ধর্মের নামে অধর্ম

চৌধুরী জহিরুল ইসলাম

ধর্মের নামে অধর্ম

অনেকটা ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের মত। গ্রাম থেকে শহর অভিমুখে হাজার হাজার মানুষ লাঠিসোটা, বন্দুক উঁচিয়ে রওয়ানা হলো। সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আগুন জ্বললো! তারপর দেশটি নিমজ্জিত হলো চিরস্থায়ী গৃহযুদ্ধে। 

ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধের এক দশক হতে চলল। নিউইয়র্কে বহু মুদি দোকান এবং গাড়ি চালিয়ে জীবন নির্বাহ করা বহু ইয়েমেনী। তাদের গৃহযুদ্ধের কারণ জিজ্ঞেস করেছি। কেউ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারে না- কেন এই গৃহযুদ্ধ? অশিক্ষা, কুশিক্ষা এবং অপুষ্টিতে জর্জরিত একটি জাতি কেন দিনদিন অন্ধকারের গহ্বরে নিমজ্জিত হচ্ছে!

কোনো কোনো ইয়েমেনী বলেছে- হুতিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ইরানী ভাবধারার বিস্তৃতি ঘটেছে। অনেক সুন্নী ইরানী টাকার লোভে শিয়া হয়ে গেছে। এখন তাই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলটাই বাকি। ইরান যেহেতু এসেছে, তাই বিপরীতে সৌদি আরবের অংশগ্রহণ অবধারিত। হাতি-ঘোড়ার লডাইয়ে প্রাণ যাচ্ছে উলু-খাগড়ার!

আফগানিস্তানের তালেবান কিংবা পাকিস্তানের তালিবানদের কথাই ধরুন। আফগানিস্তান পুরোটাই জিম্মি তালেবান দমন পীড়নে। পাকিস্তান মাঝেমাঝেই বিস্ফোরিত হয় ধর্মীয় সংগঠনগুলোর আস্ফালনে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে অঁকেজো করে দেয়ার মত! 

চলতি সপ্তায় এরা লাহোর নগরীকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করেছে। ১১ জন পুলিশ সদস্যকে জিম্মি করে বুঝিয়ে দিয়েছে, এরা ইচ্ছে করলে সিভিল প্রশাসনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসতে পারে! বাংলাদেশের পরিস্থিতিও ধীরে ধীরে সেদিকেই যাচ্ছে!

বাংলাদেশের ভেতরে বাইরে থেকে ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে অনৈতিক কাজে মদত দেয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করি। একটি হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করে এই মদত দেয়ার পেছনে। আড়ালের রাজনৈতিক নেতারা কেবল ব্যবহার করে মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের। 

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা রাজনৈতিক নেতাদের অসৎ উদ্দেশ্য ও মিথ্যাচার ধরে ফেলেছে। তাই ব্যাপকভাবে অন্তত ৯০ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রী আর নেতাদের বিশ্বাস করে না। তাদের কথায় এক মিনিটও সময় নষ্ট করতে চায় না। 

বাকি থাকে ১০ শতাংশ। এদের কেউ কেউ সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় নিজেদের আখের গোছানোর মতলবে। এবং খুব সামান্য একটি অংশ হয়ত ন্যায়ের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের নষ্টালজিয়ায় ভোগে। কাজেই নষ্ট রাজনীতির আকাঙ্খা পূরণে এখন তাই মাদ্রাসার ছাত্ররাই একমাত্র ভরসা। 

মাদ্রাসার ছাত্ররা তাদের উস্তাদের উস্কানিতে শ্রেণীকক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় আগুন জ্বালায়। জনগণের সম্পত্তি ধ্বংস করে। কয়েকজন হয়ত পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেয়। বাকিরা আবার ফিরে যায় মাদ্রাসায়। গত এক দশকে এটিই বাংলাদেশের চালচিত্র। 

বাংলাদেশের এইসব মাদ্রাসার ছাত্র কারা? এদের মোচ-দাড়িও গজায়নি ঠিকমত। উস্তাদের রক্তচক্ষু ও উস্কানিকে এরা বিধাতার আদেশ মনে করে। সামাজিকভাবে এরা হীন ও দরিদ্র। উস্তাদ এবং মাদ্রাসার কল্যাণে এদের অন্তত ৮০ শতাংশের ভাত-কাপড়ের সংস্থান হয়েছে!

