হিটলার গোয়েবলসের মিথ্যার দুনিয়া

নঈম নিজাম

হিটলার গোয়েবলসের মিথ্যার দুনিয়া

মিথ্যাচার করতে একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন ইতিহাসের খলনায়ক হিটলার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার তৈরি করেন গুজব মন্ত্রণালয়। অবশ্য ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই তিনি এ কাজে তৎপর ছিলেন। হিটলার খেয়াল করেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা প্রচারণায় এগিয়ে ছিল। জার্মানরা প্রচারণায় মার খেয়েছে বারবার। শুধু প্রচারণা দিয়েই ব্রিটিশরা আড়াল করেছিল অনেক কিছু।  জার্মানরা মার খায় ব্রিটিশ প্রচারণার কাছে। ব্রিটিশ মিডিয়া গুজব ছড়িয়ে জার্মানদের বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল। ব্রিটিশ গুজব ও প্রচারণার কাছে জার্মানরা নাস্তানাবুদ হয়। হিটলার ভাবনায় পরিবর্তন আনেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি করেন বিশেষ মন্ত্রণালয়। নাম দেন ‘মিনিস্ট্রি অব পাবলিক এনলাইটেনমেন্ট অ্যান্ড প্রোপাগান্ডা’। আর এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেন প্রিয়ভাজন গোয়েবলসকে। এই গোয়েবলস পিএইচডি শেষ করে কিছুদিন ব্যাংকার ও পরে সাংবাদিকতা করেন। তারপর যোগ দেন রাজনীতিতে। ইচ্ছা ছিল সেনাবাহিনীতে যোগদানের। কিন্তু তার এক পা খাটো ছিল জন্মগত। এ কারণে সেনাবাহিনীতে যাওয়া হয়নি। দল হিসেবে বেছে নেন হিটলারের নাৎসি পার্টিকে। সামনে আসতে বেশি সময় লাগেনি। দিনকে রাত বানাতে পারতেন। বাস্তবের সঙ্গে মিল নেই এমন সব আজগুবি খবর সৃষ্টি করতেন। মানুষ যা কল্পনা করত না তা-ই বাস্তব বানিয়ে ছাড়তেন। এমন নিখুঁতভাবে করতেন সবকিছুই বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো। প্রথম সাক্ষাতের পরই হিটলার তাকে লুফে নেন। তারপর বিশেষ গোপনীয়তা বজায় রেখে সব কাজ করতেন। তখন এত যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ ছিল না। আর সেই সুযোগকে ঠান্ডা মাথায় কাজে লাগাতেন গোয়েবলস।

আজকাল কেন জানি মনে হয় গোয়েবলসি মিথ্যাচারের যুগে ফিরে গেছি আমরা। অসুস্থ, ব্যর্থ ঈর্ষাকাতর নষ্টরা একটা হিংসুটে সমাজ তৈরি করছে। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সর্বস্তরের যার তার বিরুদ্ধে বেপরোয়া মিথ্যাচার করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে। কুৎসা নোংরামি গোয়েবলসকেও হার মানায়। সেদিন র‌্যাবের একটা ভিডিও দেখলাম টেলিভিশনে। লেকে মরা মাছ ভাসছে। মানুষ ভিড় করে দেখছে। পথচলা একজন জানতে চাইলেন, ভাই কী হয়েছে? জবাবে আরেকজন বললেন, লেকে মরা মাছ ভাসছে। সেই লোক শুনল লেকে লাশ ভাসছে। দূর থেকে মোবাইলে লেকের ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে দিল ‘লেকে লাশ ভাসছে’। মুহূর্তে গুজব ছড়িয়ে পড়ল গোটা শহরে, ‘লেকে মরা লাশ ভাসছে’। তেমনি গার্মেন্ট কারখানায় মশার ওষুধ ছিটানোর ধোঁয়া দেখে ছবি তুলে আরেকজন ফেসবুকে লিখে দিলে, ‘আগুন লেগেছে গার্মেন্টে’। ব্যস, আর যায় কোথায়? সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল আগুন নিয়ে। হুড়োহুড়ি করে নামতে গিয়ে হতাহত গার্মেন্টের মেয়েরা। এমনও হাজারো গুজব ছড়ানো হচ্ছে এখন সমাজে। কিছু লোকের কাজই হলো বাজেভাবে সমাজে গুজব ছড়ানো। হিটলারি প্রচারণার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায় আজকালের অনেক কিছুতে।

হিটলারের সময় জনপ্রিয় ছিল রেডিও। বিনামূল্যে জার্মান নাগরিকদের একটি করে রেডিও দেওয়ার ব্যবস্থা করেন মন্ত্রী গোয়েবলস। হিটলার সব সময় বিশ্বস্ত এই সহযোগীর কথা শুনতেন। কারণও ছিল। গোয়েবলসের আলোচিত উক্তি ছিল, ‘আপনি যদি একটি মিথ্যা বলেন এবং সেটা বারবার সবার সামনে বলতে থাকেন তাহলে লোকজন একসময় সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করবে।’ জার্মানিতে তা-ই হয়েছিল। ইহুদি নিধনের সময় গোয়েবলস প্রচার করতেন, জার্মানিতে হিটলারের মতো শক্তিশালী একজনকে দরকার। তিনিই পারবেন জার্মান জাতিকে তার হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে দিতে। বেতারে এ প্রচারণা শুনতে শুনতে মানুষ বিশ্বাসও করত। আলোচনায় ইহুদি নিধনের পরিবর্তে সব সময় সামনে থাকত হিটলারের সাফল্য নিয়ে। যুদ্ধের আগে প্রচারণা ছিল এক ধাঁচের। যুদ্ধের সময় আরেক। জার্মান রেডিও-টিভিতে শুধুই থাকত হিটলার ও তার বাহিনীর সাফল্যের কথা। বাস্তবে যখন রাশিয়ানদের হাতে জার্মান সেনারা নাস্তানাবুদ তখন গোয়েবলসের প্রচারণা ছিল সোভিয়েত রাশিয়া তাদের দখলে। জার্মান সেনারা রাশিয়ান ভদকা পান করছে। আর রাশিয়ান মেয়ে নিয়ে আনন্দফুর্তি করছে। এ ধরনের প্রচারণা প্রতিদিনই হতো। আমেরিকা আর ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে চলত কুৎসা রটনা। যার কোনো আগামাথা ছিল না। গোয়েবলসের শেষ পরিণতি ছিল করুণ। তাকে মরতে হয়েছিল পরিবার-পরিজন নিয়ে বিষপান করে। মৃত্যুতেও হিটলারের পথ অনুসরণ করেছিলেন। বিশ্ববাস্তবতায় আমরা কি গোয়েবলসীয় প্রচারণা থেকে মুক্ত হতে পেরেছি? এই যুগে এই সময়ে প্রচার হয় একজন মানুষকে চাঁদে দেখা গেছে। আর এ প্রচারণাতেই মধ্যরাতে সবাই ঘরবাড়ি থেকে বের হয়ে যায় দেশি অস্ত্র টেঁটা, বল্লম, লাঠি নিয়ে। আগুন ধরিয়ে দেয় সরকারি অফিস-আদালতে। নিজের জীবনও বিলিয়ে দেয়। বেশি দিন আগের কথা নয়। সময়টা ২০১৩ সালের ৩ মার্চ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়, জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গোপন স্থানে নিয়ে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। ফাঁসির পর তিনি আকাশে উড়ে গেছেন। কিছুক্ষণ আগে দেখা গেছে চাঁদে। তিনি চাঁদে বসে তাকিয়ে আছেন। আজব! এই যুগে এই সময়ে এমন প্রচারণা শুনে মানুষ বেরিয়ে আসে ঘরবাড়ি থেকে। এ ধাঁচের প্রচারণা দেখেছি ছাত্রদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময়ও। একজন অভিনেত্রী ফেসবুক লাইভে আসেন। তিনি বলতে থাকেন, চার ছাত্রকে মেরে ফেলা হয়েছে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে লাশ পড়ে আছে। তিনি নিজের চোখে সবকিছু দেখেছেন। মুহূর্তে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ে ফেসবুক, ইউটিউবসহ নানা ওয়েবসাইটে। ব্যস, আর যায় কোথায়? সবাই মিলে এ নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বড় অদ্ভুত সবকিছু।

মানুষ কেন এমন গুজব ছড়ায়? সেদিন এক মনোবিজ্ঞানীকে প্রশ্ন করেছিলাম। জবাবে তিনি বললেন, সবচেয়ে বড় কারণ হতাশা। আর হতাশা থেকে গুজব ছড়ানো একটা বড় ধরনের রোগ। কেউ গুজব ছড়ায় ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে। কেউ গুজব ছড়ায় ঈর্ষা, হিংসা, ব্যক্তিগত হতাশা, ব্যর্থতা ঢাকতে। মগজে সারাক্ষণ হিংসা লুকিয়ে থাকায় কিছু লোক অশ্লীল আনন্দ পায় মিথ্যাচার করে। এক ধরনের অসুস্থতা থেকেই মানুষ সত্য লুকিয়ে, অন্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা কুৎসা রটায়। বাংলাদেশে এই মানসিক অসুখটি অনেক বেশি বেড়েছে। গোয়েবলসীয়দের অত্যাচার থেকে নারী-শিশুদেরও রেহাই মিলছে না। তারা সবকিছুতেই নেতিবাচক অবস্থান দেখে। কোথাও ইতিবাচক কিছু খুঁজে পায় না। ওদের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ সফল মানুষদের বিরুদ্ধে। আগে প্রকাশ ঘটানোর স্থানের অভাব ছিল। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে বাজেভাবে ব্যবহার করছে।

গোয়েবলসীয় কান্ড শুধু আমাদের দেশে হচ্ছে তা নয়। মিথ্যা প্রচারণার শিকার হয়েছিলেন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। বিশ্ব মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, ইরাকের কাছে জীবাণু অস্ত্র আছে। এ অস্ত্র দিয়ে দুনিয়ায় কিয়ামত আনা সম্ভব। আর গুজবটা ছড়িয়েছিলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। থেমে থাকল না পশ্চিমা মিডিয়াও। তারাও সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে আজব সব তথ্য প্রকাশ করল। শেষ পর্যন্ত দেখা গেল কোনোটারই বাস্তব ভিত্তি নেই। কিন্তু গুজবের ভিত্তিতেই শেষ হয়ে গেল একটি দেশ। সাদ্দাম ছিলেন একনায়ক। তিনি চলতেন নিজের খেয়ালখুশিমতো। আর সেটাই সহ্য করতে পারেনি আমেরিকা ও তার মিত্ররা। বুশের সঙ্গে সুর মেলাতে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার বলেছিলেন, সাদ্দামের হাতে এমন অস্ত্র আছে এর সামান্য ব্যবহারে মুহূর্তে লন্ডন শহর ধ্বংস হতে পারে। বাস্তবে সাদ্দাম যুগ তথা ইরাক যুদ্ধ শেষে প্রমাণিত হয়েছিল গোয়েবলসীয় প্রচারণা কতটা অলীক, ভিত্তিহীন। এমন প্রচারণার শিকার প্রেসিডেন্ট আসাদ ও তার দেশ সিরিয়া। আসাদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ আর বাস্তবতা নিয়ে বিশ্ব মিডিয়ায় বিভক্তি রয়েছে। মিথ্যা প্রচারণায় পৃথিবী আজ মানুষের বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। করোনাকালে এখন একটা ভয়াবহ চিত্র বিশ্ব দেখছে নতুনভাবে।

সেদিন এক বন্ধু বললেন, একদল নষ্ট ঈর্ষাপরায়ণ মানুষের কারণে দুনিয়াটা জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। ঈর্ষার অনলে জ্বলতে থাকা মানুষ সবকিছু ছাই করে দিতে চায়। পৃথিবীর কোনো সৌন্দর্যই তাদের ভালো লাগে না। সভ্যতার সব উন্নতি-সমৃদ্ধির বিরুদ্ধে তারা। এ মানুষগুলোর কারণে দুনিয়াটা বাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে। এখন বাঁচতে হলে লড়াই করে টিকতে হবে। অথবা দৌড়ে পালাতে হবে সবকিছু ছেড়ে। এ জগৎ-সংসার থেকে পালানো সহজ কাজ। সংগ্রাম করে টিকে থাকা অনেক কঠিন। কাঠিন্যকে ভেদ করে চলতে পারাটাই বিজয়ের। পরাজয়ে আনন্দ নেই। হুমায়ুন আজাদকে একটা সময়ে কঠোর সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছিল। চারপাশের মানুষগুলো তাকে স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে দেয়নি। এই নগর সভ্যতা তাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। চারপাশে হাজারো মানুষ তামাশা দেখেছে। কেউ খুনিদের আটকাতে পারেনি অথবা আটকাতে আসেনি। কবি শামসুর রাহমানকে সারাটা জীবন বাঁচতে হয়েছিল সমালোচনা সহ্য করে। শুধু সমালোচনা নয়, তাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল বারবার। কবিকে হত্যা করতে তাঁর শ্যামলীর বাড়িতে হামলা হয়েছিল। ভাগ্যটা শামসুর রাহমানের ভালো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগের হাতে পড়েননি। পড়লে এখন আরও কত কথা শুনতে হতো তার ঠিক নেই। একবার কবিকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনার আপনজন কারা? জবাবে হাসলেন। তারপর বললেন, আপনজন কারা মাঝে মাঝে বুঝি না। তবে বেলাল চৌধুরী, রফিক আজাদ, কায়সুল হক, মনজুরুল ইসলামের কাছে প্রশ্ন করলে কিছু ভালো কথা শুনবে। বাকিদের কথা জানি না। কথা বাড়ালাম না। কবিকে নিয়ে কিছু মানুষ মাঝেমধ্যে ভীষণ নোংরা প্রচারণা চালাত। এক সন্ধ্যায় কবির তল্লাবাগের বাড়িতে গেলাম। দেখলাম তিনি মন খারাপ করে বসে আছেন। সামনে বসা তরুণ কবি মারুফ রায়হান। জোহরা ভাবি চা পাঠালেন। কবির মন খারাপ কেন জানতে চাইলাম। জবাবে মারুফ রায়হান বললেন, এক অসভ্য কবি দাবিদার নোংরা যুবক বাজে কথা লিখেছেন এক পত্রিকায়। এ কারণে কবির মন খারাপ। সারাটা জীবন কুৎসা আর মিথ্যার জবাব দিতে দিতে চলে গেছেন হুমায়ূন আহমেদ।

