‘আপনি মেয়ে মানুষ, মুসল্লিদের নামাজে সমস্যা হবে’
‘আপনি মেয়ে মানুষ, মুসল্লিদের নামাজে সমস্যা হবে’

‘আপনি মেয়ে মানুষ, মুসল্লিদের নামাজে সমস্যা হবে’

Other

একটি সম্ভ্রান্ত এলাকার মসজিদ। মসজিদের সামনে বড় মাঠ। মাঠের এপারে আমি। ব্যাকড্রপে মসজিদ রেখে একটা পিটিসি দিতে গিয়েছিলাম।

ক্যামেরার সামনে দাড়াতেই একজন লোক এসে হাজির। আমাদের কর্মকান্ড ফলো করছে। এবং রাগে ফুঁসছে। তাঁর অস্বস্তি দেখে আমি নিজেই অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। ক্যামেরায় আর কী কথা বলব! এবারে সে এক চোট নিলো। বললো, ‘তাড়াতাড়ি শেষ করে এখান থেকে যান। ’

আমি নিজেকে সংযত রেখেই বললাম, ‘কেন ভাই’। তার উত্তর- ‘এখানে মুসল্লিরা নামাজ পড়তে আসে আপনি মেয়ে মানুষ, উনাদের সমস্যা হবে। ’ যেহেতু পেশাগত কারনে কাজটা আমার করতেই হবে, তাই আমি আরো সংযত হয়ে বললাম- ‘আমি তো মসজিদের ভেতরে যায়নি। মসজিদ থেকে অনেক দূরে। মসজিদে যারা নামাজ পড়তে আসবেন তারা তো এতো দূর থেকে আমাকে দেখতেই পাবেন না। ’

সে বলল- ‘না, অনেকে গাড়ি নিয়ে ঢোকার সময় আপনাকে এখানে দেখতে পাবে, তখন সমস্যা হবে। ’ সে আরো বলল- আপনি মেয়ে মানুষ, পর্দা করেননি…বোরকা নেই…হিজাব নেই...এইখানে আসছেন কেন…ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমি বললাম- বোরকা পরে কি টেলিভিশনে রিপোর্টিং করা যায়? কাউকে করতে দেখেছেন?

সে বলল-‘ কেন করা যাবে না? আপনি শুরু করেন, না করতে দিলে জিহাদ করেন, আপনার দেখাদেখি আরো অনেকে এগিয়ে আসবে। ’

আমি আর সংযমের পরীক্ষা দিতে পারছিলাম না। তাই বের হয়ে আসলাম। পিটিসি দিয়েছিলাম, কিন্তু মুখের যে এক্সপ্রেশন! তা আর ব্যবহার করা হয়নি। পরদিন আরো তিন-চারটি মসজিদ ঘুরে অবশেষে দূরে দাড়িয়ে (গাউসুল আজম মসজিদ) একটা পিটিসি দিতে পেরেছি।

দুই.

ঢাকেশ্বরী মন্দির। পেশাগত কাজেই গিয়েছিলোম। দেখলাম, একজন বোরকা পরা ভদ্রমহিলা তার শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে মন্দিরে এসেছেন। বোরকার আড়ালে তার চোখ ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

ভদ্রমহিলাকে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলাম- মন্দিরে বেড়াতে এসেছেন? উনিও মৃদু হেসে বলেলেন- ‘এই মন্দিরের নাম অনেক শুনেছি। শুনেছি রাজবংশের সেনরাজা বা কে যেন এটি বানেয়ছিলো। খুব সুন্দর। তাই বাচ্চাটাকে নিয়ে দেখতে আসলাম। ’

তারপরও উনার সাথে আরো কিছু কথা হলো। ব্যাকড্রপে মন্দির রেখে পিটিসি দিলাম। শ্যুটিং এর সময় মন্দির কর্তৃপক্ষের একজন এসে বললেন, আপনি ভেতরে ঢুকেও ছবি নিতে পারেন। কোন সমস্যা নেই।

তিন.

হঠাৎ মনে হলো- আজ স্কুটি না, বাইসাইকেল চালিয়ে অফিসে যাবো। সাদা শার্ট এবং নেভি-ব্লু জিন্স আমার খুব পছন্দের পোশাক। সাথে হাইনেক বুট। রিপোর্টিং এর সময় মাঠে-ঘাটে দৌড়াতেও সুবিধা হয়। যাইহোক, আসার পথে হঠাৎ কে যেন ডাকলো। রিক্সা থেকে। নাম ধরে না। কিন্তু চেঁচিয়ে আমাকেই কিছু একটা বলছে।

আমি সাইকেলটা একটু স্লো করলাম। রিক্সাও স্লো হলো। রিক্সার উপরের ভদ্র মহিলাকে আমি চিনি না। বয়স পঞ্চাশোর্ধ হবে। হাতে বাজারের ব্যাগ। পরনে বোরকা। বোরকার উপর ওড়না থাকলেও মাথায় কিছু নেই। দেখলেই বোঝা যাচ্ছে সংসারের ঝামেলা মেটাতে মেটাতে নাস্তানাবুদ।


আরও পড়ুনঃ


তিন পুরুষাঙ্গ নিয়ে শিশুর জন্ম!

টাকা আছে বলেই সব কিনে ফেলতে হবে!

গৃহবন্দি থাকার দুইদিনের মাথায় আনুগত্য প্রকাশ

একমত হইনি বলে দালাল হিসেবে সমালোচিত হয়েছি


সাইকেলের পাশে রিক্সা আসতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম- ‘আমাকে কিছু বলছেন?’ বললেন- ‘হ্যা, তোমাকে রিক্সা থেকে ফলো করছিলাম। মাশআল্লাহ, তোমাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। কি করো তুমি?’ আমি বললাম- ‘আমি জার্নালিস্ট। নিউজ টোয়েন্টিফোরে আছি। ’ উনি বললেন, ‘বাহ চমৎকার। তোমাদের দেখে খুব ভালো লাগে। গর্ব হয়। ’

সারকথা : অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে সাধারন মানুষের রক্তে ধার্মিকতা আছে, ধর্মীয় সম্প্রীতিও আছে। এখনো মনুষ্যত্ববোধ মরে যায়নি। যারা ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন, অন্যকে কষ্ট দেন, নিজের বিশ্বাস, নিজের মূল্যবোধ অন্যের উপর চাপানোর চেষ্টা করেন তারাই ধর্মের বড় শত্রু। তারা দেশের শত্রু, মানবতার শত্রু। তাদের প্রতি মন থেকে ঘৃণা।

news24bd.tv / নকিব