শাহানা বেগম (কানাডা প্রবাসী), লিয়াকত আলী (খাদ্য বিভাগ থেকে অবসরপ্রাপ্ত), হায়দার ভাই (অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী) - তাদের কাউকে অনুষ্ঠানে পেলে স্বচ্ছন্দ বোধ করতাম। অন্য রিপোর্টারদের চেয়ে নূরুল হুদা ভাই এর ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি রিপোর্টার সারিতে নতুন কাউকে দেখলে এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিতেন। পরিচয় জানতে চাইতেন। হেসে কথা বলতেন, চার দশক আগের প্রথম দেখা তাঁর অমলিন হাসি কখনো মুছে যেতে দেখিনি।

সত্তরের দশকের শেষ দিকেও ঢাকায় হাতে গণা মাত্র কয়েকটি  দৈনিক। যারা অনুষ্ঠান আয়োজন করেন তারা বলতে গেলে সব রিপোর্টারকে নামে জানেন, যথেষ্ট মর্যাদা দেন। ধীরে ঢাকার প্রায় সব দৈনিকের রিপোর্টারের সঙ্গে চেনাজানা হয়ে হয়ে যায়। কিন্তু যারা আন্তরিক হন তাদের মধ্যে হুদা ভাই অন্যতম। কোনো কিছু বুঝতে না পারলে বুঝিয়ে দেন। আমিও নৈকট্য অনুভব করি, যা বরাবর বজায় ছিল। দিনে দিনে আমার বয়স বেড়েছে। দু’তিনটি দৈনিকে বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে ফেলেছি।

মাঠে ময়দানে রিপোর্টিং এর কাজ আর ছিল না। হুদা ভাই মাঝেমধ্যে ফোনে খোঁজ নিতে ভুলতেন না। মীরপুরে সাংবাদিক আবাসিক এলাকায় এক খন্ড জমি বরাদ্দ পেয়েছিলাম। পঁচানব্বই সালের কোনো এক সময় হুদা ভাই বলেন যে উনি মীরপুরে বাড়ি নির্মাণ কাজে হাত দিয়েছেন। একদিন দেখতে যাই। সাংবাদিক হাউজিংয়ে ১৭৯টি প্লটের মধ্যে শুধু তাঁর বাড়িই পরিকল্পিতভাবে নির্মিত হচ্ছিল। এর বাইরে দু’জন চালা ঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেছিলেন। আমি উৎসাহ বোধ করি। কোথায় কার কাছে নকশা তৈরি করাতে হবে, কিভাবে রাজউক থেকে প্ল্যান পাস করাতে হবে, হুদা ভাইয়ের পরামর্শ নিয়ে কাজ শুরু করি। তাঁর তিনতলা ভবনের কাজ যখন শেষ হওয়ার পথে তখন আমার বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিনি যখন সপরিবারে নতুন বাড়িতে বসবাস শুরু করেন তখন তখন আমার বাড়ি মাথা উঁচু করেছে। অনেক সময় তিনি এসে মিস্ত্রিদের পরামর্শ দেন। তাঁর ঠিক করে দেওয়া ইলেকট্রিক ঠিকাদার লাঙ্গলকোটের রুহুল আমিন বিদ্যুতের কাজ করে। বিদ্যুৎ সংযোগের অনুমতি পাওয়ার আগে তাঁর বাড়ি থেকেই আমার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দিতেও তিনি কার্পণ্য দেখাননি। আমি কৃতজ্ঞতা অনুভব করি।

উনিশ’শ পঁচানব্বই এর শেষদিকে আমি প্রায় অসমাপ্ত বাড়িতে বসবাস শুরু করি। ইতোমধ্যে হুদা ভাই বাংলাদেশ অবজারভার ছেড়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় (বাসস) যোগ দিয়েছিলেন। হুদা ভাইয়ের প্রতিবেশি হওয়ার কারণে অনেক সময় একসাথে রিকশায় মেইন রোড পর্যন্ত এসে বাসে উঠি। আমি ফার্মগেটে নেমে যাই তেজগাঁও শিল্প এলাকায় বাংলাবাজার পত্রিকা অফিসে যাই, হুদা ভাই পল্টনে বাসস তাঁর অফিসে যান।। ১৯৯৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাবাজার পত্রিকা ছেড়ে দৈনিক বাংলার বাণীর বার্তা সম্পাদক হিসেবে যোগ দেই। ওই বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে দিল্লিতে এক সফরে যেতে হয়। আমি ছাড়াও ছিলেন বাসস থেকে হুদা ভাই, ইত্তেফাকের গিয়াসউদ্দিন আহমেদ ও ডেইলি স্টারের আবদুল জলিল ভূঁইয়া। ওই সময় দিল্লিতে বাসস এর প্রতিনিধি ছিলেন ইহসানুল করিম হেলাল ভাই (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব) এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রেস মিনিষ্টার হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ অবজারভারের বিশেষ সংবাদদাতা আতিকুল ইসলাম ভাই। তাদেরকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল আমরা আসছি।

