রাজনীতি হলো মানুষকে খাঁচায় রাখার কৌশল

মহিউদ্দিন মোহাম্মদ

রাজনীতি হলো মানুষকে খাঁচায় রাখার কৌশল

ইমতিয়াজ মাহমুদ নামের এক ভদ্রলোক বিজ্ঞানকে গালমন্দ করেছেন। গালমন্দটি আমার নজরে এসেছে, এবং পড়ে মনে হয়েছে, এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পার্থক্য না জানা কোনো বুড়ো মানুষের প্রলাপ। এ প্রলাপ অনেকে গ্রহণও করেছে, কারণ আলোর সাথে এ অঞ্চলের বাসিন্দারে যোগাযোগ খুব কম। প্রলাপটি তিনি শুরু করেছেন এভাবে:

“পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সর্বনাশ করছে বিজ্ঞান। এমনকি রাজনীতির চেয়েও বেশি।  সহজ ভাষায় পুরোনো কথা বলি, সাগর আর মাটি প্লাস্টিক দিয়ে ধ্বংস করে ফেলছে। সেই প্লাস্টিক বিজ্ঞানের দান। বাতাস ধ্বংস করে ফেলছে, বিজ্ঞান।…..”

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে, আমি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে একটু ব্যাখ্যা করতে চাই। বিজ্ঞান হলো একটি প্রক্রিয়া, যে-প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে মানুষ নতুন জ্ঞানের অন্বেষণ করে থাকে। আর প্রযুক্তি হলো বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রাপ্ত কোনো জ্ঞানের ব্যবহারিক প্রয়োগ। এ প্রয়োগের প্রকৃতি কেমন হবে, তা নির্ধারিত হয় প্রযুক্তিটির ম্যানুফ্যাকচারার বা স্পন্সর দ্বারা। স্পন্সর যদি মাদার তেরেসা হন, তাহলে প্রযুক্তি এক রকম হবে, আর যদি লেসলি গ্রুভস (গ্রুভস ছিলেন ম্যানহাটন প্রজেক্টের পরিচালক) বা প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান হন, তাহলে অন্য রকম হবে। 
মানুষ যখন জঙ্গলে ছিলো, তখন দেখলো যে— কোনো বস্তু যদি শক্ত হয়, যেমন পাথর বা লোহা, এবং এর একটি প্রান্তকে যদি ঘষে ঘষে সরু করা যায়, তাহলে এটি দ্বারা নরম বস্তুদের কাটা বা বিদ্ধ করা সম্ভব হবে। এ চিন্তাটা হলো বিজ্ঞান। আর এ চিন্তার প্রয়োগের ফলে যে-রামদা বা কোদাল বা বর্শা পাওয়া গেলো, তা হলো প্রযুক্তি। কোনো সমাজে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতি দ্বারা। রাজনীতি যদি গার্হস্থ্য ধরণের হয়, তাহলে রামদা, কোদাল, ও বর্শা ব্যবহৃত হবে পশু শিকারে, কৃষিকাজে, ও রান্নাবান্নায়। আর যদি প্রভাব বিস্তারমূলক হয়, তাহলে তা ব্যবহৃত হবে গোত্র-কলহ ও যুদ্ধে। 

আধুনিক প্রযুক্তি বলতে মানুষ যা বোঝে, তার বয়স খুব বেশি নয়। এসব প্রযুক্তির বহু আগে থেকে পৃথিবীতে বিজ্ঞান ছিলো। নিউটনের কথাই ধরা যাক। তাঁর ল অব গ্র্যাভিটেশন এবং ক্লাসিকেল মেকানিক্সের ফর্মুলেশনগুলো বেশ বয়স্ক। কিন্তু পৃথিবীর ইস্কেইপ ভেলোসিটি আর বায়ুমন্ডলের ফ্রিকশোনাল হিট আমলে নিয়ে আকাশে স্যাটেলাইট ছুড়া হয়েছে মাত্র কয়েক দশক আগে। এই স্যাটেলাইট ছুড়াছুড়ি কিন্তু বিজ্ঞান নয়। এগুলো মানুষের রাজনীতি ও ব্যবসার অংশ মাত্র। 

ইমতিয়াজ মাহমুদের দাবি, প্লাস্টিক বিজ্ঞানের দান। তাকে দোষ দিই না, চিন্তা যখন খর্বাকৃতির হয় তখন প্লাস্টিককে অনেকেই বিজ্ঞানের দান মনে করতে পারেন। বিজ্ঞানের দান হলো পলিমারাইজেশোন ও পলিকনডেনসেশোন নামের দুটি কৌশল, যা ছিনতাই করে পুঁজিবাদী বণিকেরা বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করছে প্লাস্টিক। আর এ প্লাস্টিক তারা তুলে দিয়েছে তাদের হাতে, যারা মাটি ও সাগরের প্রতি যত্নশীল নয়। তবে মুফতি ইব্রাহিম আর বাবা রাম রহিমের দেশ দুটি বাদে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মানুষই তাদের নিজ নিজ মাটি ও সাগরের প্রতি যত্নশীল। তারা প্লাস্টিক বর্জ্যকে এমন একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে এসেছে, যেখানে একটি ছোট্ট পলিথিন ব্যাগের পক্ষেও আর সাগর বা কৃষিজমি ভ্রমণ করা সম্ভব নয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এ কৃতিত্ব যতোটা না বিজ্ঞানের, তার চেয়েও বেশি রাজনীতিকদের। ওই দেশগুলোর রাজনীতিকেরা বিচক্ষণ বলেই এটি সম্ভব হয়েছে। 