আরও পড়ুন

  শেষ দেখে তারপর আমেরিকা যাব: ওবায়দুল কাদেরকে হুঁশিয়ারি কাদের মির্জার

  দশম শ্রেণির ছাত্রীকে দুই দিন ধরে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মাসুম

  মগজ বদলায় কিন্তু ডিএনএ বদলায় না

  সন্তান জন্মের এক বছর পর গোপনেই বিয়ে সারলেন বরিস জনসন

 

খ্যাতিমান সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীকেও সমসাময়িকরা সহ্য করতে পারতেন না। ভাগ্যটা ভালো তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না। পত্রিকায় একটু রাখঢাক করে লিখতেন পরস্পরকে ইঙ্গিত করে। একবার তিনি একজনের টিপ্পনীর জবাব দিতে গিয়ে লিখেছিলেন, মুুকুল তুই আর ফুটলি না। এই জগতে কেউ কারও ভালোটা সহ্য করতে পারে না। একটা ভালো শার্ট পরে বের হোন দেখবেন চারদিকের চোখগুলোর মাঝে ঈর্ষার অনল। এখানে একদল মানুষ কাজ করে। আরেক দল ঈর্ষার অনলে পুড়ে পুড়ে সারা দিন অন্যের সমালোচনা করে কাটায়। তাদের আর কোনো কাজ নেই। অনেকে কথায় কথায় জ্ঞান দেন, বাণী দেন। নিজের ব্যক্তিজীবনের দীন-দুনিয়ার ঠিক নেই। আর কথায় কথায় পাড়াপড়শি নিয়ে ঘুম হারামের কথা জানান দেন। সুযোগ পেলেই কুৎসা রটান।

সেদিন আরেকজন বললেন, কারও সঙ্গে আত্মীয়তা করতে এখন আর সামাজিকভাবে খোঁজখবরের দরকার নেই। গোয়েন্দা লাগিয়েও খবর নেওয়ার দরকার নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই লোকটির প্রোফাইলে ঢুকলেই হবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কতটা হিংসুটে, অসুস্থ, মিথ্যা রটনাকারী, নোংরা মানসিকতা রাখেন তা জানা যাবে ফেসবুকে লেখনী পড়েই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন গুজব আর কুৎসা রটনার বাহন। অন্যের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় সবাই ব্যস্ত। এখানে সবাই বিচারক, সবাই আদালত, সবাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকায়। সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের দরকার নেই। মিডিয়া ট্রায়াল হয়ে যায় মুহূর্তে। একজন একটা মিথ্যা প্রচারণা শুরু করতে পারলেই হলো। বাকিরা যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন মনে করেন না। ‘চিলে কান নিয়েছে’ প্রচারণার মতো ছুটতে থাকেন। কিছুদিন আগে একদল ফেসবুকে প্রচার চালাল নায়ক আলমগীরের মৃত্যু হয়েছে। একজন থেকে আরেকজন কপি করতে থাকলেন। ফেসবুক জমে গেল। পরে নায়ক আলমগীর নিজে, রুনা লায়লা, আঁখি আলমগীর বাধ্য হলেন লিখতে তিনি জীবিত। কোনো সমস্যা নেই। নায়ক ফারুককে নিয়েও এমন হয় মাঝেমধ্যে। এ টি এম শামসুজ্জামানের মারা যাওয়ার গুজব ছড়িয়ে ফেসবুকে বারবার তাঁর জন্য দোয়া প্রার্থনা করা হয়। শোক প্রকাশেরও শেষ ছিল না।  বড় অদ্ভুত সবকিছু! সমাজের ভদ্রবেশীরাই ছড়িয়ে দেন নোংরামি। কবি বলেছেন, ‘আমরা সবাই পাপী; আপন পাপের বাটখারা দিয়ে; অন্যের পাপ মাপি!!’ কবির কবিতার আরেকটি লাইন মনে পড়ছে, ‘অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!’

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর

শেখ হাসিনা মিডিয়াবান্ধব না বিদ্বেষী

নঈম নিজাম

শেখ হাসিনা মিডিয়াবান্ধব না বিদ্বেষী

বাজায় কে

মেঘের মাদল

ভাঙ্গালে ঘুম
ছিটিয়ে জল

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ইতিহাসের অনেক হিসাব-নিকাশ থাকে। সব হিসাব-নিকাশ সবার জন্য সমানভাবে মেলে না। সেদিন একজন প্রশ্ন করলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়াবান্ধব না মিডিয়াবিদ্বেষী? এই প্রশ্ন কেন করলেন পাল্টা জানতে চাইলাম। জবাবে সেই বন্ধু বললেন, বর্তমান সময়ের কিছু ঘটনার কারণে এ প্রশ্ন উদয় হয়েছে। আজকাল অনেকের কাছে এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে ঘিরে মানুষের মনে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। টানা ক্ষমতায় থাকার ভালো-মন্দ দুটো দিকই আছে। সব বিষয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আসবে। আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এভাবে ক্ষমতায় থাকার কোনো নজির নেই। স্বাধীনতার পর নানামুখী ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত মোকাবিলা করতে করতেই সময় চলে গিয়েছিল। ’৯৬ সালের ক্ষমতার মেয়াদ আর এখনকার বাস্তবতা সম্পূর্ণ আলাদা। আওয়ামী লীগের অতীত ইতিহাস ঐতিহ্যের সঙ্গে বর্তমানকে মেলানো যাবে না। আর সরকারি দল ও বিরোধী দলের হিসাবও এক হয় না। একটি দল টানা ক্ষমতায় থাকলে ভালো-মন্দের মিশ্রণে চলতে হয়। ফুলে ভ্রমর আর মধুতে মৌমাছি বসবেই। মধুর লোভে সরকারি দলের ঘাটে ঘাটে তৈরি হয় সুবিধাভোগী। অনেক সময় সুবিধাভোগীদের তৎপরতায় হারিয়ে যায় ত্যাগী নেতা-কর্মীরা। এটা শুধু আওয়ামী লীগের বেলায় তা নয়। আমাদের মতো দেশে যখন যারা ক্ষমতায় থাকে তাদের ওপর আগাছা-পরগাছা ভর করে। ছোটবেলায় ফুলের বাগান করতাম। গোলাপ, গন্ধরাজ, জবা, টগরের সঙ্গে থাকত বাহারি পাতার গাছ। সেই গাছ দেখতে সুন্দর, কিন্তু ফুল হতো না। থাকত বাগানের শোভা হয়ে। মন দিয়ে পাতাবাহারও লাগাতাম। সরকারও তেমনই। কিছু মানুষ দক্ষতা নিয়ে কাজ করে। আবার কেউ বঞ্চনা নিয়ে পাতাবাহারের শোভা হয়ে থাকে। অনেকটা ফুল বাগানের মতো। বাগানের যত্ন না নিলে আগাছার দাপট বাড়ে। তখনই সমস্যা তৈরি হয়। ফুলের গাছগুলো ধীরে ধীরে মরে যায়। পাতাবাহারও টিকতে পারে না। আগাছাকে ঘিরে ফুল বাগানে আসে সাপ। খেয়াল না করলে সেই সাপের কামড়ে মরতে হয় মালি বা বাগান মালিককে। প্রকৃতির এ এক নিষ্ঠুর খেলা।

Bangladesh Pratidinরাজনৈতিক দলে আগাছা জমে ক্ষমতাকালে। বিরোধী দলে নিরুনির কারণে আগাছা হয় না। বিএনপির রাজনীতির দিকে তাকালেই কঠিন বাস্তবতা বোঝা যায়। দুঃসময়ের বিএনপি খুঁজে পাচ্ছে না সুসময়ের অতিথি পাখিদের। বসন্তের কোকিলরা কেটে পড়েছে। কোকিল বাদ দিন সেই সময়ের দাপুটে নেতা হারিছ চৌধুরী কোথায়? জবাবে কেউ কিছু বলতে পারে না। কেউ জানে না হারিছ কেন লাপাত্তা। অথচ এক সময়ে তিনি যা খুশি তা করতেন। অহংকারে মাটিতে পা পড়ত না। এখন তিনি নিখোঁজ। কোনো পাত্তা নেই। বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, বিএনপি কেউ তাকে পাচ্ছে না। মারা গেছেন এমন খবরও নেই। তাহলে হারিছ চৌধুরী গেলেন কোথায়? কেনই বা তিনি অন্তর্ধান হলেন? কী এমন গোপনীয়তা ছিল যা প্রকাশের ভয়ে পালিয়েছেন ওয়ান-ইলেভেনে। ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপির অনেক বিতর্কিত কান্ডের জবাব একমাত্র হারিছ দিতে পারেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় ইলিয়াস আলী বলতেন, হারিছ সর্বনাশ করছে। ইলিয়াস স্পষ্ট কথা বলতেন। কোনো কিছুর তোয়াক্কা করতেন না। তাই তখনই হারিছকে নিয়ে দলকে সতর্ক করার চেষ্টা করেছিলেন। এখন বের হচ্ছে হারিছের অন্তর্ধানে জড়িয়ে রয়েছে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, জঙ্গিদের উত্থান, চট্টগ্রামে অস্ত্র উদ্ধার, শাহ কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টারসহ অনেক ঘটনার আড়ালের রহস্য। ক্ষমতাসীন দলগুলোর ভিতরে-বাইরে অনেক রহস্য থাকে। সব সময় সব রহস্য বের হয়ে আসে না।

ক্ষমতার নৌকা চলে পাহাড় দিয়ে। বিরোধী দলের ভালো নৌকা নদীতে চলতে চায় না। উজানের স্রোতে হোঁচট খেয়ে ডুবো ডুবো হয়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও একদা বিরোধী দলে ছিল। ১৯৮১ সালে কঠিন পরিস্থিতিতে এই দলের দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। উজানে বৈঠা হাতে নৌকার মাঝির দায়িত্ব নিয়েই নামেন কঠিন সংগ্রামে। দলের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, সিনিয়রদের বাড়াবাড়ি, আওয়ামী বিরোধী মিডিয়ার দাপট, রাষ্ট্রযন্ত্রের নানামুখী ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, বারবার দলে ভাঙন, চ্যালেঞ্জ, পাল্টা চ্যালেঞ্জ সবকিছু হজম করতে হয়েছে তাঁকে। মিডিয়াতে তখন চীনাপন্থি আর মস্কোপন্থি সাংবাদিকদের একচেটিয়া অবস্থান। শিল্প সংস্কৃতির জগৎও ছিল তাই। সবকিছুতেই মুষ্টিমেয় কিছু সমর্থক নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া দলকে গোছাতে থাকেন। দল ভেঙে বাকশাল গঠন, ’৮৬ সালের নির্বাচন ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জের। ১৫-দলীয় জোটের বৈঠক হয় বাকশাল চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন আহমেদের ধানমন্ডির বাড়িতে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রীও সেই বৈঠকে যোগ দেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ তখন দাপুটে নেতা। সবাই মিলেই ভোটের সিদ্ধান্ত নিলেন। শেখ হাসিনা প্রথমে ভোটের বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু সিনিয়র নেতাদের চাপে সিদ্ধান্ত বদলান। বৈঠকে একজন নেতা জানিয়েছিলেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সাতদলীয় জোটও ভোটে যাবে। সবাই মিলে ভোটে পরাস্ত করবেন এরশাদকে। পরে খালেদা জিয়া ভোটে যাননি। ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ ইনু ভোট বর্জন করে ভাঙল ১৫ দল। এই বাম দলগুলো গঠন করল পাঁচদলীয় জোট। ভোটে গেলেন শেখ হাসিনা। সংসদে গিয়ে তিনি এরশাদ সরকারের দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। গণতন্ত্র ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তোলেন সংসদের ভিতরে-বাইরে। সেই সময়ে শেখ হাসিনার চেয়ে বড় মিডিয়াবান্ধব আর কে ছিলেন? মিডিয়াকে তিনি আপন করে তোলেন।

এরশাদকে হটাতে সংসদ থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও উদ্যোগ নেন শেখ হাসিনা। তিনি বর্জন করেন সংসদ। প্রস্তুতি নেন পদত্যাগের। এরশাদের কাছে গোয়েন্দা রিপোর্ট গেল, মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির এমপিদের বড় অংশই সংসদে অনাস্থা দেবেন। রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি বিলুপ্ত করে শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী করবে। কাজী জাফর আহমেদও একই কথা জানালেন এরশাদকে। ব্যস সংসদ ভেঙে দিলেন এরশাদ। মিজান চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে দিলেন। আওয়ামী ঘরানার আরও অনেককে বাদ দেন ক্ষমতা থেকে। সেই সময়ে মিজান চৌধুরীর একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেই সাক্ষাৎকারের কথা আরেক দিন লিখব। শেখ হাসিনা গুজবকে পাত্তা দিলেন না। তিনি রাজপথে এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করেন। ’৮৭ সালে তীব্র আন্দোলন গড়ে ওঠে তিন জোটের নেতৃত্বে। দুই নেত্রীর মাঝে অঘোষিত ঐক্য হয় আন্দোলন ইস্যুতে। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ’৯০ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এরশাদের পতন হয়। মৃত্যুর দুই বছর আগে এরশাদ অবশ্য এক সাক্ষাৎকারে আমাকে বলেছেন, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল নূরউদ্দিন তাঁর সঙ্গে বিট্রে করাতে তিনি ক্ষমতা ছেড়েছেন। আতিককে তিনি আর এক বছর রাখলে তাঁকে ক্ষমতা ছাড়তে হতো না।