বাংলাদেশের উঠতি ধনীক শ্রেণীর বদান্যতায় চলে মাদ্রাসাগুলো। এর সঙ্গে যুক্ত প্রবাসীদের অর্থানুকূল্য। এই দু’টি উৎসই জানে না বাংলাদেশের উত্থান ও জন্মলাভের ইতিবৃত্ত। এরা জীবনযাপনে আধুনিক হলেও পশ্চাদপদ মানসিকতার। 

মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ইউরোপ-আমেরিকার যে সব সরলপ্রাণ বাংলাদেশী বিনাবাক্য ব্যয়ে বাংলাদেশের মসজিদ মাদ্রাসায় টাকা ঢালেন, তারা কোনোদিন ঘুণাক্ষরেও জানতে চান না সেসব মাদ্রাসায় কী পড়ানো হয়। সেখানে শিক্ষক হিসেবে কারা কর্মরত। 

পাকিস্তানের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। সেখানে হুজুরদের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন করা ব্লাসফেমী আইনের সমতুল্য। এক পাকিস্তানীকে আমি একদিন প্রশ্ন করেছিলাম- এই যে তোমাদের দেশে শিয়া মসজিদে সুন্নীরা গুলি করে মানুষ হত্যা করে, কিংবা শিয়ারা সুন্নী মসজিদে গুলি চালায়, এসব কি ইসলাম সম্মত? 

উত্তরে সে বলেছিল- এরা পরস্পরকে মুসলমানই মনে করে না! বলে ‘ফেৎনা’ সৃষ্টিকারী। আর ‘ফেৎনা’ সৃষ্টিকারীদের ধ্বংস করা না গেলে আসল ইসলাম নাকি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না! 

এই যে ধর্মের নামে অধর্ম চলে, এর বিস্তার শুরু হয়েছে আমাদের দেশেও। এই বিষধর সাপকে রুখবেন কী দিয়ে? কারা বলবে- ধ্বংস, বিভিষিকা, হত্যা, জ্বালাও-পোড়াও ধর্মের মর্মবাণী নয়! সমাজকে শান্তি ও কল্যাণের পথে ধাবিত করাই ধর্মের কাজ। 

পরস্পরকে জানা, বুঝা, শ্রদ্ধা ও ভালবাসার মধ্যেই ধর্মের মর্মবাণী নিহিত। যতদিন পর্যন্ত মুসলমানদের মধ্যে আত্মপোলব্ধি জাগ্রত না হবে, যতদিন পর্যন্ত সমাজের অপশক্তিকে সততা ও সাহসিকতা দিয়ে মোকাবিলার প্রস্তুতি অর্জিত না হবে, ততদিন পর্যন্ত অন্ধকার এবং কুসংস্কার আমাদের পিছু ছাড়বে না! 

ধর্মকে নিয়ে যারা বাড়াবাড়ি করে তাদের উপলব্ধির সময় হয়েছে বহু আগেই যে, এই বাড়াবাড়ি ধর্মের কোনো কাজে লাগে না। বরং ধার্মিক মানুষেরা তাদের আচরণে হয় বীতশ্রদ্ধ। যারা সমাজের মঙ্গল এবং কল্যাণ কামনা করেন- উন্নাসিকতা ও নীরবতার দিন শেষ হয়েছে তাদেরও। একটিবার গর্জে উঠুন এবং বলুন- ধর্মের নামে সমাজে অধর্ম চলতে পারে না!

লেখক: চৌধুরী জহিরুল ইসলাম, নিউইয়র্ক।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

পুকুর যতবার কাটবে আর ভরবে ততই ‘পুকুর সমান মধু’

মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু

পুকুর যতবার কাটবে আর ভরবে ততই ‘পুকুর সমান মধু’

ছবিতে কলকাতার গড়ের মাঠ। অন্য নাম ময়দান। এত বড় যে ময়দানের মাঝখানে গেলে নগরের কোলাহল শোনা যায় না। মুক্তিযুদ্ধের সময় এক সন্ধ্যায় আমি খিদিরপুর রোডে ট্রাম থেকে নেমে গড়ের মাঠ আড়াআড়ি হেঁটে পেরিয়ে পার্ক স্ট্রিটে পৌঁছেছিলাম।

