আমি এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি

রাউফুল আলম

আমি এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি

আমি কেন দেশ ছেড়েছিলাম? আগের একটা পোস্টের সূত্রধরে, অনেকেই জিজ্ঞেস করেছে। 

আমি দেশ ছেড়েছিলাম লাঞ্ছনা থেকে বাঁচতে। দেশ ছেড়েছিলাম মানসিক নির্যাতন থেকে বাঁচতে। সামাজিক অনাচার থেকে বাঁচতে। 

আমার এই লাঞ্ছনা ও মানসিক নির্যাতনের জন‍্য আমি দায়ি ছিলাম না। কিন্তু আমাকে শিকার হতে হয়েছে। 

কারণ আমি গ্রামের ছেলে ছিলাম। আমার আব্বা কোন বড় পদের চাকরিজীবী ছিলেন না। তার তেমন অর্থ-কড়ি ছিলো না। তিনি সামান‍্য বেতনের চাকরি করতেন—টেনেটুনে সংসার চলতো। আমারও টাকা-পয়সা ছিলো না। 

আমার কোন উচ্চপদস্থ আত্মীয় ছিলো না। আমার বাবার কোন মুক্তিযোদ্ধা সনদ ছিলো না। কোন রাজনৈতিক লবিং ছিলো না। সবচেয়ে বড়ো কথা, কাউকে ধরে সাঁকো পাড়ি দেয়ার মানসিকতা, জন্মগতভাবেই ছিলো না। —আমি বুঝেছিলাম, এইগুলো আমাদের দেশের জন‍্য একটা যোগ‍্যতা। যদি এগুলো না থাকে, তাহলে আপনাকে পুড়তে হবে। আপনাকে ভুগতে হবে।  

প্রত‍্যেকটা কাজের জন‍্য হেনস্ত হতে হতো। ব‍্যাংক, থানা, হাসপাতাল, ভূমি অফিস, পার্সপোর্ট অফিস, চাকরির ইন্টারিভিউ, টিউশনি—এমন কোন জায়গা নেই যেখানে গিয়ে মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়নি। সামাজিক আরো কতো অনাচার তো ছিলোই! আমি জেদ ধরে ঘুষ দেইনি বলে ছয় মাসেও আমার পাসপোর্টের কাজ হয়নি। ভেরিফিকেশন রিপোর্ট আটকে রেখেছিলো। তারপর আমি এসপি’র কাছে গিয়েও অভিযোগ করেছিলাম। লাভ হয়নি। পরে আমাকে ঘুষ দিয়েই পাসপোর্ট করতে হয়েছে। —এ শুধু একটা উদাহরণ! চাকরির ইন্টারভিউগুলোর অভিজ্ঞতা লিখলে মহাকাব‍্য হবে! 

গতো বারো বছর আমি ইউরোপ এবং আমেরিকায় কাটিয়েছি। তাদের ভাষার সাথে আমার ভাষার মিল নেই। ধর্মের মিল নেই। চেহারার মিল নেই। সংস্কৃতি, আচার, খাবারের মিল নেই। অথচ, অবাক করা বিষয় হলো আমাকে একটি বারও এগুলো নিয়ে চিন্তা করতে হয়নি। কেউ কোনদিন আমার বাবার পরিচয় জানতে চায় নি। ধর্ম জানতে চায়নি। ঘুষ চায়নি। আমি কি টাকাওয়ালা নাকি রাস্তার ফকির—সেটা জিজ্ঞেস করেনি। এমনকি আমার প্রফেসরগণ, যাদের সাথে ছয়-সাত বছর একটানা কাজ করেছি, তারা পর্যন্ত জানতে চায়নি—আমার বাবা কি করে কিংবা আমার ধর্ম কি! 

কোথাও চাকরির ইন্টারভিউ দেয়ার সময় ঘূণাক্ষরেও চিন্তা করিনি, আমার তো লোক নাই। আমার তো টাকা নাই। গত বারো বছরে আমার প্রতিটি কাজের জন‍্য রিওয়ার্ডের পর রিওয়ার্ড এসেছে। আর্থিক হোক, সম্মান হোক কিংবা সনদ হোক! কখনো সেটার জন‍্য কাউকে গিয়ে বলতে হয়নি। কেউ না কেউ আমার ঘাড়ের উপর কাজের মূল‍্যায়ন করছে। আমি একবারও ভাবিনি, আমার কলিগ তো আমেরিকান কিংবা জার্মান কিংবা রাশিয়ান। তারা তো আমাকে বাংলাদেশি বলে উঠতে দিবে না। আমাকে কেউ পেছন থেকে টেনে ধরেনি। কেউ ল‍্যাং মারেনি।  

কাউকে আমার কখনো কেয়ার করতে হয়নি। কোন নেতা, অফিসার, বস—কারো ভয়ে আমাকে চুপ থাকতে হয়নি। তটস্থ থাকতে হয়নি। সহমত, জ্বি স‍্যার করে করে দিন কাটাতে হয়নি। কাউকে উপহার দিয়ে, বাসায় দাওয়াত দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে হয়নি। আমার প্রফেসর, সহকর্মী, বস, ম‍্যানেজার কাউকে এ পর্যন্ত আমি এক টাকার গিফ্ট দেইনি। উল্টো ভেবেছি, উপহার দিলে ওরা মাইন্ড করবে! 

কারো পরিচয় দিয়ে কোন কাজ করতে হয়নি। কে অফিসার, কে উলোট-পালট কর্মকর্তা—কেউ কাউকে কেয়ার করে বসে থাকে না। যে যার কাজ করে যাচ্ছে। ক্ষমতার অপব‍্যবহারকে ওরা শূণ‍্যের কোঠায় রাখার চেষ্টা করে প্রতিনিয়ত। অথচ, দেশে দেখেছি, কোথাকার কোন ওয়ার্ডের নেতা, সে পরিচয়ও গাড়িতে লাগিয়ে রেখেছে। অর্থাৎ, তার জন‍্য রাস্তা ছেড়ে দাঁড়াও! —নোংরা, ইতর! ক্ষমতার এবিউজের দিক দিয়ে, নাম্বার ওয়ান দেশ হলো বাংলাদেশ! একটা সামান‍্য কেরানি যেই ভাব নিয়ে থাকে, মনে হয় ফেরাউন এসেও তাকে নড়াতে পারবে না! 

আমি এমন একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি যেখানে একজন মানুষকে তার জন্ম নিয়ে, জন্মস্থান নিয়ে, জেলা নিয়ে, ধর্ম নিয়ে, গায়ের রং নিয়ে, উচ্চতা নিয়ে, বাপের পরিচয় নিয়ে, বাপের টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না। রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে ভাবতে না হয়। নেতা-ফেতার পরিচয় দিতে হবে না। কেউ যেনো কারো কাছে ক্ষমতা দেখাতে না হয়। নেতা-বস, ওমুক-তুমুকের সাথে সহমত আর চামচামি করে বাঁচতে হবে না। প্রত‍্যেকটা মানুষ একজন নাগরিক হিসেবে তার অধিকারটুকু পাবে। সর্বত্র। থানা, আদালত, অফিস, ব‍্যাংক, অধিদফতর—সব জায়গায়! নেতার কাজ আগে হবে, টাকাওয়ালার কাজ আগে হবে, অফিসার, সেলিব্রেটি, ইউটিউবারের কাজ আগে হবে—এইসব নোংরামি, ইতরামি যেনো না থাকে। 

একজন মানুষ যেনো আত্মপরিচয়ে, কর্ম দিয়ে সবর্ত্র ম‍ূল‍্যায়িত হয়। তাকে যেনো কেউ আর কোনকিছু দিয়ে যাচাই না করে। আমি এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্ন নিয়ে বলে যাই!

(মত ভিন্ন মত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।)

news24bd.tv তৌহিদ

পরবর্তী খবর

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘আঞ্চলিক প্রভাবশালী’ দেশের পথে

ড. মো. আওলাদ হোসেন

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘আঞ্চলিক প্রভাবশালী’ দেশের পথে

বাংলাদেশ যে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে বা হচ্ছে তা আজ বিশ্বের নামীদামি লেখক ও পত্রিকা বলতে শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল সিকিউরিটি কলেজের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ডেভিড ব্রিউস্টার তার এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ তার আঞ্চলিক শক্তি দেখাতে শুরু করেছে’।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হায়েনা বাহিনী কর্তৃক ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে নেতৃত্বদানকারী দেশের বৃহত্তম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর পূর্বক্ষণে ডেভিড ব্রিউস্টারের এই মন্তব্যে আমিসহ আওয়ামী লীগের প্রতিজন কর্মী গর্বিত। 

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভুল দর্শনের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বাঙালি জাতির উপর পশ্চিম পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতন, চরম অবেহলা ও দুঃশাসনে নিষ্পেষিত বাংলার জনগণের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কেএম দাস লেনে অবস্থিত রোজ গার্ডেন প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। পরবতীতে ১৯৫৫ সালের কাউন্সিলে অসাম্প্রদায়িক নীতি গ্রহণের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নাম ধারণ করে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শুধু এ দেশের প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলই নয়, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের এক দশকের স্বৈরশাসন-বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৮-এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রতিরোধ আন্দোলন, ৬৯’র গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০-এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” খ্যাত কালজয়ী ভাষণ ও পরবর্তীতে পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অভ্যুদ্বয় ঘটে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে যখন অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে এগিয়ে নিতে নিবেদিত, ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। ভাগ্যগুণে বেঁচে গেলেন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা-নির্বাসনে থাকলেন বহুদিন। দীর্ঘ ৬ বছরের নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালি জাতির হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এক নবতর সংগ্রামের পথে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথপরিক্রমায় আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা, রাষ্ট্রনায়ক জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে ও সুদক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় সুশাসন, স্থিতিশীল অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, উন্নয়নে গতিশীলতা, ডিজিটাল বাংলাদেশ, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নয়নের ফলে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশকে একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে উন্নীত হয়েছে।