আর “বাতাস ধ্বংস করে ফেলেছে, বিজ্ঞান” এ কথাটি দিয়ে তিনি সম্ভবত গাড়ি ও কলকারখানার ধূয়ার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তার বুঝা উচিত ছিলো যে, টয়োটা বা গুয়াংডং কর্পোরেশনের সাথে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে মানুষের লালসা, ও অর্থনীতির। বিজ্ঞান শুধু বলেছে, তাপকে মেকানিক্যাল মোশন ও ইলেকট্রিসিটিতে রূপান্তর করা সম্ভব। বাকিটুকো এগিয়ে নিয়েছেন ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকেরা। অটোহানরা শুধু দেখিয়েছিলেন, পরমাণুকে ভাঙা সম্ভব, এবং এ ভাঙন থেকে, যেটিকে আমরা নিউক্লিয়ার ফিশান বলি, পাওয়া যেতে পারে অকল্পনীয় শক্তি। কিন্তু বোমা  বানানোর জন্য লস আলামোস ল্যাব স্থাপন করেছিলো রাজনীতিক ও মিলিটারি জেনারেলরা। আর বায়ুদূষণের একটি বড় কারণ গবাদি পশুর খামার। এ বোভাইনদের পেট থেকেই সবচেয়ে বেশি মিথেন গ্যাস নির্গত হয়। 

আর বাংলাদেশ তো হয়ে উঠেছে জাপানি গাড়ির ডাম্পিং স্টেশন। যেখানে দেশটির উচিত ছিলো ব্রান্ড নিউ এবং ইলেকট্রিক ভেহিকলকে কর সুবিধা দেয়া, সেখানে তারা এগুলোর উপর বেশি করে কর আরোপ করেছে, এবং মানুষজনকে বাধ্য করছে পুরাতন জাপানি ভাঙা গাড়ি ক্রয় করতে। এ রিকন্ডিশোন্ড বা ভাঙা গাড়িগুলোর যে-ইঞ্জিন, তা বাংলাদেশের বাতাসের পুরোটিকেই বিষ বানিয়ে ছাড়বে। এক ভদ্রলোক একটি টেসলা আমদানি করেছিলেন, কিন্তু বাংলাদেশের বুদ্ধিমানেরা ওই লোক থেকে ছয়শো শতাংশ কর আদায় করেছে। যেখানে উচিত ছিলো গাড়িটিকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া, সেখানে তারা এটির প্রবেশ রোধ করতে চেয়েছে। 

অস্ট্রেলিয়ার বাতাসে তোলা ছবি, বাংলাদেশের বাতাসে তোলা ছবির চেয়ে বহুগুণ সুন্দর কেন? একই কথা প্রযোজ্য ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা, এবং সিঙ্গাপুরের ক্ষেত্রে। ওই দেশগুলো তো প্রযুক্তিতে আমাদের চেয়ে পিছিয়ে নেই, যদিও মূর্খতায় তারা অবশ্যই আমাদের চেয়ে পিছিয়ে আছে। আমার বাড়ির পাশ দিয়ে একটি খাল বয়ে গেছে, যেটিতে ছোটবেলায় আমি সাঁতার কেটেছি। তখন খালটির পানি ছিলো পানি, যা পান করে তৃপ্তি পেতো গ্রামের গরু, ভেড়া, ও হাঁসেরা। কিন্তু এখন, পুরো খালটি হয়ে উঠেছে আলকাতরার নালা। আমি অতিরঞ্জন করছি না, সত্যি সত্যিই আলকাতরা রঙের রাসায়নিকে ঢেকে গেছে খালটি। এ কৃতিত্ব একটি ডেনিম কারখানার। জেলার ডিসিকে আমি বহুবার ব্যাপারটি জানিয়েছি, কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নেন নি। ব্যাপারটি এরকম নয় যে শুধু বাংলাদেশেই কল কারখানা আছে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভুলিউশানের জন্ম হয়েছে যে-দেশগুলোতে, সে-দেশগুলোর বাতাস ও পানির মানের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যাবে, বিজ্ঞান নয়, আমাদের বাতাস ও পানির দুরবস্থার জন্য দায়ী রাজনীতি, অর্থনীতি, ও দুর্নীতি। আমি চীনের কারখানাগুলোতে যে-মানের ইটিপি দেখেছি, তার এক তৃতীয়াংশ মানের ইটিপিও বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে দেখি নি। যদিও বাংলাদেশের পরিবেশ আইনে, ফুল ফাংশোনাল ইটিপি স্থাপনের বাধ্যবাদকতা রয়েছে। ইটের ভাটাগুলির কথা নাই বা বললাম। ইটের ভাটা যে কতো বড় বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, তা তো আমরা সকলেই জানি। 

ইমতিয়াজ মাহমুদ বলেছেন, “বিভিন্ন দেশ অসংখ্য স্যাটেলাইট পাঠিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথরেও বস্তি বানাইয়া ফেলছে”। মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানোর চারটি কারণ আছে। প্রথম কারণটি গবেষণা, দ্বিতীয়টি বাণিজ্যিক, তৃতীয়টি রাজনীতিক বা সামরিক, আর চতুর্থটি শখ বা অহংকার। সম্প্রতি একটি দেশ, অহংকার প্রদর্শনের জন্য আকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে। সোভিয়েত রাশিয়ার সাথে আমেরিকার স্নায়ুযুদ্ধের সময়, গবেষণার চেয়ে রাজনীতিক কারণেই বেশি স্যাটেলাইট পাঠানো হয়েছিলো। আর এখন এলন মাস্ক নিয়ে এসেছে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বাণিজ্যিক মডেল। আর্থ অরবিটাল যদি কোনো সময় সত্যিই ঢাকার কড়াইল বস্তি ওঠে, তাহলে দায়ী করতে হবে এই দ্বিতীয়, তৃতীয়, ও চতুর্থ কারণকে। বিজ্ঞান বা গবেষণাকে নয়। 