কম-বেশি ১০০০ একরের এই বিশাল মাঠের অংশে বিভিন্ন ক্লাবের খেলার মাঠ, ইডেন গার্ডেনের মতো বিখ্যাত ক্রিকেট স্টেডিয়াম প্রভৃতি গড়ে উঠলেও বা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মতো ঐতিহাসিক ভবন থাকলেও খোলা মাঠের মূল চরিত্র দু শ বছরেও নষ্ট করা হয়নি।

কারণ এটা কলকাতা মহানগরের 'ফুসফুস'। তারপরও আর যাতে কোনো স্থাপনা না হয় সেজন্য কলকাতাবাসীর উদ্বেগ রয়েছে। ময়দানে বইমেলা, বাণিজ্যমেলার আয়োজন হতো, সেগুলো বন্ধ করা হয়েছে। গত বছরই ময়দানের অংশে মোটরসাইকেল পার্কিং ও আবর্জনা দেখে কলকাতা হাইকোর্টের একজন বিচারক স্যুয়োমটো রুল করেন।

আমাদের জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ ঢাকায় ছোট একটি 'ফুসফুস' ছিল, কম-বেশি ৬৮ একর, স্বাধীনতার পর ঘোড়দৌড় তুলে দিয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু চারদিকে শুধু নারকেল গাছ লাগিয়ে উদ্যানরূপে রাখতে বললেন। তারপর আমরা উদ্যানটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। প্রথমেই  এলোপাতাড়ি গাছ লাগানো হলো। ছেলেপেলেদের ফুটবল-ক্রিকেট খেলে ও দৌড়াদৌড়ি করে শরীরচর্চার সুযোগ বিলুপ্ত হলো। পরপরই মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলের সরকার অতীতের আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষার জন্য, সংস্কৃতি বলয় নির্মাণের জন্য উদগ্রীব হয়ে দফায় দফায় প্রকল্প আনতে লাগলেন। আমাদের দেশে নগর উন্নয়নের কাজ পরিকল্পনাবিদরা করেন না, করেন প্রভাবশালী ঠিকাদার ও আমলারা এবং রাজনীতিবিদরা সায় দেন। তাই দূরদৃষ্টি দিয়ে পরিকল্পনা নয়, প্রাধান্য পায় খণ্ড খণ্ড প্রকল্প। তাতে অনেক মধু চুঁইয়ে চুঁইয়ে নয়, স্রোতধারার মতো পড়ে। তাই যা হবার তাই হচ্ছে। এখন মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মারকসমূহ পর্যটকদের দেখানোর জন্য উদ্যানের ভেতরে রাস্তা ও হোটেল-রেস্তোঁরা দরকার। ব্যস্, এক সময় এলোপাতাড়ি গাছ লাগিয়ে যে পাতলা  বন তৈরি হয়েছিল তা এখন কেটে সাফসুতরো করো। উভয়তে লাভ। পুকুর যতবার কাটবে আর ভরবে ততই পুকুর সমান মধু।

বিশ্বে কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকদের মতামত না নিয়ে, বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও নিরীক্ষা ছাড়া এলাকার ভৌত অবস্থা ও পরিবেশ এভাবে প্রকল্পের নামে বদলে দেওয়া বা ধ্বংস করা যায় না।

দেশে এখন রাজনীতির যে ভারসাম্যহীনতা ও সুশীল বা নাগরিক সমাজের দুর্বলতা তাতে ঠিকাদারি উন্নয়নের কুঠারাঘাত থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অবশেষটুকু রক্ষা করতে পারা দূরাশা। তবু তরুণদের দ্বারা যেটুকু নাগরিক প্রতিবাদ হচ্ছে সেটুকুর প্রতি অভিনন্দন।

গড়ের মাঠের তিনটি ছবি নেটে উইকিপিডিয়া ও অন্য সূত্র থেকে নেওয়া। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের  ছবি তিনটি অতিসম্প্রতি ঢাকার সংবাদপত্রে প্রকাশিত।।

মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু: সিনিয়র সাংবাদিক

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

পরবর্তী খবর

এটি কি তাহলে ধর্মযাত্রা!

শওগাত আলী সাগর

এটি কি তাহলে ধর্মযাত্রা!

এই যে মানুষ পরি কি মরি করে গ্রামে ছুটছে তার অন্তর্নিহিত রহস্য কি! প্রতি বছর ঈদের সময় সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়- ‘নাড়ির টানে গ্রামে ছুটছে মানুষ’ এই কি সেই নাড়ির টানে গ্রামে ছুটা! সেই নাড়িটা আসলে কি!