স্বাধীনতার পর আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরী কিসিঞ্জার ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে ব্যঙ্গোক্তি করেছিল। রাষ্ট্রনায়ক জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী ও ভিশনারী নেতৃত্বের যাদুকরি স্পর্শে সে সময়ের ব্যঙ্গোক্তিকে মিথ্যা প্রমাণ করে বাংলাদেশকে বিশ্বের উন্নয়নের ‘রোল মডেল’এ পরিণত করেছেন। খাদ্য সংকটের বাংলাদেশ, খাদ্য ভান্ডারে পরিণত হয়েছে। চলতি মৌসুমেও রেকর্ড পরিমাণ বোরো ধান উৎপাদন হয়েছে, যা গত মৌসুমের তুলনায় ১২ লাখ টন বেশি।

ডেভিড ব্রিউস্টার তার নিবন্ধে আরও লিখেছেন, ‘আজকের বাংলাদেশ ১৬ কোটি মানুষের আত্মবিশ্বাসী একটি জাতি, যাদের রয়েছে রপ্তানিনির্ভর উদীয়মান এক অর্থনীতি, যা গত দুই দশক ধরে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ এর কারণে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এলেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) বলছে, ২০২১ সালে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৮ এবং ২০২২ সালে এটা দাঁড়াবে ৭ দশমিক ২ শতাংশে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২২২৭ মার্কিন ডলার, যা প্রতিবেশী ভারত (১৯৪৭ ডলার) এবং পাকিস্তানের (১৫৪৩ ডলার) চেয়ে ঢের বেশি। স্বাস্থ্য, গড় আয়ু, জন্মহার এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা নির্দেশকগুলোর ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে এগিয়ে আছে‘।

ইউরোপীয় দেশগুলো যখন কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থীদের প্রবেশে বাধাদান করেছে, সেই সময়ে মানবতার কাণ্ডারি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালে মায়ানমারে সেনাবাহিনীর দ্বারা নির্যাতিত ও গণহত্যার শিকার হয়ে নিজভূমি থেকে বিতাড়িত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মুসলমানদের বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়ে, খাদ্য ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে আন্তর্জাতিক সমস্যায় মানবিক ও রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপ নিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অনন্য ভূমিকা রেখেছেন। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ পরিচিত হয়েছে এক ‘মানবতাবাদী দেশ’ হিসেবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ যে মানবিকতা ও মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন, তা ইতিহাসে বিরল। বিশ্ব কূটনীতিতে এটি একটি বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘আমার দেশের ১৬ কোটি মানুষ খেতে পারলে ১০ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমানও খেতে পারবে’। মমতাময়ী মায়ের মত নিজের আঁচলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মুসলমানদের আশ্রয় দেওয়ার কারনেই  ব্রিটিশ মিডিয়া শেখ হাসিনাকে ‘মানবতার মা (Mother of Huminity)’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক পত্রিকা খালিজ টাইমস বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ‘প্রাচ্যের নতুন তারকা’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

আরও পড়ুন


টাঙ্গাইলে লকডাউন উপেক্ষা করে চলছে দূরপাল্লার বাস

আওয়ামী লীগের জন্মদিন আজ

দেশে দমকা হাওয়া ও বজ্র বৃষ্টির আশঙ্কা

শেখ রাসেলের পদাধিকার কর্মকর্তাদের নাম ঘোষণা


২০২০ সালে মহামারী করোনা সংকটকালে ভারতের কাছে ঋণ চেয়েছিল শ্রীলঙ্কা, তাতে প্রত্যাখ্যাত হলে শ্রীলঙ্কার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তামূলক ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কাকে প্রদত্ত ঋণটি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্য কোনো দেশকে দেওয়া প্রথম অর্থনৈতিক সহায়তা। সুদান অর্থ ঋণ সংগ্রহে জামানত দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ না থাকায়, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জামানত হিসেবে ব্যবহার করেছে।

একদা বাংলাদেশ ছিল একটি দরিদ্র সাহায্য প্রার্থী দেশ। বর্তমানে শ্রীলঙ্কাকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের এই ঋণ প্রদান এবং ঋণ সংগ্রহে সুদানকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জামানত হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অর্থনৈতিক সুস্বাস্থ্যের ইঙ্গিত করে। বর্তমানে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সিঙ্গাপুর, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়ার মত বাংলাদেশও ‘Emerging Asian Tiger` হিসেবে খ্যাত। ভারত থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর শ্রীলঙ্কাকে অর্থনৈতিক সহায়তা করা বাংলাদেশের জন্য আঞ্চলিক প্রভাবশালী দেশ হওয়ার পথে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। শুধু শ্রীলঙ্কাকে নয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভক্ষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য এই অঞ্চলে তার ভূমিকায় কেমন প্রভাব ফেলবে তা ভবিতব্যই বলে দিবে, তবে অনেক ‘আন্তর্জাতিক শক্তি’ ঢাকার দৃষ্টি আকর্ষণে লড়ে যাচ্ছেন।
আমরা গর্বিত। জয়তু শেখ হাসিনা।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

আওয়ামী লীগ জন্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও সফলতা-ব্যর্থতা

সোহেল সানি

আওয়ামী লীগ জন্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও সফলতা-ব্যর্থতা

চরমতম এক রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানে একটি দল গঠনের উপায় উদ্ভাবনের প্রচেষ্টায় ব্রত হন। প্রতিকূল পরিবেশের মুখে প্রথমে বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ববাংলাকে বেছে নেয়া হয়। পাকিস্তান প্রস্তাবক হলেও স্বাধীন বাংলার স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পাকিস্তানের নবাগত শাসকগোষ্ঠী আড়চোখে দেখতে থাকে।

পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনেই সোহরাওয়ার্দী ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাভাবনা থেকে মুসলিম লীগের নাম জাতীয়তাবাদী লীগ নামকরণের দাবি জানিয়ে গণপরিষদের সদস্য পদ হারান। তাঁকে ভারতের লেলিয়ে দেয়া কুকুর বলে অভিহিত করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান। তাঁর নির্দেশে মুসলিম লীগের দরজা বাঙালিদের জন্য বন্ধ করে দেন সভাপতি খলীকুজ্জমান চৌধুরী। করাচী হতে স্টিমারযোগে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ববাংলা রওয়ানা হলে তার গতিরোধ করা হয় নারায়ণগঞ্জে। বাংলার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকে মানহানিকর অবস্থায় ফিরে যেতে হয় করাচীতে।

অথচ, সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের নেতৃত্বাধীন বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ভারতের প্রদেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলায় নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছিল। আর সেই জয়ে পূর্ববাংলাই ছিল মুখ্য ভূমিকায়। যে খাজা নাজিমুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীকে পূর্ববাংলায় নিষিদ্ধ করলো, সেই নাজিমুদ্দিন গণপরিষদের সদস্য হন সোহরাওয়ার্দীর ছেড়ে দেয়া কলকাতার একটি আসনের উপ-নির্বাচনে। 
যাহোক, ১৯৪৯ সালের ৯ জুন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ববাংলা আসেন। তিনি পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের অস্থায়ী আহ্বায়ক দবিরুল ইসলামের হেবিয়াস কপার্স মামলা পরিচালনার জন্যই এসেছিলেন। তিনি তাঁর একান্ত অনুগামী শওকত আলীর পরামর্শে ক্যাপ্টেন শাহজাহানের পুরানো ঢাকায় "নূরজাহান বিল্ডিং" এসে ওঠেন। পুরান ঢাকার ১৫০ মোগলটুলীর মুসলিম লীগের নবীন কর্মীরা ক্ষমতাসীন দলের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলেন। যারা ছিলেন নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এরা আগেই সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে ইতোপূর্বে টাঙ্গাইলে ফিরে আসা আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ওই বাসাতেই সোহরাওয়ার্দী  মওলানা ভাসানীর সঙ্গে দল গঠন নিয়ে  আলাপ-আলোচনা করেন সোহরাওয়ার্দী। মওলানা ভাসানী আসামের ধুবড়ী জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আগেই ঢাকা এসে আলী আমজাদ খানের বাসায় উঠেছিলেন। বৈঠকের আলোচনায় কর্মী সম্মেলনের বিষয়ে কতিপয় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।  

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স এর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাখাওয়াত হোসেন, কুষ্টিয়ার শামসুদ্দীন আহমেদ, ঢাকার শওকত আলী, আলী আমজাদ খান, খন্দকার আব্দুল হামিদ ও ইয়ার মোহাম্মদ খান এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে প্রস্তুতি কমিটি গঠন নিয়ে শুরুতেই বিরোধ দেখা দেয়। আলী আমজাদ খান আহ্বায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ খান সম্পাদক করা হলে শওকত আলী ও খন্দকার আব্দুল হামিদ কমিটির বিরোধিতা করেন। পরে মওলানা ভাসানীকে আহ্বায়ক ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে সম্পাদক করে প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হয়। 

বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের রহমতগঞ্জ ইনস্টিটিউটে মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরে পাইকপাড়ায়ও ব্যর্থ হয়। উদ্যোক্তারা হতাশ হয়ে ফিরে আসেন ঢাকায়। ঢাকায় কোন স্থানেই সম্মেলন করার অনুমতি মিলছিল না। যাহোক এসব খবর শুনে ঢাকা মিউনিসিপাল করপোরেশনের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান কাজী বশীর হুমায়ুন তাঁর বিখ্যাত রোজগার্ডেনে সম্মেলন অনুষ্ঠানের স্থান নির্ধারণ করে দেন। সরকারি বাধা নিষেধের আড়ালে সম্মেলনের দু'দিন আগেই রাতের আঁধারে গায়ে কম্বল জড়িয়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে মওলানা ভাসানী হাজির হন রোজগার্ডেনে। এ কাজে সহায়তা করেন শওকত আলী।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন বিকাল তিনটায় একেক করে লোকজন আসতে শুরু করে। তিন শত কর্মীর ওই সম্মেলন চললো গভীর রাত পর্যন্ত। নিখিল ভারত মুসলিম লীগের এককালীন বহিষ্কৃত সভাপতি ও  অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক সম্মেলনে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি নতুন দল গঠনকে স্বাগত জানিয়ে কয়েক মিনিট বক্তৃতা করে চলে যান।

"ইসলামের দৃষ্টিতে আল্লাহ কেবল মুসলমানের নয়, জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সমগ্র মানবের।......  মানবতার চূড়ান্ত মুক্তিসংগ্রাম যাতে বিলম্বিত না হয়, সেজন্য জনতাকে তাহাদের সমস্ত ব্যক্তিগত এবং দলগত বিভেদ বিসর্জন দিয়া এক কাতারে সমবেত হইতেই মুসলিম লীগ কর্মী-সম্মেলন আহবান জানাইতেছে।"

১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুনের ঢাকার স্বামীবাগের বিখ্যাত রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কর্মী সম্মেলন থেকে পূর্বপাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে একটি দল গঠনের ঘোষণা দেয়া হলে উপস্থিত সবাই মুহুর্মুহু করতালি দিয়ে স্বাগত জানায়। টাঙ্গাইল দক্ষিণ আসনের উপনির্বাচনে বিজয়ী আইন পরিষদ সদস্য শামসুল হক "মূল দাবি" নামে যে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন, মূলত তাতেই উপরোক্ত দাবিগুলো উত্থাপিত হয়। 

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে কর্মী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা রাগীব আহসানের কণ্ঠে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত পরিবেশিত হয়। নেপথ্যে দল গঠনের অন্যতম সংগঠক পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে থাকায় তাঁর উপস্থিতি সম্ভব ছিল না। তিনি কারাবন্দী অবস্থায় দল গঠনে স্বাগত জানান। সম্মেলনে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান খান, শিল্পপতি সাখাওয়াত হোসেন, অ্যাডভোকেট আলী আমজাদ খান, আলী আহমেদ খান ও আব্দুস সালাম খান সহ-সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক, শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমেদকে যুগ্ম সম্পাদক, এ কে রফিকুল হোসেনকে যুগ্ম-সম্পাদক ও ইয়ার মোহাম্মদ খানকে কোষাধ্যক্ষ নির্বাচিত করা হয়।

১৯৪৯ সালের ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নবাবজাদা লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসলে আওয়ামী লীগ খাদ্য সংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। আরমানী টোলা ময়দান থেকে সমাবেশ করে একটি জঙ্গি মিছিল গভর্নর হাউজ অভিমুখে যাত্রা করলে পথিমধ্যে পুলিশ গতিরোধ করে। মওলানা ভাসানী, শামসুল হকসহ অধিকাংশ নেতা গ্রেফতার হয়ে যান।

পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে শেখ মুজিব করাচীতে নেতা সোহরাওয়ার্দীর কাছে চলে গেলেও এসেই আবার গ্রেফতার হন। '৫০ সালে ছাড়া পেয়ে ৯০ নবাবপুর একটা রুমে দুইটা টুল একটা টেবিল, দুইটা চেয়ার নিয়ে অফিস খুলে বসেন। ওখানে দলে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। ভবঘুরে মোহাম্মদউল্লাহ (পরে রাষ্ট্রপতি) কাজ চাইলে শেখ মুজিব তাকে দপ্তর সম্পাদক করেন। 

যাহোক ছাত্রলীগই কার্যত আওয়ামী লীগের মাতৃসংগঠন। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শাসকরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে পূর্ব বাংলার মানুষকে কোণঠাসা করে রাখার কারণে পুঞ্জীভূত হওয়া ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ এই দল।

এই দল আত্মপ্রকাশ করে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। মার্চে করাচী নগরীতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তার পুরনো কর্মীদের এক সমাবেশে স্বতন্ত্র একটি রাজনৈতিক দল গঠন করবেন বলে ঘোষণা দেন। এ সময় আসাম মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী দলত্যাগ করে ঢাকায় আসেন। পরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক রাজনৈতিক কর্মী সম্মেলনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীকে সভাপতি ও ‘টাঙ্গাইলের শামসুল হক’ নামে খ্যাত শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। পাকিস্তানি শাসকবর্গ এবং মুসলিম লীগ নতুন দলটির আবির্ভাবে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। তারা সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীকে ‘ভারতীয় চর’ বলে প্রচার চালিয়ে বাঙালিদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায়। কিন্তু আওয়ামী মুসলিম লীগের ৪০ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি দলকে দ্রুত একটি শক্তিমান সংগঠনে পরিণত করতে থাকে।

নতুন দলটির অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকার (যার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নুরুল আমিন ও সে সময় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিন) সন্ত্রাস, গোলযোগ সৃষ্টি এবং দমন-নিপীড়ন চালাতে থাকে। তারা আইনের অপপ্রয়োগ ঘটিয়ে নতুন দলের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। তবুও দলটি বিকশিত হতেই থাকে। প্রতিরোধের মুখে পড়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ সংগ্রামী দল হিসেবে আরও দ্রুত বিকাশ লাভ করতে থাকে। চলতে থাকে তাদের গণমুখী আন্দোলন-সংগ্রাম।

মওলানা ভাসানী ও শামসুল হককে ১৯৪৯ সালের ১৪ অক্টোবর এবং শেখ মুজিবকে ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সর্বপর্যায়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কিত বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরে। শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার স্বীকৃতিসহ বিভিন্ন দাবিতে কারাগারের ভিতর অনশন শুরু করেন। এতে আন্দোলন হয়ে ওঠে আরও বেগবান। একই বছর পুনরায় ভাসানী ও শামসুল হক গ্রেফতার হন। কারাগারে শামসুল হকের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হলে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

প্রথম কাউন্সিল: ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠাকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের ঘোষণায় আত্মনিয়ন্ত্রণের পূর্ণ অধিকারসহ পূর্ব বাংলার জন্য লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান, বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ, কৃষকদের মধ্যে কৃষি জমির বণ্টন, তে-ভাগা নীতির বাস্তবায়ন, রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে সমবায় ও যৌথ কৃষি ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা এবং সব দেশি ও বিদেশি মৌলিক শিল্পকে রাষ্ট্রায়ত্তকরণের দাবি জানানো হয়। পাকিস্তানকে সাম্রাজ্যবাদ ও বিদেশি প্রভাবমুক্ত একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করার অঙ্গীকারও ছিল এ ঘোষণায়।

১৯৫৩ সালের ১৪-১৫ নভেম্বর ময়মনসিংহ শহরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিলে পূর্ব-বাংলার আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার লক্ষ্যে অন্য দলগুলো নিয়ে নির্বাচনী জোট গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের আলোকে ৪ ডিসেম্বর আওয়ামী মুসলিম লীগ শেরেবাংলা ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টির সঙ্গে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে।

পরে এই ফ্রন্টে আরও যুক্ত হয় গণতন্ত্রী দল, কমিউনিস্ট পার্টি, নেজামে ইসলাম ও খেলাফতে রব্বানী পার্টি। যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ঘোষণায় পূর্ববাংলায় পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দাবি আদায়ের কথা বলা হয়। ১৯৫৪ সালের ১০ মার্চ অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৭টি আসনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। এর মধ্যে ১৪৩টি আসন পায় আওয়ামী মুসলিম লীগ। কৃষক-শ্রমিক পার্টি লাভ করে ৪৮টি আসন। মুসলিম লীগ মাত্র ১০টি আসন পায়। 

একই বছরে ৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তানে গঠিত হয় ফজলুল হক মন্ত্রীসভা। আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রথমে এতে যোগ না দিলেও পরে আবুল মনসুর আহমেদ, আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমানকে মন্ত্রী করা হয়। যুক্তফ্রন্ট তথা আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্য এই নির্বাচনী বিজয় যুগান্তকারী ঘটনা হলেও পরবর্তীতে ফ্রন্ট ও দলের মধ্যে বিশৃঙ্খলার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়।

কেন্দ্রীয় সরকার এই সুযোগে ৯২-ক ধারা প্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক তৎপরতাও নিষিদ্ধ করা হয়। প্রায় দেড় হাজার নেতা-কর্মীকে রাতের অন্ধকারে গ্রেফতার করে জেলে নিক্ষেপ করা হয়।

দ্বিতীয় কাউন্সিল: মওলানা ভাসানী ১৯৫৫ সালের ১৭ জুন পল্টন ময়দানের সমাবেশ এবং ২৩ জুন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে পূর্ব বাংলায় পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনসহ আগের দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। দলের হৃতমর্যাদা পুনরুদ্ধার  শক্তিশালী সাংগঠনিক বিস্তৃতির জন্য ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর (১৯৫৫) ঢাকার রোজ গার্ডেনে অনুষ্ঠিত দলের কাউন্সিল অধিবেশনে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, শেখ মুজিবকে সাধারণ সম্পাদক ও অলি আহাদকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে নতুন ওয়ার্কিং কমিটি গঠিত হয়।