হেলাল ভাই জলিল ভূঁইয়াকে ফরমায়েশ দিযেছিলেন আমরা যাতে দিল্লির সাংবাদিকদের আপ্যায়ন করার জন্য ঢাকা এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি শপ থেকে ব্ল্যাক লেভেল হুইস্কি নিয়ে যাই। কারণ দিল্লিতে বিদেশি পানীয়ের ওপর ৬০০ শতাংশ শুল্ক। সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। আমরা আমাদের পাসপোর্টের বিপরীতে এক বোতল করে ব্ল্যাক লেবেল হুইস্কি কিনে নেই। সম্ভবত তখন এক বোতল ব্ল্যাক লেবেলের দাম ২৫ ডলার ছিল। আমি কখনো মদ্য পান করি না। এ ব্যাপারে আমি মহাকট্টর। আমার পানাসক্ত অনেক বন্ধুবান্ধব আছেন। তাদের শত পীড়াপীড়িতেও কখনো চেখে দেখিনি। আমি ধুমপানও করি না। কিন্তু যারা পান করে তাদের অভ্যাসে বাদও সাধিনি। কেউ যদি এ ধরনের উপহার পেয়ে আনন্দ লাভ করে আমি তাকে সে আনন্দ দান থেকে বঞ্চিত করারও পক্ষপাতী নই।

দিল্লি ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে হাইকমিশনের গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আতিকুল ইসলাম ভাই। তিনি দিল্লির বাঙালি প্রধান এলাকা সি আর পার্ক এলাকায় আমাদের জন্য রেষ্টহাউজও ঠিক করে রেখেছিলেন। বেশ রাত হয়ে গিয়েছিল। ড্রাইভার সকালে এসে আমাদের হাইকমিশনে নিয়ে যাবেন। জলিল ভূঁইয়া ও আমি এক রুমে, হুদা ভাই ও গিয়াস ভাই অন্য রুমে। দিল্লি আমার পরিচিত নগরী। ১৯৯২-৯৩ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টের ইন্সটিটিউট অফ কন্সটিটিউশনাল এন্ড পার্লামেন্টারি স্টাডিজে (আইসিপিএস) এক ফেলোশিপ প্রোগ্রামে কাটিয়েছি। নূরুল হুদা ভাইয়েরও পরিচিত নগরী। তিনি ১৯৯৪-৯৬ পর্যন্ত বাসস এর প্রতিনিধি হিসেবে দিল্লিতে ছিলেন। সকালে ড্রাইভার এসে আমাদের হাইকমিশনে নিয়ে যায়। আতিক ভাইয়ের সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হলো। তিনি হাইকমিশনার মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মিলিটারি অ্যাটাচিসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গেও পরিচয় হয়। 
ভারতে তখন ত্রয়োদশ লোকসভা নির্বাচন চলছিল। লোকসভা নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পর অনুষ্ঠিত হলেও এটি ছিল তিন বছরের মধ্যে তৃতীয় লোকসভা নির্বাচন।

১৯৯৬ সালে একাদশ লোকসভা নির্বাচনের পর গঠিত সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে ফেললে সরকারের পতন ঘটে। ১৯৯৮ সালে দ্বাদশ লোকসভা নির্বাচনে অটল বিহারি বাজপেয়ীর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের পতন ঘটে তামিল নাড়ুর জয়াললিতা দল সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করলে। অতএব ১৯৯৯ সালে ত্রয়োদশ লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়োজন পড়ে। সমগ্র ভারতে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এক মাস জুড়ে এক সপ্তাহ পর পর পাঁচ দিনে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স Ñ এনডিএ লোকসভার ৫৪৫ আসনের মধ্যে ২৯৯ আসনে জয়ী হয়। রাজধানী হিসেবে দিল্লি ইউনিয়ন টেরিটরির মর্যাদা ভোগ করে। দিল্লির সাতটি নির্বাচনী এলাকার প্রতিটিতে বিজেপির প্রার্থীরা জয় লাভ করে। কাছাকাছি সময়ে দিল্লি মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং বিজেপির মেয়র এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সংখ্যক কমিশনার নির্বাচিত হয়েছিলেন। এখন দিল্লি নগরী উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব মিউনিসিপাল কর্পোরেশন নামে তিনটি পৃথক কর্পোরেশন হলেও দিল্লি একটি কাঠামোর অংশ ছিল। আমাদের ভ্রমন কর্মসূচিতে মিউনিসিপাল কর্পোরেশন পরিদর্শন ছিল। আমরা সেখানে গিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ দেখতে পাই। নগরীর বিজেপি নেতারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারা আমাদের অভ্যর্থনা জানান। কনফারেন্স রুমে নিয়ে আমাদের মিষ্টিমুখ করান। আমরা তাদের বিজয়ে অভিনন্দন জানাই। আমাদের পক্ষ থেকে হুদা ভাই বক্তব্য দেন।

দুপুরে হেলাল ভাই দিল্লি প্রেসক্লাবে আমাদের ছাড়াও বেশ ক’জন ভারতীয় সিনিয়র সাংবাদিককে মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ করেছিলেন। প্রেসক্লাবের সামনে বিশাল এক বোর্ডে নির্বাচনের রাজ্য ও দলওয়ারী ফলাফল দেখতে শোভা পাচ্ছিল এবং মানুষের ভিড়ে রাস্তায় যান চলাচল বন্ধ। প্রেসক্লাবের ভেতরেও সাংবাদিকদের প্রচুর ভিড়। আশপাশের দেশগুলো ছাড়াও ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক সাংবাদিক নির্বাচন কভার করতে এসেছেন। আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন ভোরের কাগজের শ্যামল দত্ত ও প্রথম আলোর সানাউল্লাহ লাবলু। শ্যামল দত্ত সম্ভবত তিনি কানাডা থেকে দিল্লিতে এসেছেন।

