তোর কতো বড় সাহস হারামজাদা; তুই আমার গাড়ি আটকাস!
তোর কতো বড় সাহস হারামজাদা; তুই আমার গাড়ি আটকাস!

তোর কতো বড় সাহস হারামজাদা; তুই আমার গাড়ি আটকাস!

Other

ভিডিও'টা আমি সব মিলিয়ে চার চার বার দেখছি! 

আমার লেখার প্রয়োজনেই দেখছি। তাছাড়া আজ রোববার, আমার এখানে ছুটির দিন। তাই সময় করে দেখতে পেরেছি।   

এক ডাক্তার ভদ্রমহিলার গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ তার আইডি কার্ড দেখতে চেয়েছে।

 

এতে ক্ষেপে গিয়ে ওই ডাক্তার মহিলা কি কি করেছে জানেন?

প্রথমে বলেছে- আমি কে জানেন? আমি মেডিকেলের সহযোগী অধ্যাপক।

দাঁড়িয়ে থাকা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ উত্তরে বলেছে- আপনি যে-ই হন; আইডি কার্ড দেখাতে সমস্যা কোথায়?


পুলিশের হাতে চিকিৎসক হয়রানি, প্রতিবাদ এফডিএসআরের

সুরা আরাফ ও সুরা আনফালের বাংলা অনুবাদ

নারী ফুটবল দলে করোনার হানা

নিখোঁজের ১১২ দিন পর সেপটিক ট্যাঙ্কে মিলল নারীর লাশ

‘মামুনুলকে গ্রেপ্তারে সরকারের লকডাউন’ যারা বলছেন, তাদের বলছি

-আমি আইডি কার্ড আনতে ভুলে গিয়েছি। কিন্তু আপনি আমার গাড়ি থামালেন কেন? দেখতে পাচ্ছেন না এটা ডাক্তারের গাড়ি? ডাক্তারদের হয়রানি করেন; কতো বড় সাহস! জানেন আমি কে? আমি বীর বিক্রমের মেয়ে।  

এরপর ওই ম্যাজিস্ট্রেট বলেছে- আমিও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।  

পুলিশ বলছে- আমিও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান।   

তর্ক কিন্তু চলছ! 

এক পর্যায়ে ওই ডাক্তার ভদ্রমহিলা তার পরিচিত মন্ত্রী বা এই টাইপ কাউকে ফোন করে বলেছে- আমাকে পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেট আটকিয়েছে; ওদের কতো বড় সাহস। তুমি একটু কথা বলো।  

এরপর এই ভদ্রমহিলা; পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ফোনটা ধরিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু উনারা কেউ ফোন না ধরে বলেছে- আমাদের সিনিয়র স্যারদের সাথে কথা বলতে বলুন।

এরপর এই ডাক্তার মহিলা বলেছে

- তোর কতো বড় সাহস হারামজাদা; তুই আমার গাড়ি আটকাস!

পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট বার বার বলছিল - আপনি তুই তকারি করছেন কেন? 

ওই ডাক্তার মহিলা এইবার আরেক ডিগ্রী উপরে গিয়ে বলেছে- আমি ডাক্তার। বুঝস, আমি ডাক্তার। তোরা তো ডাক্তারিতে চান্স না পাইয়া পুলিশ, ম্যাজিস্ট্রেট হইসস।  

তো এই হচ্ছে- দেশের তিন পেশার মানুষজনের আলাপ-আলোচনা।  

ভিডিওটা চারবার দেখার পর আমাকে বলতেই হচ্ছে- ওই পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট যথেষ্ট ভদ্র ভাষায় এই মহিলার সঙ্গে কথা বলছিল। আমার কাছে একবারও মনে হয়নি- তারা কোন বাজে ভাষা ব্যাবহার করেছে। কিংবা বাজে আচরণ করেছে।   

আপনি ডাক্তার হলে কি আপনার কাছে পুলিশ সদস্য কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট আইডি কার্ড চাইতে পারবে না? 

আর আপনার কাছে আইডি কার্ডই তো চেয়েছে; কেন আপনি তাহলে বলে বসলেন- ডাক্তারদের হয়রানি করেন, কতো বড় সাহস!  

এখানে কোথায় ডাক্তারদের হয়রানি করা হলো? পুলিশ তো তার দায়িত্ব পালন করছিল।  

আপনি ডাক্তার হন আর অন্য যে কোন পেশার মানুষ; আপনার আইডি কার্ড পুলিশ দেখতে চাইতেই পারে।  

তাছাড়া এভাবে ডাক্তারের গাড়ি দেখিয়ে সাধারণ মানুষজনও তো শহরে এমনি এমনি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই পুলিশ কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট তো আপনার কাছে আইডি কার্ড চাইতেই পারে। চেক করার জন্য এটা তারা করতেই পারে।  

আর এই জন্য আপনি কিনা রেগে মেগে- আমি বীর বিক্রমের মেয়ে! আমি ডাক্তার! তোরা কি চান্স পাইসস ডাক্তারি'তে এইসব বলে বেড়াচ্ছেন! 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে- ভদ্রমহিলা এমন আচরণ কেন করল? 