অনন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে এবারের পরিস্থিতিটা অনেক ভিন্ন। তবু মানুষ ছুটছে, পরি কি মরি করে ছুটছে। ফেসবুকে বিভিন্নজনের পোস্ট করা সংবাদপত্রে প্রকাশিত ছবি, টিভি চ্যানেলের ভিডিও চিত্রগুলো গভীর মনোযোগসহকার দেখছিলাম। 

মনে হচ্ছিলো শহর থেকে তাড়া খেয়ে মানুষগুলো নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য কোথাও ছুটছে। অনেকটা যুদ্ধ সময়ের মতো। শহরের কি কোনো যুদ্ধ হচ্ছে তা হলে! ওই যে রশি বেয়ে বেয়ে ফেরিতে উঠছে মানুষ- কিসের তাড়া খেয়ে? কিসের তাড়নায়?

বাচ্চা মতো একটা ছেলে কোনো একটা টিভি চ্যানেলকে বলছিলো- সারা বছর আমরা কষ্ট করে যাই আয় রোজগার করি। বছরের একটা দুইটা ঈদের সময় পরিবারের সবাইকে এ সাথে নিয়ে ঈদ করতে না পারলে কি ভাবে হবে! আমরা মুসলমান তো!  ‘আমরা মুসলমান তো’- কথাটা খট করে বেজে উঠলো কানে। এটি কি তাহলে ধর্মযাত্রা! যারা গ্রামে যাচ্ছেন, তাদের সবার মনে কি এই একই অনুভুতি- ‘আমরা মুসলমান তো!’।


খালেদা জিয়ার চিকিৎসার বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত স্বরাষ্ট্রে

যাত্রীদের চাপ সামলাতে সব ফেরিঘাটে বিজিবি মোতায়েন

অবশেষে করোনামুক্ত হলেন খালেদা জিয়া

কাবুলে স্কুলের পাশে বোমা বিস্ফোরণে নিহত ৫৫


বিশ্বাস করুন, টেলিভিশনের ভিডিওচিত্রগুলো দেখতে দেখতে একবারের জন্যও কোভিড, স্বাস্থ্যবিধি- এইসব মনে পড়েনি। পৃথিবীতে এখন মহামারী চলছে- এই সত্যটাই যেনো ভুলে গিয়েছিলাম। বার বার মনে হচ্ছিলো- এই মানুষগুলো এইভাবে ‘তাড়া খেয়ে ছুটে পালানোর মতো করে’ ছুটছে কেন? এর মনস্তত্বিক, সমাজতাত্বিক কোনো ব্যাখ্যা কি কারো কাছে আছে!

শওগাত আলী সাগর, প্রধান সম্পাদক, নতুনদেশ, কানাডা।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv নাজিম

পরবর্তী খবর

মা কিংবা মন খারাপের গল্প

তারিক শামমি

মা কিংবা মন খারাপের গল্প

করোনা সংক্রমণের আগে প্রায় প্রতি শুক্রবার সকালে আমরা রেসিডেনসিয়াল মডেলের স্কুলের বন্ধুরা স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলতাম। সবার বয়স প্রায় চল্লিশের আগে পিছে। টানা অনেকক্ষণ খেলতে পারি না। খেলার ফাঁকে বিরতির সময় আড্ডা হয়। অনেক গল্প হয়। সবই মজার গল্প। একদিন পাভেল বললো, ক্লাস থ্রি তে হাউসে আমরা একসাথে কাঁদতাম। হাউসের পাশে একটা গাছের আড়ালে গিয়ে কাঁদতাম। তপু এসে বলতো, এই কার কার মন খারাপ? চলে আসো। আমরা এখন কাঁদতে যাবো। তারপর সবাই গাছের পাশে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে কাঁদতাম।

পুরোনো সেই কাহিনী শুনে খেলার মাঠে সবাই হো হো করে হাসলাম। কিন্তু বাসায় ফিরে ঘটনাটা যখনি ভাবতাম মনটা কেমন যেন হু হু করে  উঠতো। মায়ের জন্য মন কেমন করা ক্লাস থ্রি'র ছোট ছোট বাচ্চাগুলো গাছের আড়ালে লুকিয়ে একত্রে কাঁদছে। আহারে কি করুণ দৃশ্য!