“বিজ্ঞান পৃথিবীরে এক দিলে কেড়ে নিছে দশ” এটি মনগড়া রোম্যান্টিক কথা। এটি বলে কিছু মানুষের মন উদাস করা যেতে পারে, নির্বোধ মর্টালদের কাছ বাহবা পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু বাস্তবতার সাথে এ কথার দূরত্ব আলোক বর্ষের সমান। প্রথমত, মানুষের ম্যাটেরিয়াল অবসেসোনের জন্য বিজ্ঞান দায়ী নয়, দায়ী প্রযুক্তি ও প্রযুক্তিব্যবসায়ীদের লোভ। পৃথিবীতে ভোগবাদ নামে যে নতুন ধর্মটি তৈরি হয়েছে, তার সাথে বিজ্ঞানের কোনো দেখা সাক্ষাৎ ঘটে না। এটি টিকে আছে মানুষের মগজহীনতাকে পুঁজি করে। দ্বিতীয়ত, আগে প্রকৃতি মানুষকে দশটি সন্তান দিলে কেড়ে নিতো নয়টি, আর এখন বিজ্ঞানের আঘাতে (আসলে হবে প্রযুক্তির আঘাতে) কেড়ে নিতে পারে না একটিও। এ বিষয়ে উদাহরণ দেয়া যাবে অনেক, তবে আমি কথা বাড়িয়ে আলোচনা লম্বা করতে চাই না। 

এবার ইমতিয়াজ মাহমুদ আশ্রয় নিয়েছেন প্রতিপক্ষকে ডিহিউম্যনাইজ করার কৌশলের। ডিহিউম্যানাইজেশনের বাংলা, হুমায়ুন আজাদ করেছিলেন ‘বিমানবিকীকরণ’, আর আমি করেছিলাম ‘প্রাণীকরণ’ (কারণ গসেতের ডিহিউম্যানাইজেশন অব আর্টের চেয়ে আমার কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিলো মানুষের এনিম্যালাইজেশন)।

তিনি লিখেছেন— “তো, এইসব কথা বললেই বিজ্ঞানরে পবিত্র জ্ঞান করা  কাঁটাবনের বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানানুভূতি আহত হয়। তারা বলে, বিজ্ঞান ঠিক আছে, মানুষ খারাপ। আরে ভোঁদরের দল, ঐ হিসাবে রাজনীতি, ধর্ম ইত্যাদি সবই ঠিক আছে, শুধু মানুষ খারাপ।”
এখানে ইমতিয়াজ মাহমুদ তার প্রতিপক্ষের মোরাল ভেঙে দেয়ার জন্য সাহায্য নিয়েছেন এনিম্যালাইজেশনের, এবং টেনে এনেছেন ভোঁদরের মতো একটি সুন্দর প্রাণীকে। উদ্দেশ্য যখন অসুন্দর হয়, তখন এরকম একটি সুন্দর প্রাণীকে কুৎসিতভাবে উপস্থাপন করাটা বিস্ময়কর কিছু নয়। পুঁটি মাছ যখন কাতলা মাছের চরিত্রে অভিনয় করে, তখন এ বিপর্যয় ঘটে। কবি হুইটম্যান তাঁর একটি কবিতায় ভোঁদরদের (প্রাণীদের) খুব প্রশংসা করেছিলেন, এবং মনে মনে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন ভোঁদর (প্রাণী) হওয়ার: 

I think I could turn and live with animals, they are 
so placid and self-contain’d,
I stand and look at them long and long.
They do not sweat and whine about their condition,
They do not lie awake in the dark and weep for their sins,
They do not make me sick discussing their duty to God,
Not one is dissatisfied, not one is demented with the mania of owning things,
Not one kneels to another, nor to his kind that lived thousands of years ago,
Not one is respectable or unhappy over the whole earth….

রাজনীতি আর ধর্মের সাথে বিজ্ঞানের অত্যন্ত মৌলিক পার্থক্য আছে। ধর্ম স্থির, অবিচল। এর মূলনীতি— প্রচারেই প্রসার। এটি নিজের ধ্বংস অনুমোদন করে না। কিন্তু বিজ্ঞানের এক তত্ত্বকে আরেক তত্ত্ব দিয়ে বাতিল করা যায়। এরিস্টোটলের সময়ে, বিজ্ঞানের চোখে পৃথিবী যেরকম ছিলো, কোপার্নিকাসের সময়ে সেরকম ছিলো না। নিউটনের সময়ে মহাকর্ষ ছিলো একরকম, কিন্তু আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির পর মহাকর্ষ হয়ে গেলো অন্য রকম। এরিস্টোটলের চারটি স্পিরিটের কথা এখন আর কেউ বলে না। এখন আমরা আত্মা নামক ভূতের আশ্রয় না নিয়ে, মগজে নিরন্তর ঘটতে থাকা বায়ো-কেমিক্যাল রিয়েকশানের সাহায্যে ব্যাখ্যা করতে পারি মানুষের মনকে। আর কাঁটাবনের বিজ্ঞানী কারা, এ সম্পর্কে আমার বিশদ জানা নেই। সম্ভবত তারা মুফতি ইব্রাহিম ঘরানার কেউ হবেন। এরকম হলে, কাঁটাবনের বিজ্ঞানী অভিধাটিতে আমার আপত্তি নেই, কিন্তু ইমতিয়াজ মাহমুদ নিজে কাঁটাবনের বিজ্ঞানী কি না এ ব্যাপারে আমার সন্দেহ থেকে যাবে।
 