উত্তর হচ্ছে- তিনি তো এইসব দেখেই বড় হয়েছেন।  

বুয়েটে পড়লে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা আর মানুষ না! আমি'ই সেরা! ডাক্তারিতে পড়লে, অন্যরা আবার পড়াশুনা করে নাকি! পড়ি তো শুধু আমরা! আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মানুষ'ই মনে হয় না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে প্রাইভেটে পড়াদের আমরা গরু-গাধা মনে করি কিংবা বলেও বেড়াই! আবার ধরুন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে, ওরা আবার ছাত্র নাকি।  

এইসব তো আমরা দেখে দেখে বড় হয়েছি।  

এতে কি হয় জানেন? আমরা আশপাশের মানুষদের আর মানুষ মনে করি না। নিজেদেরই সব চাইতে বড় ভাবতে থাকি! 

এই যেমন বিসিএস ক্যাডারে যারা চাকরি করে; তাদের বেশিভাগই নিজেদের বীর পুরুষ কিংবা হিরো মনে করে। সমাজও এদেরকে এই চোখেই দেখে!  এদের ধারণা অন্য পেশার মানুষজন বিসিএসে চান্স পায়নি বলেই না অন্য পেশায় আছে! 

তো এই হচ্ছে আমাদের দেশের অবস্থা।  

অথচ এই ভদ্রমহিলার কাছে আইডি কার্ড চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি দেখিয়ে দিয়ে বলতে পারতেন- ধন্যবাদ, আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করছেন।  

তার মনে যদি ক্ষোভও থাকতো এই ভেবে যে- আজ ডাক্তার বলে আমার গাড়ি চেক করছে। কোন সচিবের গাড়ি কি চেক করতে পারত? 

তিনি কিন্তু খুব ভদ্র ভাষায় এটাও বলতে পারতেন- আমাকে চেক করেছেন; আশা করছি সচিবদের গাড়িও চেক করবেন। আপনাদের চোখে তো সবাই সমান হবার কথা।  

তাহলেই কিন্তু ল্যাঠা চুকে যেত। খুব ভদ্র ভাবে নিজের ক্ষোভ টুকু ঝারলেন সেই সঙ্গে পুলিশ কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট যা দেখতে চাইছিল; সেই আইডি কার্ডও দেখিয়ে দিলেন।  

কিন্তু এই ডাক্তার মহিলা এর কোন কিছু না করে, এভাবে রেগে মেগে কেন বলে বসলো- আমি ডাক্তার। আমাকে চিনিস তোরা, আমি কে? 

অর্থাৎ তিনি নিজেকে পৃথিবীর সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেরা ভাবছেন। যার কারনে তার গায়ে লেগেছে গাড়ি থামানোর কারনে।

আপনাদের জানিয়ে রাখি- এই মহিলা নিজেই বলেছেন তিনি  মেডিকেলের সহযোগী অধ্যাপক (বোধকরি ঢাকা মেডিকেলের কিংবা ঢাকার যে কোন সরকারি মেডিকেলের)। তো, তিনি নিশ্চয় তার ছাত্র-ছাত্রীদের এইসবই শেখান- আমরাই সেরা! অন্যরা তো ডাক্তারিতে চান্স পায়নি বলেই না অন্য কিছু করে! 

আজ হয়ত ডাক্তার ভদ্রমহিলার শো দেখেছি আমরা। কিন্তু বিষয় হচ্ছে- পুরো বাংলাদেশে এই শো প্রতিনিয়ত চলছে।  

আজ হয়ত ওই পুলিশ এবং ম্যাজিস্ট্রেট বেশ ভালো ব্যাবহার করেছে। অন্য এক দিন হয়ত এমনই কোন পুলিশ কিংবা ম্যাজিস্ট্রেট কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা ব্যাংকের কর্মকর্তাকে বলে বসবে- আরে বিসিএসে চান্স পাও নাই বলেই তো এইসব করছ! 

এই দেশে মানুষ বাস করে না। এই দেশে বাস করে- ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার; জজ-ব্যারিস্টার; বিসিএস ক্যাডার ইত্যাদি ইত্যাদি। যারা প্রতিদিন ঘুমাতে যায় এই ভেবে- আমার চাইতে সেরা পৃথিবীতে কেউ নেই!

আমিনুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, অস্ট্রিয়া। (ফেসবুক থেকে)

news24bd.tv তৌহিদ

;