এ অধিবেশনেই দলকে অসাম্প্রদায়িক মর্যাদা দেওয়ার জন্য ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে নামকরণ হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’। আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের মন্ত্রিসভা বাতিলের দাবিতে ১৯৫৬ সালের ১৩ আগস্ট প্রস্তাব তোলে। প্রাদেশিক পরিষদের ২৯৭ সদস্যের মধ্যে ২০০ জন এতে স্বাক্ষর দেন। বাধ্য হয়ে আবু হোসেন সরকার ১৯৫৬ সালের ৩০ আগস্ট পদত্যাগ করেন। এরপর আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ৬ সেপ্টেম্বর।

এর মাত্র কয়েকদিন পর ১২ সেপ্টেম্বর চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার পতন ঘটে। ১৯৫৫ সালের ১১ আগস্ট চৌধুরী মোহাম্মদ আলী কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন। কেন্দ্রে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ১২ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় আওয়ামী লীগ ও রিপাবলিকান পার্টির কোয়ালিশন সরকার। বৈদেশিক সিয়াটো চুক্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানীর মধ্যে।

প্রসঙ্গত: সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীর দ্বন্দ্বের আগে যুক্তফ্রন্টের দ্বন্দ্ব ও কোন্দল পাকিস্তানের রাজনীতিকে টালমাটাল করে দিয়েছিল। যুক্তফ্রন্ট গঠনের আগেই সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, পূর্বপাকিস্তান আইন পরিষদের নেতা হবেন কৃষক-শ্রমিক পার্টি নেতা শেরেবাংলা একে ফজলুল হক এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নেতা হবেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী টাঙ্গাইল দক্ষিণ আসনের নির্বাচনে জমিদার খুররম খানের বিরুদ্ধে  বিজয়ী হয়েও অকৃতকার্য হওয়ার পরই ঘোষণা করেছিলেন তিনি কোনদিন নির্বাচন করবেন না। সে কথা তিনি রেখেছিলেন। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৩ টি আসন পেলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ৪৩ আসন পাওয়া কৃষক শ্রমিক পার্টির শেরেবাংলাকেই মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে সরকার গঠনের সুযোগ দেন সোহরাওয়ার্দী-ভাসানী নেতৃত্ব। 

কিন্তু বিস্ময়করভাবে শেরেবাংলা তার দলের পাঁচজনকে নিয়েই মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে আওয়ামী লীগ। ১৫ দিনের মাথায় শেরেবাংলা আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমদ, আব্দুস সালাম খান, খয়রাত হোসেন ও শেখ মুজিবুর রহমানকে মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত করেন। আর সেই সময় পাকিস্তানী চক্রান্তে আদমজীতে লাগানো হয় দাঙ্গা। বিহারী-বাঙালী দাঙ্গা। বহু প্রাণ ঝরে পড়ে ওই দাঙ্গায়। মুহূর্তে কেন্দ্রীয় সরকার মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ৯২- ক ধারা জারি করে শাসন ক্ষমতা কেন্দ্রের অধীনে নেয়া হয়। পাকিস্তানের প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে গা দেন বাঙালী নেতারাও। শেরেবাংলা পূর্বপাকিস্তানের গর্ভনর হয়ে কৃষক-শ্রমিক পাটি ও আওয়ামী লীগকে দিয়েই মন্ত্রিসভা গঠন করেন।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক  শেখ মুজিব আইন পরিষদে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। তাতে সরকারের পতন ঘটে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে আওয়ামী লীগ। মুখ্যমন্ত্রী হন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আতাউর রহমান খান। আবুল মনসুর আহমদ, আব্দুস সালাম খান, খয়রাত হোসেন, হাশিমুদ্দিন আহমেদ, কংগ্রেস দলের মনোরঞ্জন ধর, গণতন্ত্রী দলের মাহমুদ আলী মন্ত্রিসভায় স্থান পান। 

বেশ কয়েকবার মন্ত্রিসভার পতন ঘটে। একবার আওয়ামী লীগ আরেকবার কৃষক-শ্রমিক পার্টি। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের ২৩ জন আইন পরিষদ সদস্য শেরেবাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টিতে যোগদান করে মন্ত্রিত্বসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু পাদগ্রহণ করে আবু হোসেন সরকারকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করে। শেরেবাংলার সরকারে যোগ দিয়ে এর মধ্যে হাশিমুদ্দিন মন্ত্রী হন, খন্দকার মোশতাক আহমেদ চিফ হুইপ  এবং খালেক নেওয়াজ খান হুইপ হন। 

সর্বশেষ আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে যখন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় তখন সারা পাকিস্তানেও আওয়ামী লীগ প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে ক্ষমতায়। ডাঃ খান সাহেবের  রিপাবলিকান পার্টি কেন্দ্রীয় সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট তখন ইস্কান্দার মির্জা। গভর্নর জেনারেল  গোলাম মোহাম্মদ কর্তৃক খাজা নাজিমুদ্দিনের পতনের পর বাঙালি  মোহাম্মদ আলী, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, ফিরোজ খান নুন ও আই আই চুন্দ্রিগর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীত্ব করেন। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী ১৩ মাসের অধিক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। সোহরাওয়ার্দী ও ভাসানী বিরোধ এ সময় চরমে পৌঁছে বৈদেশিক নীতি নিয়ে। ভাসানী সিয়াটো চুক্তি মানছিলেন না। দলের নেতৃত্বেও শেখ মুজিবুর রহমানের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ে তাঁর অনুসারীরা ভাসানীকে উস্কে দিচ্ছিলেন। সাধারণ সম্পাদক পদে অলি আহাদ উঠে আসার জন্য বিশেষভাবে কলকাঠি নাড়ছিলেন।

এক পর্যায়ে ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে অলি আহাদ প্রশ্ন তুলেন যে, গঠনতন্ত্রে স্পষ্টত বলা রয়েছে যারা মন্ত্রী হবেন তারা কেউ দলীয় পদে থাকবেন না। মূলত, শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল। ধারনা করা হচ্ছিল যে মন্ত্রিত্ব রেখে শেখ মুজিব সাধারণ সম্পাদক পদ ছেড়ে দেবেন, কিন্তু সে ধারণার মৃত্যু ঘটে সঙ্গে সঙ্গেই শেখ মুজিব মন্ত্রী পদে ইস্তফা দেয়ায়। এরপরই শুরু হয় নতুন চক্রান্ত। 

প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর এক ইউনিট ফর্মুলা ও সিয়াটো চুক্তি নিয়ে আওয়ামী লীগে চরম বিরোধ দেখা দেয়। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক ওসমানী পদত্যাগ করেন। প্রকৃতঅর্থে সোহরাওয়ার্দী-ভাসানী বিরোধের প্রথম সূত্রপাত ঘটে '৫৫ সালে যখন দলকে না জানিয়ে সোহরাওয়ার্দী মোহাম্মদ আলীর আইনমন্ত্রী হিসাবে যোগদান করেন। 

শুধু তিনিই নন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে যোগ দেন শেরেবাংলাও। করাচীতে সাংবাদিকরা নবনিযুক্ত আইনমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীকে প্রশ্ন করেন যে, মন্ত্রীত্বগ্রহণ আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র ও মেনিফেস্টো পরিপন্থী কিনা? সোহরাওয়ার্দী গর্জে উঠে বলেন, "আওয়ামী লীগ আবার কি, আমিই আওয়ামী লীগ, আমিই মেনিফেস্টো আমিই গঠনতন্ত্র।" আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে এনিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হলেও সোহরাওয়ার্দীর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে কোন নেতা টু-টা শব্দটি উচ্চারণ না করলেও দলীয় নেতৃত্বে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। 

কাউন্সিলে সিয়াটো চুক্তি বিপক্ষে ভোটদানের ব্যবস্থা করা হলে সোহরাওয়ার্দীর পক্ষে পড়ে ৫০০ ভোট, অপরদিকে ৩৫ টি ভোট পড়ে চুক্তির বিরুদ্ধে। এমন পরিস্থিতিতে সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ পদত্যাগ করে বসেন। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বরাবরে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রটি শেখ মুজিবুর রহমানকে দিতে বলা হয়। অলি আহাদ সাধারণ সম্পাদককে না দিয়ে সংবাদ অফিসে চলে যান। জহুর হোসেন চৌধুরীর হাতে তুলে দেন পদত্যাগপত্রটি। যা পরের দিন প্রকাশিত হলে আওয়ামী লীগে অলি আহাদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। বৈঠকে অলি আহাদকে বহিষ্কার করা হয়।

"৫৩ সালে আব্দুর রহমান বহিষ্কার হলে অলি আহাদ প্রচার সম্পাদক হন। '৫৫ সালের কাউন্সিলে কোরবান আলীর স্থলে অলি আহাদ সাংগঠনিক হন। অলির পক্ষে  ১১ জন নেতা পদত্যাগ করেন। আইন পরিষদের এসব নেতা  সদস্য হলেন শ্রম সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদ, মহিলা সম্পাদিকা সেলিনা বানু, ছাত্রলীগের প্রথম সভাপতি দবিরুল ইসলাম, প্রথম সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান অন্যতম। আওয়ামী লীগ ভাসানীর পদত্যাগ পদ ফিরিয়ে দিয়ে কাউন্সিল ডেকে আবারও সভাপতি করে।