মধ্যাহ্ন ভোজ শেষে হেলাল ভাই আমাদের ইন্ডিয়া গেট, কুতুব মিনার ও দিল্লি হাটে ঘুরিয়ে রেষ্ট হাউজে পৌঁছে দিলেন। রাতে আতিক ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত। তিনিও কয়েকজন বিশিষ্ট ভারতীয় সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। হুদা ভাই ও গিয়াস ভাই পরিকল্পনা করেছেন আজমীর যাবেন খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির মাজারে যাবেন। ভোরে ওঠেই তারা চলে গেলেন। আমি ও জলিল ভূঁইয়া আজমীর না গিয়ে দিল্লিতেই রয়ে গেলাম এবং এখানে ওখানে ঘুরে কাটালাম। রাতেই ফিরে এসেছেন তারা। আমাদের জন্য আজমীর শরীফ থেকে পবিত্র সূতা ও তবারক এনেছেন। হুদা ভাইয়ের বেশ কিছু পরিচিত লোক ছিল দিল্লিতে। সকালে এক আবুল ফজল এনক্লেভে এক মুসলিম শিল্পপতির বাসায় নাশতার দাওয়াত। আবুল ফজল এনক্লেভ যমুনা তীবরর্তী একটি সুন্দর আবাসিক এলাকা। শিল্পপতির নাম মনে নেই। টেক্সটাইল মিলের মালিক। ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রী হুদা ভাইকে পেয়ে আবেগাপ্লুত। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে হুদা ভাইয়ের স্ত্রী ও তাঁর তিন মেয়ের কথা জানতে চাইলেন। হুদা ভাই সপরিবারে দিল্লিতে ছিলেন এবং পরিবারটির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেছিলেন। রাজকীয় নাশতার আয়োজন করেছেন ভদ্রলোক। বিদায় নেওয়ার সময় আমাদের চার জনের জন্য চারটি থান কাপড়ের রোল আনলেন। প্রতিটিতে চল্লিশ গজ করে কাপড়। শেষ পর্যন্ত আমরা একটি রোল নিতে রাজি হলাম। সি আর পার্কে এসে দর্জির দোকানে নিয়ে কেটে ভাগ করে নিলাম। রাতে হেলাল ভাইয়ের বাসায় দাওয়াত ছিল। পরদিন সেন্ট্রাল মার্কেটে কিছু কেনাকাটা করে বিকেলের ফ্লাইটে ঢাকায় চলে আসি।

আরও পড়ুন


সালমান পরিবারের আরও একজন নায়িকা হিসেবে পা রাখছেন বলিউডে

নিউইর্য়ক পুলিশের লেফট্যানেন্ট হলেন বাংলাদেশি সাজেদুর রহমান

ঢামেক থেকে শিশুর মরদেহ নেয়ার সময় আনসারের মারধরের শিকার বাবা-মা

তিন দিনে মারা গেল তিনটি বাঘ


কিন্তু ২০০১ সালের এপ্রিলে বাংলার বাণী বন্ধ হয়ে যায়। হুদা ভাই বাসায় ্এসে সহানুভূতি জানান। আমি আমার মাসিক ম্যাগাজিন ঢাকা ডাইজেষ্টে সময় ব্যয় করি। বেকারত্ব যত সাময়িক হোক না কেন, আর্থিক কষ্ট যদি নাও হয়, আইডেনটিটি ক্রাইসিস বড় হয়ে ওঠে। সেজন্য মানসিক যাতনা অবশ্যই হচ্ছিল। হুদা ভাই প্রায়ই আসতেন সাহচর্য দিতে। অনেক কথা হতো তাঁর সঙ্গে। ইতোমধ্যে তাঁর বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছিল লাঙ্গলকোটের এক ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সঙ্গে। অমায়িক ছেলে। তাঁর শ্বশুরের বন্ধু বলে মাথা তুলে কথা বলে না। বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম তখন এটিএন বাংলার চিফ নিউজ এডিটর। আমরা বাংলাবাজার পত্রিকায় কিছুদিন সহকমী ছিলাম। বাংলার বাণীর খবর জানার পর তিনি আমাকে এটিএন বাংলায় যোগ দিতে বলেন। চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান ও  উপদেষ্টা সাইফুল বারীর সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত করে ফেলেন। আমি যোগ দিতে সময় নিচ্ছিলাম। কারণ এ সময়ে বাসস এ আমার নিয়োগ নিয়ে কথা হচ্ছিল। সাইফুর বারী সাহেব ফোন করে জানতে চান আমি কবে থেকে এটিএন বাংলায় যোগ দিচ্ছি। আমি তাকে জানাই যে আমি এসে কথা বলছি। তাঁর সাথে দেখা করে বাসস এ নিয়োগের সম্ভাবনার কথা বলি। তিনি বলেন যে বাসস এ নিয়োগ হলে এটিএন বাংলায় আসার প্রয়োজন নেই। না হলে যাতে অবশ্যই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করি।

একটু বিলম্ব হলেও বাসস এ নিয়োগ লাভ করি। আমি যেহেতু আগে ইংরেজি সাংবাদিকতা করিনি, সেজন্য ধরেই নিয়েছিলাম আমাকে বাংলা সেকশনে দেয়া হবে। নিয়োগপত্রে ইংরেজি সেকশনে যোগ দেয়ার কথা থাকায় দ্বিধার মধ্যে পড়ে যাই। উদ্ধার করতে আসেন হুদা ভাই ও সৈয়দ আবুল মাকসুদের মতো সজ্জনরা। আমাকে সাহস দেন। আমি উৎসাহিত হই। হুদা ভাইয়ের সহকর্মী হতে পারার আনন্দও ছিল। বাসস এ আমরা এক সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর কাজ করি। হুদা ভাইয়ের বয়স ষাট পূর্ণ হলে তাঁকে অবসরে যেতে হয়। আমি মীরপুর থেকে বনানী চলে এসেছিলাম। কিন্তু মীরপুর নিয়মিতই যেতে হতো বাড়ির দেখাশোনা জন্য। হুদা ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতাম তার বাসায় অথবা হাউজিং সোসাইটির অফিসে। অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন তিনি। সোসাইটির সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর গত বছর তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয়েছে টেলিফোনে। অসুস্থতার কথা একবারও বলেননি। স্বভাবসুলভ হেসে কথা বলেছেন। আমার কথা জানতে চেয়েছেন। দীর্ঘদিন দেখা হয়নি বলে আফসোস করেছেন। আমিও তাঁর সাহচর্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা বলেছি। এত শিগগির চলে যাবেন ভাবতেও পারিনি। মৃত্যু পরিকল্পনা করে আসে না। যাকে যেতে হবে তিনিও জানেন না। কাছের লোকজনও জানে না। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর আশঙ্কার সাথে জীবনের আশাও থাকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুই অনিবার্য। হুদা ভাইয়ের পরকালীন শান্তি কামনা করি।

