প্রসঙ্গ মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা ও বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক
প্রসঙ্গ মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা ও বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক

প্রসঙ্গ মামুনুল হকের বিরুদ্ধে মামলা ও বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক

Other

বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক: ধর্ষণ না প্রতারণা?
বিয়ের প্রলোভনে শারীরিক সম্পর্ক ধর্ষণ না প্রতারণা এ প্রশ্নটি সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত একটি প্রসঙ্গ। কিছুদিন আগে ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুকে জড়িয়ে করা একটি মামলা প্রসঙ্গে এ প্রশ্নটি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। আজ হেফাজত নেতা মামুনুল হকের কথিত দ্বিতীয় স্ত্রী জান্নাত আরার ঝর্না মামুনুল হকের বিরুদ্ধে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের মামলা করার খবরে এ প্রশ্নটি আবারও সামনে চলে এসেছে।

বাংলাদেশে সম্প্রতি আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হলেও ধর্ষণের সংজ্ঞায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।

আগের সংজ্ঞাই বহাল আছে।

একই আছে৷ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ৯(১)-এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহবন্ধন ব্যতীত [ষোল বছরের] অধিক বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করে, অথবা [ষোল বছরের] কম বয়সের কোন নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলে গণ্য হইবেন। ’

এ আইনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে ১৬ বছরের নীচে হলে নারীর সম্মতি থাকলেও তা ধর্ষণ৷ কারণ নারী প্রাপ্তবয়স্ক নয়৷ তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নেই৷ কিন্তু প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়েও কিছুক্ষেত্রে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে৷ বিশেষ করে বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ বিষয়ে। অনেকে এটিকে ধর্ষণ বলতে আপত্তি করছেন। এ প্রসঙ্গে অনেকে পার্শ্ববতী দেশ ভারতে্র আদালতে এ সংত্রান্ত কয়েকটি মামলার রায়কে দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করছেন। এ রায়ে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রেমের সম্পর্কে পারস্পরিক সম্মতিতে দৈহিক মিলন হলে সেটা ধর্ষণ হবে না।
বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণের ক্ষেত্রে যে জোরপূর্বক বা বলপ্রয়োগের বিষয় থাকে তা অনুপস্থিত থাকার বিষয়টি সামনে এনে অনেক আইনজীবী এটা ধর্ষণ নয় বলে যুক্তি তুলে ধরার প্রয়াস পাচ্ছেন। তাদের মতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে যখন শারীরিক সম্পর্ক হয় তখন সেটা ধর্ষণ নয়৷ কিন্তু পরে যখন বিয়ের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয় না তখন ধর্ষণ মামলা করা হয়৷ তারা এটিকে ধর্ষণ নয়, প্রতারণা বলে বিবেচনা করতে চান। এবং সে মোতাবেক বিদ্যমান আইনেরও সংশোধন চান।
মানবাধিকার কর্মী ও মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘প্রেমের সম্পর্কে পারস্পরিক সম্মতিতে দৈহিক মিলনের পর বিয়ে করতে অস্বীকৃতি বড় ধরনের প্রতারণা৷ তবে আমার বিবেচনায় এটা ধর্ষণ নয়৷ বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে এই ধরনের প্রতারণার বিচার ও শাস্তির বিধান আছে৷ কিন্তু যেহেতু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে এটা ধর্ষণ, তাই দণ্ডবিধির ওই ধারায় কেউ মামলা করেন না৷ সরাসরি ধর্ষণ মামলা করেন৷
দণ্ডবিধির ৪৯৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো নারীকে প্রতারণামূলকভাবে আইনসম্মত বিবাহিত বলে বিশ্বাস করান, কিন্তু আদৌ ওই বিয়ে আইনসম্মতভাবে না হয় এবং ওই নারীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন, তবে অপরাধী সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে৷

এখানে একটি বিষয় নিয়ে দো’চার কথা বলা দরকার। তা হলো বিয়ের প্রলোভন শুধু প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে হয় না। অন্য ক্ষেত্রেও হয়। এ ক্ষেত্রে এক শ্রেণীর নারীলিপ্সু ব্যক্তি নারীকে নিছক ভোগ বা যৌনশোষণের কুমতলবে তাদের বিশেষ কোনো দুর্বলতা বা অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে তাদের বিয়ের মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে থাকে। এটি আদৌ প্রেমের সম্পর্কের মতো বিষয় নয়। তাই কোনো নারী কারো সঙ্গে যৌনসম্পর্কের সম্মতি দিয়ে থাকলে তা তার কাছ থেকে কিভাবে আদায় করা হয়েছে বা ওই নারী কোন পরিস্থিতিতে সম্মতি দিতে বাধ্য হয়েছেন তা দেখার দায়িত্ব আইনকেই নিতে হবে। এটা ন্যায়বিচারের দাবি।

পরিশেষে একটুখানি মাওলানা মামুনুল হকের প্রসঙ্গে আসা যাক। আমারা এতক্ষণ যে আইনের কথা বললাম তা হলো দেশের প্রচলিত আইন। এ আইনেই রাষ্ট্র বিচার করবে। পরকালে আল্লাহর আদালতের কথা নাইবা বললাম,  জনতার আদালত বলতেও তো একটা কথা আছে। এক্ষেত্রে জনতার আদালত নিশ্চয়ই ইসলামি শরিয়াহ্ মোতাবেক হওয়ার কথা। কেননা তিনি তো আর দেশের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো নন। তিনি দেশে ইসলামি শাসন তথা ইসলামি শরিয়াহ প্রচলনের অন্যতম প্রবক্তা। ইসলাম প্রিয় মানুষের তো তার শাস্তি ইসলামি শরিয়াহ মোতাবেকই চাওয়ার কথা। তাই না? কিম্বা তার নিজেরও তো শরিয়াহর বিধানকেই বেশি পছন্দ করার কথা।  

মামুনুল হক তাকে বিয়ে করেননি- জান্নাতের এ দাবি সত্যি হয়ে থাকলে ইসলামি শরিয়াহ্ মোতাবেক এটাতো সুস্পষ্ট জিনা, বিবাহিত পুরুষ হিসেবে যার শাস্তি পাথর ছুঁড়ে মৃত্যুদণ্ড। এদেশের ইসলামপ্রিয় মানুষ এটাকে কিভাবে নেবেন? পরকালে তার কী বিচার বা শাস্তি হবে? আল্লাহই ভালো জানেন।

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়। )

লেখক : হারুন আল নাসিফ : কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক।

news24bd.tv/আলী