এরশাদের পতনের পর নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন শেখ হাসিনা। সবার ধারণা ছিল তিনি ক্ষমতায় আসবেন। কিন্তু নানামুখী চক্রান্তের কবলে পড়ে তিনি ক্ষমতায় আসতে পারলেন না। ক্ষমতায় এলো বিএনপি। সেই সময়ে নাঈমুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে প্রকাশিত আজকের কাগজে কাজ শুরু করি আমরা একদল তারুণ্য উদ্দীপ্ত যুবক। আমার বিট পড়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা। সরাসরি শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়। সারা দেশ ঘুরে বেড়ানোর তালিকায় আমিও যুক্ত হই। ’৯১ সালের ভোটের আগে পরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে বের হতাম খুব ভোরে। সকালে আলু ভর্তা, ডিম, ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে নেত্রীর গাড়ি বহরে যুক্ত হতাম। তিনি নিজেও অনেক সময় নাশতার টেবিলে যোগ দিতেন। আবার কখনো তৈরি হয়ে হাসতে হাসতে গাড়িতে ওঠার সময় বলতেন, আমার সাংঘাতিকরা এসে গেছে, এবার যাত্রা শুরু করা যায়। তখন এত সাংবাদিক ও পত্রপত্রিকা ছিল না। এত নিরাপত্তার ব্যাপারও ছিল না। বেসরকারি টেলিভিশন, অনলাইন ছিল না। তিন-চারটি পত্রিকা ও ইউএনবির সাংবাদিকরা সফরসঙ্গী হতেন। বেশির ভাগ সময় ফটোসাংবাদিক থাকতেন একজন। গাড়ি থাকত দুটি। নেতারা যোগ হলে বাড়ত। নেত্রীর গাড়ি থাকত সামনে। পেছনের জিপে মৃণাল কান্তি দাসের নেতৃত্বে সাংবাদিকরা। সফরে নজীব আহমেদ আর মৃণাল কান্তি দা সবাইকে প্রাণবন্ত রাখতেন। শেখ হাসিনা ’৯১ সালের ভোটে পরাজয়ের পর সবাই ভেবেছিলেন তিনি দমে যাবেন। থমকে যাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি। দলের ভিতরে ড. কামাল হোসেন, আবদুল মান্নান, মেজর জেনারেল (অব.) খলিলুর রহমানসহ অনেকে নেত্রীর বিপক্ষে শক্ত অবস্থানে ছিলেন। শেখ হাসিনা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করলেন না। সবকিছু মোকাবিলা করেই ’৯১ সালের সংসদ গঠনের পর তিনি নতুন করে সারা দেশ সফর শুরু করেন। দলকে সুসংগঠিত করতে থাকেন। কয়েকজন সাংবাদিক সফরসঙ্গী হিসেবে সারা দেশ সফর ও তাঁর কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাই। তিনি সবাইকে আপন করে নেন।

ঢাকার বাইরে সফরের সময় খেয়াল করতাম শেখ হাসিনা ফজরের নামাজ পড়ে দিন শুরু করতেন। নাশতা সেরেই বেরিয়ে পড়তেন। সারা দিন ঘুরতেন। সভা-সমাবেশ করতেন টানা। পথসভা থাকত যেখানে সেখানে। দলের মাঠের নেতাদের বাড়িতে চলে যেতেন। ভরদুপুরে অনেক সময় খাওয়ারও সুযোগ পেতেন না। আমরা হঠাৎ করে দেখতাম গাড়িতে রুটি, কলা, মুড়ি। মৃণালদা বা নজীব ভাই অথবা অন্য কেউ এসে বলতেন আপা আপনাদের জন্য পাঠিয়েছেন। খেতে বসলে শেখ হাসিনা প্রথম প্রশ্ন করতেন, তার সফরসঙ্গী ড্রাইভার, সাংবাদিক আর নিরাপত্তারক্ষীরা খেয়েছেন কি না। তারপর তিনি খেতে বসতেন। একবার বগুড়াতে ঝামেলা বেধে যায়। সময়টা মনে হয় ’৯২ সালের। বগুড়া সার্কিট হাউসে পৌঁছে আমরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ঢাকায় সংবাদ পাঠানো নিয়ে। খাওয়ার সময় ছিল না। সেই সময়ে সংবাদ পাঠানো সহজ ছিল না। ফোনে সংবাদ পাঠানো হতো। ফ্যাক্সও পাওয়া যেত না অনেক শহরে। টেলিফোনও সহজলভ্য ছিল না। অনেক সময় সার্কিট হাউসে নেত্রী তাঁর রুমে বসে আছেন। আমরা দল বেঁধে সংবাদ পাঠাচ্ছি ওনার রুম থেকে। তিনি বিরক্ত হতেন না। বিশ্রামের সময় পেতেন না। বগুড়াতে সংবাদ পাঠিয়ে এসে দেখি আমাদের জন্য রাখা খাবার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা খেয়ে শেষ। খাবার না পেয়ে আমরা আশপাশে রেস্টুরেন্টের সন্ধানে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। নেত্রীর সফরসঙ্গী ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের একজন ছুটে এলেন। বললেন, আপা আপনাদের ডাকছেন। গিয়ে দেখলাম, তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বগুড়ার নেতাদের বকছেন। খেতে বসে তিনি শুনলেন, সফরসঙ্গী সাংবাদিকরা খাবার পাননি। সঙ্গে সঙ্গে তিনি খাবার টেবিল থেকে উঠে পড়েন। তিনি নিজেও খাননি। বগুড়ায় রাতে থাকার কথা ছিল। তিনি বললেন, বগুড়া থাকব না। রংপুর গিয়ে থাকব। আমাদের একজন সিনিয়রের হাতে ২ হাজার টাকা দিলেন। বললেন, তুমি ওদের নিয়ে খাইয়ে রংপুর আস। গাড়ি বগুড়া ছেড়ে রংপুরের পথে যাত্রা শুরু করে।  আমরাও নেত্রীর গাড়ির পেছনেই ছুটতে থাকি।

বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনার সঙ্গে আমাদের হাজারো স্মৃতি। তিনি সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়াতেন। বিপদে-আপদে অবস্থান নিতেন। সময়ে-অসময়ে আস্থাভাজনদের ডেকেও নিতেন। আমাকে বিভিন্ন সময়ে অনেকবার ডেকে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি আমিনুল হক বাদশা আমাকে একবার বলেছেন, শেখ হাসিনা গুণটি পেয়েছেন বাবার কাছ থেকে। নির্মল সেনের লেখাতে পড়েছি, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লিখে বঙ্গবন্ধুর সামনে যেতেন তারা। দল বেঁধে গিয়ে ছাড়িয়ে আনেন এনায়েতুল্লাহ খান মিন্টুকে। আরও অনেক গল্প আছে। শেখ হাসিনা কি তার বাইরে? আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লিখে অনেকবারই তাঁর সামনে হাজির হলে তিনি প্রথমে গম্ভীর থাকতেন। তারপর কথা বলতেন। স্বাভাবিক হতেন ধীরে ধীরে। শুধু বিরোধী দল নয়, ’৯৬ সালের সরকারি দলেও তিনি সাংবাদিকদের কাছ থেকে আলাদা হননি। আমরা তখন বড় সাংবাদিক ছিলাম না। কিন্তু আমাদের ডেকে নিয়েও কথা বলতেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালেও একাধিকবার ডেকে নিয়েছিলেন। সেই সময়ে আমার কাগজটি ছিল কট্টরভাবে সরকারের সমালোচক। সাংবাদিকরা ঝামেলায় পড়লে এই শেখ হাসিনা সবার আগে পাশে দাঁড়াতেন।  শত শত উদাহরণ আছে। অনেকে প্রশ্ন করেন, সেই শেখ হাসিনা কি বদলে গেছেন? ভাবছি বিস্তারিত লিখে যাব। আমাদেরও বয়স বাড়ছে।  করোনাকালে জীবন-মৃত্যুর কোনো হিসাব নেই।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv / কামরুল

পরবর্তী খবর

শেখ হাসিনার বিকল্প কে?

নঈম নিজাম

শেখ হাসিনার বিকল্প কে?

অনেক দিন আগে উত্তম কুমার অভিনীত একটি ছবি দেখেছিলাম। নাম ‘দেয়া নেয়া’। উত্তম কুমারের বিপরীতে অভিনয় করেছেন তনুজা। এ তনুজাই বলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী কাজলের মা। নায়ক বিত্তবান বাবার ছেলে গানের নেশায় বাবার সবকিছু ছেড়ে লখনৌ শহর ত্যাগ করেন। স্বপ্ন ছিল গায়ক হবেন। ঘটনাচক্রে নায়িকার বাড়িতে চাকরি নেন। কাহিনি সেভাবে এগিয়ে যেতে থাকে।  এ লেখা সে ছবি নিয়ে নয়। এ ছবির একটি গান আছে, ‘জীবনখাতার প্রতি পাতায় যতই লেখ হিসাব-নিকাশ কিছুই রবে না...’। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা গানটি গেয়েছিলেন শ্যামল মিত্র। এখনো মনে দাগ কেটে আছে সেই সুর। শ্যামল মিত্রের অনেক গানেরই কোনো তুলনা চলে না। আর মানুষের জীবনখাতার হিসাব-নিকাশও কখনই মেলে না। শ্যামল মিত্রের দরাজ কণ্ঠের অনেক গান শুনেছি। ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারা দিন...’, ‘আহা মরি মরি চলিতে চলিতে বাজায় কাঁকন পরনে নীলাম্বরি...’, ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে সাত সাগর  আর তের নদীর পারে...’ এখনো শুনলে মন ভরে যায়। শ্যামল মিত্রের ছেলে সৈকত মিত্র বাবার গানগুলো পরিবেশন করেন এখন। তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ঢাকায় এসেছেন অনেকবার। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে গান গেয়েছেন। সৈকতের কণ্ঠে শ্যামলকেই খুঁজে পাই। এভাবে সবাই পারেন না বাবার উত্তরাধিকার ধরে রাখতে। জীবন চলার পথে উত্তরাধিকার হওয়া সহজও নয়। এক জীবনে কেউ পারেন, কেউ পারেন না। আমাদের দেশেও অনেক জনপ্রিয় শিল্পীর সন্তানরা সংগীতে এসেছেন। মাহমুদুন্নবী, খান আতা, বশির আহমেদসহ অনেকের সন্তানদের কণ্ঠে গান শুনে ভালো লাগে। আবদুল আলীমের সন্তানরা আসেন আমার কাছে। বাবাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন তাঁরা। উত্তরাধিকার হলেই ধারাবাহিকতা থাকবে এমন নয়। কি গান, কি রাজনীতি। সৃষ্টিশীলতা আলাদা বিষয়। নেতৃত্বের যোগ্যতা, নিজস্ব ক্যারিশমা সবার থাকে না। আল্লাহ সবাইকে সব গুণ দিয়ে সৃষ্টিও করেন না।