news24bd.tv আহমেদ

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

আব্দুল মতিন খসরু একজন সহজ মানুষ

খালেদ মহিউদ্দিন

আব্দুল মতিন খসরু একজন সহজ মানুষ

১৯৯৯ সালের ডিসেম্বর। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল এর সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ও বাধ্যবাধকতা নিয়ে একটি স্টোরি করব বলে একমাস ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি। 

আইনমন্ত্রীর মন্তব্য দরকার। বিষয়টা সরকারেরর জন্য একটু বিব্রতকর বলে মন্ত্রীকে পাই না তো পাই ই না।  অবশেষে তার ব্যক্তিগত সহকারি মারফত জানলাম, মন্ত্রী আমাকে সময় দিয়েছেন শুক্রবার সকাল পাঁচটায়। এইদিন তিনি তার কুমিল্লার বাড়িতে যাবেন। আমি ইচ্ছে করলে তার সঙ্গে যেতে পারি, বিকেলে তিনি ফিরবেন। আসা যাওয়ার পথে তাকে ইন্টারভিউ করা যাবে। 

আমার দরকার একটামাত্র কোট, তার জন্য ছুটির দিনের ছয় থেকে আট ঘণ্টা মাটি করব? ভাবলাম যা আছে কপালে! মন্ত্রী আমার সঙ্গে খেলছেন আমিও তার সঙ্গে খেলি।  চারটা ৫৫ মিনিটে মন্ত্রীর বাসায় হাজির হলাম। মন্ত্রীর এপিএস মাহবুব ভাই ছাড়া কাউকে চিনি না। তিনি অপেক্ষা করতে বললেন। মন্ত্রী সোয়া পাঁচটায় নামলেন। আমাকে দেখে অবাকই হলেন মনে হয়, সত্যি সত্যি ভোর পাঁচটায় আসব বোধহয় ভাবেন নাই। তার  গাড়িতে পাশাপাশি বসে রওনা হলাম কুমিল্লা।

পতাকার গাড়ি কাঁচপুর ধরতেই, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল জানতে চাইলাম। কড়া প্রস্তুতি ছিল আমার, উনি ডান বাম করতে চাইলেও মন্তব্য করতে একরকম বাধ্য করলাম তাকে। গাড়ি ছুটছে, মন্ত্রী একটু চুপ মেরে গেলেন। আমার রিপোর্ট হয়ে গেছে। আমি ফুরফুরে মেজাজে ঢাকার ধূসর পেছনে রেখে সবুজে ডুবে গেলাম জানালায় চোখ রেখে।

সাংবাদিক সাহেব আপনার বয়স কত? জ্বি ২৫। আইনমন্ত্রী আরও গম্ভীর হয়ে গেলেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল নিয়ে তার মন্তব্য তাকে কতখানি ভোগাবে তাই ভাবছিলেন বোধ হয়। 

অনেকক্ষণ পর নিজেরে সামলে নিলেন, জানতে চাইলেন কী খাব দুপুরে? পুকুর থেকে ধরা তাজা মাছ দিয়ে মাসকলাই এর ডাল আর ভাত খাব। 

এতক্ষণে তার মুখ হাসি হাসি হয়ে উঠল। বললেন উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু যাইতেছে মন্ত্রী ওরা কী আর ডালভাত খাওয়াবে? দেখি তবুও। পকেট থেকে মোবাইল ফোন বার করে ডিসিরে জানতে চাইলেন, দুপুরে খাওয়ার ব্যবস্থা কি? উত্তেজিত ডিসি মহোদয় পোলাও কোর্মা আর রোস্টের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, মন্ত্রী বললেন, একজন বাচ্চা জার্নালিস্ট আজকে আমার মেহমান। সে মাসকলাই এর ডাল আর ভাত খেতে চায়। আমি তারে কথা দিয়ে ফেলছি। আপনারা জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা পোলাও কোর্মা খান। আমার আর তরুণ জার্নালিস্টের জন্য ডাল আর ভাত। 

খিদে জিইয়ে রাখার জন্য সকাল থেকে আর কিছু খাইনি। জুমার আগেই দুপুরের খাবার দেওয়া হল। কুমিল্লার মানুষ সাক্ষী থাকল এক অদ্ভুত দৃশ্যের। সবাই খায় তিন চার পদের মাংস বড় মাছ। মন্ত্রী আর ছোট এক সাংবাদিক খায় ডালভাত। ফেরার সময় তার সঙ্গে খাওয়া নিয়ে বেশ হাসাহাসি হল। 

মন্ত্রী বললেন, আমার কল্যাণে তার ফেভারিট ডিশ খাওয়া হল। জানতে চাইলেন, আমার গ্রামের বাড়ি কই। ইনসিডেন্টালি আমরা তখন আমার দাদাবাড়ি পার হচ্ছি। বললাম। তিনি সবিস্ময়ে বললেন এতক্ষণ বল নাই কেন? আমি হাসলাম।