আমার ক্যাডেটে পড়ার শখ ছিল। চান্স পাইনি। নাইনে রেসিডেনসিয়ালে চান্স পেয়ে তাই খুব খুশি ছিলাম। হাউসে থাকবো। অনেক বন্ধু। অনেক মজা। এক বিকেলে বাবা মা আমাকে ফজলুল হক হাউসে রেখে আসতে গেলেন। আরো ছেলেরা ও তাদের গার্ডিয়ানও এসেছে। সন্ধ্যায় সব গার্ডিয়ানকে চলে যেতে বলা হলো। একমাত্র ছেলেকে রেখে যাচ্ছেন। বিদায় নেয়ার সময় মা আমাকে জড়িয়ে ধরলো। এক পলক মা'র দিকে তাকালাম। মা'র দু"চোখ বেয়ে দুই সারি অশ্রুধারা। ওই এক পলকই। আর একবারও পেছনে ফেরেনি মা। বা পারেনি। এরপর কতো কিছুই শুরু হলো। ভোরে পিটি, সকালে ক্লাস, বিকেলে গেমস, রাতে আড্ডা, কিন্তু এক পলকের সেই অশ্রুজল মুখটা কিছুতেই মন থেকে মুছতে পারিনি। আজও।

সিনেমার অনেক দৃশ্য আমি ঠিক নিতে পারি না। 'তারে জামিন পার' সিনেমায় দারশিলকে যখন বোর্ডিং স্কুলে দিয়ে বাবা মা ফিরে আসে আর 'মেরি মা' গান শুরু হয়-

Main Kabhi Batlaata Nahi, Par Andhere Se Darta Hoon Main Maa
Yuun To Main Dikhlaata Nahi, Teri Parwaah Karta Hoon Main Maa
Tujhe Sab Hai Pata, Hai Na Maa
Tujhe Sab Hai Pata... Meri Maa…

তখন আমি কিছুতেই সহ্য করতে পারিনা। সারাজীবন আবেগের সাথে লুকোচুরি খেলেছি। কিছুতেই ধরা দেই না। কান বন্ধ করার উপায় নাই। তবে খুব সংগোপনে ল্যাপটপের স্ক্রীণে চোখ না রেখে একটু উপরে তাকিয়ে থাকি। আড়চোখে অন্যদের দিকে তাকাই। ওদের চোখ টলোমলো। পলকেই চোখ সরিয়ে নেই। দ্বিতীয়বার তাকানোর সাহস করি না। চোখের জল যে বড্ড ছোঁয়াচে!

আমার মা বাবা বেঁচে আছেন। তাই সত্যিই জানি না যাদের মা বেঁচে নেই তারা কিভাবে নিতে পারে যখন জেমস গেয়ে ওঠে-

সবাই বলে ঐ আকাশে লুকিয়ে আছে
খুঁজে দেখো পাবে দূর নক্ষত্র মাঝে
রাতের তারা আমায় কি তুই বলতে পারিস
কোথায় আছে কেমন আছে “মা”
ওরে তারা রাতের তারা “মাকে” জানিয়ে দিস
অনেক কেঁদেছি আর কাঁদতে পারি না।

কিংবা যখন ফকির আলমগীর এর সেই বিখ্যাত গান শুনতে পায়-

মায়ের একধার দুধের দাম
কাটিয়া গায়ের চাম
পাপোশ বানাইলে ঋণের শোধ হবে না
এমন দরদি ভবে, কেউ হবেনা আমার মা-গো।

কিংবা যখন জলদ গম্ভীর কন্ঠের আবৃত্তি কানে আসে-

মাকে আমার পড়ে না মনে
শুধু যখন বসি গিয়ে
শোবার ঘরের কোণে,
জানালা থেকে তাকাই দূরে 
নীল আকাশের দিকে
মনে হয়, মা আমার পানে
চাইছে অনিমিখে।
কোলের  পরে ধরে কবে
দেখত আমায় চেয়ে,
সেই চাউনি রেখে গেছে
সারা আকাশ ছেয়ে।

আরও পড়ুন


বাড়িতে যেতে চাইলে হাসবেন-ভয় দেখাবেন, এই আপনাদের বিচার!