মাওলানা ভাসানী অনেক বড় রাজনীতিবিদ ছিলেন। তাঁর অনুসারীরা এখনো রয়েছেন। কিন্তু তিনি কোনো রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেননি। আর পারেননি বলেই মওলানা ভাসানীর আদর্শ ঘিরে কোনো দল বিকশিত হয়নি। মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর অনেক কিছু থেমে গেছে। তাঁর ছেলে আবু নাসের খান ভাসানীকে রাজনীতিতে টানতে চেষ্টা করেছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ক্ষমতায় থাকার সময় কাছেও টেনেছিলেন। জোর করে রাজনৈতিক নেতা বানানো যায় না। আলেমা ভাসানীকে রাজনীতিতে আনতে চেয়েছিলেন গোলাম কবীর নামে ন্যাপ ভাসানীর একজন নেতা। এরশাদ জমানার শেষ সময় তিনি এ উদ্যোগ নেন। চট্টগ্রামের বনানী কমপ্লেক্সের মালিক এই গোলাম কবীর ভাসানী ন্যাপ করতেন। আশির দশকের শেষভাগে গোলাম কবীর ন্যাপ ভাসানীকে আবার এক করার চেষ্টা চালান। তিনি ভেবেছিলেন আলেমা ভাসানীকে লাইমলাইটে আনলে হয়তো ঐক্যপ্রক্রিয়া তৈরি হতে পারে। আলেমা ভাসানী থাকতেন টাঙ্গাইলে। সাদামাটা নারী। রাজনীতি সেভাবে বুঝতেন না। গোলাম কবীর ভাসানীর আবেগ কাজে লাগাতে চেষ্টা করেন। তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য ভালোই চলছিল। চলচ্চিত্র ব্যবসার সঙ্গে থাকার কারণে দ্বিতীয় বিয়ে করেন নায়িকা কবিতাকে। আলাদা জগৎ-সংসার তৈরি হলেও রাজনীতির নেশাটা ছাড়তে পারলেন না। তাই দল সংগঠিত করতে টাঙ্গাইল গেলেন। লক্ষ্য ছিল হুজুরের মাজার জিয়ারত ও আলেমা ভাসানীর দোয়া নিয়ে কাজ শুরু। পত্রপত্রিকার সংখ্যা তখন এত বেশি ছিল না। দৈনিক ইত্তেফাক থেকে নাজিমউদ্দিন মোস্তান ভাই, দৈনিক খবরের তারিকুল ইসলামসহ কয়েকজন সাংবাদিক টাঙ্গাইল যান। সেই টিমে আমিও ছিলাম। কাজ করি সাপ্তাহিক সন্দ্বীপ, স্বদেশ খবরে। মালিক ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনিই আমাকে পাঠালেন। বললেন একটা নিউজ করে দেবেন। সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো তখন ভালোই চলত। টাঙ্গাইল গিয়ে ভালোই লাগল। মওলানা ভাসানীর মাজার জিয়ারত করলাম। আলেমা ভাসানীকে কাছ থেকে দেখলাম। কথা বললাম তাঁর সঙ্গে। রাজনৈতিক প্রশ্ন করে বুঝলাম তিনি কোনো প্যাঁচের মানুষ নন। সাদামাটা মানুষ। জীবনের শেষ প্রান্তে ঝুটঝামেলায় জড়ানোর শক্তি ছিল না। কিছুক্ষণ কথা বলার পরই বুঝে গেলাম অকারণে তাঁকে টানাটানির চেষ্টা চলছে। ভাসানী ন্যাপের ঐক্যপ্র্রক্রিয়া আলেমা ভাসানীকে দিয়ে হবে না। রাজনীতির সহজ হিসাব বুঝতে বেশি কিছু লাগে না। অল্প কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ করলেই হয়। রাজনীতি সবাইকে দিয়ে হয় না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসতে চাননি। সময় ও পরিস্থিতি তাঁদের রাজনীতিতে এনেছে। জীবন এক বহতা নদী। সময় বয়ে যায় দ্রুত। জীবনযুদ্ধ মানুষকে টেনে নিয়ে যায় অনেক দূর। ৪০ বছর আগের বাস্তবতা আর এখনকার চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। উন্নতি, সমৃদ্ধি, প্রযুক্তি, শিক্ষা, চিকিৎসা সবকিছু বদলে গেছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় ইতিবাচক অধ্যায় তৈরি হয়েছে। আবার পাশাপাশি এর নেতিবাচক কাণ্ডকীর্তি  চারদিকে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। কেড়ে নিচ্ছে আমাদের আবেগ -অনুভূতি। স্বার্থপরতা মানুষের মাঝে তৈরি করছে ভয়ংকর নষ্টামি। সুবিধাভোগীরা দেখি সামাজিক মাধ্যম ভাসিয়ে ফেলছে। মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীতের বিরুদ্ধে সাইবারযুদ্ধ চলছে। কেউ দেখার নেই। বলার নেই। দলীয় এবং সরকারে পদ-পদবিধারীর সংখ্যার শেষ নেই। কিন্তু অভাব কর্মদক্ষ মানুষের। সরকারি দল দুর্বল হলে আমলাকুল শক্তিশালী হয়। সবকিছু নিজেদের দখলে নিয়ে যায়। আর তখনই সরকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। খলিফা হারুনুর রশিদের আমলের মতো দক্ষ মন্ত্রী পাওয়া যাবে বলছি না। কিন্তু আমলাদের সামাল দিয়ে মন্ত্রণালয় চালানোর মতো শক্তি রাখেন এমন মন্ত্রী থাকাটা জরুরি। মন্ত্রীদের চরম অদক্ষতা নিয়ে অনেক গল্প শুনি। সে আলোচনায় আজ যাচ্ছি না। প্রধানমন্ত্রীর একক সাফল্যের কারণে অনেক কিছু সাদা চোখে ধরা পড়ছে না। সমস্যাও হচ্ছে না। কিন্তু কোনো কারণে এদিক-সেদিক হলেই সমস্যা তৈরি হবে; যা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বললেন, দল ও সরকারে শেখ হাসিনার বিকল্প কে? এই অধ্যাপক মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একজন মানুষ। তবে তিনি দলকানা নন। বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনাকে পছন্দ করেন আমাদের মতো। আমি বললাম, আপনি বলুন। জবাবে বললেন, ‘আমার চোখে শেখ হাসিনার বিকল্প তিনি নিজে। অন্য কেউ নন।’ শুধু এই অধ্যাপক নন, দেশ-বিদেশের অনেক বন্ধু, সুহৃদ, প্রিয়জন একই প্রশ্ন করেন। জানতে চান। অনেক কূটনীতিকের কাছে একই প্রশ্ন শুনি। নিজেও অনেকের কাছে জানতে চাই শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার কে? সাদামাটা জবাব পাই। হিসাব-নিকাশ মেলে না। কাছ থেকে শেখ হাসিনাকে দেখেছি। তাঁর দক্ষতা, নেতৃত্বের সফলতা, কঠোর পরিশ্রমে তিল তিল করে আজকের বিশালত্ব সৃষ্টি করেছেন। এক দিনে কোনো কিছু হয়নি। বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনি একজন। টানা ক্ষমতায় থাকার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। বিরোধী দলে থাকার সময়ও কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন। ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, একুশে আগস্টের মতো ঘটনা বারবার মোকাবিলা করেছেন। কোনো কিছু তাঁকে থামাতে পারেনি। মাঠের রাজনীতিতে কখনো আবেগের উচ্ছলতা, আবার কখনো কঠোরতার মাঝে আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় এনেছেন। সাংগঠনিক বিশাল ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। বাস্তবতার সঙ্গে হিসাব-নিকাশ মেলাতে হবে।

অধ্যাপক সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সঙ্গে কিছুদিন আগে আমার অফিসে কথা হচ্ছিল। তাঁর কাছে দুটি প্রশ্ন করলাম- এক. ২০২৪ সালের নির্বাচনে কী হবে? দুই. শেখ হাসিনার বিকল্প কে?  তিনি বললেন, ‘এ মুহূর্তে বিকল্প আলোচনার দরকারই নেই। সময়ও আসেনি।’ তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন, ‘আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের বয়স কত? শেখ হাসিনার বয়স বাইডেনের সমান হোক। তারপর এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে।’ তিনি আরও বললেন, ‘শেখ হাসিনা এমন কোনো বুড়ি হয়ে যাননি যে তাঁর বিকল্প নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচন শেষ হোক। তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। তারপর দলের ভিতরে কথা হতে পারে। তখন হয়তো তিনি নিজেও ভাববেন বিকল্পের কথা।’

মোদাচ্ছের ভাইয়ের সঙ্গে কথোপকথনের পর একজন কূটনীতিক আমাকে প্রশ্ন করলেন, দল-সরকারে বিকল্প কে হবেন শেখ হাসিনার? জবাবে সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর রেফারেন্স টেনে এ উত্তরটাই দিলাম।

শেখ হাসিনা দূরদর্শিতা নিয়ে রাজনীতি করেন। তিনি জানেন তাঁর গন্তব্য কোথায়। ১৯৯৩ সালের মার্চের কথা মনে পড়ছে। ভোরের কাগজে কাজ করছি। শেখ হাসিনা তখন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা। সংসদ ভবনে তাঁর কক্ষে গেলাম। বললাম একটি সাক্ষাৎকার নিতে চাই। তিনি জানতে চান, ভোরের কাগজের জন্য? জবাবে বললাম, নেশন টুডে নামে একটি ইংরেজি পাক্ষিক ম্যাগাজিনে পুরোটা বের হবে। আপনার ওপর একটা কভার স্টোরি করবে। কিছু অংশ ভোরের কাগজে দেব। তিনি বিষয় জানতে চাইলেন। বললাম, আপনি বিরোধী দলের নেত্রী। ছায়া প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতায় এলে কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজাবেন, পররাষ্ট্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার নীতি কী হবে? পার্বত্য চট্টগ্রাম সংকট, রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধান কীভাবে করবেন, সেনাবাহিনীর বিষয়ে কী নীতিমালা হবে এসব নিয়ে। তিনি মন দিয়ে আমার কথা শুনছেন। আরও বললাম, ক্ষমতায় এলে কীভাবে সরকার সাজাবেন তা দেশ-বিদেশে তুলে ধরতে চাই। আরেকটা বিষয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের কিছু দূরত্ব আছে বলে অনেকে মনে করেন। আপনি ক্ষমতায় এলে যা করতে চান তা-ও প্রকাশ করতে চাই। একটি অংশ ভোরের কাগজে, সম্পূর্ণটা যাবে ইংরেজি ম্যাগাজিন নেশন টুডেতে। নেশন টুডের সম্পাদক জিল্লুর রহিম দুলাল বাকশালের মহিউদ্দিন আহমদের মেয়েজামাই। আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন জনসংযোগ কর্মকর্তা কাজী আখতার আহমেদ। পরে তিনি সচিব হন। নেত্রী বললেন, ‘বসো। টেপরেকর্ডার চালু কর।’ সাক্ষাৎকার শুরু হলো। এক ঘণ্টা পর নজীব আহমেদ ভাই তাগাদা দিলেন, ইফতারের সময় ঘনিয়ে আসছে। আমাদের সাক্ষাৎকার মাত্র জমে উঠছে। শেখ হাসিনা তুলে ধরছেন বাংলাদেশ ঘিরে তাঁর স্বপ্নগুলোর কথা।

আরও পড়ুন


দখল হয়ে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী লীলা নাগের বাড়ি

ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ: মাঠে যাওয়ার সময় আম্পায়ারদের গাড়িতে হামলা

১০ বছরের জেল হতে পারে নেতানিয়াহুর: ইসরাইলি আইনজীবী

এবার ফিলিস্তিনি নারীকে গুলি করে হত্যা ইসরাইলি বাহিনীর


নজীব ভাইয়ের তাগাদার পর বললেন, ‘চল বাসায়’। বিরোধী দলের নেতা হিসেবে তিনি তখন থাকতেন ২৯ মিন্টো রোডে। নেত্রীর সঙ্গে এলাম সে বাসায়। তিনি নামাজ পড়তে চলে গেলেন। একসঙ্গে ইফতার শেষ করলাম। ইফতারের টেবিলে ডিনারের ব্যবস্থাও ছিল। আমার পাতে খাসির মাথা দিয়ে রান্না করা বুটের ডাল তুলে দিলেন। বললেন, ‘এটা আমার রান্না।’ বড় বোনের মতো বিভিন্ন খাবার তুলে দিলেন। ইফতার শেষ করে চা খেতে খেতে সাক্ষাৎকার শুরু হলো আবার। তিনি ভিতরে গেলেন, লিখিত অনেক কাগজ এনে দিলেন। বললেন, ‘এস এ এম এস কিবরিয়া সাহেব আমার সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন। আরও কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও কূটনীতিক আছেন। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে আমার পরিকল্পনা রয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা, পার্বত্য শান্তিচুক্তির পরিকল্পনাসহ সব বিষয়ে চিন্তা করছি। নারী উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে। গ্রামীণ অর্থনীতি বদলাতে হবে।’ শুনছি আর বিস্মিত হচ্ছি। আমরা কয়েকজন সাংবাদিক সারা বাংলাদেশ ঘুরেছিলাম আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর সঙ্গে। বিস্ময় নিয়ে বললাম, আপা আপনি সব কাজ করে রেখেছেন। চিন্তাও করতে পারিনি এভাবে সবকিছু আপনার কাছে গোছানো আছে। তিনি হাসলেন। বললেন, ‘দেশে ফেরার পরই কাজ শুরু করেছি। ’৯১ সালের ভোটের আগের কাজগুলোকে আরও গুছিয়ে নিচ্ছি নতুন করে।’ সেই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছিল নেশন টুডেতে ‘পি এম ইন ওয়েটিং’ শিরোনামে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন হিসেবে। প্রচ্ছদের ছবি তুলেছিলেন পাভেল রহমান।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এলে কী করবেন শেখ হাসিনা সে পরিকল্পনা আগেই করে রেখেছিলেন। সেই দূরদর্শিতা এখনো ধরে রেখেছেন। তাঁর সঙ্গে সারা দেশ সফরের সময় বুঝেছি তিনি মানুষের মনের ভাষা বোঝেন। সে অনুযায়ী চিন্তা করেন। শেখ হাসিনা এখনো তা-ই আছেন। রাজনীতির জটিল দাবার চালে তিনি নিজেকে টানা ক্ষমতায় রাখছেন। সময়ের হিসাব-নিকাশে শেখ হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করে রেখেছেন। সবাই এভাবে পারে না। দেশ-বিদেশের নানামুখী ষড়যন্ত্রের কাছে হার মেনে যেতে হয় অনেককে। শেখ হাসিনা সবকিছু মোকাবিলা করেই এগিয়ে চলেছেন সামনের দিকে। কঠিন বাস্তবতা মোকাবিলা করে বাংলাদেশকে নতুন পথ দেখিয়েছেন। সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করেছেন দেশের অর্থনীতি। কী করে সব সম্ভব হচ্ছে এ প্রশ্নও আসছে। কারণ দুর্বল মন্ত্রিসভা। ভোট ছাড়া জিতে অনেক এমপি কর্মী ও দল বিচ্ছিন্ন। তারা মনে করছেন মানুষকে দরকার নেই। কর্মীদেরও প্রয়োজন নেই। হয়তো এ চিন্তা থেকে মন্ত্রী সাহেবদের অনেকে এলাকায় যান না। অনেক এমপিও এলাকার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। কেউ কেউ দলবিচ্ছিন্ন। অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে দুর্নীতি-অনিয়মের অভিযোগ। আবার কেউ কেউ নিজেকে টিকিয়ে রাখতে জামায়াত-বিএনপিকে ঠাঁই দিচ্ছেন। পদ-পদবি দিচ্ছেন। উপেক্ষা করছেন কর্মীদের। দুঃসময়ের নেতা-কর্মীরা হতাশ। তবে বঞ্চনার কথাও এখন আর কেউ বলেন না। আস্থা ও ভরসার একমাত্র ঠিকানাকে ঘিরেই এত সংকটের পরও আওয়ামী লীগ টিকে যায়।  কঠিন সময় সামাল দেয়। আমার চোখেও শেখ হাসিনার বিকল্প তিনি নিজে, অন্য কেউ নন। তার পরও নজরুলের  সেই কথা মনে রেখে চলতে হবে, ‘চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়’।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর

অদ্ভুত এক দুনিয়ায় বাস আমাদের

নঈম নিজাম

অদ্ভুত এক দুনিয়ায় বাস আমাদের

পরাজিত দিল্লি সম্রাট বাহাদুর শাহকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন আশ্রয়দানকারী এক ফকির। ইংরেজ কর্মচারী হাডসন দিল্লির রাজপথে গুলি করে হত্যা করেন সম্রাটের পুত্রদের। তারপর লাশ টানিয়ে রাখেন চাঁদনিচকের উন্মুক্ত স্থানে। হুমায়ুন সমাধিতে প্রথম পালিয়েছিলেন সম্রাট। ভেবেছিলেন ফকির-মিসকিন আর দরবেশদের কাছে নিরাপদ থাকবেন। সবাই দিল্লির বাদশাহকে আগলে রাখবেন।  কোনো সমস্যা হবে না। ইংরেজ সেনারাও টের পাবে না কিছুই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সরে পড়বেন। বাদশাহকে পরিবারসহ বিপদের দিনে এক মুসলমান ফকির আশ্রয় দিলেন। বাদশাহ কৃতজ্ঞতা জানানোর আগেই সেই ফকির বললেন, দিল্লির সম্রাটকে অতিথি করেছি আল্লাহপাকের ইচ্ছায়। না হলে এ সৌভাগ্যের অধিকারী কখনো হতে পারতাম না। আপনি আমাদের সঙ্গে থাকুন। কোনো সমস্যা নেই। নিজেকে নিরাপদ মনে করলেন বাহাদুর শাহ। কিন্তু না, কথা রাখলেন না ফকির। লোভে পড়ে সম্রাটকে ধরিয়ে দেন ইংরেজ সেনাদের হাতে। গ্রহণ করেন পুরস্কার। বিদায়ের সময় বাহাদুর শাহ হতবিহ্‌বল চোখে তাকিয়ে দেখলেন ফকিরকে। দুই চোখজুড়ে শুধুই বিস্ময়। বিশ্বাস আর আস্থার জায়গাগুলো এভাবে শেষ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সবারই আসা-যাওয়া ছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে। খুনি ডালিমকে কত দিন রান্না করে খাইয়েছিলেন। অদ্ভুত এক দুনিয়ায় বাস আমাদের। নিষ্ঠুরতার কারণে সমাজ-সংসারে আপন-পর চেনা যায় না। চারপাশের মানুষগুলো হুট করে বদলে যায়। মানুষই পারে গিরগিটির মতো নিজেদের বদলে ফেলতে। শেখ সাদি লিখেছেন, ‘হামা আজ দন্তে/গঁয়ের নলা কুনান্দ/সাদি আজ দন্তে/খেশতান ফরিয়াদ।’ অর্থাৎ ‘নিজের হাতই যখন নিজের গালে চড় বসিয়ে দেয়, তখন হে সাদি! অন্যের হাতে মার খাওয়া নিয়ে খেদ বা দুঃখ কী?’ বাহাদুর শাহ কোনো আফসোস করেননি আশ্রয়দানকারীর বিশ্বাসঘাতকতায়। বয়োবৃদ্ধ মানুষটি শুধু থমকে গিয়েছিলেন। বাহাদুর শাহকে ইংরেজ বেনিয়ারা নির্বাসনে পাঠায় রেঙ্গুনে। শেষ জীবনে নিঃসঙ্গ ছিলেন বাদশাহ। সময় কাটাতেন কবিতা লিখে। নিজের অসহায়ত্বের কথাই বেরিয়ে আসত সে কবিতায়। ভাগ্যবান মানুষ আমি। বাহাদুর শাহের মাজার জিয়ারতের সুযোগ পেয়েছিলাম। ইয়াঙ্গুনে বাহাদুর শাহের মাজার জিয়ারতের সময় বলেছিলাম, ‘হে আল্লাহ! এই মানুষটি দিল্লির সম্রাট ছিলেন। দুনিয়ার এই বাদশাহর শেষ জীবনটা ছিল কষ্টের। দুঃসময়ে আশ্রয়দানকারীর বিশ্বাসঘাতকতায় সন্তানদের হারিয়ে নির্বাসনের জীবন কাটাতে হয়েছিল বাদশাহকে। আপনি ভারতবর্ষের শেষ বাদশাহকে হেফাজতে রাখুন।’

সময় বয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে বদলে যায় পৃথিবীও। বিশ্ববাস্তবতায় ভেবেছিলাম করোনাকাল মানুষকে বদলে দেবে। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন চিত্র আগের চেয়েও জটিল হয়ে উঠছে। সমাজ ও ব্যক্তি জীবনে বেড়ে গেছে হিংসা-বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা। একদল মানুষ নিজেদের মনে করে ধোয়া তুলসী পাতা। পোপ, ধর্মগুরু বা মাদার তেরেসার আপন ভাইবোন। তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পড়লে তা-ই মনে হয়। অথচ তাদের ফেসবুক লেখনী পড়লে দেখতে পাই ঈর্ষা, হিংসা-বিদ্বেষ আর নোংরামি। নষ্টদের পৈশাচিক উল্লাসের শেষ নেই। মানবিকতা শেষ হয়ে গেছে। আগে কারও খারাপ খবরে ১০ গ্রামের মানুষ ছুটে আসত। এখন ১২ গ্রামের মানুষ নিষ্ঠুর আনন্দ পায়। আগে সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্রে মানুষের অস্তিত্ব পাওয়া যেত। উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিসিজম আকুল করে তুলত পুরনো দিনের মানুষগুলোকে। সেই গান, সেই সুর, সেই ছবি আর নেই। পূর্ণেন্দু পত্রীর কথোপকথনে মুগ্ধ হয় না এখনকার তারুণ্য। সুনীলের নীরার সন্ধানে কেউ বের হয় না এখন। সমরেশের কালবেলা, কালপুরুষ, উত্তরাধিকার নিয়ে আড্ডা নেই। চোখের জল ফেলে না কেউ শরৎ পড়ে। ফালগুনী, নীহাররঞ্জনের নামও হয়তো অনেকে শোনেনি। মাসুদ রানা, দস্যু বনহুর, কুয়াশা সিরিজেরও চাহিদা নেই। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই দিনগুলো কেউ জানি না। এখন চলছে এক টিকটক জমানা। মায়া-মমতার বালাই নেই। নোংরামি, অসুস্থতা, মাদকে হচ্ছে সর্বনাশ। শহীদ মিনারের ঘটনাটি ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। কী করে সম্ভব এক তরুণের নিজেকে নিজে শেষ করে দেওয়া।

সামাজিক, রাজনৈতিক, নৈতিক অবক্ষয়ের টিকটক প্রজন্মের যুগে ভালোবাসা, মায়া-মমতা কাউকে আঁকড়ে রাখতে পারছে না। কেউ জানে না ভালোবাসার জোর রাজা-বাদশাহর ক্ষমতার থেকে বেশি। সম্রাট শাহজাহান ভালোবাসাকে স্মরণীয় করতে তাজমহল নির্মাণ করেছেন। আবার সেই ভালোবাসার দৃষ্টান্ত তাজমহলের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তাঁরই পুত্র আওরঙ্গজেব। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ এনে আওরঙ্গজেব বন্দী করেন পিতাকে। শাহজাহানের স্বপ্ন ছিল যমুনার অন্য তীরে কালো পাথরের আরেকটি তাজমহল গড়ার। শুরু করেছিলেন। পারেননি। মানুষের সব স্বপ্ন কখনো পূরণ হয় না। আকবরপুত্র জাহাঙ্গীর বাদশাহি ছেড়ে বারবার বিদ্রোহ করেছেন, শুধু আনারকলির প্রেমের জন্য। সেই জাহাঙ্গীরের জীবনে আবার নূরজাহানও এসেছিলেন। ভালোবাসার কারণে এক জীবনে কত কিছুই হয়ে যায়। রাজা প্রজার ভালোবাসায় আবার অনেক ফারাক। দিল্লিবাসী একবার বিপাকে পড়েছিল সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলককে নিয়ে। একদিকে ছিল বাদশাহের ইমারত নির্মাণের কাজ, আরেকদিকে সাধারণ মানুষের পানি সমস্যা নিরসন। মানুষের পাশে ছিলেন একজন ফকির। বাদশাহি নির্দেশের চেয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ফকিরের ভালোবাসাই ছিল বেশি। সেই ফকিরের নাম নিজামুদ্দিন আউলিয়া। দিল্লিতে পানি সংকট নিরসনে নিজামুদ্দিন আউলিয়া সিদ্ধান্ত নিলেন জলাশয় খনন করবেন। আর গিয়াসুদ্দিন তুঘলক ব্যস্ত ছিলেন দিল্লির বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে। শহরের নিরাপত্তাপ্রাচীর নির্মাণের কাজে যোগ দিতে শ্রমিকদের নির্দেশ দিলেন বাদশাহ। বাদশাহের কাজে অর্থ মিলবে। আউলিয়ার কাজে শুধুই ভালোবাসা। শ্রমিকরা গোপনে দরবেশের আহ্‌বানে সাড়া দিতে থাকলেন। তারা শুরু করলেন জলাশয় খননকাজ। তুঘলক টের পাননি। জরুরিভাবে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমনে দিল্লি ছাড়লেন তিনি। পুত্র মুহাম্মদকে দিল্লি দেখভালের দায়িত্ব দিয়ে যান। জানিয়ে যান দ্রুত প্রাচীর নির্মাণকাজ শেষ করতে। সবাই জানতেন, গিয়াসুদ্দিন ছিলেন নিষ্ঠুর শাসক। তাঁর সাহস, শক্তি, বীরত্বের পাশাপাশি নিষ্ঠুরতা ছিল ভয়াবহ। তিনি কান্ডজ্ঞানহীনভাবে অনেক কাজ করতেন। যার আগামাথা খুঁজে পাওয়া যেত না। মন চাইলে কাউকে পুরস্কৃত করতেন আবার কারও কল্লা কাটতেন। এসব কান্ডকীর্তি নিয়ে প্রবাদ শুরু হয় ‘তুঘলকি কান্ড’। লোকমুখে এখনো কথাটি প্রচলিত।

সেই তুঘলকের ভয়কে এড়িয়ে দিল্লির শ্রমজীবী মানুষ যোগ দিলেন পানির জন্য জলাশয় খননে। বাদশাহর নগরপ্রাচীরের নির্মাণকাজ থমকে গেল। সাধারণ মানুষের জন্য জলাশয় খনন করে স্বস্তিতে ছিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়া। আউলিয়ার ভক্তকুল রাজদরবারেও ছিল। তাদের একজন এসে জানাল, অচিরেই দিল্লি ফিরছেন গিয়াসুদ্দিন তুঘলক। বিদ্রোহ দমনসহ ছোটখাটো সব ঝামেলা তিনি কঠোরভাবে দমন করেছেন। দিল্লি ফিরে তিনি নগরপ্রাচীর নির্মাণ না দেখলে ক্ষুব্ধ হতে পারেন। তাই ভক্তরা নিজামুদ্দিন আউলিয়াকে পরামর্শ দিল দিল্লি থেকে দূরে চলে যেতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার ফিরতে। সবার কথা শুনলেন নিজামুদ্দিন। তারপর ভক্তকুলের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘দিল্লি দূর অস্ত’। মানে, দিল্লি অনেক দূর। সবাই বাড়ি ফিরে গেল। কিন্তু মুরিদদের মনে শান্তি নেই। কারণ সুলতান দ্রুত ফিরে আসছেন। আর নিজামুদ্দিন আউলিয়া গুরুত্ব দিচ্ছেন না। উৎকণ্ঠা নিয়ে ভক্তরা প্রতিদিন আউলিয়ার সামনে গিয়ে হাজির হতো। তাদের আকুতি-মিনতি বাড়তে থাকল। তাদের এক কথা, আপনি সরে যান। তুঘলক নিষ্ঠুর মানুষ। আপনার সম্মান ক্ষুণ্ণ করবে। প্রতিবারই নিজামুদ্দিন একই জবাব দেন, দিল্লি দূর অস্ত। সর্বশেষ জানা গেল দু-এক দিনের মধ্যে সুলতান গিয়াসুদ্দিন ফিরছেন। তিনি দিল্লির কাছাকাছি। এবার সবাই দল বেঁধে গেলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সামনে। বললেন, তিনি কাছাকাছি চলে এসেছেন। এবার আর আপনার দিল্লিতে থাকার দরকার নেই। হাসলেন ফকির। তারপর হাতের তসবিহ ওপরে তুলে ধরে বললেন, ‘দিল্লি হনুজ দূর অস্ত’। দিল্লি এখনো অনেক দূর।

আরও পড়ুন

  আজিমপুর স্টাপ কোয়ার্টার থেকে ঢাবি ছাত্রীর লাশ উদ্ধার

  বুরকিনা ফাসোতে বন্দুকধারীদের হামলায় ১৩২ জনের বেশি নিহত

  আল-জাজিরার নারী সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করলো ইসরায়েলি পুলিশ, মারধরের অভিযোগ

  ৪ হাত, ৪ পা নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুটি সুস্থ আছে: চিকিৎসক