রাজনীতি হলো মানুষকে খাঁচায় রাখার কৌশল, আর বৈজ্ঞানিকভাবে রাজনীতিক চিন্তা করা হলো মানুষকে খাঁচা থেকে বের করার কৌশল। দুটি দুই জিনিস। হবস  ও হিউম যেভাবে চিন্তা করতেন, সেটি ছিলো রাজনীতির বৈজ্ঞানিক চিন্তা। একটি লেবিয়াথান লেখা আর ভোটের জন্য রাজনীতি করা এক ব্যাপার নয়। হিউম তাঁর কাজকে বর্ণনা করেছিলেন ‘দ্য সায়েন্স অব হিউম্যান ন্যচার হিশেবে’, যেটিকে আমরা এখন রাজনীতি বলি। সে-হিশেবে রাজনীতিক তত্ত্ব বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হলেও রাজনীতি করা কিন্তু বৈজ্ঞানিক ব্যাপার নয়। মানুষ রাজনীতি করে থাকে ক্ষমতা উপভোগের জন্যে, আর ক্ষমতার এ উপভোগ টিকিয়ে রাখার জন্যে সে আশ্রয় নেয় প্রযুক্তির। এক প্রযুক্তি দিয়ে মানুষ ফেসবুকে ঢোকে, আর আরেক প্রযুক্তি দিয়ে রাজনীতিকেরা ফেসবুক বন্ধ করে। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর প্রিন্সকে মানুষ দমনের যে-বুদ্ধি দিয়েছিলেন, রাজনীতিকেরা প্রযুক্তির সাহায্যে সে-বুদ্ধিরই বাস্তবায়ন ঘটাচ্ছে। এখানে মূল উৎপাদ হলো রাজনীতিকের লক্ষ্য। হ্যাঁ, কিছু বাইপ্রোডাক্ট তৈরি হচ্ছে, যেগুলোর জন্য ইমতিয়াজ মাহমুদ অন্ধভাবে বিজ্ঞানকে গালমন্দ করছেন। আমেরিকার ডিফেন্স পলিসির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রি-এম্পটিভ মিজার বা আগাম সতর্কতা। এই প্রি-এম্পটিভ মিজারের অংশ হিশেবেই তারা সাগর মহাসাগরে অনেকগুলো পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে, এবং তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করেছে, কিন্তু বাইপ্রোডাক্ট হিশেবে পৃথিবী পেলো তেজস্কক্রিয় জলবায়ু, দূষিত পানি, আর নানা প্রাণীর মৃতদেহ। এ কাজগুলো যারা করেছে তারা অস্ত্রধারী, এবং অস্ত্রধারী কারও বিরুদ্ধে কথা বলতে আমরা বেশ ভয় পাই। ফলে গালাগালির জন্য অনেকে বেছে নেন নিরস্ত্র বিজ্ঞানকে। ইমতিয়াজ মাহমুদও তাই করেছেন। 

“গ্যালাক্সির দার্শনিক” শব্দগুচ্ছটির ‘গ্যালাক্সি’ অংশটি কিন্তু বিজ্ঞানের আবিষ্কার। আর ‘দার্শনিক’ শব্দটি বাংলাদেশে হয়ে উঠেছে ছাগলের মাথার মুকুটের মতো। যে যেভাবে পারছে শব্দটিকে ব্যবহার করছে। এদেশে যে কোনো কালে কোনো দার্শনিক জন্মান নি, এবং দর্শনের সাথে যে আমাদের কোনো পরিচয় নেই, তার বড় প্রমাণ এ শব্দটির অপপ্রয়োগ। একটি প্রিন্সিপিয়া ম্যাথম্যাটিকা বা ফেনোমেনোলজি অব স্পিরিট কি আমাদের আছে? কান্টের তিনটি ক্রিটিকের সাথে, বা রাসেলের অন ডিনোটিংয়ের সাথে, বা শোপেনহাওয়ারের উইলের সাথে বা বেন্থামের ফ্রাগমেন্টের সাথে কি কোনো ভাবাবেগময় পদ্যের তুলনা করা যায়? কিন্তু বাঙালি করছে কবরবাসীর আচরণ। তারা যাকে তাকে ডাকছে দার্শনিক! আমি বিভিন্ন সভা সেমিনারেও লক্ষ করেছি, সস্তা রাজনীতি ও ইতিহাস উচ্চারণকারীদের দার্শনিক ডাকা হচ্ছে! গল্প, উপন্যাস, ছড়া, এবং কবিতা লেখেন, এমন মানুষদেরও দার্শনিক ডাকা হচ্ছে! এসব দেখে অন্য গ্যালাক্সিতে লুকিয়ে থাকা রুশো, লক, বার্কলেরা নিশ্চয়ই হাসাহাসি করছেন। 

“বিজ্ঞানরে পবিত্র জ্ঞান করার কিছু নাই”, বিজ্ঞান কি কারও কাছে পবিত্রতা দাবি করেছে? বিজ্ঞান কি মানুষ যে এর স্থলন ঘটে? যাদের লুঙ্গি সারাক্ষণ নষ্ট থাকে তারা এ কাজ করলে করতে পারে, কিন্তু এদের সাথে বিজ্ঞানের কোনো যোগাযোগ নেই। এরা বড়জোর প্রযুক্তিভক্ত উন্মাদ। আর মানুষের অভ্যাস বদলিয়েছে মানুষ। এক মানুষ আরেক মানুষকে টোপ দেখিয়েছে নতুন পণ্যের, আর অমনি আলসে মানুষেরা গিলেছে ওই বড়শী। এখন আটকা পড়ে লাথি মারছে বিজ্ঞানের উপর। স্বর্ণ তো এক প্রকার ধাতব পাথর, মানুষের জীবনে এটি কোনো কাজে লাগে বলে শোনা যায় না, কিন্তু এটি লাখ টাকা দিয়ে কেনার অভ্যাস মানুষ কেন করলো? স্বর্ণ মূল্যবান, এটি তো বিজ্ঞান রটায় নি। রটিয়েছিলো অর্থলোভী মানুষেরা। স্মার্টফোনের ব্যবসা তো সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে কাজ করা বিজ্ঞানীরা করছে না, করছে প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা। 

মানুষকে ক্ষুধা, ভয়, মৃত্যু, অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির দায়িত্ব বিজ্ঞান নেয় নি, নিয়েছিলো ধর্মনেতা ও রাজনীতিকেরা। রুশ জারদের হাত থেকে এ দায়িত্ব লেনিন নিয়েছিলো, এবং মানুষ দিয়ে ভরে ফেলেছিলো কারাগার। বহু দেশে এখন, না খেয়ে মারা যাওয়ার চেয়ে মেদ-ভুঁড়িতে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অসুখে মারা যাওয়ার চেয়ে যুদ্ধে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এগুলো মানুষের দুর্দশার বৈজ্ঞানিক কারণ নয়, সামাজিক ও রাজনীতিক কারণ। 