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় সীমিত পরিসরে চলছে ফেরি, অপেক্ষায় শতশত যাত্রী

নিয়ন্ত্রণ হারানো চীনের রকেট পড়লো ভারত মহাসাগরে

যাত্রীদের চাপ সামলাতে সব ফেরিঘাটে বিজিবি মোতায়েন


কবি বলেছেন, ''মা কথাটি ছোট্ট অতি কিন্তু জেনো ভাই, মায়ের চেয়ে নামটি মধুর ত্রিভুবনে নাই''। তবুও সন্তানেরা মা'কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়। মাকে ফেলে আসে রেলস্টেশনে। জঙ্গলে।

আজ প্রতিটা প্যারা লিখতে বড় সমস্যা হচ্ছে। বারবার দুচোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। এতো জল যে কোত্থেকে আমদানি হয়? আর বুকের ভেতর কোথায়ইবা লুকিয়ে থাকে?

চোখের জলের হয় না কোনো রঙ 
তবু কতো রঙের ছবি আছে আঁকা।

পুনশ্চ: মাকে নিয়ে লেখা কখনো পুরোনো লেখা হয়না। আমার মা, শ্বাশুড়ি মা থেকে শুরু করে বেঁচে থাকা এবং দূর আকাশের তারা হওয়া সকল মায়েদের প্রতি জ্ঞাপন করি বিনম্র শ্রদ্ধা। মা তো নিত্যদিনের, তাই বছরে একদিন মা দিবস নিয়ে অনেকেরই আপত্তি। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আমার মতামতটা বলি, নিস্তরঙ্গ মায়ের জীবনে একটা দিনে আসুক না একটু উদ্বেলিত তরঙ্গ। সন্তানেরা একটা দিন মা'কে নিয়ে করুক না একটু বাড়াবাড়ি। কোনো ক্ষতিতো নেই তাতে।

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর

আমি একজন ভাঁড় বলছি

খালেদ মুহিউদ্দীন

আমি একজন ভাঁড় বলছি

আমরা যারা ঈদে বাড়ি ফেরা নিয়ে হাসাহাসি করছি তারা কি স্বীকার করি যে আমরা ব্যর্থ? আমরা কি জানি বা বুঝতেছি যে আমাদের উৎপাদিত বার্তার কোনো মূল্যই অনেকের কাছে নাই।

আমাদের মেসেজের, তা জীবনসংহারি গণমৃত্যুর হলেও যে লোকে তোয়াক্কা করছে না এতে আপনে কী বুঝতেছেন? এইটা কী বুঝতেছেন, আমাদের পরিবেশিত আর সব বার্তাকে ভোক্তারা কতটুকু গুরুত্ব দেন?

যারা মেসেজ বানান, তাদের সকলেরই কিন্তু বিষয়টা ভেবে দেখা উচিত। আমরা সবাই মিলে বার্তা আর উপদেশ দিতে গিয়ে পরিণত হয়েছি সম্মিলিত ভাঁড়ে। কেউ বাড়ি ফেরা নিয়ে হাসছি, আবার কেউ হাসছি যারা বাড়ি না গিয়ে ফেসবুকে বিপদ সংকেত দিচ্ছেন তাদের নিয়ে। 

আমার মনে হয় ঐতিহাসিকভাবে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সংবাদগুচ্ছ হল, এটা-আমি-আগেই-বলেছিলাম-তখন-কেউ-আমার-কথা-শুনো-নাই। আমরা কিছুতেই বিস্মিত হই না। সবই আমরা আগে বলে রাখি। আমাদের বাবা মা ও ছোটবেলা থেকে আমাদের তাই শিখিয়েছেন। আপনি অংকে ১০০ পেলেও বাবামা বলবেন, তিনি আগে থেকেই তা অনুমান করেছিলেন, মেট্রিকে ফেল করলেও জানবেন যে, পিতামাতা আগেই তা জানতেন। 

করোনা নিয়ে কী কী বিপদ হতে পারে তাও আমি আগে আগে বলে রাখি তা আমার কথা কেউ শুনুন আর নাই শুনুন। আবার এইসব করোনা ওভারহাইপড, আজাইরা এমন কথাও আমরা কেউ কেউ বলে রাখি।

ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের প্রধান খালেদ মুহিউদ্দীন

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর

আমাদের দেশ হলো পদের নাম ভাঙ্গিয়ে খাওয়ার দেশ

রউফুল আলম

আমাদের দেশ হলো পদের নাম ভাঙ্গিয়ে খাওয়ার দেশ

আমাদের দেশটা হলো নেতা, পিতা ও পদ পরিচয়ের দেশ। বাপের নাম, নেতার নাম, পদের নাম ভাঙ্গিয়ে খাওয়ার দেশ। 
আমরা বাপের সাহসিকতার সনদ নিয়ে বড়াই করি। সেই সনদ নিয়ে চাকরি নেই। বাপের পরিচয় দিয়ে রাস্তায় আকাম-কুকাম করি। বাপের দাপট দেখিয়ে জীবন কাটাই। দেশের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত অসংখ‍্য মানুষ এই “বাপের নাম”, “বাপের স্বপ্ন”, “বাপের ধন” নিয়েই আছে। 

একদল আছে নেতার কাঁধের গামছা হয়ে, জীবন কাটাবে। তুই চিনিস আমি কে? —ওমুক আমার বড়ো ভাই! —আমি ওমুক নেতার চামচা! অর্থাৎ নিজ বাহুতে ছটাক বল না থাকলেও, নেতার বাহুবলে সেরের ওজন দেখিয়ে চলো! 
আরেক দল হলো পদ-পদবী দিয়ে চলো। আমি ওমুক অফিসার! আমি তুমুক সরকারী “উলোট-পালট কর্মকর্তা”। মানুষের কল‍্যাণে কিছু করতে না জানলেও মানুষের কাছে পদ ভাঙ্গিয়ে খেতে পারি ঢেড়! 

আত্মপরিচয়ে, নিজ কর্মে, নিজগুণে বড়ো হওয়ার যে শিক্ষা—সেটা বহুলাংশেই নেই। 

বিদেশে বহু টেলেন্টেড ছেলে-মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে। সহপাঠী, সহকর্মী, বন্ধু—এমন বহু তরুণ-তরুণী ছিলো, যাদের বাপের অনেক টাকা। কারো বাপ রাজনীতিবিদ। কারো বাপ বড়ো ব‍্যবসায়ী। অথচ, তাদের মুখে কখনো বাপের পরিচয় শুনিনি। বাপের পরিচয় বেচে খেতে দেখিনি। অনেক উদাহরণ আছে। এই মুহূর্তে একটা বলছি। আমেরিকার এমরি ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হু ডেভিস, আমাদের ফিল্ডে জাঁদরেল গবেষক। তার ছেলে ও আমি, ইউনিভার্সিটি অব প‍্যানসেলভেনিয়াতে একসাথে কাজ করেছি। কখনো জানতেই পারিনি যে সে প্রফেসর ডেভিসের ছেলে। বহুদিন পর অন‍্যদের কাছ থেকে শুনেছি। 

বহু কর্মকর্তা দেখেছি। নোবেল বিজয়ী দেখেছি। বহু প্রফেসরদের কাছ থেকে দেখেছি। একসাথে কাজ করেছি। কিন্তু কখনো পদ-পদবী নিয়ে হাইলাইট করতে দেখিনি। আপনি হয়তো কফিশপে কফি নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। আপনার পেছনে একজন বিলেনিওয়ার দাঁড়িয়ে আছে। টেরও পাবেন না। আপনার আগে গিয়ে দাঁড়াবে না কোনদিন। 

আমাদের সমাজে এগুলো হলো সামাজিক অপশিক্ষার ফলাফল। কারণ, আমরা পরিবার থেকে, শৈশব থেকে আত্মপরিচয়ে বড়ো হতে শেখাই না। সামাজিকভাবে এই চর্চার অনেক অভাব। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই চর্চা নেই। যারা অগ্রপ্রজন্ম, তারা এই চর্চা করে না। ফলে অনুপ্রজন্মের মধ‍্যেও দেখা যায় না।

মানুষের দুনিয়ায়, আত্মপরিচয়ে বড়ো হতে না পারলে—সে জীবন তুচ্ছ! নিজ কর্মে আলোকিত না হতে পারলে সে জীবনে কোন মহিমা থাকে না। পরিচয় ভাঙ্গিয়ে খাওয়া যে একটা নিকৃষ্টতা—এই শিক্ষাটুকু আমরা পাই না। কী দুর্ভাগ‍্য! 

রউফুল আলম, নিউজার্সি, যুক্তরাষ্ট্র।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv/আলী

পরবর্তী খবর