সব জল্পনার অবসান ঘটিয়ে সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলক দিল্লি আসেন। রীতি অনুযায়ী দিল্লির প্রবেশমুখে বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করা হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে। প্রথমে তিনি সংবর্ধনায় যোগ দেবেন। তারপর প্রবেশ করবেন দিল্লি শহরে। সেভাবেই সব আয়োজন। সুলতানের পুত্র মুহাম্মদ নিজে তদারকি করছিলেন সবকিছুর। সুলতান ফিরলেন বিজয়ীর বেশে। বিশাল শামিয়ানা, প্যান্ডেল করা হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের ভোজেরও ব্যবস্থা ছিল। রেওয়াজ অনুযায়ী শুরুতে ছিল অশ্বারোহী বাহিনী ও হাতির কুচকাওয়াজ। পুত্র মুহাম্মদ গিয়ে অনুমতি প্রার্থনা করলেন অনুষ্ঠান শুরুর। শাহেনশাহ অনুমতি দিলেন। মুহাম্মদ এগিয়ে গেলেন। মুহুর্তে একটি হাতির শিরসঞ্চালনে কাঠের পাটাতন ভেঙে পড়ল। শুরু হলো হুড়োহুড়ি। হাতিরা ছুটতে শুরু করল। পুরো ডায়াস ভেঙে লন্ডভন্ড। বড় বড় কাঠের থাম ভেঙে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটল। উদ্ধারকাজ শেষ করতে লেগে গেল একদিন। সুলতান গিয়াসুদ্দিন তুঘলক নিহত হলেন। সঙ্গে পুত্রও মারা গেলেন। গিয়াসুদ্দিন তুঘলকের জন্য দিল্লি আসলেই অনেক দূর ছিল। দিল্লি গেলে নিজামুদ্দিনের মাজারে যাই। নিজের মতো করে জিয়ারত করি। প্রার্থনা করি নিজামুদ্দিনে শুয়ে থাকা সবার জন্য। দিল্লিতে সুলতান গিয়াসুদ্দিনের স্থাপনাগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাজারে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে মানুষের ভিড়। সম্রাট শাহজাহানকন্যা জাহানারাকেও তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী নিজামুদ্দিনে সমাহিত করা হয়। জাহানারা বন্দী শাহজাহানকে দেখাশোনা করতেন। বাবার সেবাযত্নে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। অথচ এ শাহজাহানই কন্যা জাহানারার প্রেমকে মানতে পারেননি একদা। নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেন কন্যার প্রেমিককে। ভাইদের ঝগড়া-বিবাদ, আওরঙ্গজেবের হাতে ভাইদের মৃত্যু, শোকাহত বন্দী পিতাকে জাহানারাই সামাল দিয়েছেন। নিজামুদ্দিনে কবি গালিবের কবর রয়েছে। গালিব লিখেছেন, ‘দর্দ মিন্নতকশে দাওয়া না হুয়া/হাম না আচ্ছা হুয়ে বুরা না হুয়া’। অর্থাৎ, বেদনা নিধনের মিনতি করেনি/আমি ভালো হলাম না, মন্দ হয়নি।

মানুষ খুব দ্রুত বদলে যায়। চেনা মানুষগুলোর মুখ অচেনা হয়ে পড়ে অতি সহজে। আজকাল জগৎ-সংসার, খোলা আকাশটা কেমন যেন বিবর্ণ মনে হয়। বেতারে একসময় শিল্পী আবদুল আলীমের ভরাট কণ্ঠে শুনতাম, ‘এ সংসারে কেউ নয় আপনজনা/চিনে নে তোর আপনারে ওরে অবুঝমনা’।

সিরাজ সাঁইয়ের মুখে মানুষের কথা শুনে লালন তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। বিশ্বাস, ত্যাগ, ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজেকে। লালন বলেছেন, ‘এই মানুষে আছেরে মন, যারে বলে মানুষ রতন, লালন বলে পেয়ে সে ধন, পারলাম না চিনিতে’। মানুষের পরিবর্তনগুলো হয় খুব দ্রুত। ডিজিটাল দুনিয়ায় আপন-পর বলে কিছু নেই। আবেগ-অনুভূতির জায়গাগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ এখন নানামুখী বিরোধে আক্রান্ত। এ যুগে ফকির লালন বেঁচে থাকলে কী হতো জানি না। তবে এটুকু বলতে পারি, মানুষ তাঁকে শান্তি দিত না। ভালো থাকতে দিত না। কাজী নজরুল ইসলাম সেই যুগে চার সন্তানের নাম রেখেছিলেন, কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ বুলবুল, কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ।  কপাল ভালো, এ যুগে জন্ম নেননি নজরুল। আধুনিক যুগে ছেলের নাম কৃষ্ণ মুহাম্মদ রাখলে পরিণতি কী হতো জানি না।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর

রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রীদের কাজটা কী

নঈম নিজাম

রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রীদের কাজটা কী

বিনয় কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় লিখতেন যাযাবর নামে। অসাধারণ সেই কলমের গাঁথুনী এখনো ঝাঁকি দেয় আমাদের। যাযাবরের দৃষ্টিপাতের দুটি লাইন এখনো মনে গেঁথে আছে- ‘প্রেম জীবনকে দেয় ঐশ্বর্য, মৃত্যুকে দেয় মহিমা। কিন্তু প্রবঞ্চিতকে দেয় কী? তাকে দেয় দাহ। যে আগুন আলো দেয় না অথচ দহন করে, সেই দীপ্তিহীন অগ্নির নির্দয় দাহনে পলে পলে দগ্ধ হলেন কান্ডজ্ঞানহীন হতভাগ্য চারুদত্ত আধারকার।’

মানুষের জীবনে কত আক্ষেপ থেকে যায়। অভিনেত্রী কবরীরও আক্ষেপ ছিল।  সে আক্ষেপটা তিনি চলে যাওয়ার পর সামনে আসে। তিনি বলেছেন, ‘আমার একটা দুঃখ রয়ে গেল, জীবনে আমি একজন ভালো বন্ধু পেলাম না, ভালো স্বামী পেলাম না। সন্তানরা অনেকটা যার যার মতো করে আছে। কিন্তু সঙ্গ দেওয়ার মতো একজন ভালো মানুষ আমি পাইনি, যাকে বলতে পারি, এসো, এক কাপ চা খাই, একটু গল্প করি। এটাই হয়তো মানুষের জীবন। তবে মানুষের চাওয়ার তো শেষ নেই। মনে হয়, একজন বন্ধু যদি থাকত, তাহলে যখন-তখন তার সঙ্গ পেতাম। এই আনন্দটুকু আমি পাইনি। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আফসোস।’ মতিউর রহমানকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারটি পড়েছিলাম। নিজের অজান্তে হয়তো অনেক কথা বলে গেছেন। সুখ-দুঃখ শেয়ার করেছেন। এভাবে সবাই পারে না। সবাই বলে না। কবরী জীবনের আরেকটি বড় ঘটনাও সাক্ষাৎকারে নিয়ে আসেন। কিশোরী বেলায় তাঁকে ভালোবাসতেন একজন। কবরী জানতেন। কিন্তু তাদের সেই ভালোবাসার আর প্রকাশ ঘটেনি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিশাল অবস্থান পাওয়া কবরীকে একবার চট্টগ্রামের ফরিদাবাদ এলাকার একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি করা হয়। তিনি সে অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। যোগদানের কারণও ছিল। প্রথম জীবনের সেই ভদ্রলোক থাকতেন পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সেই এলাকায়। কবরী ভাবলেন তাদের দেখা হবে। তিনি গেলেন। কিন্তু অবাক হলেন অনুষ্ঠানে সেই ভদ্রলোককে না দেখে। অনুষ্ঠান শেষে একটি ছেলে এসে বলল, আপনি আমার বাবাকে চিনতে পারেন। তার নাম অমুক। তিনি খুব অসুস্থ। অনুরোধ করেছেন আপনি যদি একবার তাকে দেখতে যান। কবরী দেখতে গেলেন সেই ভদ্রলোককে। দীর্ঘদিন বিছানায় শুয়ে থাকা মানুষটি স্বাভাবিকভাবে কথা বললেন, মজাও করলেন পুরনো স্মৃতিগুলো নিয়ে। কবরী ঢাকা ফিরলেন। কিছু দিন পরই সেই ভদ্রলোকের মেয়ের ফোন পান। মেয়েটি জানায়, কবরীর সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক দিন পরই মারা গেছেন ভদ্রলোক। হয়তো এত দিন অসুস্থ হয়ে বেঁচেছিলেন যৌবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষটির সঙ্গে শেষ সাক্ষাতের অপেক্ষায়।

লড়াই করে বেঁচে থাকা মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। অনেক হিসাব-নিকাশ মেলানো যায় না। করোনাকালের শুরুতে বেশ কয়েকটি মৃত্যুর কথা জানি। ঢাকার বিত্তবান পরিবার। সন্তানরা থাকেন আমেরিকায়। করোনা হয়ে মারা গেলেন বাবা-মা। সন্তানরা কেউই আসতে পারলেন না শেষ মুহূর্তে। অংশ নিতে পারেননি দাফন, জানাজায়। শেষ দেখাটাও হয়নি। বড় কষ্টকর চারপাশের সব খবর। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের এ মুহূর্তে প্রতিদিন ফোন ধরতে ভয় করে। ফেসবুক খুলি মনের মাঝে অজানা আশঙ্কা নিয়ে। চারদিকে শুধু মৃত্যুর সংবাদ। কোনো ভালো খবর নেই। প্রিয় মানুষরা চলে যাচ্ছেন। জন্মের পর মৃত্যু অবশ্যই হবে। দাদি বলতেন, বিধির বিধান কে করিবে খন্ডন! বিধি যা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন তাই তো হবে। কিন্তু সবকিছু এমন কেন হবে? সেদিনের আরেকটি খবরে মনটা ভেঙে যায়। একাকিত্বকে সহ্য করতে না পেরে মুগদা হাসপাতালে একজন করোনা রোগী আত্মহত্যা করেছেন। নিজের সব ছিল। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা ছিলেন পরবাসে। আক্রান্তের পর দেখেছেন পাশে আপনজন কেউ নেই। আইসিইউতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিজেকে নিতে হচ্ছে। আল্লাহ নেওয়ার আগে নিজেই চলে গেলেন।

রাজধানীতে অনেক মানুষ একাকী থাকেন। আগে সময় কাটাতে কেউ যেতেন মসজিদ, মন্দিরে। কেউ যেতেন ক্লাবে। শেষ বয়সে স্বামী স্ত্রীর নিঃসঙ্গ জীবন। সন্তানরা থাকেন বিদেশ। অধ্যাপক ড. তারেক শামসুর রেহমানের বেলায়ও তাই হয়েছিল। বুকভরা একাকিত্ব নিয়েই চলে গেছেন। স্ত্রী ও মেয়ে থাকতেন আমেরিকায়। অনেক দিন থেকে ভদ্রলোককে জানি। ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় ২০০০ সালে এটিএন বাংলায় কাজ করার সময়। তখনো এটিএনে নিউজ চালু হয়নি। তিনি একটা টক শো করতেন। আমি করতাম আরেকটা। মাঝে অনেক দিন সাক্ষাৎ নেই। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা হতো। কথা হতো। কিছু দিন আগে হঠাৎ মনে পড়ল। নিউজ টোয়েন্টিফোরের মেহমুদকে বললাম তারেক শামসুর রেহমানকে ফোন দাও। মোদি ইস্যুতে টক শোয় আনো। মেহমুদ ফোন করে অনুরোধ করলেন। আমার কথাও বললেন। তিনি আপাতত কোনো অনুষ্ঠানে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে আসবেন বলে জানান। সেই মানুষটি হুট করে চলে গেলেন। উত্তরায় থাকতেন একাকী। পুলিশ তালা ভেঙে লাশ উদ্ধার করেছে। হায়রে মানুষের জীবন! এমন মৃত্যু কাম্য নয়।

যা কাম্য নয় এখন তাই হচ্ছে। করোনাকাল আমাদের সবকিছু বদলে দিয়েছে। জানিয়ে দিয়েছে এ অসুখটি হলে কেউ পাশে থাকবে না। সবাই সরে যাবে। মৃত্যুর সময় অসুস্থ মানুষটি দেখবেন তিনি একা। প্রিয়জনদের কেউ হাতটি ধরে বসে নেই। আইসিইউতে যাওয়ার মুহূর্তে কেউ পাশে নেই। অবস্থার আরও অবনতি হলে একাকী যেতে হবে লাইফ সাপোর্টে। চিকিৎসক, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করবেন আত্মীয়-পরিজনের সঙ্গে। তারা বলে দেবেন লাইফ সাপোর্ট খুলে নিন। তারপর দায়সারা দাফন-কাফন। করোনা আক্রান্তদের দাফনে অনেক প্রতিষ্ঠান হয়েছে। লাশটি নিয়ে যায় বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। তারপর দাফনকাজ সম্পন্ন করে। আপনজন কেউ থাকে না। জীবনের শেষ আক্ষেপ শোনানোর মতো কেউ থাকে না। অনেক দাপুটে মানুষ নীরবে চলে গেছেন। দেখা গেল, হাঁটতে হাঁটতে হাসপাতালে প্রবেশ করছেন। বের হচ্ছেন লাশ হয়ে। মৃত্যুর পর স্বজনদের হিসাব-নিকাশ সম্পদের ভাগাভাগি। সেরা চিকিৎসকরা এখন অসহায়। তারাও জীবন দিচ্ছেন। আল্লাহর দুনিয়ায় কোনো কিছুরই স্থায়িত্ব নেই। হুটহাট করে শুধুই শেষ বিদায়ের খবর। সারাক্ষণই মৃত্যুসংবাদ।

গেল বছর এমন সময়ে আক্রান্ত ছিলাম। তখন করোনা মানে ভয়াবহ আতঙ্কের বিষয়। কেউ কারও নয়। হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। আপনজনদের সহানুভূতি নেই। সন্তান ফেলে দিচ্ছেন করোনা আক্রান্ত মাকে। পাড়া-পড়শি পিটিয়ে মারছে রোগীকে। বাজে একটা অবস্থা। শুধু মুগদা আর কুর্মিটোলা হাসপাতাল রোগী নিত। কারও বাড়িতে করোনা হলে লাল পতাকা টানিয়ে দেওয়া হতো। গ্রামে কেউ কোয়ারেন্টাইনে গেলে ১০ গ্রামের মানুষ ভিড় জমাত কোয়ারেন্টাইন দেখতে। এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তখনকার মহাপরিচালক বলেছিলেন, সহজে করোনা যাবে না। মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে তুলাধোনা করল। তাই ভয়ে ভয়ে পরিবার আর দু-চার জন বন্ধুবান্ধব-সহকর্মী ছাড়া কাউকে প্রথম করোনার খবর জানালাম না। অফিস সহকর্মীরা অনুমান করলেন। আমি হোম অফিস করছিলাম। ভাবখানা এমন আমার কিছু হয়নি। অদ্ভুত আঁধারে দেশ। এক কঠিন ভয়াবহ পরিস্থিতি। আমরা সে পরিস্থিতি পার করেছি। দেখতে দেখতে দিন চলে যায়।

মানুষ বুঝে গেছে মহামারীর সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হবে। জীবনের সঙ্গে চলবে জীবিকার লড়াই। এ লড়াইতেও তৈরি হচ্ছে নানামুখী জটিলতা। সে জটিলতায় তিনজন দায়িত্ববান মানুষকে রাজপথে ক্ষমতার দম্ভ করতে দেখলাম। কার কত ক্ষমতা সবাই নিজেরটার জানান দিচ্ছিলেন। সবার বাবাই মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। সবাই সরকারি কর্মকর্তা। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হওয়া অবশ্যই গর্বের বিষয়। এ নিয়ে কারও কারও ট্রল করাটা বাজে মনে হয়েছে। আবার সেই তিন কর্মকর্তাও এভাবে চিৎকার না করলেও পারতেন। মানুষের সামনে সম্মানিত অবস্থানে থেকে নিজেদের এভাবে ছোট কেন করবেন? সম্মান ও মর্যাদা কাজের ওপরই নির্ভরশীল। অন্য কোনোভাবে নয়। এ আমলে অনেকে অকারণে নিজেদের জাহির করেন। বিশেষ করে ২০১৯ সালের ভোটের পর এ প্রক্রিয়াটা বেশি দেখছি। এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণযোগ্য নয়। ক্ষমতা দুই দিনের। মহামারী জানিয়ে দিয়েছে দুনিয়াটা আসলেই ক্ষণস্থায়ী। ক্ষমতার বড়াই করে কী হবে? পেশাগত জীবনে অনেক মন্ত্রী, এমপি, দাপুটে সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ক্ষমতাধর, আমলা কামলা দেখেছি। ক্ষমতায় থাকাকালে কথা বলতে পারেন না অহংকারে। ক্ষমতা শেষ হলে বিড়ালের মতো চুপসে যান। কথাও বলেন চোরা চোরা চোখে। বছর তিন আগের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি আধুনিক মানুষ। চিন্তা-চেতনায় প্রগতিশীল। টক শোয় বড় বড় কথা বলেন। তিনিই আমাকে প্রথম বললেন হেফাজত ক্ষমতার স্বপ্ন দেখে। সংসদে যেতে চায়। তিনিসহ অনেক শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। আগামী নির্বাচন ঘিরে তাদের একটা স্বপ্ন আছে। বুঝতে পারলাম হেফাজত একদল সাদাকালো বুদ্ধিজীবীর কবলে পড়েছে। সর্বনাশা বুদ্ধি নিয়ে বারোটা বাজাবে নিজেদের এবং দেশের। কিছু মিডিয়ার পন্ডিত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অধ্যাপক সাহেবরা কী পরামর্শ দিয়েছিলেন জানি না। রাজনৈতিক দলের একটা স্বচ্ছতা থাকে। অরাজনৈতিক জঙ্গি ধ্বংসাত্মক চিন্তায় দেশের জন্য কিছু করা যায় না। তারা ভেবেছিল সমঝোতার ভাবে থেকে যা খুশি তা করতে পারবে। সরকার উচ্ছেদের ঘোষণা দিতে পারবে, মিডিয়ার গাড়ি ভাঙচুর, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, নারী সাংবাদিককে হেনস্তা, ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিচিহ্ন পোড়াতে পারবে। কেউ কিছু বলবে না। কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ওপর প্রথম আঘাত হেনে ঔদ্ধত্যের সূচনা। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ হলে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়ার ঘোষণাসহ অনেক কান্ড ঘটিয়েছেন। আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। ভেবেছেন সমঝোতার নামে সরকারের কাছ থেকে অনেক নিয়েছেন। হুমকি-ধামকি তান্ডব করে ক্ষমতা নেবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে শেখ হাসিনা লাগাম টেনেছেন। হেফাজত এখন টের পাচ্ছে বাস্তবতা কঠিন। প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, ‘বাঘে ধরলে ছাড়ে, শেখ হাসিনা ধরলে ছাড়েন না।’

আরও পড়ুন


বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ৩১ লাখ ছাড়ালো

বিচারক পরিচয়ে প্রেম, অত:পর ধর্ষণ

দোকানপাট-শপিংমল খুলছে আজ

১৭০ অভিবাসী নিয়ে লিবিয়া উপকূলে নৌকাডুবি


সেদিন এক বন্ধু ফোন করলেন। বললেন, কান্ড দেখেছেন, মামুনুল হক আটকের পর সারা দেশে কোনো সভা-সমাবেশ হয়নি। অথচ সে রাতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সয়লাব মিছিল বিক্ষোভের ভিডিও আর ছবি দিয়ে। কী কারণে এ মিথ্যাচার জানি না। সরকার প্রথম দুই দিন ঘুমিয়ে ছিল। পরে অবশ্য র‌্যাব-পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে গুজব ছড়ানোর দায়ে। ডিজিটাল দুনিয়া এখন আওয়ামী লীগের বিরোধী শিবিরের হাতে। যা খুশি তা হচ্ছে, দেখার কেউ নেই। এমনকি পাল্টা জবাবও নেই। আইসিটির টপ আমাকে বার্তা দিলেন, এসব দেখার দায়িত্ব তাঁর নয়, অন্যদের। যৌক্তিক কথা। রাজনৈতিক সরকারের মন্ত্রীদের কাজটা কী? কিছু দিন আগে জিটিভিতে ধারাবাহিক রিপোর্ট দেখছিলাম আইসিটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পে লুটপাট কীভাবে হয়। কাজ না করেই ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে কীভাবে বিল নিয়ে যায়। রিপোর্টার সংশ্লিষ্ট ঠিকানা ঘুরে ঘুরে কাজ না করে বিল নেওয়া কাউকে পাননি। এ রিপোর্ট দেখার পর বুঝতে পারলাম আইসিটির কাজ কী! ভালো। আদবকায়দা দেখিয়ে সবাইকে বিমোহিত করে রাখাও একটা বড় সাফল্য।

অনেক দিন পর ’৯৬ সালের সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের কথা মনে পড়ছে। দাপট আর ক্ষমতার শেষ ছিল না। চোখের সামনে দেখেছি নাঙ্গলকোটের এমপি জয়নাল আবেদীন ভূইয়া আর মির্জা আজম তথ্য প্রতিমন্ত্রীর অফিসে গেলেন। তিনি অফিসে থেকেও দুই এমপিকে ঢুকতে দেননি। সে সময় তিনি অন্য গল্পগুজবে ছিলেন। সরকারের মেয়াদ শেষে বিএনপি বানাল ‘শাবাশ বাংলাদেশ’। আওয়ামী লীগবিরোধী সর্বোচ্চ ভিজুয়াল প্রচারণা। কাজ করতাম এটিএন বাংলায়। একদিন আমার কাছে এলেন সাবেক কূটনীতিক মাহমুদ আলী (গত মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) ও যুগ্মসচিব আজিবুর রহমান (পরে তথ্য কমিশনার)। দুজনই বললেন, নেত্রী পাঠিয়েছেন শাবাশ বাংলাদেশের পাল্টা কিছু করার জন্য। আমার পরামর্শ চান তারা। বললাম, সাইয়িদ সাহেবের কাছে যান। তিনি মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। জবাবে দুজনই বললেন, তিনি কিছু করেননি। ভোট করতে গেছেন এলাকায়। সে ভোটে অবশ্য হেরেছিলেন। তাদের নিয়ে গেলাম সৈয়দ বোরহান কবীরের অফিসে। বানানো হলো ‘জয় বাংলার জয়’। এটিএন বাংলায় দুটি অনুষ্ঠানই প্রচার হয়। কিন্তু ‘শাবাশ বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠানটি দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়ে নির্মাণ করা। হঠাৎ তৈরি করা ‘জয় বাংলার জয়’ কোনো অবস্থানই পেল না দর্শকের কাছে। এখনকার মন্ত্রী সাহেবরা দায়িত্ব নেন না। তারা ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ নীতিতে আছেন। সবাই তাকিয়ে থাকেন একজনের দিকে। তারা বোঝেন না দায়িত্ব দিলে পালন করতে হয়। তাদের আগেও অতীতে অনেকে দায়িত্ব পেয়েছিলেন। আর দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করার কারণেই ছিটকে পড়েছেন। ’৯৬ সালের দিকে গেলাম না। ২০০৯ সালের পর থেকে কত মন্ত্রী এলেন-গেলেন হিসাব নেই।

বঙ্গবন্ধুর মেয়েকে কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর মন্ত্রীরা দায়িত্ব না নিলেও তিনি সবকিছুরই দায়িত্ব নেন। কোনো কিছু পাশ কাটিয়ে যান না। সংকট-সমস্যা, জীবন-মৃত্যু কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেন না। এ মুহূর্তে মহামারীর কারণে হয়তো তিনি বের হন না। কিন্তু সবকিছুই মনিটর করেন কঠোরভাবে। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন নির্ভীকচিত্তে। একটা নিজস্ব ক্যারিশমা ও স্টাইল নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন। ধরে রেখেছেন সবকিছু। তাঁর পথচলা হাজার কিলোমিটার গতির। জানেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত কর্মী বাহিনী তাঁর পাশে আছে, থাকবে।  বিপদ দেখলে সবাই ভিতরের হতাশা কাটিয়ে তাঁর প্রশ্নে আরও আপসহীন হবেন।

লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর

রাজনীতিতে ভুল হলে খেসারত দিতে হয়

নঈম নিজাম

রাজনীতিতে ভুল হলে খেসারত দিতে হয়

আমার দাদি বলতেন, জোড়াতালির ঘর, আল্লাহ রক্ষা কর। সেদিন এক চিকিৎসক বন্ধু ফোন করলেন। বললেন, হেফাজত কিন্তু আওয়ামী লীগ, বিএনপির চেয়ে আধুনিক দল। তাদের স্মার্ট বক্তব্য-বিবৃতির প্রশংসা করতে হয়। থ মেরে গেলাম। বলে কী! বন্ধু আরও বললেন, এরশাদের জাতীয় পার্টি এমনকি বামদেরও শেখার আছে। এরশাদ যা পারেননি মামুনুল সাহেব তা করিয়ে দেখিয়েছেন।  এবার আর পারলাম না। বললাম, রহস্য কী? হঠাৎ মামুনুল হকের দলের এত প্রশংসা কেন? জবাবে বন্ধু বললেন, বাস্তবতায় আসুন। চিন্তা করুন একবার, মামুনুলকান্ড আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে ঘটলে কী হতো?  কোনো অবস্থান থাকত না কারও। ধরে নিন, এ দলগুলোর  জাতীয় পর্যায়ের মাঝারি বা উচ্চ কোনো নেতা আবেগে পড়ে এমন কিছু ঘটালেন। তারপর প্রথম বহিষ্কারের প্রস্তাবটা আসত নিজ দলের ভিতর থেকে। নেতা-কর্মী সবাই মিলে আক্রমণ করতেন সেই নেতাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে করতেন তুলাধোনা। বাধ্য হয়ে বহিষ্কার করত দল। তার পরও নেতা-কর্মীদের লেখালেখি চলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অন্য দলের প্রয়োজন পড়ত না। নিজ দলের হাতেই হতো সব সর্বনাশ।

হেফাজতে ইসলাম এখানে অতি আধুনিক একটি প্রতিষ্ঠান। তাদের সার্বিক বক্তব্য-বিবৃতি, সমর্থন, কান্নাকাটি পশ্চিমাদেরও হার মানিয়েছে। বাবুনগরী সাহেব দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করলেন। তারপর বললেন, রিসোর্টকান্ড মামুনুলের ব্যক্তিগত বিষয়। আহা! কী চমৎকার কথা। পশ্চিমা দুনিয়ায় এমন মন্তব্য-মতামত শোনা যায়।  এভাবে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বলতে পারবে না। আর পারলেও মানুষ মেনে নেবে না। শুধু বাবুনগরী নন, মামুনুল সাহেব নিজেও টেলিফোন কথোপকথন অস্বীকার করেননি। বরং বলেছেন, সবকিছু তার নিজের ব্যক্তিগত বিষয়। টেলিফোন কথোপকথন ও রিসোর্টকান্ডে সরকারি হস্তক্ষেপের নিন্দাও করেছেন তিনি। বিষয়গুলো অনেকের খারাপ লাগলেও আমার পছন্দ হয়েছে। এত আধুনিকতা বিএনপি, আওয়ামী লীগে নেই। তারা হতেও পারবে না। বন্ধুর কাছে জানতে চাইলাম, হেফাজত নিজের বেলায় আধুনিক পরের বেলায় থাকবে তো?  বন্ধু বললেন, বলা কঠিন। নিজের বেলায় সবাই সুনসান, পরের বেলায় ঠনঠন।

আল কোরআনের সুরা বাকারার ৪২ নম্বর আয়াতে বলা আছে, ‘ওয়ালা-তালাবিসুল হাক্বক্বা বিলবা ত্বিলি ওয়া তাকতুমুল হাক্বক্বা ওয়া আনতুম তা’লামুন।’ অর্থাৎ ‘মিথ্যার রং ছড়িয়ে সত্যকে সন্দেহযুক্ত বানাবে না এবং জেনে বুঝে সত্য গোপন করবে না।’ আল্লাহ মাফ করুন সবাইকে। যেভাবে মাটি কামড়িয়ে অবস্থান নিয়েছেন সবাই মিলে, সব অপকর্মের পক্ষে সাফাই গাইছেন, নজিরবিহীন। আগামী দিনে তাদের পুরস্কার দেওয়া উচিত। আর আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির কর্মীদের শেখা উচিত কীভাবে নেতাদের বাজে সময়ে পাশে থাকতে হয়। চিকিৎসক বন্ধু বলেছেন, সবকিছু ইতিবাচকভাবে নিন। গান্ধীবাদে সবকিছু ইতিবাচকভাবে নেওয়ার কথা আছে। হেফাজত নেতারা কেন মামুনুলকে বহিষ্কার করেননি? এ নিয়ে বন্ধুর কাছে শোনা গল্পটা তুলে ধরছি : শীতকালে গ্রামের এক মসজিদের ইমাম সাহেব ভোরবেলায় উঠে অজু করতে গেলেন পুকুরের ঘাটলায়। তিনি খেয়াল করলেন পুকুরের আরেক তীরে আরেকজন হাত-পা পরিষ্কার করছেন। খুশি হলেন ইমাম সাহেব। ভাবলেন, জগতে ইমানদার মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর মধ্যে এ শীতের ভোরেও একজন উঠেছেন নামাজ আদায় করতে! খুব ভালো। ইমাম সাহেব খুশি হলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন এ মানুষটির হায়াত বাড়ানোর জন্য নামাজের পর আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করবেন। অন্যদিকে পুকুরের অন্য পাড়ের মানুষটা ছিলেন এলাকার নামকরা চোর। সারা রাত চুরি করে বাড়ি ফেরার পথে হাত-মুখ পরিষ্কার করতে পুকুরে নেমেছেন। দিনের বেলায় এই চোরা শুধুই ঘুমায়। রাত হলে শুরু হয় তার সব কাজকারবার। এই ভোরে পুকুরের অন্য তীরে আরেকজনকে দেখে মন খারাপ হলো চোরের। তার ধারণা এ গ্রামে চোরের সংখ্যা বেড়ে গেছে। আয়-রোজগারে এবার টান পড়বে। রুটিরুজি নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেন চোর। সিদ্ধান্ত নিলেন দিনের বেলায় তদন্ত করে দেখবেন। তারপর ব্যবস্থা নেবেন। বন্ধু গল্প শেষ করে বললেন, হেফাজতেরও হয়েছে তাই। মামুনুলকে বহিষ্কার করছেন না সিনিয়র নেতারা। তাদের নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে ভয় আছে। দলে মামুনুলের প্রভাব অনেক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সক্রিয়। চিন্তাধারায় অন্যদের চেয়ে আধুনিক। তিনি মুখ খুললে অন্য নেতারা বিপদে পড়তে পারেন। এত ঝামেলার কী দরকার? তার চেয়ে সবাই মিলেমিশে থাকাই ভালো।

এবার আমার বন্ধু সরকারের ওপর এক হাত নিলেন। বললেন, ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের কথা আমরা জানি। তৈরি করা দানবের হাতে খুন হন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন পরিবার। ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ইতিবাচক চিন্তায় দানব তৈরি করেছিলেন। হয়েছে বিপরীত। এ জগতের হিসাব-নিকাশ বড় কঠিন। সবকিছু একরকম হবে এমন কথা নেই। অনেক সময় মানুষ শেষ হয়ে যায় নিজের সৃষ্টির হাতে। ক্ষমতাবানরা সাদা চোখে প্রতিপক্ষ মনে করেন একজনকে। বাস্তবে প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠেন আরেকজন। মহাভারতে এমন উদাহরণ অনেক। নিয়তির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ ১২ বছর টানা ক্ষমতায়। ওভার কনফিডেন্স তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলটি জিম্মি হয়েছে সুবিধাভোগী চক্রের কাছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের দরকার ছিল। সুবিধাবাদী, অতি উৎসাহীরা তা করতে দেয়নি। আর দেয়নি বলে অপশক্তিগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। হেফাজতকে লালনপালন করে আজকের অবস্থানে এনেছেন সরকারের ভিতরের কেউ কেউ। অনেকে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন। এতে তাদের কারও মাঝে আফগান, ইরান স্টাইলের স্বপ্ন তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে সুবিধাবাদী আওয়ামী লীগাররাও ব্যস্ত সময় পার করছেন নিজেদের বাণিজ্য নিয়ে। ডিজিটাল দুনিয়া এখন হেফাজত কর্মীদের দখলে। আইসিটির ক্ষমতাবানরা ব্যস্ত কামাই রোজগারে। ভাব দেখান ভাজা মাছ উল্টে খেতে পারেন না। কিন্তু কাজকারবারে বড়ই ওস্তাদ। জানি না আইসিটির এ বসরা ডিজিটাল দুনিয়ার প্রচারণাগুলো দেখার সুযোগ পান কি না। আইসিটি দুনিয়ায় সরকারবিরোধী সবচেয়ে বেশি প্রচারণা চলছে এখন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা হচ্ছে। আর আইসিটির ক্ষমতাবানরা তামাশা দেখেন, জেগে জেগে ঘুমান। সরকারে ঘুমানো মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের সঙ্গে যোগ হয়েছে নবাগত বহিরাগত, হাইব্রিডের ঘাপটি মেরে থাকা গ্রুপগুলো। ওরা ভালো সময় দেখলে আহা বেশ বেশ করে। আর খারাপ সময়ে ঘাপটি মেরে থাকে।

রাজনীতির কিছু হিসাব-নিকাশ থাকে। তাতে একবার ভুল হলে খেসারত দিতে হয়। ভুলের চক্রবাকে পড়ে বিএনপিকে এখন শুধুই সময় গুনতে হচ্ছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে ক্ষমতায় থাকাকালে ভুল রাজনীতির কবলে ছিল বিএনপি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, জঙ্গি উত্থান, চট্টগ্রামে ট্রাকে ট্রাক অস্ত্র আটক, বগুড়ায় গোলাবারুদ উদ্ধার, শাহ এ এম এস কিবরিয়া, আহসান উল্লাহ মাস্টার, নাটোরের মমতাজ উদ্দিন হত্যাকান্ড আন্তর্জাতিক দুনিয়া থেকে বিএনপিকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। সে বিচ্ছিন্নতা থেকে বিএনপি এখনো বেরোতে পারেনি। কবে পারবে নিজেরাও জানে না। অন্যদিকে বিএনপিকে দমনপীড়নে রেখে শাপলা চত্বরের ঘটনার পর আওয়ামী লীগ ছাড় দিয়েই সম্পর্ক করেছিল হেফাজতের সঙ্গে। আওয়ামী লীগের ছাড়কে তারা দুর্বলতা হিসেবে নিয়েছে। হেফাজত নেতারা ভুল করেছেন অন্যখানে। তারা বঙ্গবন্ধুর মেয়েকে চেনেন না। শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শেষ ঠিকানা। উদারতা দেখানো মানে তিনি দুর্বল নন। আর বাংলাদেশ ইরান আর আফগান নয়। বাংলাদেশের জন্ম অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর ভিত্তি করে। বঙ্গবন্ধু এ দেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন। শেখ হাসিনা তাঁর মেয়ে।

আরও পড়ুন


দিনমজুরের ছেলের হার্ট অপারেশনের ব্যবস্থা করলেন শামীম ওসমানের স্ত্রী

করোনায় ঢাবি অধ্যাপক নজরুল ইসলামের মৃত্যু

হাসপাতালে বেড না পাওয়ায় হতাশ করোনা রোগীর আত্মহত্যা

দেশের সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতালের উদ্বোধন আজ


ভুলে গেলে হবে না সুফি-সাধক, অলি-আউলিয়ারা এ দেশে ধর্ম প্রচার করেছেন। চাইলেই জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ সবকিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেবে তা সম্ভব নয়। এমন স্বপ্ন দেখা সাময়িক হতে পারে, দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। মামুনুল হকেরা ভুলে গেছেন, তাদের চেয়ে বড় দাম্ভিক ছিলেন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। মুহূর্তে সে অহংকার তছনছ হয়ে গিয়েছিল। আলী আহসান মুজাহিদ কম যেতেন না। নির্বাচন কমিশন অফিস থেকে বের হয়ে দম্ভ করে বলেছিলেন, পারলে আমাদের কিছু করুন। বুঝতে চাননি রাষ্ট্রের চেয়ে কেউ বেশি ক্ষমতাশালী নন। এ দেশে বাস করবেন আর জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, সংবিধান মানবেন না হতে পারে না। রাষ্ট্রে বসবাস করতে হলে আইনকানুন মেনেই চলতে হয়। আর তা না মানলে রাষ্ট্রের অধিকার আছে কঠোরতায় যাওয়ার। শেখ হাসিনাকে হুমকি দিয়ে, দাম্ভিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে যা খুশি করার সুযোগ নেই।  মাদানি হুজুরের বয়ান দেখছিলাম ইউটিউবে। গ্রোথ হরমোনের কারণে ছোটখাটো রফিকুল ইসলাম মাদানি যা খুশি বলতেন। তিনি বলেছেন, ‘কীসের সংবিধান! কীসের প্রেসিডেন্ট! কীসের প্রধানমন্ত্রী! আমি সংবিধান, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী মানি না।’ হেফাজত তাকে বাজারে ছেড়েছিল পরিস্থিতি গরম করতে। ময়মনসিংহে আরেকজন বক্তব্য দিলেন জবাই করার আহ্বান জানিয়ে। উসকানিমূলক ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যের একটা সীমা আছে। সীমা অতিক্রমকারীকে আল্লাহও পছন্দ করেন না। রাষ্ট্রকে হুমকিদানকারীদের সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক হতে হবে। আইনের শাসনের ব্যত্যয় কেউ ঘটালে অবশ্যই ব্যবস্থা নিতে হবে।

ইতিহাসের দিকে তাকান। এ দেশ জঙ্গিবাদের জন্য নয়। সাধারণ মানুষের আস্থা-বিশ্বাস আছে ধর্মের প্রতি। কিন্তু কেউ ধর্মান্ধ নয়। ধর্মকর্ম পালন করে সবাই। আবার সংস্কৃতির উৎসবেও যায়। ধর্মের নামে অতীতে অনেক কিছু করার চেষ্টা বহুজন করেছেন। মুফতি হান্নানরা পারেননি। মানুষ ধর্মভীরু। কিন্তু ধর্মের অপব্যবহার কেউ মানে না। সাময়িক উত্তেজনা তৈরি করা যায়। এর বেশি না। সরকারকে পছন্দ অনেকের না-ও হতে পারে। সরকারের অনেক কর্মকান্ডের আমিও সমালোচক। নেতিবাচক কর্মকান্ডের সমালোচনা, আন্দোলন-সংগ্রাম অবশ্যই করার অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু কথায় কথায় উসকানি, খুনখারাবির আহ্বান, জ¦ালিয়ে-পুড়িয়ে সব শেষ করে দেওয়ার প্ররোচনাকারীদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় রাষ্ট্রই থাকে না। শাসকদের সঙ্গে সক্রেটিসের মেলেনি। তিনি কঠোর সমালোচনা করতেন শাসকদের। আর এ কারণেই সক্রেটিসকে মিথ্যা অজুহাত তুলে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছিল। সক্রেটিসের ভক্ত-অনুসারীরা অনুরোধ করেছিলেন তাঁকে পালিয়ে যেতে। সক্রেটিস আইনকে মহান মেনেই পালাননি। মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছিলেন। শাসকদের কারণে আইনের অপপ্রয়োগের শিকার হয়েছিলেন সক্রেটিস। বিষের পেয়ালা তুলে নিয়েছিলেন। সংবিধান, রাষ্ট্র, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী না মানলে বাংলাদেশ ছাড়ুন। জানি দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের জন্য কোনো অবদান আপনাদের নেই। আর নেই বলেই রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখান। অনেক হয়েছে। এবার থামুন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করুন, জাতীয় সংগীত পরিবেশন করুন নিজেদের প্রতিষ্ঠানে। আগে প্রমাণ করুন বাংলাদেশকে ভালোবাসেন। তারপর লম্বা লম্বা কথা বলুন। জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা, সংবিধান, মুক্তিযুদ্ধকে মানতে হবে।  আর না মানলে চলে যান অন্য কোথাও। এ দেশে আপনাদের  কোনো অধিকার নেই।

লেখক: লেখক: সিইও, নিউজ টোয়েন্টিফোর ও সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

news24bd.tv আহমেদ

পরবর্তী খবর