ওই ট্রিপ থেকে ফিরে আমার লিড স্টোরি নামল। সংসদের ভেতরে বাইরে তা নিয়ে কথা হল। সমালোচনার মুখে চুপ করে থাকলেন আইনমন্ত্রী। ঘনিষ্ঠজনেরা বললেন তার বিস্ময় নাকি আকাশ স্পর্শ করল যখন সপ্তাহ না ঘুরতে তিনি দেখলেন তারে নিয়া আমি প্রথম আলোর কমিক সাপ্লিমেন্ট আলপিনে একটা কাভার স্টোরি লিখেছি। আইনমন্ত্রীর সঙ্গে একদিন শিরোনামের ওই লেখায় দেখিয়েছি তিনি কেমন ফানি ক্যারেক্টার। তার মন্ত্রণালয়ের অনেকে হারেরেরে করে উঠলেও তিনি ছিলেন স্বাভাবিক। শুধু বললেন, ছেলেটা মনে হয় ভাল। 

আরও অসংখ্যবার তার পেছনে লেগেছি আমি, টকশোতে বিব্রত করেছি কত বার! কত লোকে কত কথা বলেছে, তিনি কিন্তু বলেছেন, ছেলেটা মনে হয় ভাল।

খসরু ভাই, ২২ বছর ধরে আমার আপনজন, আপনার জন্য আমার খারাপ লাগতেছে!

ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান খালেদ মুহিউদ্দীন

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

বিদায় আব্দুল মতিন খসরু

আনোয়ার সাদী

বিদায় আব্দুল মতিন খসরু

আনোয়ার সাদী

আব্দুল মতিন খসরুকে আমি প্রথম দেখেছিলাম কুমিল্লা বোর্ডে। তখন আমি আইনের ছাত্র। সেখানে একটা সামার স্কুল হচ্ছিল মানবাধিকার বিষয়ে। মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর মিজানুর রহমান স্যার ও আইন কমিশনের সাবেক সদস্য প্রফেসর শাহ আলম স্যার ছিলেন উদ্যোক্তা। এটি মানবাধিকার ও কমিউনিটি আইন সংস্কার বিষয়ে দেশের প্রথম আবাসিক ক্যাম্প ছিলো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,  চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সীমিত সংখ্যক ছাত্রছাত্রীরা সেই স্কুলে অংশ নিয়েছিলেন। 

আপনারা বুঝতেই পারছেন, সরাসরি আইনমন্ত্রীর মুখে মানবাধিকার প্রসঙ্গ ও আইনের সংস্কার বিষয়ে জানতে পারা কতো আনন্দের বিষয় ছিলো তখন। অল্প সময়ের জন্য  ফার্স্ট সামার স্কুলের সবাই দাবি করতেই পারি, এডভোকেট আব্দুল মতিন খসরুর সরাসরি ছাত্র আমরা। এক ঘণ্টার জন্যে হলেও।   

বিশ্ববিদ্যালয় পার করে আমি সাংবাদিকতায় যোগ দেই । চ্যানেল আইয়ে থাকতে কোর্ট বিট করতে অসংখ্য বার উচ্চ আদালতে যেতে হয়েছে। যতবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছে, ততবারই তিনি আমাকে চিনতে পেরেছেন। সামার স্কুল তার মনে দাগ কেটে ছিলো। 

এরপর নিউজ টোয়েন্টিফোরে তিনি আমার উপস্থাপিত টকশোতে বেশ কয়েকবার গেস্ট হয়েছেন। অনেক অপ্রিয় প্রশ্নের সহজ সাবলীল জবাব দিয়েছেন। ক্যাসিনো কাণ্ডের পর এক শোতে তিনি আ্ওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাদের কথা বলতে গিয়ে তার কণ্ঠ  বাষ্পরুদ্ধ হয়ে যায়। 

বলেন, কতো কষ্ট করে মাঠ পর্যায় থেকে কাজ করে করে, দলের প্রথম সারিতে এসেছেন, কিন্তু হাইব্রিড ও দুর্নীতিবাজদের জন্য বড় দুর্নাম হয়ে গেলো দলের। তার বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠের রেশ ধরে সেদিন আমাকে  শো এর বিরতি টানতে হয়েছিলো।
 
আব্দুল মতিন খসরু বলতেন বেশ ভালো। সংসদে তার সরব উপস্থিতি ছিলো। অনেকে বলেন, মন্ত্রী নয় বরং এমপি থাকাকালে তিনি দলের বিবেচনায় দুর্দান্ত দুটি বক্তৃতা করেছিলেন। একটি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার ও ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিষয়ে, অপরটি বেগম জিয়ার বাড়ি বিষয়ে। 

যাহোক, আ্ওয়ামী লীগ তাকে দলীয় বিবেচনায় মূল্যায়ন করবে, আর রাজনীতি তাকে সময়ের পরিক্রমায় বিবেচনা করবে। তবে ছাত্র অবস্থায় রাজনীতি শুরু করে মুল দলে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা আব্দুল মতিন খসরু রাজনীতির ছাত্রদের গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণীয় হবেন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিদায় জনাব আব্দুল মতিন খসরু। 