“হাজার হাজার বছরেও মানুষের বিশেষ কোনো অগ্রগতি হয় নাই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সব অহংকার নিয়ে মানুষ এখনো কুত্তার মতন অসহায়”, এগুলো হলো চিপ রেটোরিক। কুত্তা কখনোই অসহায় ছিলো না। কুত্তা অসহায় হয়েছে মানুষ কর্তৃক কুত্তার ডোমেস্টিকেশন বা গৃহপালিতকরণের পর। মানুষ ও কুত্তা যখন উভয়েই জঙ্গলে ছিলো, তখন কুত্তা মানুষের চেয়ে ভালো খাবার খেতো। মানুষকে দীর্ঘকাল অন্য প্রাণীর উচ্ছিষ্ট খেতে হয়েছে। শক্তিমান প্রাণীরা যখন শিকার ধরে মাংস খেতো, এবং মাংস খেয়ে হাড়গোড় ফেলে যেতো, তখন মানুষ ওই ফেলে যাওয়া হাড় ভেঙে বোনম্যারো খেতো। 
বিজ্ঞানকেও গালমন্দ করার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আছে, কিন্তু ইমতিয়াজ মাহমুদ ওই পড়াশোনো আর পরিশ্রমের পথে হাঁটতে চান নি। তিনি হেঁটে গিয়েছেন সেই পথে, যে-পথে বাঙালি, লাইন ধরে পিঁপড়ার মতো যায়। 

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

মহিউদ্দিন মোহাম্মদ 

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলেছে: তসলিমা নাসরিন

তসলিমা নাসরিন

ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলেছে: তসলিমা নাসরিন

ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনিদের সমস্যা আজকের নয়। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল নামক রাষ্ট্র তৈরী হওয়ার পর থেকে। এই রাষ্ট্র  তৈরির পেছনে ছিল ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর  ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাস করা অত্যাচারিত ইহুদিরা নিজেদের জন্য একটি স্বদেশ চেয়েছিল। সেই স্বদেশই তাদের গড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে ফিলিস্তিনিরা যে অঞ্চলে হাজার বছর ধরে বাস করতো, সেই অঞ্চল থেকে ফিলিস্তিনিদের  উৎখাত ক’রে, উদবাস্তু ক'রে। যারা ইসরায়েল তৈরি করেছিল, তাদের উচিত ছিল ফিলিস্তিনিদের জন্যও একটি রাষ্ট্র তৈরি করা। ১৯৬৭ সালে  ইসরায়েল ছয় দিন ব্যাপী একটি যুদ্ধ করে মিশর আর জর্দানের  আরও ভূমি দখল করে নিয়েছিল,  তারপরও ফিলিস্তিনিদের তাড়ানো বন্ধ করেনি।

ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যে যুদ্ধ হয়, তা অসম যুদ্ধ। ইসরায়েল পৃথিবীর অন্যতম মিলিটারি মহাশক্তি, আর ফিলিস্তিনিদের হাতে কিছু ইট পাটকেল, কিছু  হাত বোমা, কিছু রকেট। নিজেদের স্বাধীনতা ফিরে পেতে, আর অসহনীয় শরণার্থী-জীবনের ইতি ঘটাতে যুগে যুগে ফিলিস্তিনিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠন গড়ে তুলেছে। জঙ্গিরা ইসরায়েলের দিকে রকেট ছুঁড়ে মারে, ২ জন নিহত হয়, আর প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েল যুদ্ধ-বিমান পাঠায়, মিসাইল ছুঁড়ে ফিলিস্তিনি জঙ্গিসহ সাধারণ মানুষ, তাদের ঘর বাড়ি  সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে আসে, ২০০০ জনের মৃত্যু হয়। ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন দেখে অন্যান্য দেশের মুসলিমরা ইহুদি এবং খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে, ইসরায়েলকে সমর্থন করা ইউরোপ আর আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য জঙ্গি হয়ে ওঠে।


আরও পড়ুনঃ


গ্রহাণু ঠেকাতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে: নাসা

তাহসান-মিথিলার ‘সারপ্রাইজ’-এর রহস্য উন্মোচন, আড়ালে অন্য কেউ

ইসরায়েলের হামলা নিয়ে নোয়াম চমস্কির টুইট

ইসরায়েলের হামলা মানবতাবিরোধী অপরাধ: মিয়া খলিফা


আজ ইউরোপ আর আমেরিকা চেষ্টা করে ইসরায়েল আর ফিলিস্তিনিদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে। কিছুদিন শান্তি বিরাজ করে, আবার শুরু হয়ে যায় সংঘাত। আমার মনে হয় না এই সংঘাত-সংঘর্ষ অচিরে শেষ হবে। এ আরও দীর্ঘকাল চলবে। ফিলিস্তিনিরা রাষ্ট্র চায়, তবে যে  ভূমিতে তারা বাস করতো, সেই ভূমির কিছুটা হলেও ফেরত চায়। কিন্তু সেই ভূমিতে এখন বাস করছে ইসারেয়েলিরা। এরাও দেবে না, ওরাও ছাড়বে না। এই সম্পর্কের মধ্যে এখন জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদের অধিকার নিয়ে আগুন জ্বলছে। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে কালো ধোঁয়া। দূর থেকে এই অসম যুদ্ধ দেখতে হবে আমাদের, এ ছাড়া উপায় কী? যারা ইসরায়েলকে সমর্থন করছে আজ, তাদের যদি ফিলিস্তিনিদের মতো অবস্থা হতো, তারাও জানে তারা তখন ফিলিস্তিনিরা যা করছে, তাই করতো। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চাইতো।

যুদ্ধ অনেক দেখেছি, আর দেখতে ইচ্ছে করে না। আর দেখতে ইচ্ছে করে না বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা। শান্তি দেখতে  চাই সর্বত্র। কিন্তু শান্তি বোধহয় মানুষ নামক প্রাণীর জন্য খুব সহজ নয় পাওয়া।

news24bd.tv / নকিব

পরবর্তী খবর

নারীদের ইদগাহে ইদ করা প্রসঙ্গে

হারুন আল নাসিফ

নারীদের ইদগাহে ইদ করা প্রসঙ্গে

রমজান মাসব্যাপী রোজা পালন করার পর রোজাদার তথা মুসলিম পুরুষদের জন্য রয়েছে ইদ বা আনন্দ। শাওয়াল মাসের প্রথম দিন মুমিন মুসলমান পুরুষরা দলে দলে ইদগাহে একত্রিত হন। ইদের নামাজ আদায় করেন এবং পরস্পর কুশল বিনিময় করেন। 