১৬ জুন অসুস্থ ভাসানী হাসপাতাল থেকে এক বিবৃতিতে প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেন। ১৭ জুন অপর এক বিবৃতিতে ২৫ ও ২৬ জুলাই তিনি ঢাকায় নিখিল পাকিস্তান ‘গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন’ ডাকেন। দলের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব ১৩ জুলাই বিবৃতিতে এই সম্মেলনে আওয়ামী লীগ কর্মীদের যোগদান না করার আহ্বান জানান।  ২৫ জুলাই গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। কেন্দ্র ও প্রদেশের সভাপতি হন ভাসানী এবং কেন্দ্রে সাধারণ সম্পাদক করা হয় মাহমুদুল হক ওসমানীকে। প্রদেশে সাধারণ সম্পাদক হন মাহমুদ আলী। 

এরপর আইন পরিষদ অধিবেশনে ঘটে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী হত্যা।  স্বভাবতই আসে সামরিক শাসন। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জাকে হটিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সেনাপ্রধান জেনারেল আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করেন। সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন তিনি। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে নিক্ষেপ করা হয় কারাগারে। 

আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন : সামরিক শাসন প্রত্যাহারের আগে ১৯৬২ সালের ১ মার্চ জেনারেল আইয়ুব খান একটি শাসনতন্ত্র প্রবর্তন করেন, যার মধ্যে গণতন্ত্রের লেশমাত্রও ছিল না। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠা এবং এই প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করার জন্য উভয় প্রদেশে ৪০ হাজার করে ‘মৌলিক গণতন্ত্রী’ নির্বাচনের বিধান ছিল এই শাসনতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য। 

আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমান এবং নূরুল আমীনের মতো মুসলিম লীগ নেতাও আইয়ুবের প্রবর্তিত এই শাসনতন্ত্র বাতিল করে নতুন একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়নের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্বের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিলেন (নয় নেতার বিবৃতি, ২৫ জুন ১৯৬২)।

১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর বৈরুতে গণতন্ত্রের মানুষ পুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর রহস্যময় মৃত্যু ঘটে। এরপর আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খান ও আবুল মনসুর আহমদসহ দলের প্রবীণ নেতারা  বিরোধিতা করেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশের সভাপতিত্বে শেখ মুজিবের বাসভবনে অনুষ্ঠিত এক প্রতিনিধি সভায় আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ৬ মার্চ প্রায় এক হাজার প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে মাওলানা তর্কবাগীশকে সভাপতি ও শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। 

ঐতিহাসিক ছয় দফা : ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর জাতীয় কনভেনশনে শেখ মুজিব তার ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। এতে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানানো হয়। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছয় দফাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচি’ বলে আখ্যায়িত করে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান বলেন, ‘শেখ মুজিবের এসব দাবি অস্ত্রের ভাষায় মোকাবিলা করতে হবে। ’

শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালের ১ মার্চ ঢাকার হোটেল ইডেনে আহ্বান করেন সামরিক শাসনোত্তর দলের বৃহত্তম কাউন্সিল অধিবেশন। প্রায় পনেরোশ’ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে এই অধিবেশনেই ‘বাঙালির বাঁচার দাবি’ হিসেবে ছয় দফা কর্মসূচিকে গ্রহণ করা হয়। এ কাউন্সিলে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। কাউন্সিল অধিবেশনের পর শেখ মুজিবসহ কেন্দ্রীয় নেতারা পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ছয় দফার প্রচারণায় নেমে পড়েন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেয়া হয়।

শেখ মুজিবুর রহমানকে দেশদ্রোহী সাব্যস্ত করার জন্য সামরিক ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়। গর্জে ওঠে ছাত্রজনতা। ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় উনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থান। পতন ঘটে আইয়ুব খানের। কারাগার হতে মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন শেখ মুজিব। ছাত্রজনতার পক্ষ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে "বঙ্গবন্ধু" উপাধিতে ভূষিত করেন।

জেনারেল ইয়াহিয়া খান বসেন প্রেসিডেন্টের গদিতে। অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। যে নির্বাচনে ছয় দফার পক্ষে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। জাতীয় পরিষদের ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসন লাভ করে আওয়ামী লীগ। ফলাফলের পর শুরু হয় ষড়যন্ত্র। জাতীয় পরিষদে মাত্র ৮৮টি আসন লাভকারী পিপলস পার্টির জুলফিকার আলি ভুট্টোর ষড়যন্ত্রের মূল হোতা। 
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে সাংবাদিকদের কাছে শেখ মুজিব পাকিস্তানের ভাবি প্রধানমন্ত্রী বলে অভিহিত করে গেলেও পাকিস্তানে গিয়ে ওয়াদা ভঙ্গ করেন। "৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান  ৩ মার্চের অনুষ্ঠিতব্য অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে ফুঁসে উঠে পূর্বপাকিস্তান। ২ মার্চ ছাত্রলীগের সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে ডাকসু ভিপি আসম আব্দুর রব স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। 

৩ মার্চ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা করেন। ডাকসু কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে 'জাতির পিতা" হিসেবেও অভিহিত করা হয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু গ্রেফতারের প্রাক্কালে বাংলাদেশ স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণা ২৬ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বার্তা প্রেরক হিসাবে এম হান্নান এবং ২৭ মার্চ মেজর জিয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা করেন। ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব হাতে নেয় মুক্তিযুদ্ধের।

যে সরকার রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, অর্থ মন্ত্রী এম মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এএইচএম কামরুজ্জামান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদকে নিয়ে গঠিত হয়। চিফ হুইপ অধ্যাপক ইউসুফ আলী, হুইপ আব্দুল মান্নান ও ব্যারিস্টার আমির উল ইসলাম। মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানী বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করে সেক্টর কমান্ডার নিয়োগ করেন।

এছাড়াও শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত হয় মুজিব বাহিনী ( বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স- বিএলএফ) নূরে আলম সিদ্দিকী, আসম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখনের নেতৃত্ব ছিল স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। নয় মাসের যুদ্ধে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় তা অর্জিত হয় তা বঙ্গবন্ধুর নামে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে। "৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন রাষ্ট্রপতি হিসেবে। কিন্তু ১২ জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করে দেশে সংসদীয় শাসন পদ্ধতি প্রবর্তন করেন।

বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিল করেন- '৭২ সালে। বঙ্গবন্ধু সভাপতি হয়ে সাধারণ সম্পাদক করেন জিল্লুর রহমানকে। '৭৪ সালের কাউন্সিল করে বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ছেড়ে দেন। এইচ এম কামরুজ্জামানকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক করেন।

এরপর বাকশাল প্রতিষ্ঠার কথা আগেই তুলে ধরেছি। রাষ্ট্রপতি সায়েম কর্তৃক ঘোষিত রাজনৈতিক দলবিধি আইনের আওতায় ১৯৭৭ সালের ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হয়। রাষ্ট্রপতি সায়েম প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক  হলেও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছিলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, প্রচার সম্পাদক সরদার আমজাদ হোসেন প্রমুখ নেতা কারাগারে বন্দী থাকায় সরকারের কাছে রাজনৈতিক দলবিধি আইনের আওতায় দলের অনুমোদনের জন্য আবেদন পত্র যাবে কার নামে? সেই প্রশ্ন দেয়। সভাপতি এএইচএম কামরুজ্জামান নিহত হওয়ায় ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন মহিউদ্দিন আহমেদ। মহিলা সম্পাদিকা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আইন মন্ত্রণালয় বরাবরে রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করেন। 

কিন্তু দলীয় মেনিফেস্টোতে বঙ্গবন্ধুর নাম থাকায় তা অগ্রাহ্য করা হয়। ফলে বৈঠকে বসে আওয়ামী লীগ সিদ্ধান্ত নিতে হয় নতুন মেনিফেস্টো ছাপাবার। পীড়াদায়ক হলেও সেদিন আওয়ামী লীগকে "বঙ্গবন্ধুর" নাম বাদ দিয়েই মেনিফেস্টো ছাপিয়ে পুনরায় আবেদন করতে হয়। আইন মন্ত্রণালয় থেকে ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগকে দল হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়। মিজানুর রহমান চৌধুরীর বাড়ির ছাদে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে আওয়ামী লীগ পুনর্জীবনের বৈঠক করা হয়। 

সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ও মিজানুর রহমান চৌধুরী যৌথভাবে দলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন। কাউন্সিলে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহবায়ক করা হলেও ১৯৭৮ সালে আবার কাউন্সিল করা হয়। এতে সভাপতি হন আবদুল মালেক উকিল ও সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক। মিজানুর রহমান চৌধুরী ও অধ্যাপক ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পাল্টা কমিটি গঠিত হয়। ফলে আওয়ামী লীগ (মালেক) ও আওয়ামী লীগ (মিজান) আত্মপ্রকাশ করে।

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ভাষ্যমতে, তাঁকে স্বদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আওয়ামী যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ভূমিকাই প্রথম। আওয়ামী যুবলীগের যখন চেয়ারম্যান আমির হোসেন আমু এবং ছাত্রলীগের সভাপতি যখন ওবায়দুল কাদের। গত ১৭ মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই একথা বলেন।

১৯৮১ সালের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা সভাপতি ও আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৩ সালে আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগে ভাঙন দেখা দিলে তাঁকেসহ বেশকিছু নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। মহিউদ্দিন আহমেদ ও আব্দুর রাজ্জাক মিলে আবার বাকশাল পুনর্জীবন করেন। আবদুর রাজ্জাক বহিষ্কার হলে  যুগ্ম-সম্পাদক সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৮৭ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনা ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে পুনর্নির্বাচিত করা হয়। ১৯৯২ সালের কাউন্সিলে সভাপতি পদে শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক পদে জিল্লুর রহমানকে নির্বাচিত হন।

১৯৯৭ সালের কাউন্সিলেও শেখ হাসিনাকে সভাপতি ও জিল্লুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ২০০২ সালের ২৬ ডিসেম্বর পল্টন ময়দানের কাউন্সিলে শেখ হাসিনা ও আবদুল জলিল এবং ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই কাউন্সিলে সভাপতি পদে শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নির্বাচিত হন। 

২০১৩ সালের কাউন্সিলেও এ দুজনই যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। পরের দুটি কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভাপতি ও ওবায়দুল কাদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এরই মধ্যে মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় আগামী ত্রিবার্ষিক কাউন্সিল নিয়েও তোরজোড় শুরু হয়েছে। দীর্ঘ সংগ্রাম করে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয় এবং সেটা ২১ বছর পর।

২০০১ সালে বিএনপি জামাত জোট সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে চরম আন্দোলন করতে গিয়ে শেখ হাসিনাকে চরম নির্যাতন নিপীড়ন ভোগ করতে হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা করা হয়েছে। অলৌকিকভাবে তিনি বেঁচে গেলেও আইভি রহমান, মোশতাক আহমেদ সেন্টুসহ ২৪ জন নিহত হয়। ২৯ বার বিভিন্ন হামলায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা ওয়ান ইলেভেন সরকারের রোষানলে পড়ে দুবছর কারাবন্দী ছিলেন। 

২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দলগতভাবেই টু-থার্ট মেজরিটি নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। ২০০৯ সাল থেকে  তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত। তাঁর সুদক্ষ নেতৃত্বের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এখন  বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল বলে অভিহিত করছেন। তাঁর শাসনামলে বিচার হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের। ফাঁসিতে ঝুলেছে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রনায়কের মুখে। 

আওয়ামী লীগের জন্মদিনে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আর এদিনে স্মরণ করছি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।  

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, কলামিস্ট ও ইতিহাস বিশেষজ্ঞ।

পরবর্তী খবর

অস্তমিত সূর্যোদয়ের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

গুলশাহানা ঊর্মি

অস্তমিত সূর্যোদয়ের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন নবাবের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শেষ স্বাধীন সূর্য অস্তমিত হয়। এরপর বাংলার আকাশে স্বাধীন সূর্য উদয়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ২০০ বছরের বেশি সময়। কাকতালীয়ভাবে সেই ঐতিহাসকি ২৩ জুন তারিখেই এ উপমহাদেশে জন্মলাভ করে একটি রাজনৈতিক দল, পরবর্তীতে সেই দলের নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং নয় মাস মরণপণ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ২০০ বছরের বেশি সময় পরে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সূর্য উদিত হয়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ দেশের বৃহত্তম, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয় এবং দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। ভৌগলিক সীমারেখাগত বিস্তর দূরত্ব থাকার পরও আমাদেরকে পাকিস্তানের সাথে বেঁধে দেওয়া হয়। ফলে জন্ম হয় পাকিস্তানের দুইটি অংশ- ‘পুর্ব পাকিস্তান’ ও ‘পশ্চিম পাকিস্তান’ এর। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতেই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালি জাতির উপর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নির্যাতন, চরম অবহেলা ও দুঃশাসনে নিষ্পেষণের স্ট্রিম রোলার চলতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকের রক্তচক্ষুকে রুখে দাঁড়ানোর প্রয়াসে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ। প্রতিষ্ঠাকালীন এই সংগঠনের  নাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ২৩ ও ২৪ জুন ঢাকায় ঐতিহাসিক ‘রোজ গার্ডেন’ এ জননেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী মুসলিম লীগের প্রগতিশীল কর্মীদের নিয়ে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে পাকিস্তানের প্রথম বিরোধীদলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। প্রতিষ্ঠাকালে মাওলানা ভাসানী সভাপতি ও শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং জেলে থাকা অবস্থায় যুগ্ম-সম্পাদক নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ শুধু এ দেশের বৃহত্তম, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠনই নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির মূলধারাও। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ একসূত্রে গাঁথা। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে সুদৃঢ় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন সমাপ্ত হয় ১৯৫২ সালে। যা পৃথিবীর ইতিহাসে ‘ভাষা আন্দোলন’ নামে সম্মানের সাথে স্বীকৃত। তরুণ সংগ্রামী জননেতা শেখ মুজিব সেই সময়ে কারান্তরীণ অনশনে থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রেরণাদাতার ভূমিকা পালন করেন। ভাষা আন্দোলনের মহান বিজয়ের পরে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় হয়।

তারপরও পশ্চিম পাকিস্তানি বর্বর-কুচক্রীমহল আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব থেকে দূরে রাখে। নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়ে ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার মাধ্যমে পূর্ব বাংলায় নিশ্চিত হয় মুক্ত গণতান্ত্রিক পরিবেশ। আওয়ামী লীগের উদ্যোগেই মাতৃভাষা বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার আনুষ্ঠানিক মর্যাদা লাভ করে, ২১ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত হয় ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে এবং জাতীয় ‘ছুটির দিন’ এর মর্যাদা লাভ করে। ‘শহিদ মিনার’ এর নির্মাণ কাজও প্রায় সম্পন্ন হয় এই সরকারের উদ্যোগেই। প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলা একাডেমি’।

এছাড়াও, আইয়ুব খানের এক দশকের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২ ও ’৬৪ এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৪ এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ, ’৬৬ এর ঐতিহাসিক ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৮ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ’৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান, ৬-দফাভিত্তিক ’৭০ এর নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এর ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চের কালরাতের নৃশংস হত্যাকান্ড, ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বাঙালি জাতি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন বঙ্গবন্ধু সরকার স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় যখন যুদ্ধে প্রায় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া দেশকে পুনর্গঠন করে অর্থনীতির চাকা সচল করার সংগ্রামে নিবেদিত ছিল ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আন্তর্জাতিক শক্তির সহায়তায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে। স্তব্ধ-স্থবির হয়ে যায় দেশ, থেমে যায় উন্নয়নের চাকা। মুখ থুবড়ে পড়ে গণতন্ত্র, ভোট ও ভাতের অধিকার। শুধু সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকেই না, জাতীয় চার নেতাকেও কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে গুলি করে হত্যা করা হয়। জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমূলে উৎপাটনের নীল নকশা করা হয়।

জাতির পিতার দুই কন্যা বিদেশে অবস্থানের ফলে প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁদের দেশের মাটিতে আসতে দেওয়া হয় না। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দীর্ঘ ৬ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে আসেন তিনি। বঙ্গবন্ধুকন্যাকে ফিরে পেয়ে প্রাণ ফিরে পান নেতা-কর্মীগণ, নব উদ্যমে সংগঠিত হতে থাকেন তাঁরা। জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বাঙালির মূল্যবোধ ও হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য নতুন করে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। বঙ্গবন্ধুকন্যার শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ-সুদৃঢ় নেতৃত্বে দীর্ঘ  আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা  আর রক্তের বিনিময়ে বাঙালি জাতি ফিরে পান ‘ভাত ও ভোটের অধিকার’।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ’৭৫ সালে হোঁচট খাওয়ার পর আবারও চলতে শুরু করে উন্নয়নের চাকা। অর্থনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠে বিশেষ করে কৃষিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও দেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাকল্পে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘সেইফটি নেট’ কার্যক্রম শুরু করেন। গ্রহণ করা হয় ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ এর মতো দারিদ্র বিমোচনে যুগান্তকারী কর্মসূচি। বয়স্কভাতা ও বিধবাভাতার মতো কর্মসূচিগুলোর সূচনাও ঘটে এ সময়ে। তথ্য প্রযুক্তিখাতে আমদানি শুল্ক কমিয়ে তথ্য প্রযুক্তিকে জনগণের কাছে সহজলভ্য করে তোলে, ‘ডিজিটাল যুগ’ এ প্রবেশের সূচনা হয় মূলত এর মাধ্যমেই।  রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সাথে ‘গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি’, ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ এর স্বীকৃতি, জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচন বিশ্ব আঙিনায় বাংলাদেশকে মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে নতুনভাবে উপস্থাপন করে।

২০০১ সালের নির্বাচনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে যায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। দেশে শুরু হয় খুন, ধর্ষণ, হামলা, লুটপাট, সহিংসতা, সংখ্যালঘু নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের মহোৎসব। রাজাকার মন্ত্রিসভায় স্থান পায় আর রাজাকারের গাড়িতে ওড়ে ৩০ লক্ষ শহিদের রক্ত ভেজা পতাকা। যুদ্ধ করে স্বাধীন একটি জাতির জন্য এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে। দুর্নীতি, চুরি আর লুটপাটের ফলে লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ থুবডে পড়ে, হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়, বিশ্ব দুর্নীতির র‌্যাংকিং এ চ্যাম্পিয়নের খাতায় নাম ওঠে, জন্ম হয় ‘বাংলা ভাই’ এর মতো সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীর। সারাদেশে একসাথে চলে সিরিজ বোমা হামলা, পরিচালিত হয় ইতিহাসের নির্মম-বর্রোচিত গ্রেনেড হামলা। দেশকে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনগণের ভোটে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্র্জন করে ২০০৮ সালে আবারও সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

আরও পড়ুন:


গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় ৭৬ জনের মৃত্যু

শুভকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ৬-৭জন খেলোয়াড়

মাদারীপুরে লকডাউনে রাস্তাঘাট জনসমাগম কম


বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একযুগের অধিক মেয়াদে পরিচালিত হচ্ছে দেশ। ইতোমধ্যে আমরা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ করতে পেরেছি। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের ফলে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ একটি প্রত্যয়ী ও মর্যাদাশীল দেশ হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচকে আমাদের অগ্রগতি বিস্ময়কর। ‌‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর সুবিধা আজ শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড সুবিধা পৌঁছে গেছে। ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট’ এর সুবিধা কাজে লাগিয়ে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। সারাদেশে একশত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, দুই ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব বাস্তবায়ন হলে কর্মসংস্থান তৈরিসহ আমাদের অর্থনীতিতে আরও গতি সঞ্চার হবে। পৃথিবীর বুকে এখন আর আমরা ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, মঙ্গা, ক্ষুধা, দারিদ্যপীড়িতের দেশ না। খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ স্বয়ংসম্পূর্ণ।

এ দেশের সকল গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী দলের নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশের প্রতিটি ক্রান্তিকালে উদ্ধারকারীর ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হয়েছে। জনমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে এ সংগঠনের নীতি, আদর্শ ও কর্ম পরিকল্পনায়। নেতা-কর্মীদের ইস্পাতসম মনোবল ও ঐক্যবদ্ধতার ফলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র সফল হয় নাই।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বঙ্গবন্ধুকন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এ সংগঠনটি অতীতের মতো সামনের দিনগুলোতেও এ দেশের মানুষের সকল গণতান্ত্রিক অধিকার ও অর্থনৈতিক মুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিরন্তর সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই সবার প্রত্যাশা। শুভকামনা জানাচ্ছি ‘অস্তমিত সূর্যোদয়ের দলকে’।

লেখক- গুলশাহানা ঊর্মি, বিসিএস (তথ্য), সংযুক্তি- প্রেস উইং, প্রধানমন্ত্রী’র কার্যালয়।

news24bd.tv / তৌহিদ

পরবর্তী খবর

জীবন আর মৃত্যু খুব কাছাকাছি থাকে

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

জীবন আর মৃত্যু খুব কাছাকাছি থাকে

জীবন আর মৃত্যু খুব কাছাকাছি বাস করে। যতক্ষণ দেহে প্রাণ থাকে ততক্ষণ জীবনের অস্তিত্ব থাকে। দেহ থেকে প্রাণটা বেরিয়ে গেলেই  সব শেষ......সব ইতিহাস। একটা প্রাণবন্ত মানুষ তখন লাশ হয়ে যায়। মানুষটা আর মানুষের কাছে মানুষ থাকে না। মানুষের কাছে লাশ হয়ে যায়। যে মানুষদের কাছে মানুষটা লাশ হয়ে যায়, সে মানুষেরাও একদিন লাশ হবে। কখন, কিভাবে কেউ তা জানেনা।

খুব অদ্ভুত এ পৃথিবীর নিয়ম। একটা মা তার গর্ভে তিলে তিলে বয়ে বেড়ায় তার আদরের সন্তানকে। ঘড়ির কাটাটা যেন খুব অলস হয়ে যায় তখন। কিছুতেই যেন সময় সময়ের মতো গতিময় হয়ে উঠে না বরং সময় ক্রমাগত ঘাত-প্রতিঘাতের ঠাডা লড়াইয়ে ম্রিয়মান হয়ে যায়। জীবনের দর্শনটাই বুঝি এমন। আনন্দ মানুষকে সহজে ধরা দেয় না, অথচ বেদনা মানুষকে প্রতিদিন পাগলের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়। তারপর সব প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে একদিন আসে সেই মহাবিস্মরণের দিন। মাতৃগর্ভ থেকে বেরিয়ে আসে নতুন একটি জীবন। খুব নিষ্পাপ, খুব মায়াবী। জীবন থেকে জীবন সৃষ্টির যাত্রা সারা পৃথিবীকে চিৎকার করে জানিয়ে দেয় "যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে, তার মুখে খবর পেলুমঃ, সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক, নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার, জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।" 

একদিন এভাবেই মানুষ পৃথিবীতে আসার ছাড়পত্র পায়। পৃথিবীর আলোকিত মুখ দেখে চমকিত হয়। অথচ মানুষ জানেনা কখন তাকে থেমে যেতে হবে। কারণ মানুষের জীবনটা যে খুব অনিশ্চিত। একটা তেলাপোকার পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়া থেকে বাঁচার মতো প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে, মানুষের তাও নেই। একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত ঘটিয়ে জ্বলে উঠবার মতো শক্তি আছে, মানুষের তাও নেই। মানুষ মৃত্যুর কাছে খুব অসহায়।

স্টিভ জবস বলেছেন, ‘মৃত্যুই আমাদের সবার গন্তব্য। কেউ কখনো এটা থেকে পালাতে পারেনি। এবং সেটাই হওয়া উচিত। কারণ মৃত্যুই সম্ভবত জীবনের অন্যতম বড়ো আবিষ্কার। এটা জীবনে পরিবর্তনের এজেন্ট। এটা পুরোনোকে ঝেড়ে নতুনের জন্য জায়গা করে দেয়।’ কথাটির প্রতিফলন ঘটেছে স্টিভ জবসের জীবনে। প্রচুর ধনসম্পদ রেখে গেলেও ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এই বিপুল সম্পদ তার ক্যানসারকে নির্মূল করতে পারেনি। মৃত্যুর কাছে সম্পদ মূল্যহীন। সম্পদ দিয়ে মৃত্যুকে কখনো কেনা যায় না।

একই ধরনের ঘটনার সম্মুখীন হয়েছিলেন বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার, ব্লগার, সেলিব্রেটি ও লেখক কিরজেইডা রডরিগুয়েজ। তার জীবনের ব্যাপ্তি ছিল আরো কম। মাত্র ৪০ বছর। ক্যানসার তার শরীরেও বাসা বাঁধে। মৃত্যুকে খুব কাছাকাছি দেখছিলেন। গভীর অনুভূতি থেকে জন্ম নিয়েছিল জীবনবোধ। মৃত্যুর আগে লিখে যাওয়া একটি নোটে তিনি উল্লেখ করেন। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের গাড়িটি আমার গ্যারেজে পড়ে আছে। কিন্তু আমাকে বসে থাকতে হয় হুইল চেয়ারে। সব রকমের ডিজাইনের কাপড়, জুতা, দামি জিনিসে আমার গৃহ ভরপুর। কিন্তু আমার শরীর ঢাকা থাকে হাসপাতালের দেওয়া সামান্য একটা চাদরে। ব্যাংকভর্তি আমার টাকা। কিন্তু সেই টাকা এখন আর আমার কোনো কাজে লাগে না। প্রাসাদের মতো আমার গৃহ, কিন্তু আমি শুয়ে আছি হাসপাতালের টুইন সাইজের একটা বিছানায়। এক ফাইভস্টার হোটেল থেকে আরেক ফাইভস্টার হোটেলে আমি ঘুরে বেড়াতাম। কিন্তু এখন আমার সময় কাটে হাসপাতালের এক পরীক্ষাগার থেকে আরেক পরীক্ষাগারে। শত শত মানুষকে আমি অটোগ্রাফ দিয়েছি, আর আজ ডাক্তারের লেখা প্রেসক্রিপশনটাই আমার অটোগ্রাফ। আমার চুলের সাজের জন্য সাত জন বিউটিশিয়ান ছিল, আজ আমার মাথায় কোনো চুলই নেই। ব্যক্তিগত জেটে আমি যেখানে খুশি সেখানেই উড়ে যেতে পারতাম। কিন্তু হাসপাতালের বারান্দায় যেতেও এখন আমার দুজন মানুষের সাহায্য নিতে হয়। পৃথিবীব্যাপী ভরপুর নানা খাবার থাকলেও দিনে দুটি পিল আর রাতে কয়েক ফোঁটা স্যালাইন আমার খাবার। এই গৃহ, এই গাড়ি, এই জেট, এই আসবাবপত্র, এত এত ব্যাংক একাউন্ট, এত সুনাম আর এত খ্যাতিÍএগুলোর কোনো কিছুই আমার আর কোনো কাজে আসছে না। এগুলোর কোনো কিছুই আমাকে একটু আরাম দিতে পারছে না। শুধু দিতে পারছে প্রিয় কিছু মানুষের মুখ আর তাদের স্পর্শ।

সমরেশ মজুমদার লিখেছেন, মৃত্যু কি সহজ, কি নিঃশব্দে আসে; অথচ মানুষ চিরকালই জীবন নিয়ে গর্ব করে যায়। বাস্তবিকই জীবন নিয়ে গর্বের কিছু নেই। পৃথিবীতে মানুষ একাই আসে, একাই চলে যায়। ধন-সম্পদ, অর্থ, অহমিকা, ক্ষমতা সবকিছু পড়ে থাকে। একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়। বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডারের নিজের দৃষ্টিভঙ্গির দর্শনে তার প্রকাশ ঘটেছে। মৃত্যুশয্যায় আলেকজান্ডার। তার প্রিয় সেনাপতিকে কাছে ডাকলেন এবং তার মৃত্যুর পর তিনটি ইচ্ছা পূরণ করার কথা বললেন। আলেকজান্ডার তাদের অলৌকিক দর্শনতত্ত্ব থেকে বললেন, ‘আমি আমার জীবনের বিনিময়ে তিনটি বিষয় শিখেছি, সেগুলো পৃথিবীর মানুষকে জানাতে চাই। প্রথমত, আমার শবদেহ চিকিত্সকেরা বহন করবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে মৃত্যুর সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন পৃথিবীর কোনো চিকিত্সকের পক্ষে মৃত্যুকে রোধ করা সম্ভব নয়।’ দ্বিতীয় ইচ্ছার বিষয়ে আলেকজান্ডার বলেন, ‘আমার শবদেহ যে পথ দিয়ে বহন করে সমাধিক্ষেত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, সেই পথের চারপাশে আমার অর্জিত ধন-সম্পদ ও অর্থ ছড়িয়ে দেবে। যাতে মানুষ বুঝতে পারে আমি আমার পুরো জীবন ধন-সম্পদের পেছনে ব্যয় করলেও মৃত্যুর পর তার কিছুই সঙ্গে করে নিতে পারছি না।’ তৃতীয়ত, ‘কফিনের বাইরে হাত বের করে রাখবে। কারণ আমি পৃথিবীকে বোঝাতে চাই, আমি পৃথিবীতে শূন্য হাতে এসেছিলাম; আবার যাওয়ার সময় শূন্য হাতেই ফিরে যাচ্ছি।’

বিশ্বখ্যাত পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের ১৫০ বছর বেঁচে থাকার স্বপ্ন ছিল। দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার জন্য তিনি অনেকগুলো আত্মরক্ষা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। কোনো মানুষের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার সময় তিনি দস্তানা ব্যবহার করতেন।

আরও পড়ুন


খিলগাঁয়ে ড্রেনে পড়ে এক কিশোর নিখোঁজ, উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস

সেই রাতের পরীমণির আরও একটি ভিডিও ভাইরাল

ঢাকার ৭১ শতাংশ মানুষের শরীরে করোনার অ্যান্টিবডি: আইসিডিডিআরবি

সাতক্ষীতায় আজ সর্বোচ্চ মৃত্যু, শনাক্তের হার ৪৭ শতাংশ


জীবাণু থেকে বাঁচার জন্য মুখে মাস্ক লাগানো থাকত। তার সারা শরীর প্রতিদিন পরীক্ষা করা ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য ১২ জন চিকিৎসক সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত ছিলেন। খাদ্যে কোনো ধরনের বিষক্রিয়া বা জীবাণু আছে কি না, তা নিয়মিতভাবে শনাক্ত করার জন্য ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যবস্থা ছিল। ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীরকে সুস্থ রাখতে ১২ জন বিশেষজ্ঞ ও ফিজিওথেরাপিস্ট নিযুক্ত ছিলেন। অক্সিজেনের অভাবে যাতে মৃত্যু না ঘটে, সে কারণে অক্সিজেনযুক্ত বিছানায় ঘুমাতেন। কিডনি, ফুসফুস, চোখ, লিভার, হৃদপিণ্ডসহ শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে পড়লে সেগুলো যাতে দ্রুত মাইকেলের দেহে প্রতিস্থাপন করা যায়, সেজন্য সার্বক্ষণিকভাবে অর্গান ডোনার বা অঙ্গদাতা রাখা হয়েছিল।

কিন্তু এত সব সুরক্ষার ব্যবস্থা করেও মাইকেল জ্যাকসনের দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার স্বপ্ন সফল হয়নি। ২০০৯ সালের ২৫ জুন মাত্র ৫০ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেন তিনি। মৃত্যুকে হার মানানোর চেষ্টা তার থমকে গেল। মৃত্যুর কাছে জীবন হার মানল। তার বাসায় কর্মরত ১২ জন চিকিত্সকের কোনো প্রচেষ্টাই সফল হলো না। লস অ্যাঞ্জেলেস, ক্যালিফর্নিয়ার বিশ্বখ্যাত চিকিৎসকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা তার জীবনকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারল না।

জীবন আছে বলেই মৃত্যু আছে। মানুষ জীবনের চাকচিক্যকে দেখে মৃত্যুকে ভুলে যায়। সব নেতিবাচকতার আবর্তে নিজেকে ডুবিয়ে রাখে। মানুষকে জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য খুঁজে পেতে হলে ভাবতে হবে একদিন তাকেও এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। তাই পৃথিবী ছেড়ে যাবার আগে পৃথিবীকে গড়ার মতো অভূতপূর্ব শক্তি মানুষের মধ্যে থাকতে হবে। তবেই পৃথিবী আঁধার ছেড়ে আলোকিত হয়ে উঠবে।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর

পরিণত বয়স বা কোন অসুস্থতাই আমাদের মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত করে না

আলী রীয়াজ

পরিণত বয়স বা কোন অসুস্থতাই আমাদের মৃত্যুর জন্যে প্রস্তুত করে না

বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের পথিকৃৎ ও মহীরুহ মহিউদ্দিন আহমেদ আর নেই – এই সংবাদ আমার কাছে অবিশ্বাস্য বলেই মনে হয়। মহিউদ্দিন ভাই দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন; কিন্তু অপরিমেয় জীবনী শক্তি দিয়ে তিনি তা মোকাবেলা করেছেন। পরিণত বয়স বা অসুস্থতা আমাদেরকে কোনও মৃত্যুর জন্যেই প্রস্তুত করে না।

যাঁদের ছায়া দীর্ঘ, যাঁদের কাজ একটি ক্ষেত্রকে আমূল বদলে দিয়েছে তাঁদের জীবনাবসানের সংবাদ আমাদেরকে কেবল বেদনাহতই করেনা, আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁদের কাজ কী করে অন্যদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। যাঁদের কাজ অন্যদের সৃজনশীলতা এবং গবেষণাকে বদলে দিয়েছে তাঁদের অনুপস্থিতি স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁরা কতটা প্রয়োজনীয় ছিলেন।

মহিউদ্দিন আহমেদকে প্রচলিত পরিচয়ে আমরা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেই বর্ণনা করবো। কিন্তু তাঁর পরিচয় আমার কাছে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন গবেষণার ক্ষেত্রকে প্রতিষ্ঠিত করার একজন নিবেদিত মানুষ  হিসেবে। বাংলাদেশে বাংলাদেশ বিষয়ে যে সব কাজ হচ্ছে তার সঙ্গে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেয়া, একই সঙ্গে সারা পৃথিবীতে বাংলাদেশ বিষয়ে যে সব গবেষণা হচ্ছে তাঁকে বাংলাদেশের পাঠকের হাতে তুলে দেয়া – এটাই তিনি করেছেন সারা জীবন ধরে। এক বাক্যে যত সহজে তা লেখা যায় সেই কাজ করা যে কতটা কঠিন সেটা কেবল তাঁর কাজের প্রভাব থেকেই উপলব্ধি করা সম্ভব।

অন্তরালের মানুষ ছিলেন তিনি। কিন্ত তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প এবং মানসম্পন্ন প্রকাশনার ইতিহাস রচনা করা যাবেনা। সাংবাদিকতা দিয়ে তাঁর জীবনের সূচনা হয়েছিলো। স্থায়ীভাবে একাডেমিক জগতে প্রবেশের ডাক এসেছিলো তাঁর, যখন তিনি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি-তে ভর্তির সুযোগ পান, কিন্তু অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির (ওইউপি) প্রকাশনা ও সম্পাদনা তাঁকে বেশি আকর্ষণ করেছিলো, সেটা ১৯৬৯ সাল।

আরও পড়ুন


‘পরমাণু নিয়ে ভিয়েনা সংলাপ সবাইকে সন্তুষ্ট করবে’

কষ্টার্জিত জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা

করোনায় বিশ্বে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মৃত্যু

পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে সুইডেনের প্রধানমন্ত্রীর বিদায়


এক সময় সাংবাদিকতার পাশাপাশি পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতাও করেছিলেন। মহিউদ্দিন ভাই ১৯৯৭/৮ সালে লন্ডনে আমাকে তাঁর জীবনের এই পর্বের কথা বললে আমার স্বতস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিলো যে – ভাগ্যিস আপনি পিএইচডি না করে ওইউপি’র সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ হাসিতে উজ্জ্বল মুখে বলেছিলেন – ‘আমিও তাই ভাবি’। তারপরে আরও কথা হয়েছিলো। কি করে ১৯৭৫ সালে ইউপিএল প্রতিষ্ঠা পেলো সেই সব গল্প।

বাংলাদেশে গবেষণা-ভিত্তিক ইংরেজি বইয়ের প্রকাশনার যে ধারা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন তা কি অন্য আর কারও হাতে তৈরী হতে পারতো? যে সময়ে তিনি প্রকাশনার জগতের জন্যে নিজেকে নিবেদন করলেন, যেভাবে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন তা কেবল ধৈর্য্য, নিষ্ঠা আর ভালোবাসা দিয়েই সম্ভব। যে দেশে প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনা, যেখানে প্রতিষ্ঠানের অকাল মৃত্যুই ভবিতব্য বলে বিবেচিত সেখানে মহিউদ্দিন ভাই তৈরি করেছেন এমন প্রতিষ্ঠান যা নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব করতে পারে। বাংলাদেশ সময় সোমবার দিবাগত রাতে মহিউদ্দিন আহমেদ ৭৭ বছর বয়সে ঢাকায় পরলোক গমন করেন। তাঁর আপনজনদের প্রতি আমার সমবেদনা।

news24bd.tv এসএম

পরবর্তী খবর