আনোয়ার সাদী, সিনিয়র নিউজ এডিটর, নিউজটোয়েন্টিফোর।

news24bd.tv/আলী

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

এমন একজন সাদা মনের রাজনীতিবিদ চলে যাওয়া বেদনার

জুনাইদ আহমেদ পলক

এমন একজন সাদা মনের রাজনীতিবিদ চলে যাওয়া বেদনার

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সম্মানিত প্রেসিডিয়াম সদস্য, সুপ্রীম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের নব নির্বাচিত সভাপতি, সাবেক আইন মন্ত্রী এ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইন্তেকাল করেছেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)

তিনি তৃনমূল থেকে উঠে এসে জাতীয় রাজনীতির চূড়ায় অবস্থান নিয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে বৃহত্তর কুমিল্লা থেকে নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচিত একমাত্র সংসদ সদস্য। এরপর তিনি অখন্ড কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক, সর্বশেষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম - সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। ‌

১৯৯৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, কিছুদিন পরে পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন।‌ তিনি ‌জাতীয় সংসদে কালাকানুন ইনডিমিনিটি আইন বাতিলের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবের উপর তিনি জাতীয় সংসদে পরম আবেগ‌ ও যুক্তিনির্ভর যে ভাষণ দিয়েছেন তা সংসদীয় ইতিহাসে এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।

তিনি কুমিল্লা বার থেকে উঠে এসে ক্রমশ সর্বোচ্চ আদালতে একজন বিচক্ষণ আইনজীবী হিসেবে নিজেকে অপরিহার্য করে গড়ে তুলেছিলেন। ‌যার ফলশ্রুতিতে মাত্র ক'দিন আগেই এই অমর ব্যক্তি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ‌ দুর্ভাগ্য তাঁর এই দায়িত্ব পালনের সুযোগ হল না।‌

এমন একজন সাদা মনের রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞ আইনজীবী ও সমাজ সংস্কারকের অসময়ে চলে যাওয়া বড় বেশী বেদনার।‌

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

আমি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আমিন

(ফেসবুক থেকে)

news24bd.tv / কামরুল 

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

নিকৃষ্টতম সমাজেও “সেশন-জট” বলে কোন শব্দ নাই

রউফুল আলম

নিকৃষ্টতম সমাজেও “সেশন-জট” বলে কোন শব্দ নাই

রউফুল আলম

স্টকহোম ইউনিভার্সিটিতে যখন গবেষণা শুরু করলাম, আমার বয়স তখন উনত্রিশ। আমি লক্ষ করলাম, ল‍্যাবের অন‍্যান‍্যদের বয়স চব্বিশ-পঁচিশ। এই বিষয়টা আমাকে খুবই কষ্ট দিতো। আমার মাঝে মাঝে অসম্ভব খারাপ লাগতো। ল‍্যাবের যে পোস্টডক স্টুডেন্ট আমাকে শুরুর দিকে গাইড করতো, তার বয়স ছিলো আমার সমান। তার নাম পিলারস্কি। 

এখন সে সুইডেনের উপসালা ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। কাজের আগ্রহ ও অগ্রগতি দেখে, এই ছেলেটা আমাকে কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলো, আমি কেন দেরি করে কাজ শুরু করেছি। আমি তাকে বহুবার সেশন-জট বিষয়টা বুঝানোর চেষ্টা করে ব‍্যর্থ হয়েছি। 

আমার প্রফেসরও আমাকে একই কথা কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছিলো। তাকেও বুঝাতে পারিনি। সেশন-জট আমার জীবন থেকে প্রায় চার বছর গায়েব করে দিয়েছে। সেই সময়গুলো খোয়া না গেলে হয়তো আরো এগুতে পারতাম। গর্ব করে বলছি না (ক্ষমা করবেন), প্রসঙ্গত বলছি, সেসময়ে আমার প্রফেসরের গ্রুপে বেস্ট কাজ এবং বেস্ট পাবলিকেশন করেছিলাম আমি। পিএইচডির দুই বছর যেতেই আমার থিসিস ডিফেন্স করার মতো পাঁচটা পাবলিকেশন ছিলো (JACS & ACIE সহ)। 

আমাদের দেশের অসংখ‍্য ছেলে-মেয়ের ভিতর একটা অফুরান আগ্রহ থাকে। সুপ্ত একটা জেদ থাকে। নেশা থাকে। লেগে থাকার শক্তি থাকে। এটা আমরা বের করে আনতে পারিনা। আমাদের ছেলে-মেয়েদরকে তো আমরা তেমন কোন সুবিধা দিতেই পারিন না, উপরন্তু জীবন থেকে সময় খেয়ে ফেলি। দুনিয়ার কোন নিকৃষ্টতম সমাজেও “সেশন-জট” বলে কোন শব্দ নাই। আমাদের দেশে এখনো আছে। জেলায় জেলায় ইউনিভার্সিটি খুলছি, আর ছেলে-মেয়েদের “সেশন-জট” উপহার দিচ্ছি। জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের কথা তো বলাই বাহুল‍্য!  


৮ দিনের লকডাউন শুরু, রাজধানীর সড়কে সুনসান নীরবতা

সূরা ফাতিহার বাংলা উচ্চারণ ও অর্থ

করোনাবিধ্বস্ত জনপদে উৎসবহীন পহেলা বৈশাখ আজ

ফের বিয়ে করলেন কণ্ঠশিল্পী পুতুল


সেশন-জটের কারণে আমাদের অসংখ‍্য স্টুডেন্টদের স্পিরিট নষ্ট হয়ে যায়। পরিকল্পনা ধ্বংস হয়ে যায়। মটিভেশনটাই ধূলোয় মিশে যায়। এটা বন্ধ করতে হবে, সব প্রতিষ্ঠান থেকে।   

স্টুডেন্টদেরকে বড়ো বড়ো স্বপ্ন দেখান। তাদেরকে দুনিয়ায় ছড়িয়ে যেতে বলুন। তারা যখন অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে তখনই বলুন, যাদের উচ্চতর গবেষণার আগ্রহ আছে, তারা যেনো মাস্টার্স করে সময় নষ্ট না করে। বিদেশে গিয়ে মাস্টার্স করতে বলুন। বহু স্টুডেন্ট এখন কোরিয়া, চীন, সিঙ্গাপুর, মালেয়শিয়া, জাপান, ইরান, তুরস্ক—এসব দেশে গিয়ে মাস্টার্স করে পরবর্তী ধাপ সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা ও পথ খুঁজে পায়। বহু ছেলে-মেয়ে এখন ব‍্যাচেলর শেষ হওয়ার আগেই জিআরই-টোফেল দিয়ে নর্থ আমেরিকায় চলে আসছে। স্টুডেন্টদের এই গতিস্রোতটাকে আরো জাগিয়ে দিন। 

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সমাজে গবেষণায় একটা রেভুল‍্যুশনের প্রস্তুতি পর্ব চলছে। এবং সেই প্রস্তুতি পর্বে অসংখ‍্য ছেলে-মেয়েকে দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই হবে। এছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। কারণ দেশে বসে তো ওরা কাটিং-এজ গবেষণার কিছুই শিখতে পারবে না। সুতরাং তাদের জীবনের সময়টুকু বাঁচিয়ে তাদেরকে বেড়িয়ে পড়তে সর্বাত্বক সহযোগিতা করুন। বিশ্বমানের তারুণ‍্য ছাড়া, বিশ্বমানের সমাজ কখনো গড়া যায় না। অসম্ভব! 

রউফুল আলম, নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র।

news24bd.tv নাজিম

মন্তব্য

পরবর্তী খবর

এই দেশে আমি ও আমার মতো অনেকেই মূল্যহীণ ও অপ্রয়োজনীয়

আব্দুর নুর তুষার

এই দেশে আমি ও আমার মতো অনেকেই মূল্যহীণ ও অপ্রয়োজনীয়

আমি করোনা নিয়ে বহু কথা বলেছি। এখনো পর্যন্ত ভুল কিছু বলি নাই।  যা বলেছি কোনটাই নিজের জন্য না। আমি মনপ্রাণ দিয়ে চেয়েছি মানুষের উপকার হোক। আগে থেকে সতর্ক করেছি।  বারবার লিখেছি। বলেছি। প্রতিটি ঔষধ , প্রতিটি বিতর্ক, প্রতিটি নতুন খবর বিশ্লেষণ করেছি।

মৃদু কথায় কাজ না হলে জোরালো কন্ঠে , আঘাত করেও লিখেছি। মানুষ যেন শোনে , বোঝে, বাঁচে। আমি তো জানিই কি করা উচিত বা উচিত না। এসবই করেছি কারণ ভেবেছি সবার জীবন মূল্যবান। জানলে হয়তো ভালো হবে। একজনেরও যদি উপকার হয় তবে হোক। আমি বিবেকের কাছে দায়হীন থাকতে চেয়েছি। কেউ যদি প্রশ্ন করে সব জেনেও চুপ করেছিলেন কেন?

আমি বলতে পারবো , আমি চুপ করে ছিলাম না। গালাগাল দিয়েছেন অনেকে। আক্রমণ করেছেন। জঘন্য ভাষায়। সেটাও সহ্য করেছি। এসব আমাকে কখনো আক্রান্ত করে না। আমি কুকুরের ঘেউ শুনি না। আমি কোকিলের গান শুনি। ডাস্টবিনের ময়লা দিয়ে ভরাট করা জমিতে প্রাসাদের চেয়ে একটি ছিন্ন গোলাপও আমার কাছে অনেক দামী।

গত বছর এর শেষ থেকে যে ইউফোরিয়াতে সবাই ছিলেন সেটা নিয়েও আমি লিখেছিলাম। সাবধান করেছিলাম।  ব্লুমবার্গের রিপোর্টটির অন্তসারশূণ্যতা নিয়েও বলেছি। আমাকে বলা হয়েছে আমি নাকি হুদাই এসব বলি।  জীবন না থাকলে এই জীবিকা কি কাজে লাগবে?

যে পরিমান টাকা আমাদের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে লুটেরারা লুট করেছে তার অর্ধেক দিয়ে জাতিকে তিনমাস লকডাউনে রাখা সম্ভব ছিলো। লকডাউন বাঁচার জন্য জরুরী। বাঁচলে আবার শুরু করা যায় সব। না থাকলে কোটি টাকাও কিছু না। কি কাজে লেগেছে টাকা তাদের?  যারা ৩০০০ কোটি ৬০০০ কোটি টাকা ধার করে মরে গেছেন? ফিউচার পার্ক কি ফিউচার এর নিশ্চয়তা দিতে পেরেছে? হাজার হাজার কোটি টাকার এক্সপোর্ট জোনের মালিক নিজের ভাইকে সাড়ে তিন হাতের বেশী জমি দিতে পেরেছে?  

এবছরেও সবার আগে লকডাউনের বিষয়ে মনে করিয়ে দিয়েছিলাম, যখন লুংগী নৃত্যের ভিডিও তে ফেসবুক সয়লাব ছিলো। মৃত্যু যখন হবার তখনই হবে। এটা আমরা বলি কারণ হলো মৃত্যুকে রিভার্স করা যায় না।  কিন্তু আমরা ভুলে যাই জীবনে বহুবার সাবধানতা ও চিকিৎসার কারণে আমরা মৃত্যু থেকে বেঁচে গিয়েছি। 

টিকা না থাকলে আমাদের মধ্যে অনেকে শৈশবে গুটি বসন্ত, হাম, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি, নিউমোনিয়া , টিটেনাসে মারা যেতাম। চিকিৎসা না থাকলে এখন যাদের হার্টে স্টেন্ট /রিং পরানো তাদের অনেকে থাকতেন না। ডায়ালিসিস এর রোগীরা বহু আগেই বাঁচতেন না।
ইনসুলিন না থাকলে বহু মানুষ ত্রিশ বছর বয়সে পৌঁছাতেন না।

তাই সতর্কতা ও সাবধানতা জরুরী। মৃত্যু যখন আসার তখনি আসে। কিন্তু গত এক বছর টিকা আসার আগেও যারা বেঁচে থাকলেন আর এখন আক্রান্ত হয়ে মরে যাচ্ছেন, এদের অনেকেই অসাবধান হয়ে গিয়েছিলেন। যেমন এখন জাতীগত ভাবে আমরা অসাবধান হয়ে গিয়েছি।পুরো মানবজাতি নির্মূল হবে না। কিন্তু সংক্রামক রোগের প্রতিটি মৃত্যু হবে মূলত: কারো না কারো অসাবধানতার কারণে।

এখনো বিজ্ঞানকে অবহেলা করে , জীবিকার কথা বলে বলে, যতো ধরনের তুঘলকি কাজ চলছে। ১৬ কোটি মানুষ, তাই সহজে আমরা নি:শেষ হবো না। কিন্তু প্রতিটি প্রাণের অবসানের জন্য কেউ না কেউ দায়ী হবো। সব কাজ ঠিক মতো করার পরেও ব্যর্থ হলে সেটাকে ভাগ্য বলা যায়। ভুল কাজ করে ব্যর্থ হলে সেটা ভাগ্য না, সেটা বোকামী।আমি এখন প্রতিদিন প্রিয়জনদের মৃত্যুর খবর পাচ্ছি আর লাশের হিসাব রাখছি। করোনা নিয়ে আর লিখবো কিনা সেটাও ভাবছি। 

আমার যে খালাতো ভাইটা করোনা হবার পরে নিজের কথা না ভেবে নিজের অসুস্থ স্ত্রীর কথা বলে কাঁদছিলেন, যিনি প্রতি সপ্তাহে আমার মন ভালো রাখার জন্য আমাকে ফোন করতেন, তিনি ৪ এপ্রিলে দুপুর বারোটায় আমার সাথে কথা বলে , ৮ এপ্রিলে মরে গেছেন। আমার যে বন্ধুটা করোনার মধ্যেও গরীব মানুষের চিকিৎসা করেছে, ফোন করে যার কাছে আমি রোগী পাঠিয়েছি, সে মরে গেছে। আমাকে সারাক্ষন মনের শান্তি খুঁজতে বলতেন যিনি সেই বন্ধুর মতো পর হয়েও আপনের চেয়ে বেশী শাকিল ভাইটাও মরে গেছে। আমার অনুষ্ঠানের সংগীত পরিচালক ফরিদ ভাই মরে গেছে। আমার প্রোডাকশন চিফ সামিউল ভাই মরে গেছে। আমার দুজন দুলাভাই মরে গেছে। 

আমি করোনায় বন্দীদশায় বসে বসে হিসাব রাখি দিন ভালো হলে যদি আমি বেঁচে থাকি তবে মোট কয়টা কবর জিয়ারত করতে হবে। এই দেশে আমি ও আমার মতো অনেকেই মূল্যহীণ ও অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু আপনারা নিজেদের মূল্য বুঝতে শিখুন।  নিজেকে বাঁচান। নিজের পরিবার পরিজনকে সুস্থ রাখুন। দয়া করে মানুষের সততা ও সৎচেষ্টাকে সাহায্য করুন। নিজে পারেন না বলতে। দালালী আর ভয় আপনার চামড়া থেকে রক্তে সর্বত্র।  সত্য বলতে না পারলে অসুবিধা নাই । মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকুন। তেলের শিশি পকেটে রেখে, হাতটা সাবান দিয়ে ধুয়ে নেন।

যার জন্য মিথ্যা বলছেন, তিনি বা তারা আপনার সাথে কোথাও যাবেন না। মৃত্যুর পরে তো দূরের কথা। আপনাকে দেখতে হাসপাতালেও যাবেন না। এই মহামারীতে কোন একজনের জন্য শোকের আগেই আরেকজনকে হারাতে হবে।

শোকের সময় কোথায়? নিজেকে মূল্য দিন। বাঁচার চেষ্টা করেন। প্রিয়জনকে বাঁচাতে নিজের ভোগ উপভোগ কমান। লোভের ওপর লাগাম টানুন।শত্রুতা আর ঘৃণা মেটাবার অনেক সময় পাবেন।  এই মহামারীতে শত্রুকেও ভালোবাসা দিন। হয়তো বিপদের দিনের পরে পৃথিবীটা আরো সুন্দর হবে। হয়তো আজকের সামান্য ভালোবাসার বীজ একদিন মহিরুহ হবে। 

সেই অনাগত দিনের কথা ভেবে বেঁচে থাকুন, নিরাপদে থাকার জন্য স্বাস্থ্যবিধি মানুন।

(এটা সবার জন্য নয়। যাদের জন্য বলা , তারা জানেন তারা কারা, আপনারা অনেকেই জানেন তারা কারা। আমাকে গালি দিতে চাইলে, আমার ওপরে রাগ হলেও তারা বেঁচে থাকুন।)

 লেখক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও চিকিৎসক আব্দুন নূর তুষার।

news24bd.tv/আলী

মন্তব্য

পরবর্তী খবর