কিন্তু নারীদের বেলায় করণীয় কী? তারা কি ইদগাহে যেতে পারবেন বা ইদের নামাজ আদায় করতে পারবেন? নারীদের ইদের নামাজ আদায়ের হুকুমই বা কী? হাদিস অনুযায়ী মুসলিম নারীরা ইদগাহে যেতে পারবেন, ইদের নামাজ পড়তে এবং দোয়াতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। 

এ প্রসঙ্গে বুখারির ৩২৪ নং ও মুসলিমের ৮৯০ নম্বর হাদিসে এসেছে: হজরত উম্মে আতিয়া (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ(সা,) প্রাপ্তবয়স্কা, ঋতুবতী ও গৃহবাসিনীসহ সকল নারীকে ইদুল ফিতর ও ইদুল আজহার নামাজের জন্য বের হওয়ার এবং নামাজে অংশগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে ঋতুবতী মেয়েরা নামাজ আদায় থেকে বিরত থাকবেন কিন্তু কল্যাণ ও মুসলিমদের দোয়ায় অংশ নেবেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মাঝে কারো কারো ওড়না নেই। রাসুলুল্লাহ(সা.) বললেন, তিনি তার অন্য বোন থেকে ওড়না নিয়ে পরবেন।

তবে নারীদের ইদের নামাজে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়, সুন্নাত। এ নিয়ে আবার মাজহাবগুলোতে মতভেদ রয়েছে। 
১. ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে নারীদের ঈদগাহে নামাজ আদায় সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

 ২. হানাফি মাজহাব মতে, নারীর জন্য ঈদের নামাজ পড়া নফল। আর নফল নামাজ জামাতে আদায় মাকরূহ। অবার ফেতনার আশংকায় নারীদের ইদের নামাজ আদায় করাও মাকরুহ।

আমাদের দেশে নারীরা সাধারণত ইদের জামাতে অংশ নেন না। এ ব্যাপারে কেউ তেমন কিছু জানেন না, আবার জানার আগ্রহও দেখা যায় না। এ নিয়ে আরো আলাপ-আলোচনা হলে আমাদের জানার সুযোগ হতো। এ নিয়ে আমরা কোনো ভুলে থাকলে তা থেকে বাঁচা যেতো।
নিচের ছবিটি ২০১৬ সালের ৬ জুলাই ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগরে একটি ইদগাহে নারীদের জামাতের একাংশ।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

লেখক : হারুন আল নাসিফ  : কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক।

(ফেসবুক থেকে নেয়া)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

ধর্ম পরিচয় জানতে চাওয়ার মধ্যে কোন বাহাদুরী বা পৌরুষত্ব নেই

চঞ্চল চৌধুরী

ধর্ম পরিচয় জানতে চাওয়ার মধ্যে কোন বাহাদুরী বা পৌরুষত্ব নেই

আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক আলোচনা আর সমালোচনার ঝড় বয়ে গেল। এতে আমি শুধুই বিব্রত নই, সেই সাথে মানসিকভাবে খুব অস্বস্তিকর সময় পার করছি...।

এখন নিশ্চয়ই আমার পরিচয় নিয়ে কারো কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ভবিষ্যতে নতুন করে আমার পরিচয় জানার জন্য কেউ আগ্রহী হলে ব্যক্তিগত ভাবে আমাকে ইনবক্স করলে ধন্য হবো। তবে পরিচয়ের নামে, এরকম পরিস্থিতি কাম্য নয়।

গুটি কতক মানুষ যুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন, ধর্ম পরিচয় জানতে চাওয়াটা কি কোন অপরাধ? তাদের জন্য বলছি... অপরাধ নয়, এটা যেমন ঠিক, আবার বার বার এই পরিচয়টা জানতে চাওয়ার মধ্যেও তেমন কোন বাহাদুরী বা পৌরুষত্ব নেই।

বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমাকে ভালোবাসে, আমার কাজ পছন্দ করে, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। এই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে যারা আমাকে ভালোবেসে আমার হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন, অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলেছেন, সকল ধর্মের মানুষ আমার মাকে মা ডেকেছেন, আমার পরিচিত জন, শুভানুধ্যায়ী, সহকর্মীসহ, দেশ বিদেশের হাজার হাজার মানুষ খোঁজ নিয়েছেন, আমি এ হেন পরিস্থিতিতে কেমন আছি...। তাঁদের প্রতি আমার ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

আর সামান্য সংখ্যক মানুষ নানান বিব্রতকর প্রশ্ন করে ও গালি গালাজ করে বা আমাকে বর্জন করেও, পরবর্তীতে তাদের কমেন্টগুলো ডিলিট করে দিয়েছেন, তাদের প্রতিও আমার ভালোবাসা রইলো। কারণ তারা এক পর্যায়ে বাস্তব পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেছেন। যে কারণে, অনেকেই পরবর্তীতে আমাকে দেয়া গালিগুলো আর খুঁজে না পেয়ে উল্টো অভিযোগ করেছেন, বলেছেন...কই আমার বিরুদ্ধে তো কেউ তেমন কিছুই লেখেনি....। এ নিয়েও আর কোন বিতর্কের দরকার নেই।

আপনাদের সবার কাছে আমার বিনীত অনুরোধ, এই বিষয়টাকে কেউ ধর্মীয় বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউই কাউকে অসম্মান করে কিছু লিখবেন না। পারলে গঠনমুলক কিছু লিখুন। সেটাই হবে সভ্য মানুষের কাজ।

আরও পড়ুন


যার জন্যে মিতুকে হত্যা, কে সেই এনজিও কর্মী গায়েত্রী?

দেশের দুঃসময়ে বিদেশে বসবাসরত ভারতীয় চিকিৎসকদের অনন্য উদ্যোগ

শিমুলিয়া ঘাটে আজও ঘরমুখো মানুষের ঢল, অপেক্ষায় শতশত যান

পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই মাইক্রোবাস চালকের লাশ উদ্ধার


শুধু একটি কথা সবাইকে বলতে চাই, আপনি যে ধর্মেরই হোন না কেন, যে পেশারই হোন না কেন, আপনার কর্ম দিয়ে দেশের জন্য কতটুকু মঙ্গল করছেন, সেটাই আসল কথা। সব ধর্মেই ভালো মানুষ, মন্দ মানুষ রয়েছে। আমার মনে হয় সকল মানুষের পরিচয়টা কর্ম, সহনশীলতা, আর ধর্মীয় উদারতা দিয়ে হোক।

আমাকে নিয়ে অতি:সত্বর এই আলোচনারও পরিসমাপ্তি হোক।

আমার পরিচয়....
আমি মানুষ,আমি বাংলাদেশী,আমি বাঙালী....
আর ধর্ম পরিচয়টা প্রত্যেকের মতই জন্মগত।
এতে কারো কোন আপত্তি থাকলেও, আমার কোন সমস্যা নেই।

আর সবচেয়ে বড় যে পরিচয়ে আপনারা আমাকে চেনেন...। সেটা হলো, আমি একজন শিল্পী....। আমার কাছে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান সবাই সমান এবং আপন।

সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা...
ঈদ মুবারক....

সারা পৃথিবী জুড়ে যে করোনা সংকট চলছে, এই দু:সময়ে সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন...। আসুন,আমরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেই। 

মানবতার জয় হোক....
সবার জন্য ভালোবাসা।

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর

বাবুল আক্তার: বাদী থেকে প্রধান আসামি!

হারুন আল নাসিফ

বাবুল আক্তার: বাদী থেকে প্রধান আসামি!

স্ত্রী হত্যা মামলার বাদী ছিলেন তিনি। পাঁচ বছরের মাথায় তিনি আজ শ্বশুরের করা নতুন মামলায় স্ত্রী হত্যার অভিযোগে প্রধান আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এ ঘটনা সচেতন ও চিন্তাশীল মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। এমন অবিশ্বাস্য ব্যাপারও যে ঘটতে পারে তা অনেকে ভাবতেই পারেননি!

সে সময় বাবুল আক্তারের কান্নার দৃশ্য দেখে অনেকে আর প্রতি সমবেদনা বোধ করেছিলেন। তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু এ কী কথা! সেই বাবুলই তাহলে স্ত্রী হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী? একজন সৎ ও কীর্তিমান অফিসার হিসেবে পরিচিত ও প্রশংসিত ব্যক্তি সম্পর্কে এমন কথা বিশ্বাস করাকে অন্যায় মনে করেছিলেন বেশির ভাগ মানুষ।

এমন ঘটনা সত্যি না হওয়াই কাম্য। আইন-শৃংখলা বাহিনির গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এমন ছক আঁটা ও তা বাস্তবায়নে যে তিনি তার পদ ও এসংক্রান্ত সুবিধা কাজে লাগিয়েছিলেন তাতে সন্দেহ থাকার কথা নয়। কী ভয়ংকর! ভাবতে গা শিউরে উঠছে। এটাই কি তার একমাত্র অপরাধ সংশ্লিষ্টতা? মনে হয় না। 

২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পরকীয়ার জের ধরে পুলিশের এক এসআই আকরাম হোসেনেকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে বাবুল আক্তারের বিরুদ্ধে একটি মামলা  করা হয়। আকরামের বোন জান্নাতারা রিনি ঝিনাইদহ আদালতে মামলাটি করেন। এমামলার বিষয়টিও এখন নতুন করে বিশ্বাসযোগ্য বলে প্রতীয়মান হওয়া বিচিত্র নয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, এসআই আকরাম হোসেনের স্ত্রী বনানী বিনতে বছির বর্ণির সঙ্গে বাবুল আক্তারের পরকীয়ার জেরে ২০১৫ সালের ১৩ জানুয়ারি ঝিনাইদহের শৈলকুপায় মহাসড়কে মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করা হয় আকরামকে। নিহত আকরাম হোসেন তখন বিমানবন্দরে স্পেশাল ব্রাঞ্চে কর্মরত ছিলেন। 

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুলের বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত হন। তাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। 

ওই সময় পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি বলেন, তার জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমের জন্য স্ত্রী হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকতে পারেন। 

এরপর দেশব্যাপী জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। ওই সময় বেশ কয়েকজন কথিত জঙ্গি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তার প্রথমে ঢাকার মেরাদিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে উঠেছিলেন। শ্বশুর এসময় বাবুল আক্তারের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছিলেন।

তবে সপ্তাহ দুয়েকের মাথায় মিতু হত্যার তদন্ত নতুন মোড় নেয়। বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন ও শাশুড়ি সাহেদা মোশাররফ, বাবুল আক্তারই মিতুকে হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করেন। কিন্তু বাবুল আক্তার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন।

(ফেসবুক থেকে)

news24bd.tv / কামরুল  

পরবর্তী খবর

যদি চালুই করতে হয়, তবে আজ থেকে নয় কেন?

রউফুল আলম

যদি চালুই করতে হয়, তবে আজ থেকে নয় কেন?

ইউনিভার্সিটিগুলো অনার্স-মাস্টার্স পাশ করা স্টুডেন্ট নিয়োগ দেয়। নিয়োগের পর তরুণ শিক্ষকদের অনেকেই গড়ে দুই-তিন বছর বা আরো বেশি সময় ব‍্যয় করে বিদেশে মাস্টার্স/পিএইচডি পাওয়ার চেষ্টায়। এতে তাদের পাঠদান ও অন‍্যান‍্য কর্ম ব‍্যাহত হয়। যারা বিদেশে যাওয়ার সুযোগ পায়, তারা পাঁচ-সাত বছর ডিপার্টমেন্টে উপস্থিত না থেকেই বেতন পায়। এটা বস্তুত কাজ না করেই বেতন! প্রফেসর কামরুল হাসানের এক লেখায় জানতে পারি, অনেকে এই টাকা ফেরত না দিয়ে বিদেশ থাকার চেষ্টা করে বা থেকে যায়। সে টাকা আদায় করতে সরকারের অনেক বেগ পেতে হয়।

ক্ষতিটা যে শুধু আর্থিক তাই নয়। এই যে পাঁচ-সাত বছর একজন শিক্ষক ডিপার্টমেন্টে নেই, সে কারণে শিক্ষার্থী ক্লাস থেকে বঞ্চিত হয়। অনেক সময় পরীক্ষার ফলাফল দিতে দেরি হয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষককে শিক্ষিত করতে গিয়ে বহু তরুণের জীবনকে হুমকিতে ফেলছি আমরা। কী ভয়াবহ! অথচ সেসব তরুণদের মধ‍্যে কতো সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।

তাহলে, চাকরি জীবনের গড়ে দশ বছরই কাটে উচ্চশিক্ষার পেছনে। আবার এই শিক্ষকদের অনেকেই দেশে ফিরে আর গবেষণার সাথে কোনভাবেই জড়িত থাকেন না। অনেকে করেন রাজনীতি। অনেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব নেয়ার জন‍্য দৌঁড়ান। তাহলে, এই দশ বছরে গড়ে পাঁচ লক্ষ টাকা করে বেতন ধরলেও, জনপ্রতি রাষ্ট্রের পঞ্চাশ লক্ষ টাকা জলাঞ্জলি।

তাহলে সমাধান কি? সমাধান হলো, রাষ্ট্রকে উচ্চ বেতন-ভাতা দিয়ে বিদেশ থেকে দেশিয় ছেলে-মেয়েদের ফিরিয়ে নেয়ার উদ‍্যোগ নিতে হবে। পিএইচডি করা প্রার্থীদের প্রাধ‍ান‍্য দিয়ে নিয়োগ দিতে হবে। তাদেরকে গবেষণার জন‍্য পর্যাপ্ত ফান্ড দিতে হবে। বিদেশ থেকে শিক্ষক ভাড়া করে আনতে হবে। সারা দেশে যদি হাজার হাজার বিদেশি লোক, কর্পোরেটের চাকরি দখল করে রাখতে পারে, বিশ্ববিদ‍্যালয়ে শিক্ষক বা গবেষক আনা যাবে না কেন?

চলমান এই নিয়ম বা ধারা হয়তো নব্বই দশক পর্যন্ত উপযোগী ছিলো। কিন্তু এখন এই ধারাটা রাখার কোন প্রয়োজন নেই। এখন সময় এসেছে সরাসরি পিএইচডি করা প্রার্থীকে নিয়োগ দেয়ার। চাইলেই হয়তো দেশের সব ইউনিভার্সিটির জন‍্য এতো শিক্ষক আমরা একসাথে পাবো না, সেটা সত‍্য। কিন্তু আমার যদি এখন থেকে নিয়মটা চালু করি, চর্চাটা ভালোভাবে শুরু করি, তাহলে সেটা সংস্কৃতিতে দাঁড়াতেও প্রায় এক দশক লেগে যাবে। আমি ভাবতেই পারি না, বাংলাদেশের ইউনিভার্সিটিতে ২০৩০ সালে গিয়েও পিএইচডি ছাড়া নিয়োগ হবে! দুনিয়ায় আমরাই হয়তো তখন এ বিষয়ে একমাত্র উদাহরণ হবো।

আরও পড়ুন


বিবেকবোধ বা মানবিকতায় ‘চুজ অ্যান্ড পিক’ ব্যবস্থা নেই

আবারও করোনায় মৃত্যুর রেকর্ড গড়লো ভারত

পরিচয় পাওয়া গেছে পদ্মায় ডুবে যাওয়া সেই মাইক্রোবাস চালক ও মালিকের

যে ৮ বিভাগে ভারী বর্ষণসহ শিলাবৃষ্টি হতে পারে


সীমিত পরিসরে হলেও, দেশেই উন্নত মানের পিএইচডি ডিগ্রি তৈরি করার চেষ্টা শুরু করতে হবে। এর কোন বিকল্প নেই। এটা হলে, আমাদের কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার মান অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। নির্দিষ্ট কিছু সেক্টরকে নির্বাচিত করুন। আমরা হয়তো একবারে সব দাঁড় করাতে পারবো না। কিন্তু আগামী দশ-পনের বছরের জন‍্য পাঁচটা সেক্টর বেছে নিতে পারি। এই সেক্টরগুলোতে পনের বছরে পাঁচশ গবেষক তৈরি করার লক্ষ নেন। যারা হবে বিশ্বমানের। তাদের হাত দিয়ে হবে দেশে গবেষক তৈরির সংস্কৃতি। যতোদিন আমরা দেশে বিশ্বমানের গবেষক তৈরি করতে না পারবো, ততোদিন গবেষণায় আত্মনির্ভরশীলতা আসবে না। কখনোই না!

২০৭১ সালে বাংলাদেশের বয়স হবে একশো বছর। একশো বছরের একটা দেশে যদি বিশ্বমানের কুড়িটা ইউনিভার্সিটি ও রিসার্চ ইনস্টিটিউট না থাকে, আমি স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি, সে দেশ সে সময়ে হাবুডুবু খাবে। তাকে বাঁচানোর জন‍্য পর্যাপ্ত লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে দেশটা পুরোপুরি হয়ে যাবে অন‍্যদের পণ‍্যের বাজার। সারা পৃথিবী যে পথে হেঁটেছে আমাদেরকে টিকে থাকতে হলে সে পথেই হাঁটতে হবে। এই নিয়মগুলো কখনো না কখনো আমাদের দেশেও হবে। একদিন না একদিন যদি চালুই হয়, তবে আজ থেকে নয় কেন?

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর